একটা মানুষ ছিলো
আমরা তার শরীর নিলাম
অস্ত্রাঘাতে
বন্দুকের সস্তা গুলি, পাওয়াও যায় যত্রতত্র
কৃষকের ধান, গরিব মানুষ, করের টাকা
লোকটা কবরে গেল, দোয়া-দরুদ আর যা কিছু
আইনের লোক খুশি হলো
দিলো পাকা কাগজ, শাপলা ফুলের ছবিওয়ালা
এ হত্যার জয় আমাদের, বিচার নয়
কবরে আছে অনেক দিন
তবু বাতাসে ওড়ে কেমন একটা অস্বস্তিবোধ
এতো মানুষ কথায় কথায় বাদ্য বাজায়
ফেনা তোলে বকতে বকতে
বড়ো মানুষ, বড়ো মানুষ, আমাদের বাড়ির পিতা
ওর বাড়িটা হলো নষ্টের মূল
মানুষজন বেড়াতে আসে, মেকি কান্না
ছবি তোলে, যেন পূজার বেদি
সহ্য হয় না
এবার আমরা বাড়ি নিলাম
প্রথমে আগুন, টুকিটাকি জিনিস ভাঙা
পরের বারে উৎপাটন, ভীষণ ভারী যন্ত্রপাতি
অবশ্য সেসব কিছুও সস্তা জিনিস
কৃষকের ধান, গরিব মানুষ, করের টাকা
আবার আমরা জয়ী হলাম
আইন দিলো বীরের যাত্রা
শাপলা ফুলের ছবির কাগজ? সে সব পরে হবে
আমরা এখন মালিকপক্ষ
অস্বস্তির ভাবটা কিন্তু রয়েই গেছে
লোকটা কবরে আছে, তার বাড়ির ওপর
মানে যে জায়গায় বাড়ি ছিলো, পেশাব করে কালো বিড়াল
এমনকি ওর নাম তুললেই সমস্যা হয়
পুলিশ অথবা ঢিলেঢালা জামাজোব্বা বাজার ভাঙে
তবু মানুষজনের বাদ্যযন্ত্র, হাহুতাশ আর ফাজিল কান্না
আমরা বেশ আতংকিত
লোকটা যেন ভুতের মতো
যতই মারি, আঘাত করি, অপমান আর ধ্বংসলীলা
তার কণ্ঠ যেন আরো সতেজ, যেন ছড়িয়ে পড়ে অনেক জনের বুকের মাঝে
তার হাতের পাইপ আর মোটা কালো ফ্রেমের চশমা
দুঃস্বপ্নে তাড়া করে
ওর নামটা এখন মুছে ফেলা খুব প্রয়োজন
নচেৎ নষ্ট হবে ভবিষ্যতের আলো বাতাস, আমাদের সকল কিছু
কি করা যায়, বলতে পারেন?
অগাস্ট ১৭, ২০২৫; ভাদ্র ৩, ১৪৩২

ভালোবাসা এবং কবিতা
জোর করে কি কবিতা আসে
ভালোবাসা?
বুকের ভেতর কানা গলির চিকন কন্যা
শূন্যতার ব্যবসা করে
আবেগের মেঘ উড়ে গেছে, শুকিয়ে গেছে—
পরকালের অভিশাপে
এভাবে কি জীবন চলে
শুধু ভাত ডাল আর শরীর-খেলা
ফুলের সুবাস, চাঁদের আলো
কতদিন কাছে আসে না
আসলেই কি আকাশ জুড়ে বৃষ্টি ছিলো?
ভেজা পাতা, ঘাসের বুকে সবুজ আলো?
খাঁখাঁ দুপুর ঘুরে বেড়ায় যত্রতত্র
আমার কোন তুমি ছিলো?
দৃষ্টি ভরে ছড়াতো যে আনন্দ আর বিষণ্ণতা
উচ্ছলতা, রাগ কখনো
উস্কে দিতো বেঁচে থাকা
তেমন মানুষ, ঘুমের ঘোরেও মনে পড়ে না
মার্চ ৩০, ২০২৬; চৈত্র ১৬, ১৪৩২

আমরা, আমি, তুমি
আমরা
স্তব্ধ দুজন, নির্বাক
কিছু কি করার আছে, যৌথ প্রয়াস?
বসার ঘরে নতুন ঢঙের বাতি পাখা অথবা ছাদবাগানের লাউশাক
কিংবা পুত্র কন্যার জমাট ছবির আলোচনা
মনে হয় না
দিনের পাঙ্গাস রাতের চিকেন আর লোডশেডিঙেই কাহিনি শেষ
অথচ যুগল জীবন সেদিনও ছিলো প্রাণবন্ত
কণ্ঠে, চোখে, নীরবতায়
আমি
দেখি নতুন যুগের চালু নাটক, ঈর্ষা আর ঈর্ষা
যুবক জানে কি চাই, কাকে
স্বচ্ছ দৃষ্টি, স্পষ্ট দাবী
আমার তো ভিন্ন জীবন, কোনো কিছুই বুঝলাম না
তোমার স্পর্শ, হাসি, এক বিছানায় রাত্রি যাপন
আটকে গেলাম, এক জনমের বেঁচে থাকা
আমি কি সেই মানুষ– যে ছিলো তোমার অপেক্ষাতে, শুধু তোমার
যদি হতো অন্য কেউ, ভালোবাসতো শরীর ঘেঁষে
তবে কি ফুল ছড়াতাম তার জন্য?
তুমি
চোখের পাপড়ি, মায়া ছড়ায়, এখনো
ফুরফুরে ক্রিমের গন্ধ, বয়সের দাগ চোখে পড়ে না, প্রায়
যোগব্যায়ামের বাঁকানো মুদ্রা, কি সহজে শরীর ঘুরাও, আহ্লাদে
শাড়ি, ব্লাউস, জুয়েলারি– আকর্ষণীয়া, কেউ কি ডাকে?
কি চাও তুমি?
শরীর, নাকি পাশে বসে হাত ধরা, গুনগুন, আর ভালোবাসা
মে ২৯, ২০২৩; জ্যৈষ্ঠ ১৬, ১৪৩০

ঘুরে দাঁড়াই
অন্ধকার গলিপথের নোংরা মাস্তান
কুশলী হাতে ক্ষুরের ঝলক
চাপা হাসি জানান দেয়, চেনে আমাকে
পালাতে চাই, দৌড়োই, বুকের হাপর ওভারটাইম করে
স্মরণ করি অলিম্পিক স্প্রিন্টারের ভঙ্গি, জমাট পেশি খুলে অক্লেশে বার করে গতি
বিফল চেষ্টা, প্রতি শ্বাসে স্পষ্টতর তার শার্টের প্রিন্ট
সে জানে আমার গতি, ফুসফুসে অক্সিজেনের মাপ, রক্তের চিনি আর ল্যাকটিক এসিড
চেনে আমার গন্তব্য
স্থানাঙ্কের নির্ভুল মাপে খুঁজে নেবে
দুর্গন্ধ শহরে, নীল আকাশ আর সবুজ সমুদ্রের সঙ্গমে
ঘাড়ের নিচে শিরশিরে ঠান্ডা, অদৃশ্য হাত অবিরাম ঘষে ভয়ের বরফ
উপায়বিহীন আমি ঘুরে দাঁড়াই, মনুষ্যত্বের শেষ বিন্দু আঁকড়ে ধরি
দুর্বল কণ্ঠে বলি, আর নয়
এই দেখো আমার শরীর, স্ফীত উদর, কাপুরুষের বুক
অপমানে শক্ত হওয়া ত্বক, ঝোলা থুতনি
নাও, যা তোমার পছন্দ
ঝলসে উঠুক ভাঁজখোলা ক্ষুর, লুকোনো আগ্নেয়াস্ত্র
আর সহ্য হয় না ভয়
হাড়ের ভেতর মজ্জায় মজ্জায় ভয়
কে আপনি, কি বলছেন, মাথা ঠিক আছে?
সরে যায় সে, যেন রাস্তার পাগলের স্পর্শ এড়ায়
সামনে এগোয় দ্রুত
যদিও চোখে তার ভিন্ন বয়ান, স্পষ্ট দেখি, বিস্ময়
জন্মান্তরের কাপুরুষ, হঠাৎ এতো সাহস
ব্যাপারটা কি?
অগাস্ট ২০, ২০২৫; ভাদ্র ৫, ১৪৩২

বাঁধন
ঝলমলে হাসি মুখ
টকটকে লিপস্টিক, যেন গুনগুন ঠোঁটের কবিতা
কথা বলছো
শ্বাসনালীর মৃদু কম্পন পৌঁছে যায় স্টাইলিশ ব্লাউস,
একপাশ বুকঢাকা শাড়ির আঁচল
কি কথা?
বড়ো পর্দার নতুন কাহিনী, পারিবারিক আহ্লাদ,
নাকি সকালের সহযাত্রীকে নিবেদিত দৃষ্টির আদর
বেচারা, কতদিন সে ঘুমুবে না
কি কথা তোমার বাঁধন?
আমার শ্রুতি বন্ধ, কানের ফুটোয় ঢেলেছি নরম ছাঁচের মোম
হয়তো অভেদ্য কাচের জানালার বাইরে আমি
কিংবা নষ্ট টেলিভিশন আমার সম্বল
কি আসে যায় বলো
তোমার অনায়াস আনন্দ, মায়াভরা চাউনি, যত্নে সাজানো অগোছালো চুল
আমার কল্পনার মোড়কে নির্ভুল বিস্তারে ছড়ায় মোহ
এই ভালো
উচ্চারণ আনে শুধু বাক্যের বিড়ম্বনা
মে ৯, ২০২৬; বৈশাখ ২৬, ১৪৩৩

লেখক:
সৌমী মোস্তফা
কবি, গবেষক, অর্থনীতিবিদ