স্মৃতির অলিন্দে ১৫ অক্টোবর, ১৯৮৫ । সাগর লোহানী

Comments

১৫ অক্টোবর, ১৯৮৫, সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার দিকে আমাদের সংগঠন স্বরশ্রুতি-র কিছু কাজ সেরে রিতা (ক্ল্যারা রোজারিও)দের ক্রিসেন্ট রোডের বাসা থেকে আমি আর অমিত বের হলাম রিক্সায়। জগন্নাথ হলের পুর্ব গেটে নামালাম অমিতকে। ফিরলাম আমাদের কমলাপুরে মতিঝিল কলোনির বাসায়। খাওয়া দাওয়া সেরে সম্ভবতঃ রাত ১১ টা বা সাড়ে ১১ টার দিকে বিটিভি-র নিউজ এ শুনলাম সেই ভয়াবহ সংবাদটা। মুহুর্তে অমিতের মুখটা ভেসে উঠলো। সেকালের টিএন্ডটি ফোনে পরিচিত সাংবাদিক এবং ঢাকা ইউনিভারসিটি এলাকায় বাস করা শিক্ষকদের যোগাযোগ করে নিশ্চিত হবার চেষ্টা করতে কেটে গেলো অনেকটা সময়।

সেই সময়ের ঢাকায় অতো রাতে গাড়ি পাওয়া খুব কঠিন, ষ্টেশনের সামনে ঝিমুতে থাকা এক রিক্সাওয়ালাকে অনেক কষ্টে পল্টন মোড় পর্যন্ত যেতে রাজী করিয়ে রওয়ানা হলাম। মনে হল পৃথিবীর সবচাইতে ধীর গতির রিক্সায় উঠেছি। পল্টন থেকে প্রায় দৌড়ে পৌঁছুলাম ঢাকা মেডিকেলে। ইমার্জেন্সিতে মানুষের ঢল, চিৎকার, কান্নার আওয়াজ আর ছোটাছুটি। আহতদের কয়েকজনকে চিনলাম, অনেককেই চেনার উপায় নেই, যারা মারা গেছে তাঁদের দেখার সাহস পেলাম না। ভিড়ের মাঝে পরিচিতদের খুঁজলাম দুয়েকজনের সাথে কথা বলে জানতে চাইলাম অমিতের সাথে দেখা হয়েছিল কিনা, নির্মল, অনুপম, কার্তিক, বিমলকে দেখেছে কিনা। সঠিক কিছুই জানতে পারলাম না। ভরসা একটাই ওরা কেউই পুরনো ভবনে থাকতো না। ছুটলাম হলের দিকে। সেখানে পৌঁছে স্থবির হয়ে গেলাম। ঐতিহাসিক ভবনটা খুঁজে পেলাম না। ছাত্র, শিক্ষক, জনতা, পুলিশ, ফায়ার ফাইটার গিজগিজ করছে। এগিয়ে ধ্বসে পড়া ভবনের ভেতরে ঢুকলাম, ঢুকতেই জহির রায়হানের সেই রচনাটা মনে পড়ে গেলো। পা ফেলতে ভয় লাগলো- জল কাদা রক্ত মগজ স্যান্ডেল গামছা বই সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে মেঝেতে। পা আটকে গেলো এগুতে পারলাম না।

