সেলিনা শেলীর কবিতা

Comments

ফিরে যাচ্ছি

ফিরে যাচ্ছি পুঙ্গব সময়
অনন্ত ঘরে ফিরে যাচ্ছি- যেখানে শূন্যতা, শূন্য শূন্যতা-
ফিরে যাচ্ছি–
যেখানে মহা ব্রহ্মাণ্ডময় আমিহীন আমি

ধানের পাতার গন্ধে, নৌকার গুলুইয়ে শুয়ে
আকাশের নীল মেঘে চোখের স্মৃতি রেখে
চলে যাচ্ছি।

এখানে হাটের উদোমে বিক্রি হয় কবিতা
বেসাতির বাজারে প্রিয়তার কর্পোরেট সূচকে
নিভৃতে হাসে একা কবি
এখানে নাদান সময় গিলে খায়
তকমা আঁটা টেবিল।
অবশেষে ফিরে যাচ্ছি-
হে পণ্য সভ্যতার নগর, রক্তশূন্যতার হৃদয়
বর্ণান্ধ ধর্ম, আমার সময়ের রেখে যাওয়া
অবশেষ- স্মৃতি- দুঃখ যার নাম
বিভ্রমে বুনে চলা বিবেক
সঙ্গমের বুনে যাওয়া জরায়ুজীবন-
ফিরে যাচ্ছি।
মিথ্যের চোখে ঢাকা রাত, ধর্ষণে কাতরানো
মুখচাপা আর্তনাদ, মানুষের হাতে মানুষের
জবেহ মচ্ছব-
সংহার-সর্বনাশ-সর্বগ্রাসী____
নিজের ছায়ার নিচে নিজেরই রক্তাক্ত লাশ
অনতিক্রম্য দূরত্বের প্রান্তিকতায় মানুষের বাস।

আমাকে হনন করো, হনন করো হে মৃত্যুর দাসানুদাস

আমি ফিরে যাচ্ছি-
যে সকাল নেমেছিলো দুয়ারে আগুনমুখো
সে এক কপট বাহানা- প্রাণসংহারী আলো
আমাকে ক্ষমা করো- ভূমিপুত্রগণ
প্রান্তিকের খবর কে নেয়?
কেন্দ্রাক্রান্ত আমি; হায়!
এতকাল নেচে দেখি কেন্দ্র কোথায়?
এত কেন্দ্রচ্যূতি!

অতএব ফিরে যাচ্ছি-
ব্যর্থতার সমূহ পাপে- জন্মবীজ ফেলে।

আমি ব্যর্থ। কী করুণ মানুষেরা- ধর্মকাতারে
কী বীভৎস মানুষের বর্ণচিহ্নায়ন!
আমি ফিরে যাচ্ছি—

যা কিছু জেনেছি বোধিকাণ্ডে- প্রজ্ঞায়
মার্ক্স, হ্যাগেল অথবা দারিদাবিদ্যায়–
যা কিছু জেনেছি শক্তিঘরে একান্ত তপস্যায়
রবীন্দ্র লালন অযুত মনীষায়
সব কিছু পড়ে থাক শব্দে অক্ষরে।

মানুষেরা মানুষ নয়- এককেতাবি কেবল।

অতএব ফিরে যাচ্ছি—
আমার অবিনাশী আত্মার ক্ষত থেকে
গড়িয়ে পড়া কষ
গলিত চোখের ভেতর থেকে
প্রিজমায়িত সূর্যের রঙ
উদ্ভ্রান্ত শরীরের নুন থেকে
ক্ষুব্ধ অভিমান নিয়ে
মগজের ভেতর থেকে অল্প কিছু স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে
আমি ফিরে যাচ্ছি–

হাতে নিয়ে নিজস্ব ভুবনের চাবি;
যে কোনও এককধর্মের নয়-
গোত্র ও দেশপাঠ তাকে সীমায়িত করে না।
নিজেই একা, একাকী স্বধর্মপাঠে
নিজ ইশ্বরে!

চিরকাল বানান ভুল

আমার বারান্দা জুড়ে রোদে মেঘে চুমোচুমি হয়
যে ডাকে গভীর সেও কানে কানে বুনোকথা কয়

কথাই অকথা যদি কথকেরও না থাকে প্রতিভা
জীবনের যতো রঙ যতো স্বাদ তারও বেশি বিভা

যে জলে নেভে না তাপ সেই জলই উর্বশীর খাড়
দুপায়ে জড়িয়ে নিলে জং ধরা শরীরও সাঁতারু

বুনো কথা, বন্য কথা, ডাকে অতিদূর সহবাসে
বানানে অজস্র ভুল, তবু প্রেম-চিঠি হাতে আসে

প্রদোষে প্রত্যুষে দ্যাখো নদী তার মেলিতেছে ডানা
নদীরও যে আছে প্রাণ-সে কথা কী তোমাদের জানা!

রজঃস্বলা থেমে গেছে

গভীর মোহ-নিদ্রা ঘোরে, নিদাঘ দুপুরে
বালিকা উত্তীর্ণকালে
শরীরে ফুটেছিলো রক্তিম বিভা!
কুমারিকুসুম কালে–নিজেকে অস্পষ্ট মানি
জানি, এই শরীরের কতোটুকু জানি
কী জানি কী জানি!
শরীরের রন্ধ্র বেয়ে
রজঃস্বলা নেমে এসে ঋতুবতী হই।

কাম, ঘ্রাণ, স্পর্শের অতীত স্পর্শ, বিস্তারিত কুসুম
জীবনের অতল পলে–জলাগুনে জ্বলে জ্বলে
অনুভব আঁকশি হয়ে স্মৃতি টেনে ধরে।
সেইসব কাম জাগানিয়া ভোরে,
মধ্যদুপুরে, শরীর-পদ্য পাঠে কেটেছে প্রহর।

এখন শীতের দুপুর।
কুয়াশার ঘেরাটোপে
না সকাল, না সন্ধ্যা! বন্ধ্যা কী সে!
আমারই মতোন?
রজঃস্বলা থেমে গেছে–
জীবন করেছে পার–অপার কুমারি বেলা
আমার সকল খেলা, উৎসের জীবন বীজ!
যদিও থেমেছে ঋতু, নদীর অমৃত স্বর
স্পর্শের গহিন ঘোর, ঢেউয়ের ছলাৎ কলা,
আজও শুনি ঋতুবৎ নিজের ভেতর!
আজও পুড়ি জলাগুনে, যেমন পুড়েছি একুশ
অক্ষয় রজঃস্বলা মনে!

দেহপৃষ্ঠায় লেখা কতো গান!
ষড়রিপু ধরেছি পুষ্পে কাঁটায়
রজঃস্বলা থেমেছে শরীরে–
মনে তবু অথই রজঃপাত!
ঘ্রাণের অমল পালক, নীরব গোপন ঠোঁট
স্মৃতির বিছানা!

আমিই আমাকে গড়ি, ছিঁড়িখুঁড়ি
নবায়ন করি মনোত্বক
আমাকে কি চেনো তুমি?
এখনো চেনো না যদি–
তুমি তবে বৃথাই যুবক!

উন্মাতাল

বৃষ্টির ঝপাৎ ঝুমে ঘুম ভেঙে গেলে
ভোরের মশারি আলোয়–নীল ডানা তুলে
আমিও উড়ে যাই রংবাজ হিলে
পরিরা পাখনা মেলে–কোর্ট হিলে এলে
দূর কোনো সঙ্গীতে বৃষ্টি হলে
পাহাড় চুড়োয় নাচি কাঁচুলি খুলে
আমারই শরীর-রঙে কর্ণফুলী দোলে।

আমি কী আমার থাকি! কে আমাকে ভোলে!
আমি কৃষ্ণ আমি রাধা নাচি ভুল জলে
আড় বাঁশি বেজে যাক মৃত্যু অতলে–

দূরত্ব

অনেক দূর তো হেঁটেছি তোমার আয়ুস্কাল জুড়ে
কোনো কথা গলায় বিঁধে গেছে,
কোনো সময় করেছো আড়াল
শ্বাসপ্রশ্বাসে বুঝি, বুঝি তোমার ভনিতাকাল! 

আজো আমি সমুদ্রজল! 
আমার অতল জুড়ে–
ভুলে না যাওয়া তট-বালুরেখা–
ঠোঁট জুড়ে নুনের সাম্পান!
পাল তুলে হাল ধরে বিছিয়েছি জলের ফরাস!
সূর্যসমাধি দেখে ভেবো না 
অন্ধকারই সত্য।
ভনিতা বৈভবে বুঝি ঢাকা পড়ে সত্য সময়?

আজ বুঝি আত্মার সুগন্ধী কতো, কতোটা পচন!

চামর দোলাও, যত বেশি গাল দিয়ে
প্রতাপের তাপে ছাড়খার করো–
ভাবো, তত বড় তুমি! 

আমি এক হাওয়া-গান,
নিজের সঙ্গে চলি–নিজেরই অনুসঙ্গে
তোমাকে যাতনা মানি জীবন বিভঙ্গে।

সাধ্য কী বলো–
তোমায় উড়ালে বাঁধি? আর উজানে টানি– 
জীবন বিভায়!

ছুটি

ঘড়ি থেকে সময়চিহ্ন নিয়েছি খুলে
পক্ষীর ঠোঁটে জীবনের খুদকণা
আমাকে ছুঁড়েছি অনন্ত ঊর্ণাজালে
মিথ্যে সকলই অহেতুর ঘর বোনা!

থেমে গেছে দিন, রাতের প্রাচীন ঘুঁটি
দিয়েছি নিজেকে মহাজাগতিক ছুটি!

আহা কান্না, মৃত্যুমাদল ঝড় তোলো ভৈরবী
ছিঁড়েখুঁড়ে খাই, নিজকে সাজাই মৃত্যুর মসনবি!

ইচ্ছেমৃত্যুর খোল-করতাল–বাজায় মৃত্যুফণা 
মরে মরে বাঁচি–মৃতবৎ নাচি কিম্ভূত ব্যঞ্জনা!

ভিড় নই আমি,একা ও একক–ভবপাড়ে নেই ঘর
তোমাকে কী চিনি! আমাকেও বলো! কে আপন কেবা পর!
তুমি জাদুকর, বড় কারিগর ভ্রান্তিলোচন তোমার
মগজে ও মনে ভুল বিরচনে করছো জীবন পার!

আধেক জীবন পার করেছি কুয়াশার মতো মিছে
কিছু দেখা যায় কিছু ধোঁয়াশা অন্ধ ছানির নিচে!

ভেবেছি শ্যামা, অগ্নিব্রতেরও বিন্যাস নিতে জানি
ছিঁড়েছি পাঁজর, রক্ত ঝাঁঝর হৃদ–তন্দুরখানি

পুড়ে পুড়ে আজ হয়েছি ধোঁয়াশা উড়ে গেছি মহাকাশে
পাবে না তো আর ইচ্ছে পুতুল–বেদনায় আক্রোশে।

প্রতিকৃতি

খোল করতালে নাচি, আত্মা খুলে রাখি
ছিঁড়ে ফেঁড়ে রক্ত বুনি, নিজেই সমেহন
অস্তিত্বের জিহ্বার নিচে মৃত্যু প্রহেলিকা
আমাকে কে বেড়াতে নেয় মনোবৃন্দাবন!
আমাকে কে বুনে রাখে সমেহনে তার!
নিজেকে চিৎকারে রাখি খত-পটি খুলে
আমাকে মুক্ত করি মৃত আত্মা ছিঁড়ে।

কোথায় রয়েছে পক্ষী নীল কবুতর
তাকেও ছিঁড়ে খাবো পরানের ভেতর!
খুলে গেলে লেলিহান সন্দেহ-শিখা
মৃত কথামালা খোলে গোপন খোসা।

অগ্নি-উনুনে রাখি সিলভিয়া প্লাথ
কতো সুখ কতো রাত কতো মেদুরতা
তোমরা জানো না তাকে, তার সহপাঠ
ধারালো ইস্পাত ফলায় বিছানা পাতা!

ছিঁড়ে ফেলো, উন্মূলে, শ্মশানসম
ছাই হয়ে উড়ুক এই বেদনাজন্ম।

লেখক:
Selina Sheli
সেলিনা শেলী, কবি, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার, অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর মহিলা কলেজ।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট