সুখ ফানুস । কাকলী আহমেদ

Comments

।। কাকলী আহমেদ ।।

বিয়ের পরে যেদিন প্রথম সবার সাথে খাবার টেবিলে খেতে বসেছি, চোখ আমার ছানাবড়া। শ্বশুর শাশুড়ি দেবর ননদসহ । ঘরের মানুষ কেবল আমরা জনাসাতেক। আমি আড়চোখে কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকলাম। কনুই-এ ভর দিয়ে প্লেটে ডান হাত নেড়ে খাবার জায়গা নেই। এতগুলি পদ দেখে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না কি দিয়ে শুরু করব। নতুন বউ হিসেবে কিছুটা লাজবোধ যে নেই তাও তো না। লাজ, জড়তা মিলে মিশে গলাগলি করে কেমন এক আড়ষ্ট আলোয়ানে জড়িয়ে ধরল যেন। বর আমার সদা সর্বদা কম কথা বলে। শাশুড়ি প্লেটে ভাত তুলে দিলেন। আমি কেবল মনে মনে ভাবছি এতকিছু কি আজকের এই দুপুরে খাবার জন্যে। নিশ্চয় না। হয়ত আস্তে ধীরে উঠাবেন তিনি। পাখীর মত মাথা গুজে রয়েছি একদিকে। শাক নিতে যেতেই শাশুড়ি বলে উঠলেন এটা নাও। বলেই ভর্তা তুলে দিলেন।

খুব অল্প খেয়ে বড় হওয়া আমরা চার ভাইবোন। দিন শেষে লেখাপড়ার টাকা দিয়ে, বাদ বাকি খাবার পয়সা জুটত খুব কম। দুপুরের খাবারে একটা সবজি আর ছোট মাছ চচ্চড়ি আমাদের উত্তম খাওয়া। নীচে পাটি খেতে বসে যেতাম চার ভাইবোন। মা কড়াই এনে ছোট মাছের চচ্চড়ি বেড়ে দিতেন। আমি লোভ লোভ চোখে তাকিয়ে থাকতাম কখন মা বলবে, “মানসী কড়াই মুছে নে”। ছোট্ট কড়াইয়ের তলায় মাছ পুড়ে পেঁয়াজ আর অল্প হলুদ মরিচের যে ঘণ মসলা ওটা দিয়ে খেতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। মা বলেন মুছে খাওয়া নাকি ভাল। খাওয়া নষ্ট হয় না একেবারেই। কড়াই ধুতেও সুবিধে হয়। আমি কড়াইয়ের আঠা আঠা তেল মশলায় পোড়া মাছের চচ্চড়ি দিয়ে এক প্লেট উঁচু ভাত সুন্দর করে মেখে পেট ভরে খেয়ে নেই।

আমার ছোট ভাই আর বাকি দুই বোন ঘ্যান ঘ্যান করে বড় মাছ বা মাংস খাবার বায়না করে। আমি প্লেট চেটে পুটে খেয়ে উঠে রান্না ঘরের নীচে ধোয়ার জায়গায় দিয়ে আসি। আবার পড়ার টেবিলে গিয়ে অংক করতে বসি।

আমার বিয়ে হয়েছে আজ সাত দিন। প্রতিটি দিন বিভিন্ন বেলায় খালি একেক রকম খাওয়া খাচ্ছি। প্রতি বেলায় এত মানুষের জন্যে বড় বড় হাঁড়িতে এতরকম রান্না কি করে করছেন আমার শাশুড়ি তাও মাথায় আসছে না। আমাদের বাড়িতে এত রান্নার বাহার নেই। গরীব ঘরে আয় রুজি কম। খাওয়া দাওয়াও কম।

ভীষণ গরীব ঘরের মেয়ে আমি। বাবা সরকারি অফিসে কেরানির চাকরি দিয়ে তার জীবন শুরু। এখন সেকশন অফিসার। মতিঝিলে দু কামরার এক কোয়ার্টারে বড় হয়েছি। চার ভাইবোনের মুখে তিন বেলা আহার জোগাতে মায়ের কষ্ট নিংড়ান পানির ওজনই অনেক বেশি।
বিয়েবাড়ি-তে এতদিন মেহমান ছিল । একে একে সবাই চলে গেছে। কেবল বাড়ির মানুষের জন্যে এত পদের রান্না কি জন্যে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। অল্প একটু ভর্তা নিয়ে ভাত মেখে এক নলা মুখে দিতেই আমার এত মজা লাগল। আমি দুবার এই ভর্তা দিয়েই গপ গপ করে ভাত খেলাম। শাশুড়ি মা আমার আরেক পদের ভর্তা এগিয়ে দিলেন। শুটকি ভর্তা। আমি শুটকি খুব পছন্দ করি। আমার মা কিন্তু শুটকি খান না। এমন কি রান্নাও করতে পারেন না। দক্ষিণ অঞ্চলে এত তাজা মাছ পাওয়া যায়। শুটকি খাবার তেমন প্রচলন নেই।

তৃতীয় পদ আমার দিকে এগিয়ে দিতেই আমি মাথা নেড়ে না বোঝাতে চাইলাম। টেবিলে বসা সবাই অবাক। আমি আর খাচ্ছি না কেন।আসল আইটেম গুলো-তো রয়েই গেছে। আমি টেবিলে আরেকবার খেয়াল করে তাকাতেই দেখলাম।

ভর্তা, ভাজি, সবজি, বড় মাছ ভাজা, মাছ রান্না, মুরগীর রোস্ট, গরুর মাংস, পোলাও এছাড়াও আরো কি কি যেন আছে। আমার চোখ ধরে এলো। গলার ভিতর দিয়ে ভাত যেন নামছে না। ঠিক একই সময়ে না জানি আমার মার বাড়িতে তিন ভাইবোন মা বাবা কি দিয়ে খাচ্ছেন। চোখ ঝাপসা, মন ধোঁয়াশা, প্রাণ আকুল। বেদনাময় মনে আমার উথালপাতাল ঢেউ উঠল। ডালের বাটিটা কাছে টেনে নিলাম। আমার দেবর ননদ হা রে রে রে করে উঠল। তাদের ধারণা আমি লজ্জা করে খাচ্ছি। আসলে মোটেও সেটি নয়।

ডাল আর ভাত খেয়েই বড় হয়েছি। বড়জোর ভাজি ভর্তা। ভর্তার সাথে এক থালা ভাত কি সুন্দর মেখে পেট পুরে খেয়ে উঠেছি। তাতেই শোকর আর সবর। এ কদিন পোলাও, মোরগ মোসল্লাম খেয়ে আমার পেটে শ্যাওলা পড়ে গেছে। কাকে বুঝাই। নতুন বাড়িতে মাথায় ঘোমটা সামলাতে আর হাতে সালাম,পায়ে সালাম করে নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতেই আমি অস্থির।
শাশুড়ি আর সবাইকে বুঝালাম এ ক’দিন শাহী খাওয়া খেয়ে আজ একটু তৃপ্তির সাথে খেলাম। দশ পদ দিয়ে কখন খাইনি এ কথা ঠিক এত তাড়াতাড়ি বলতে আমার কেমন যেন বাধো বাধো লাগল। যদিও আমি স্পষ্ট কথা বলি এ কদিনে এ বাড়ির সবাই খানিকটা জেনে গেছে।

বাবার ছোট চাকরি, ঢাকায় বাড়ি নাই। মধ্যবিত্ত নয় নিরেট গরীব ঘর থেকে এসেছি আমি। নতুন আত্মীয় স্বজনের অনেকের বাঁকা ত্যাড়া প্রশ্নের উত্তর ভীষণ পষ্টাপষ্টি জবাব দিয়েছি।
আমার শুশুরবাড়ির ভালই টাকা পয়সার ঝন ঝনানি। তার উপরে খাওয়ার ব্যাপারে উদারহস্ত। এ কদিনে বুঝে গেছি আমি। সবার সাথে খেতে বসলেই মুশকিল হয়ে যায় আমার। শাক ভাজি আর ডাল দিয়ে তৃপ্তি করে খেয়ে ফেলি। বড় মাছ বা মাংস খাবার তেমন অভ্যাস নাই আমার। আর তাই খেয়েও তেমন মজা পাই না।
টেবিলে এগুলো দেখলেই মনে হয় ছোট ভাইটার কথা। চোখে ভাসে ছোট ভাইটা আমার মায়ের আঁচল ধরে ঝুলছে আর বলছে ” মা, মুগগা খাই না কতদিন। আমারে একটা মুগগা রান্না করে দিবা। বুবু নাই। বুবু শশুর বাড়িতে। দুইটা রানই আমারে দিবা। তাপসী বুবুরে দিবা না”। আদুরে গলায় কথা বলার সময় সে মুরগী-কে মুগগা বলে। আমার এই ভাইটা আমাদের অনেক ছোট। আমার প্রায় পনের বছরের ছোট এই ভাইটাকে দারিদ্রের ওই অথৈ সাগরে রেখে বিয়ের দিন শশুরবাড়িতে যেতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।
আমার বিয়েতে একটা নতুন লাল পাঞ্জাবী কিনে না দিলে সে বিয়েতেই যাবে না বলে হুমকি দিয়েছিল। শেষতক তাকে পুরনো একটা সবুজ পাঞ্জাবী পরেই যেতে হলো। তবু বুবুর বিয়েতে সে খুব বেশি যেন মজা পেয়েছে বলে মনে হচ্ছিল।

গাড়িতে উঠে শশুরবাড়িতে যখন চলে আসছিলাম, এত মলিন সবুজ পাঞ্জাবী ভরা ভাইটাকে ফেলে আস্তে আমার বুকের মোচড় আমি এখনও টের পাই।

দ্বিতীয় একটা জীবন শুরু হলেও এ জীবন আমার কাছে যেন তেতো স্বাদে ভরে গেল।
মার বাড়িতে যাওয়ার সময় আমি গাড়ি থামাই। দোকান থেকে ভাল মন্দ খাওয়া কিনি। হাতভর্তি অনেক রকম খাওয়া কিনে যাই।
কলোনির সবাই দেখে সাবেদ আলি সেকশন অফিসারের মেয়ে চকচকে দামি একটা গাড়ি থেকে নামছে। ভালই গয়না গাটি পরা। নতুন সুন্দর শাড়ি পরা। কলোনির সবাই বলাবলি করে সৎ মানুষ সাবেদ আলী তাই তার মেয়ের আল্লাহর ইচ্ছায় এত ভাল বিয়ে হয়েছে। কত বড়লোকের ঘরে বিয়ে হয়েছে। মেয়েটাও কত ভাল ছিল লেখাপড়ায়। কত কষ্ট করেই না মাস্টার্স করেছে।

মার বাড়িতে গেলে বসার ঘরের দৈন্যদশা আমাকে কাছে টানে। পুরোনা বেতের সোফার ছেড়া কাভারে আমি সবার অগোচরে হাত বুলাই। ছেঁড়া এই ফুটোর মধ্যেই যেন এ বাড়ির জন্যে আমার ভালবাসা আমি পুরে রেখে গেছি। বাবার খাটুনির চেহারা দেখে বারাধিক বার দীর্ঘশ্বাস ফেলি। বোনদের দামি দামি কসমেটিকস দেই। তক্ষুনি সেজে দেয়ালে ঝুলানো আয়নাতে নিজেদের দেখে দুই বোনে অকারণেই হাসাহাসি করে। ওদের চোখের তারার ঝিলিক আমার বুকে আনন্দেরর ঢেউ তোলে।
বাবাকে এক দুই সপ্তাহ পরে দেখলেও কেমন যেন বয়স ধরেছে বলে মনে হয়।
মার রান্নাঘরে গিয়ে চুলার উপরে কড়াই আলগা করে দেখি ছোট মাছ চচ্চড়ি। মায়ের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলি, “মা, আমি কড়াই মুছে ছোট মাছের চচ্চড়ি দিয়ে এক থালা ভাত খাব”।
পাটিতে বসে বাবা,মা আর ভাই বোনের সাথে থালা চেটেপুটে তৃপ্তি নিয়ে ভাত খাই।
মা, জিজ্ঞেস করেন, “কি রে দুপুরে কি রেঁধেছিল তোর শাশুড়ি “।
আমি খাঁটি মিথ্যা কথা বলি, ” ভর্তা আর শাক ভাজি। ”
ভাইটা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলে, ” বুবু, আমি গেলে কিন্তু মুরগী রান্না করতে বলবা। আমি দুইটা রান খাবো “।
আমি মাথা নেড়ে বলি, ” আচ্ছা”।
ড্রাইভার কলোনির মোড়ে আসতেই আমি গাড়ি ঘুরানোর কথা ভাবি । ড্রাইভার কে বলি, ” সোজা কলোনীর বাজারে যান তো ড্রাইভার সাহেব। ভাল দেখে বারোটা দেশি মোরগ কেনেন। ”
বারোটা মোরগ কেনা হয়।
সেলিম ড্রাইভার -কে বলি, ” আপনি গাড়ি ঘুরান। আমার মার বাসায় যাব”।
গাড়ির ভিতরে সামনের সিটের নীচে রাখা বারোটা মুরগি কক কক করে ডেকে ওঠে। প্রচণ্ড জ্যামে আমি ছোট ভাইয়ের চব্বিশটা রান খাওয়ার কথা ভাবি। নিজের সুখ আর মা বাবার দারিদ্রের দড়ি টানাটানি খেলি।

 

লেখক পরিচিতি:
কাকলী আহমেদ, চাকুরে ও গল্পকার
Image may contain: Kakoli Ahmed, smiling, closeup

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.