আরও পড়ুন: ১৫ অক্টোবর: আমাদের পথ চলার  বাঁকে

তখন আহতদের জন্যে রক্তের প্রয়োজন। যে যে ভাবে পারছে রক্ত দিচ্ছে কিম্বা রক্তের খোঁজে ছুটছে মিটফোর্ড, পিজি, সন্ধানী আর রেডক্রিসেন্টে। প্রচুর রক্তের প্রয়োজন। সকালে টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ায়, গেমস রুমে রেডক্রিসেন্ট, সন্ধানী, লায়ন্স ক্লাবের সহযোগিতায় ব্যবস্থা হল রক্ত সংগ্রহের। আজিজ, বাবু, তোতন, তুহিনসহ আমরা অনেকের সাথে যুক্ত হলাম সেই যুদ্ধে। যুদ্ধই বটে – আমি সেই ৭৮ থেকে নিয়মিত রক্ত দান করি রেডক্রসে। কখনো প্রয়োজনে সময় মত রক্ত পাইনি কারণ গুটিক’য় ডোনার ছাড়া রক্ত দান করত না কেউ। এমনকি নিজের বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তানের প্রয়োজনেও নিজেরা দিত না ছুটত ব্লাড ব্যাংকে। সেই দেশের মানুষ যেন রক্ত দেয়ার প্রতিযোগিতায় নামলো ১৬ অক্টোবর সকালে। টিএসসির মেইন গেট বন্ধ করে বিশাল লাইন সামাল দিতে হিমশিম খেতে হল আমাদের। প্রায় ৭০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে স্কুল ছাত্র-ছাত্রী যাদের সামলাতে আমাদের ভীষণ বেগ পেতে হয়েছিল। ভিক্ষুক, রিক্সা চালক, বাস চালক, উকিল, ডাক্তার, মওলানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষের রক্ত দেবার সে আকুতি এখনো আবেগ তাড়িত করে। বেলা ১১ টার দিকে একটি বাস ভরে ঘোড়াশাল থেকে একদল স্কুল ছাত্র এসে উপস্থিত হল টিএসসিতে। রক্ত দেবে- কিছুতেই মানবে না যতই বলি ওদের বয়স হয়নি- ওরা বলে স্কুলে পড়ে ঠিকই কিন্তু বয়স ১৮ এর উপরে স্কুলে বয়স কম দিয়েছে। সেদিন দেখেছিলাম রক্ত দিতে পারলো না বলে বাচ্চাগুলোর কি কান্না। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর হারিয়েছিলাম আমাদের খুব কাছের ৩৯ জনকে কিন্তু পেয়েছিলাম মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি। কেউ সম্প্রদায় খোঁজেনি, রাজনীতি খোঁজেনি, দল খোঁজেনি। কথায় নয় এগিয়ে এসে কাজে দেখিয়েছিল ‘মানুষ মানুষের জন্যে’।

বিকেলের দিকে হঠাৎ কে যেন খবর দিল বিটিভি থেকে আমাদের খোঁজ করছে যোগাযোগ করতে বলেছে জরুরী ভাবে। সম্ভবতঃ মিতা (ক্রিস্টিনা রোজারিও) বিটিভির অনুষ্ঠান প্রধান খালেদা ফাহমির সাথে কথা বলে এসে জানালো জগন্নাথ হলের ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে আবৃত্তির একটা অনুষ্ঠান করতে হবে সেই রাতে। আমরা সকলেই ছিলাম ভীষণ ক্লান্ত এবং প্রস্তুতিহীন। সিদ্ধান্ত হল পরের সন্ধ্যায় ১৭ তারিখে অনুষ্ঠান করবো। রিয়াজ ভাই (আলী রিয়াজ), আমান ভাই (আমান উদ দৌলা), রিতা, অমিত (অমিতেশ রয়), মিতা, কেয়া (ক্যাথেরিনা রোজারিও), বন্যা (বন্যা লোহানী) সকলে বিভিন্ন রচনা সংগ্রহ করে বসলাম আমাদের বাসায় পরদিন সকালে। এলো জাহাঙ্গীর ভাই (জাহাঙ্গীর আলম), তৃপ্তি (শাহজাদী হোসনে আরা), আজিজ (সৈয়দ আজিজ), সাঈদ হাসান তুহিন, কিসলু (ইমামুল হক)। তৃপ্তি আর জাহাঙ্গীর ভাইকে আমি আর বন্যা মিলে তুলে দিলাম গান দুটো। অডিওভিস্যুয়াল মিডিয়া তাই একই ধরনের শাড়ী আর ছেলেদের জন্যে পাঞ্জাবীর খোঁজে ছুটল কেউ কেউ। কোন রকমে একবার চোখ বুলিয়ে দুপুরে চলে গেলাম রামপুরা টেলিভিশন সেন্টারে। প্রডিউসার ছিলেন সম্ভবতঃ আলি ইমাম। রামপুরায় পৌঁছে তাঁর সাথে বসে প্রোগ্রাম ডিজাইন নিয়ে কাজ শেষ করতেই সন্ধ্যা ৭টায় ক্যামেরা অন হল তাও আবার লাইভ টেলিকাস্ট। কেমন করে যে ৩০ মিনিট পার হয়ে গেলো টের পাইনি। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে রিয়াজ ভাইয়ের ডাকে তাকিয়ে দেখলাম শুধু আমরা নই স্টুডিও আর কন্ট্রোল রুমে যারা ছিল সকলের চোখ ছলছল করছে। বিটিভির ইতিহাসে এধরনের আবৃত্তি অনুষ্ঠান লাইভ টেলিকাস্ট আর কখনো হয়েছে বলে শুনিনি। হৃদয়ের উষ্ণতায় সিক্ত আবেগের প্রকাশ যে কত অসাধারণ হতে পারে সেদিনের সেই ‘কাঁদো বাংলার মানুষ আজিকে কাঁদো’ অনুষ্ঠানটিই তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

লেখক: সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.