সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা: প্রথম পর্ব

Comments
।। রাহমান চৌধুরী ।।

মহাভারত, ইলিয়ড অডিসি এ যুগে লেখা হলে আর পাঠক পাওয়া যেতো না। প্রকাশক তো নয়ই। শুধু মহাভারত আর ইলিয়ড অডিসি কেন, যদি প্রাচীন গ্রিক নাট্যকাররা তাঁদের নাটক এ যুগে বসে লিখতেন, পাঠক দু-চারজন মিললেও মঞ্চস্থ হবার সম্ভাবনা ছিল না। শেক্সপিয়রই পাত্তা পেতেন না। গ্যাটে, ইবসেন প্রমুখের কপালে কী জুটতো কে জানে? মধ্যযুগের চার্চের কাছে ব্রুনো, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওর চিন্তার যে পরিণতি হয়েছিল; ঠিক তেমনই হতো সাহিত্য রচয়িতা এঁদের ক্ষেত্রে এ বাজার সংস্কৃতির যুগে। যদি বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে সাহিত্যে পুরস্কার প্রাপ্তদের সকল তালিকা আর বই বিক্রির দিকে নজর দেওয়া যায়, এ কথার সত্যতা মিলবে।

ভাগ্যিস মহাভারত লেখা হয়েছিল দু হাজার বছর আগে, সম্ভবত তেইশো চব্বিশশো বছর আগে। ইলিয়ড অডিসিও প্রায় তাই। ফলে টিকে থাকতে পেরেছে আজ অবধি। বর্তমানে যে টিকে আছে তার কারণ, গত দু হাজার বছর ধরে এসব নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা বা নানাভাবে এর প্রশংসার কারণে। সেই ধারাবাহিকতায় মানুষ এখনো উল্লেখিত রচনাগুলি পাঠ করে চলেছে। মহাভারত আবার ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে পরিচিতি লাভ করায়, টিকে থাকার সম্ভাবনা কিছুটা বেড়ে গেছে। যদি দুহাজার বছর ধরে এসব গ্রন্থ বিদগ্ধ সমাজে আলোচিত না হতো, হঠাৎ যদি ঘটনাচক্রে আজকের যুগে রচিত হতো; তা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবার সম্ভাবনই ছিল অধিক।

বর্তমান সময়ে ওগুলো রচয়িত হলে, যারা সমঝদার, সেরকম কিছু মানুষ ছাড়া না আর কারো কাছে এসব ধ্রুপদীর ঠাঁই মিলতো না। পাঠকই পাওয়া যেতো না। বর্তমান সময়ে মহাভারত, ইলিয়ড, প্রাচীন গ্রিক নাটক মানুষ যে পাঠ করছে তার কারণ দু হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এসবের বিজ্ঞাপন চলছে। বিজ্ঞাপনটাই কাজে আসছে। ভয়াবহ বিজ্ঞাপনের জোরেই এগুলি টিকে রয়েছে। বিজ্ঞাপন বলতে হালের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন নয়। বিদ্বান মানুষের মুখে মুখে বা তাঁদের লেখনিতে যে প্রচার বা প্রশংসা হয়েছে, সে বিজ্ঞাপনের কথা বলছি। মূলত এর চিরায়ত আবেদন, বিদগ্ধ সমাজ কখনো অস্বীকার করতে পারেনি। চিরায়ত এসব সাহিত্যের প্রতি বিদগ্ধ সমাজের সেই চিন্তার ঢেউ কখনো অন্যদের সংক্রামিত করেছে, কখনো প্রভাবিত করেছে। বিশ্বসাহিত্যেও এসব রচনা আলোচিত হচ্ছে বহুকাল ধরেই। মাটির ভিতরে শেকড়টা এত শক্ত আর গভীরে প্রোথিত চট করে চাইলেও অস্বীকার করা যাবে না।

বিদ্বান মানুষদের যুগ যুগ ধরে এসব সাহিত্য নিয়ে নানা প্রশস্তিমূলক কথা লেখার কারণেই, এসব সাহিত্য শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ, ভদ্রসমাজ সবার উপরেই তার প্রভাব পড়েছে। কারণ অভিজাতরা মনে করছেন, এসব না পাঠ করা বা এসব সম্পর্কে দু-চার কথা না জানা লজ্জার। ভদ্রসমাজে সম্মান থাকে না। ফলে তাদের মুখে এসব গ্রন্থের নাম বা তাদের লেখকদের নাম উচ্চারিত হয়। সেটাও এক ধরনের বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করছে। ফলাফলটা যদিও হচ্ছে নেতিবাচক। সবচেয়ে বড় কথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে খুব শক্তভাবে এখন পর্যন্ত ঠাঁই পাচ্ছে এসব রচনা। ফলে বাতিল হয়ে যাচ্ছে না। খুব শীঘ্রই যে বাতিল হবে না, এমন নিশ্চয়তাও দেয়া যায় না। কিন্তু শেষ বিচারে তা যে হারিয়ে যাবে না, সেটা বলা যায়। ঠিক যেমন গ্রিক বা রোমান সাহিত্য, ক্রিস্টান চার্চের শাসনে সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু হারিয়ে যায়নি। কারণ সত্যিকারের সৃষ্টিশীল রচনার মূল্য কিছু মহৎ মানুষের কাছে থাকবেই। বর্তমান সমাজে মূল্য নেই সত্যি, কিন্তু বাজার সংস্কৃতির ঠিক পরের সমাজেই এর মূল্য বেড়ে যাবে। যদি বিশ্বটাই কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন।

যদি পূর্ব পরিচয় না থাকতো, মহাভারত নিয়ে আজকে আর তেমনভাবে আলোচিত হতো না। বর্তমান বাজার সংস্কৃতির সময়ে মহাভারত লেখা হলে, পাঠক পাওয়া যেতো না। প্রকাশকরা দু-এক পৃষ্ঠা পাঠ করে বলতো যত্তসব আজগুবি গল্প। মহাভারতের ভেতরের সারবস্তু দেখার সময় বা ইচ্ছা কোনোটা তাদের থাকতো না। মুনাফার পেছনে ছুটে বেড়ানো সমাজে মহৎ রচনা মূল্যায়িত হবে, এমন আশা করাটা স্বপ্নচারিতার সমান। ধরা যাক, বর্তমান যুগে মহাভারত রচনা করে তার রচয়িতা প্রকাশকের সামনে উপস্থিত হয়েছেন। প্রকাশকরা সঙ্গে সঙ্গে এত বড় রচনা দেখে বিদায় করে দিতেন। কার হাতে এত সময় যে, এত বড় রচনা পাঠ করবে। ফলে প্রকাশকের তা ছাপিয়ে লাভ কী? ব্যসদেব হোক আর যেই হোক কে তাকে চিনতো। বর্তমান তারকাদের ভীড়ে ব্যসদেবকে নিয়ে ভাবার সময় কোথায় প্রকাশকদের। বরং পাঠপুস্তকের নামে কিছু শিক্ষা-সংক্রান্ত আবর্জনা ছাপালে লাভ বেশি।

বুদ্ধিমান প্রকাশকরা যদি কেউ আগ্রহ নিয়ে মহাভারতের কয়েক পাতায় চোখ বুলাতো, সঙ্গে সঙ্গে বলতো ঠিক আছে সম্পাদনা করে ছোট করে নিয়ে আসেন। পুস্তকের ভিতরে যে আদিরসাত্মক জায়গাগুলি আছে, মশায় সেটুকুই রাখবেন। দরকার হলে ছোট ছোট খণ্ডে প্রকাশ করবো। ব্রাহ্মণের দ্বারা আইনগতভাবে অন্যের স্ত্রীকে গর্ভবতী করার বিধান বা মহাভারতে কীভাবে পাণ্ডব আর ধৃতরাষ্ট্রের জন্ম; সেটা থাকতেই হবে, তবে আরো বিস্তৃতভাবে। ভিন্ন দিকে দ্রৌপদী কীভাবে পাঁচ স্বামীকে সামলাতো সেটা মহাভারতে খুব দুর্বলভাবে রচিত, বরং আরো বিস্তারিতভাবে লেখা হোক; দাবি করতেন বাজার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত আজকের প্রকাশক। ব্যসদেব বা মহাভারত রচয়িতা প্রকাশকের পরামর্শ মেনে নিতেন কি না সে বিতর্কে না যাওয়াই ভালো। বর্তমান যুগে মহাভারত লেখার পর ব্যসদেবকে হয়তো গাছতলায় বসে, চীৎকার করে করে মহাভারত পাঠ করতে হতো, যদি কেউ দয়া করে দু-একটা লাইন শোনে সেই আশায়। রচয়িতার লক্ষ্য তো পাঠকশ্রোতা বা সত্যি বলতে সমঝদার।

অন্য পর্ব

সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা: দ্বিতীয় পর্ব

সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা: তৃতীয় পর্ব

ব্যসদেব বা মহাভারতের সব রচয়িতারা কেমন করে জানবে, সমাঝদার খোঁজে না এ সমাজ। বর্তমান সমাজ খোঁজে ভোক্তা, পণ্য মনে করেই যে-সব কিছু কিনবে। জার্মান নাট্যকার ব্রেশটের ‘মানুষ সমান মানুষ’ নাটকে, এ নিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ আছে। বাজারে বিক্রি করা গেলে, যা কিছু একটা ‘হাতি’ বলে চালিয়ে দেয়া যায়। যদি একখণ্ড কাগজকে বিজ্ঞাপনের জোরে লোকে হাতি বলে বিশ্বাস করে, সে হাতিটা কেনার ক্রেতা থাকবেই। সৃষ্টিশীল মানুষরা বাজারের ক্ষমতা এড়িয়ে এখনো খোঁজে সমঝদার। ব্যসদেব তাই গাছের নীচে বসে সমঝদার খুঁজবেন। কিংবা বর্তমান কালের ফেসবুকে নিজের লেখা খানিকটা খানিকটা করে মুদ্রণ করবেন পাঠক পাবার আশায়। কিন্তু ফেসবুকে মুদ্রণ করে কি তার আকাঙিক্ষত ফল পাবেন? ধৈর্য ধরে পুরো মহাভারত পড়াের পর দেখা গেল একজন কিছুই লিখলেন না, একটা ‘লাইক’ দিয়ে বসলেন মাত্র। হয়তো আর একজন পাঠক রূপবান পাঠ করে বললেন ‘ভালো হয়েছে’, কিছুদিন পর ‘মহাভারত’ পাঠ করেও বললেন ‘ভালোই হয়েছে’। তার চোখে মহাভারত আর রূপবানই একই কথা। কতোগুলি অক্ষর।

যদি ভাগ্য খারাপ হয় বা যদি ভাত কাপড়ের অভাব হয়, প্রাচীন গ্রিক নাটকের বা মহাভারতের রচয়িতার ঠাঁই মিলবে গ্রামে বা শহরের অলিগলিতে বা রাস্তার পাশে। দেখা যাবে সফোক্লিস, য়্যারিস্টোফেনিস গ্রামের গাছের নীচে বসে নিজের লেখা পাঠ করছেন শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য। গ্রামের দু-চারজন মানুষ যারা এখনো গল্প শুনতে পছন্দ করে, হয়তো দেখা যাবে তাদের কেউ কেউ নাট্যকারদের মুখে চমৎকার সংলাপ শুনে দু চারটা মুদ্রা ছুঁড়ে দিচ্ছে। সারাদিন এমন করে যা দু-চার পয়সা সংগ্রহ হবে, তাতে চালডাল কিনে জীবন ধারণ করাটাই যাবে হয়তো। সেটাও নিশ্চয়তা নেই। গ্রামে বা শহরে রাস্তার পাশে বসে যারা ‘হাত দেখে’ দুচার পয়সা রোজগার করে, ঠিক তাদের দশা হবে তখন মহাভারত রচয়িতাদের, হোমারের আর গ্রীক নাট্যকারদের। শেক্সপিয়ারের ভাগ্যে যে তার চেয়ে বেশি কিছু ঘটবে তেমন বলার সুযোগ নেই। যদি হঠাৎ এ যুগে বসেই তাঁরা সেসব রচনা করতেন।

বাদ দেয়া যাক তাদের কথা। মধুসূদনের কপালে কী ঘটতো যদি এ যুগে বসে ‘মেঘনাধবধ কাব্য’ লিখতেন! বর্তমান যুগের মহান সাহিত্যিক আর সমালোচকরা বলতেন, এ ব্যাটা বাংলাই জানে না। সব উদ্ভট কথাবার্তা লিখে নিয়ে এসেছে। হয়তো কিছুটা বুদ্ধিমান প্রকাশক বলতে পারতেন, যান মশায় আখ্যানটা ঠিক করে আনুন। রাবণ সীতাকে হরণ করে কিন্তু সম্ভ্রম নষ্ট করে না এমন গল্প চলবে না। রাবণকে দিয়ে সীতার সতীত্ব হরণ করার একটা দৃশ্য বানান, খুঁটিনাটি তার বর্ণনা দেন। রাখঢাক করবেন না মশায়। দেখি কী করা যায়। সবটা ছাপা যাবে না, কয়েকটা অমন জায়গা ছেপে দেবো। বাংলাটা ঠিক করে নিয়ে আসবেন। যদি আপনি না পারেন আমার বাঁধা লোক আছে ভাষা দেখে দেয়ার, ঠিক করে দেবে আপনার ভাষার দুর্বলতা।

হয়তো শেক্সপিয়ারকে প্রকাশক বলে বসবেন, যতোসব সেকেলে কথা, সেকেলে ভাষা। যান মশায়, দেশের বর্তমান রানী, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কিছু লিখুন; হয় পুরো নিন্দা বাক্য, না হলো পুরোটাই প্রশংসা গাথা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পুরানো বালিকাবন্ধুর কিছু ঘটনা রাখবেন, যেন সেটা বেশ রগরগে হয়। লিখতে সবে শুরু করেছেন, লেখার হাতটা মন্দ না একেবারে, কদিন প্রকাশকের সঙ্গে থাকেন আপনাকে লেখার কৌশল শিখিয়ে দেবো। কীসের জুলিয়াস সীজার! ডায়ানাকে নিয়ে লিখুন একটা জমিয়ে নাটক, ডায়ানা হত্যাকাণ্ড । হত্যা নিয়ে বেশি লেখার দরকার নেই, ডায়ানা কেমন করে পোষাক পাল্টাতেন সে বর্ণনাটা রাখবেন। বিশাল এক চিত্রকর কেমন করে নগ্ন ডায়ানার চিত্র আঁকতো সেরকম কিছু একটা যুক্ত করে দেবেন নাটকে। শুধু লেখকই হয়েছেন, দর্শক রুচি বোঝেন না। কাকে শুনতে হতো এ যুগে বসে কথাটা? যে শেক্সপিয়রের মঞ্চায়িত নাটকে কখনো দর্শকের অভাব হয়নি।

যুগটার দিকে তাকিয়ে বারবার ভাবতে হয় কোন্ যুগে বসে আছি। দাসসমাজ খুব খারাপ সমাজ, কিন্তু বিরাট বিরাট চিন্তা আর নানা মহৎ সাহিত্য পাওয়া গেছে। সামন্তসমাজে সব মহীরুহ স্রষ্টারা জন্মেছে। সন্দেহ নেই, দাস আর শূদ্রদের শ্রমে আর ঘামে এসব করেছেন তাঁরা। ঠিক তারপর চার্চ বহুকাল অবরুদ্ধ করে রেখেছিল জ্ঞানবিজ্ঞানের সাধনা। কিন্তু সারা পৃথিবীতে সৃষ্টিশীলতা থেমে যায়নি তখনো। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অন্ধকার যুগে সারাবিশ্ব একযুগে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়নি। যারা আজকে কট্টর মুসলমান বলে পরিচিত, তাদের হাতে তখন গ্রিক দর্শন রক্ষা পেয়েছে। চার্চ সবকিছু ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু রক্ষা পেয়েছে মুসলমানদের দ্বারা। মাদ্রাসা স্বয়ং ধর্মীয় শিক্ষার ভিতরেই এক ধরনের বিজ্ঞানের সাধনা চালিয়ে গেছে। প্রভাবিত হয়েছিল গ্রিক দর্শন দ্বারা। মাদ্রাসা শিক্ষার বহু সুফল আজকের পৃথিবীতেও স্বীকৃত কিন্তু নিজেই সে এখন ভয়াবহ অন্ধত্বের বলি। চার্চ যা করেছিল সে যুগে, মাদ্রাসা তাই করতে চায় এ যুগে দাঁড়িয়ে।

সামন্তযুগেও সৃষ্টিশীলতা পণ্য হয়ে দেখা দেয়নি। সমঝদার ছিল ধনীরা। সামন্তযুগ গর্ব করার মতো যুগ নয়। সুখ বা বিলাসিতা ভোগ করতো হাতে গোনা মানুষ। কিন্তু শত শত সৃষ্টিশীলতার উদাহরণ হচ্ছে সামন্ত যুগ। বিশ্বের পর্যটন শিল্প বিস্তৃত হবার পেছনে রয়েছে মধ্যযুগ আর তার সৃষ্টিশীলতা। বুর্জোয়া যুগ সবচেয়ে আধুনিক, সবচেয়ে প্রগতিশীল আগের সবগুলো সমাজের চেয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে সব সৃষ্টিশীলতার যেন গলাটিপে ধরছে। টাকার হিসেব করা ক্লেদাক্ত একটা সমাজ। ঠিক আজকে নয়, শুরু থেকেই। শেক্সপিয়রের নাটকে, শিলারের রচনায়, বালজাকের সাহিত্যে; সব মহৎ সাহিত্যে সেটা ধরা পড়বে। টাকা গুণতে গুণতে সে সমাজ আজ কোথায় এসে ঠেকেছে, সেটা এখন টের পাই। করোনার সংক্রমণ আরো স্পষ্ট করে দেবে তা।

বিজ্ঞানের বিরাট বিকাশ, বিভিন্ন দেশের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলা; বহুশত প্রগতিশীলতার দ্বারা এ যুগ চিহ্নিত হতে পারে। কিন্তু অর্থ দিয়ে কেনাবেচা করা যায় না, এমন সব সৃষ্টিশীলতার স্থান এখানে নেই বললেই চলে। চলচ্চিত্র ছিল এ সমাজের বিরাট এক সৃষ্টিশীলতার জায়গা, কিন্তু বেশিদিন চলতে পারেনি। মুনাফার দাপটের কাছে হেরে গেছে। চার্লি চ্যাপলিন একমাত্র স্রষ্টা, যিনি এখনো এ সমাজকে যথেষ্ট নাড়া দিতে পারেন তাঁর চলচ্চিত্র দিয়ে। কিন্তু সেগুলির প্রচার চায় না পুঁজিবাদী সমাজ। কারণ, পুঁজিবাদী সমাজকে আক্রমণ করতে ছাড়েননি চ্যাপলিন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর জন্য। চলচ্চিত্র বানিয়ে মুনাফা কম করেননি চ্যাপলিন নিজেই, কিন্তু সৃষ্টিশীলতার বাইরে দাঁড়িয়ে নয়। সৃষ্টিশীল মানুষ পুজিঁবাদকে আক্রমণ না করে পারে না, চ্যাপলিনের বিবেক জাগ্রত হলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, সাম্যবাদী দলের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও তিনি চিহ্নিত হলেন সাম্যবাদী হিসেবে। পুঁজিবাদ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না, চ্যাপলিনের বেলায় তাই ঘটলো। তিনি মানবতা দেখাতে গিয়ে বোলতার চাকে ঢিল ছুঁড়েছিলেন। জায়গা হলো না তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের ভদ্রসমাজে।

চলবে…

লেখক পরিচিতি:
রাহমান চৌধুরী, লেখক, শিল্প সমালোচক
Raahman Chowdhury

অন্য পর্ব

সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা: দ্বিতীয় পর্ব

সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা: তৃতীয় পর্ব

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট