সিদ্ধার্থ হকের কবিতা

Comments

অচেতনতা ১

ঘুমের ঔষধ পায়ে, শব্দহীন হয়ে, ক্রমাগত নেমে আসো তুমি;
অন্য এক জলের অনেক নিচে, অন্য এক অসীমে তলিয়ে যাই;
তোমার পায়ের শব্দে, শব্দহীনতায়, আমার চোখের পাতা
                 ধীরে ধীরে ক্রেনের হাতের মতো ভারী হয়;
বহুদিন অনায়াসে ঘুম নাই এ আমার; ঘুমের ট্যাবলেট পায়ে
তুমি এসো আজ, কোনো স্নিগ্ধ মানুষের স্পর্শের মতো, ঘুম;

শ্রমহীন সুস্থ স্বপ্নের প্রয়োজন নেই; স্বপ্ন দুঃস্বপ্নই হোক;
ঘুমের ভিতরে বহু ভয় হোক; বাড়ির ঠিকানা ভুলে যাই,
ফিরতে না পারি ডেরায়, পশুদের মতো খুঁজি ডেরার ঠিকানা,
তবু তুমি আসো; নিরাময় ঔষধ পায়ে ঢেঁকির মতন
                                           হেঁটে আসো আর
আমার শরীরময় ফুলের পায়ের মতো হাঁটো;
ধীরে ধীরে অবশ, নীরব হই আমি;
ধীরে ধীরে এপাশ ওপাশ করা বন্ধ করি;
ধীরে ধীরে আমার মাথার তাপে বালিশের পুড়ে যাওয়া শেষ হোক

তোমাকে বহুতভাবে চাই বলে, দেখো আজ ঘুমের ঔষধের মাত্রা
বাড়িয়ে দিয়েছি; অতিথি পাখিদের ফাঁকি দিয়ে
                                                বিছানায় এসেছি আগে আগে
বাম দিকে কাত হয়ে শুয়েছি শূন্যে; শূন্যের অনুভুতি আমার ভিতরে
                           টাইমস্পেসে মিশে যাচ্ছে; দেখছি যে পৃথিবীর
সব শোয়া শূন্যের ভিতরে; বিছানার উপরে আমি; কিন্তু আমি
শূন্যের ভিতরে এবং আমার ভিতর মূলত শূন্যের অদ্ভুত খেলাঘর

শীত চলে গেছে তবু জ্যাকেট গায়ে দিতে ইচ্ছা করছে খুব;
ঝুলন্ত জ্যাকেট শান্ত ঘুমের মতন, তাকে ভুলে গেছি আমি,
আমার শরীর ভুলে গেছে নিজ থেকে ঘুমিয়ে পড়ার প্রক্রিয়া;
খোলা চোখে কাপড়ের স্ট্যান্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে,
অসময়ে সুন্দর জ্যাকেট গায়ে দিতে ইচ্ছা করছে,
মূলত ইচ্ছা করছে ঘুমিয়ে পড়তে—
ঘুমিয়ে পড়তে চাই আমি,
অসীম শূন্যের হৃদয়ে চলে যেতে চাই;

শূন্যের দরজা খোলো প্রিয়, ঔষধের দাগ আজ বাড়িয়ে দিয়েছি;
এক দাগ বেশি ট্যাবলেট খেয়েছি এ আমি;
ভীষণ দুঃস্বপ্নের সাথে খেলা হচ্ছে, হোক;
ছুটছি আমি কত স্থানে, ছুটি; কত যে অপ্রেম আসে যায়,
আসুক ও যাক, তবু আজ আমার অন্তরে ঢুকে,
প্রায় এক ঘুম থেকে, গভীর ঘুমের দিকে,
ট্যাবলেট পায়ে তুমি ক্রমান্বয়ে নিয়ে যাও আমাকে, আমাকে

২১/০২/২০২৪

অচেতনতা

ধোঁয়ার নরম হাত, দুইহাতে, খুব ধরে ফেলেছে আমাকে;
                           এখন উড়তে কোনো অসুবিধা নেই, হাত খুলে;
চোখ জাগরিত রেখে ঘুম এসে গেছে; এখন হাঁটতে পারি
বসার ভিতরে বসে থেকে; জীবন ভয়ঙ্কর নয়, মনে হচ্ছে নরম ক্লান্তিতে;
বহু আগে শোনা কোনো গান মনে পড়ে গেছে সম্ভবত; তোমার নিঃসঙ্গতা
দূরবীন ছাড়াই দেখতে পাচ্ছি চোখ বুজে; কেউ নও তুমি এ আমার—

আমার সকল কিছু তুমি; ক্লান্তি যে নরম এমন, আমি আগেও কি
লক্ষ করে দেখেছি কখনো; অর্থহীনতার মধ্যে নিশ্চুপ বসে থাকা,
সে কি ঘুম নয়… জলের ঢোঁকের মত যে ঘুম আমার গলা দিয়ে
শরীরে প্রবেশ করছে সে কে… তেমন নিশ্চিন্ত নই কোনো কিছু নিয়ে;
কাল সারারাত যে হৃদয় জাগিয়ে রেখেছিল, এখন কেন যেন
সে আমাকে বলছে ঘুমাতে, ধোঁয়ার বালিশে মাথা পেতে

ঘুমিয়ে পড়ার মতোই আমার নিঃসঙ্গতা বোধ নষ্ট হয়ে গেছে বহু আগে;
ঘুণপোকাদের মতো অবিরাম বাস করি অনেক অতলে, আমি অন্য
অতলে চলে যাই, যা আসলে কোনো স্থান কিম্বা ধারণার তল নয়;
যেখানে ক্রমশঃ থাকি, চোখ খুলে বুজে,
যেখানে বয়সকে আমি ক্রমান্বয়ে হেঁটে যেতে দেখি,
যেখানে অরণ্য ক্রমে ইটভাটা হয়, গ্রামগুলি, মফস্বল পিছনে রেখে
শহরের দিকে হেঁটে আসে, শহর অতল সমুদ্রের মতো ওঠে নামে
তারপর অনিদ্রায় কলাপ্স করে সবেগে নামিয়ে দেয়া শাটারের মতো,
আমি সেই অতলের কথা ভাবছি হয়ত, ধোঁয়ার বালিশে মাথা রেখে

২৩/০২/২০২৪

অচেতনতা

অনেক অন্যায় হয়ে গেছে, ছোটো বড়ো, ব্যক্তিগত কিম্বা দেশব্যাপী
                                                                মহাদেশ ব্যাপী—
মানুষের অন্যায়ের চিহ্ন জেগে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন সড়কে;

আরো অন্যায় হবে আমি জানি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষেরা বড়ো কিম্বা ক্ষুদ্র
অন্যায় ক্রমাগত করতে থাকবে; এ নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই
                  কিন্তু হয়ত আছে আমার অবচেতনার, অচেতনের;

দৃশ্যত অনিদ্রার কোনো কারণ না থাকলেও, ঘুম হয়না আমার;
আমার অবচেতনতার মধ্যে, অচেতনের অতল গভীরে, সম্ভবত,
সারারাত টপ টপ করে মানুষের অন্যায় ঝরে আর জমে ওঠে;
প্রতিটি ফোটার ভয়ঙ্কর নীরব শব্দ হয়, সে শব্দ শুনি না আমি,
মনে করি, শোনে আমার অস্তিত্ত্ব, আর কেঁপে কেঁপে ওঠে
                         রাত্রিভর, মনে করি, তাই ঘুম হয়না আমার    

যারা ভয়হীন ছিল তারা মরে গেছে ভীতু মানুষের হাতে ক্রমান্বয়ে
এখন সকল স্থানে ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষ সব আসন দখল করেছে
বই সাজিয়ে বসেছে; ঠোঙ্গা কিম্বা লোহা ওদের সামনে, ভিতরে
অন্ধকার গুহার ভিতর থেকে জ্বলজ্বলে চোখ মেলে তাকিয়ে রয়েছে
                                 ভয়হীন মানুষকে নাই করবে বলে;

                                                       যখন অনেক রাত,
মানুষের মুখ আমি চারদিকে ভাসমান দেখি, তখন কোনো ঘুম
হয়না আমার; যদিওবা থেকে থেকে কিছু ঘুম হয়,
আমার সকল স্বপ্ন প্রবল দুঃস্বপ্ন হয় বলে, ফের চমকে
জেগে উঠি আমি; মনে করি, তারপর আর ঘুম হয়না আমার

২৪/০২/২০২৪  

অচেতনতা

আমার ঘুমের মধ্যে বসন্তেও পাতা ঝরে শেষ-নেই-ভাবে,
ঘুরে ঘুরে সারারাত, সারাদিন নেমে আসে ওরা,
রাত্রির নেমে আসা অদ্ভুত খুব—জঙ্গলের মধ্যে
সড়কের অনির্দিষ্ট, ছেঁড়াখোড়া, ছাটা আলোর ছিটেফোঁটা এসে পড়ে,
যা ঠিক আলো নয়, বরং আলোর ভগ্নাংশ—
আলোর ভগ্নাংশে পাতাদের ঝরে পড়তে দেখে,
                                   মনে হয় হাজার হাজার পাখি
কি কারণে মরে গিয়ে ঝরে পড়ছে গাছ থেকে শূন্য পার হয়ে;

দিনের ঝরাও খুব কম অদ্ভুত নয়; ছোটো ছোটো পাখিদের
দেখে মনে হয় ওরা পাতা; উপরের ডাল থেকে ঝুপ করে
নিচের ডালের বুকে নেমে আসছে, ঝরা পাতাদের ক্ষুদ্র ফ্রেম

আমার ঘুমের মধ্যে সারারাত সারাদিন পাতা ঝরে
জাগরণও তাই; আমার সমস্ত জাগরণ অবিরাম পাতা ঝরতে থাকা
রাত্রিদিন ঝরে পাতা, জমে ওঠে আমার জাগরণের সকল সড়কে
থেকে থেকে নড়ে ওঠে পাতার বুনন; থেকে থেকে চুপ হয়ে আছে;

আমার জাগরণের সঙ্গে বুননের সম্পর্ক হয়েছে
কেউ সেলাই করছে আমাকে পাতার সাথে, বানাচ্ছে কাঠামো
অলীকের কারিগর, তার হাত অদৃশ্য, কিন্তু সে বুনছে আমাকে হাত দিয়ে
আমার শরীর আর ঝরা পাতা দিয়ে সে বুনন করছে এক ঘুম
বিছানার মতো সেই সর-সরে ঘুম, পৃথিবীর সড়কে সড়কে পড়ে আছে

ঘুম এক গল্প যা শুরু হয় দুই চোখ বন্ধ করবার সাথে সাথে
সারারাত গল্পের ভিতরে কত ডাল-পালা জন্মে ওঠে অরণ্যের মতো;
সারারাত ঘুমে জন্ম নেয়া গাঢ় অরণ্যের মধ্য দিয়ে অবিরাম
বাতাসেরা ছোটে; বাতাসের সাথে সাথে ছুটে যায় ঝরা পাতার পৃথিবী;
আমিও ছুটতে থাকি গল্প থেকে গল্পে, এক উদ্ভ্রান্তের মতো;
কত মৃত মানুষেরা আসে;
জীবিত মানুষের মতো ব্যবহার করে যায় এ আমার সাথে;
ভুলে যায় মরে গেছে তারা, ঝরে গেছে, গুচ্ছ গুচ্ছ পাতার মতন;

আমার ঘুমের মধ্যে মৃত মানুষের এক স্বাধীনতা রয়ে গেছে বেঁচে উঠবার
তাই তারা সারারাত জীবিত মানুষের মতো ব্যবহার করে
মারে, ভালবাসে, হেল্প করে, হেল্প চায়,
ভোরে ঝরা পাতা হয়ে রাস্তায় রাস্তায় পুরু হয়ে জমে থাকে

২৬/০২/২০২৪

অচেতনতা

এ জীবনে যা যা প্রয়োজন একটি গ্রামেই তার সব আছে;
মানুষ যে সমস্ত শহর দেখতে চায়—প্যারিস, নিউ ইয়র্ক—
গ্রামে ঢোকার মুখের বড়ো বড়ো দুই বটগাছ, সেই প্যারিস ও নিউ ইয়র্ক—
পাখির শরীরে চোখ পড়লে মনে হয়, পরিশ্রান্ত চোখ বহুদিন পর
                                                       কোথাও বা বিশ্রামের ঠাই পেল

মহাসমুদ্রের মা গ্রামের পুকুর; কত প্লেন সারাদিন পার হয়;
পুকুরের পাশে বসে উড়োজাহাজের গুমগুম ড্রোন শোনা যায়—
তুমি কি তা লক্ষ্ করো? লক্ষ্য করাও এক শোনা;
এবং শোনাও লক্ষ্য করা; এ পৃথিবী এভাবে প্রস্তুত—
ধ্বনি শুধু শুনবার নয়, ধ্বনি ভেবে দেখবারও; ধ্বনির ভিতরে
সব লেখা আছে; চুপ করে বসে থাকলে লেখাগুলো ছবি হয়ে ওঠে;
দেখা যায়, গ্রামের ক্ষেতের মধ্যে পৃথিবীর সব বই আঁকা আছে
একেকটি ধান, একেকটি লাইব্রেরি;
প্রতিটি কৃষক একজন দস্তয়ভস্কি কিম্বা লাকা;
প্রতিটি উঠান একটি পুনঃস্থাপিত ভূমধ্যসাগর

এ জীবনে যা যা প্রয়োজন একটি গ্রামেই তার সব ছিল
আজ নেই—এখন সকল গ্রাম গ্রামের কঙ্কাল;
মার খেতে খেতে ছাল, চামড়া, মাংস উঠে গেছে সব পুকুরের;
জল শুধু জলের স্কেলেটন; কিন্তু তবু
আমার কোথাও না কোথাও যেতে ইচ্ছা করে;
কোথায় যে যাব জানা নাই;
গ্রামে যাবার অভিজ্ঞতা অন্য কোথাও গিয়ে হয়না তো;
কোথায় যে উবে গেছে স্বয়ংসম্পূর্ণ চেতনার গ্রামগুলি

২৭/০২/২০২৪

অচেতনতা

রাত্রির অসুস্থতা আমার জীবনে, কোথা থেকে আসে রাত্রি হলে,
দিন হলে কোথায় যে যায়, বহু দূর থেকে বাতাসের বাধা পার হয়ে
কাছে আসা উঁচু নিচু গানের মতো গুনগুন অধিকার
আমার শরীরে ব্যাপ্ত করে, ঘুমাতে দেয় না; অদ্ভুত হুইজিং
শব্দে আমাকে জাগিয়ে রাখে, একপাশ থেকে অন্য পাশে
                                    নিয়ে যায় সময়ের; সময়স্পেসের;

ভোরে আর শত খুঁজে পাইনা ওদের
বুকে হাত দিয়ে খুঁজি; বুলাই দুহাত মুখে, নাই, ওরা নাই;
তাকাই ঘরের চতুর্দিকে, উৎসের উৎস শূন্যে, টের পাই
বাতাসের বাধা পার হয়ে নিজের আবাসে ফিরে গেছে
                                             আমার সে রাত্রি অসুস্থতা

সতত খেয়াল শুনি, নিরন্তর, অহর্নিশ; আমার শিরার মধ্য থেকে
মাধুপ মুদগাল উঠে আসে; রঙিন স্রোতের মতো আও আও করে;
সহস্র রঙের স্রোতে মিশ্রিত থেকেও সে যে কি এক নতুন রং
তৈরি করে; মনে করি কাল রাতেও আমি শুনেছি খেয়াল;
আমার হুইজিং শব্দের সাথে মিশে গিয়েছিল গান আর রঙ
                                  দুটি নদীর মিশে যাবার সময়ের মতো;
কত যে বিভিন্নতা তৈরি হয়েছিল এর ফলে;
খেয়াল এগিয়ে চলে সকল সময়স্পেসে, তার অবিরাম এগিয়ে যাবার
বিষয় কখনো থাকে না—কালরাতে টের পেয়েছিলাম তা,
                             আমার গভীর অসুস্থতার মধ্য থেকে কান পেতে

কিছুদিন পর পর একজন আসে, বহু কিছু এগিয়ে দিয়ে চলে যায়;
জানি রাত্রে আবার সে ফিরে আসবে, আমার এ বক্ষের ভিতরে;
মাধুপ মুদগালের মতো বাজতে থাকবে শব্দ আর রঙের মিশ্রণ;
ঘুমাতে পারবো কিনা জানা নাই;
সতত খেয়াল শোনে যারা তারা কি ঘুমায় রাত্রি হলে?
বহু রকমের ঘুম এ পৃথিবীতে আছে; কিছু কিছু ঘুম অসুস্থতার মতো,
রাত্রে খেয়াল শুনি বলে, সজাগ থাকতে হয় রাত্রিভর
                                 তার স্বাদ এই মানুষের জিহবায় পেতে;

০১/০৩/২০২৪

লেখক:
Siddhartho Haque
সিদ্ধার্থ হক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট