সোহাগপুর বিধবাপল্লী: জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ

Comments

তৎকালীন শেরপুর মহকুমা বর্তমান শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর ও বেনুপাড়া। সীমান্ত ঘেঁষা শান্ত গ্রাম দুটির মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করে আসছিল। ১৯৭১ এর এপ্রিল মাস থেকে হানাদার বাহিনীর পৈশাচিকতার কিছু খবর তারা পেয়েছিল। তাদের মাঝে তৈরি হয়েছিল উৎকন্ঠা আর ভয়।

আর দশটা দিনের মতোই ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই -এর  সকালে সোহাগপুর গ্রামের মানুষ কেউ লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে মাঠে গিয়েছিল, কেউ কেউ ছিল বাড়িতেই।

এমন সময় সকাল ৭টার দিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মেশিনগানের শব্দে কেঁপে উঠে উত্তর সোহাগপুর এলাকা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মানুষজন আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। নেমে এল এক বিভীষিকা।

নালিতাবাড়ী ও শেরপুর এলাকার আলবদর, রাজাকার ও আলশামসের প্রধান, জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের পরিকল্পনা ও নির্দেশে স্থানীয় আলবদর, রাজাকার, আলশামসের নেতা বল্লু বকা বুড়া, নসা ও কাদির ডাক্তার পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ১৫০ জন সৈন্য নিয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ীর সোহাগপুর ও বেনুপাড়া গ্রামে প্রবেশ করল।

যাতে করে কেউ পালাতে না পারে সে জন্যে সৈন্যরা সোহাগপুর প্রফুল্লের দীঘি থেকে সাধুর আশ্রম পর্যন্ত এলাকা ঘিরে রাখল। প্রথমেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হলেন রমেন রাসেল, চটপাথাং ও মিরিশ গ্যাব্রিল নামের ৩ জন আদিবাসী গারো অধিবাসী। চটপাথাং ও মিরিশ বাড়ির সামনে মাঠে কাজ করছিল।

দুটি গ্রামে সেদিন মন্তাজ আলী, শহীদ আলী, আবুল বাশার ও হাসেম আলী, সফিউদ্দিন, কিতাব আলী, মোন্নাস আলী, মোহাম্মদ আলী, মমিন মিয়া, কুটুমউদ্দিন, রেজত আলী, ঈমান আলী, ঈমান আলীসহ ২৪৫ জনকে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন বয়সের ১৭০ জন নারী পাকিস্তানিদের বর্বর নির্যাতনের শিকার হন।

1971_Widows_Shohagpur_Martyres

ছবি: হারুন উর রশীদ স্বপন

পাক হানাদার বাহিনী চারদিক থেকে সোহাগপুরকে ঘিরে চলেছিল নির্মম হত্যার মহোৎসব। প্রায় আটঘন্টা ধরে চালানো পৈশাচিকতায় হত্যা করল ১৮৭ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। গ্রামের ৬২ জন নারী বিধবা হন। মুহূর্তেই ভেঙে গেল তাদের সাজানো গোছানো সোনার সংসার। সেদিনের হত্যাযজ্ঞ এ গ্রামে তৈরি করল ৫৯টি গণকবর।

স্বাধীনতার পর প্রায় পুরুষহীন গ্রামটি প্রথমে বিধবাপাড়া ও পরে সোহাগপুর বিধবাপল্লী হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করে।

স্বাধীনতার পর ঐ গ্রামের অসহায় বিধবাদের জীবন সংগ্রাম আরো বেড়ে গেল। ৭২ পরবর্তী সরকারগুলো তাদের তেমন কোন খোঁজ খবর রাখেনি। বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠা এবং কিছু ব্যক্তি নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে এই গ্রামের বিধবাদের সহযোগিতা করেন। এতে প্রায় ৩১ জন বিধবা কোনক্রমে জীবন চালিয়ে আজও বেঁচে আছেন।

সম্প্রতি সরকার এদের মাঝে প্রথম পর্যায়ে ৮ জন ও পরে ৪ জন, মোট ১২ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরা হলেন:

১) সালমা বেওয়া
২) হাফিজা বেওয়া
৩) জবেদা বেওয়া
৪) আছিরন বেওয়া
৫) জোবেদা বেওয়া
৬) হাসেন বানু
৭) মহিরন বেওয়া
৮) আছিরন নেছা
৯) জরিতন বেওয়া
১০) হাসনে আরা
১১) হাজেরা বেগম-১
১২) হাজেরা বেগম-২

সরকার সোহাগপুর বিধবাপল্লীকে ‘বীরকন্যাপল্লী’ নামে অভিহিত করেছে।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.