স্মৃতির মণিকোঠায় কাজীদা । লায়লা আফরোজ

Comments

গতকাল (১৯ জানুয়ারী ২০২২) ছিলো আমার জীবনের অন্যতম একটা বিষন্ন দিন। পরপারে চলে গেলেন কাজী’দা অর্থাৎ ‘সেবা প্রকাশনী’র কর্ণধার অগণিত পাঠকের প্রিয় কাজী আনোয়ার হোসেন।  সংবাদটা প্রথম পাই, তাঁর পুত্রবধূ মাসুমা মায়মুরা’র পোস্ট পড়ে। জানতে পারি, ১০ই জানুয়ারি থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। আহা, ৮৬ বছর বয়স !

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন-কিছু কিছু মৃত্যু আমাদের ব্যক্তিগত শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কিছু কিছু মৃত্যু আমাদের সমষ্টির ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু সমষ্টির ক্ষতি’। তেমনি, কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুও আমাদের সামষ্টিক ক্ষতি। কারণ, তিনি কয়েকটি জেনারেশানকে বিগত কয়েক দশক ধরে অতি স্বল্প মূল্যে (পেপারব্যাক) বিশ্বসাহিত্য পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন যদিও তার অধিকাংশই ছিলো ওয়েস্টার্ণ থ্রিলার। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর যখন আমাদের চারপাশ শূন্য করে দিয়ে এই চর্চিত, প্রজ্ঞাবান, শুভবোধ সম্পন্ন আধুনিকমনস্ক মানুষগুলো একে একে দূর গ্রহের তারা হয়ে যাচ্ছেন তখন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কথাটাই বারবার মনে পড়ছে। কারণ, এঁরাই তো লাইট হাউজ হিসেবে আমাদের অন্ধকার পথে আলো ফেলে ফেলে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে গেছেন জীবনভর।

আমার বড়ো ভাই এ টি এম শামসুদ্দীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তিনি। সেই সূত্রেই আমাদের বাসায় যাতায়াত ছিলো তাঁর। কতো কতো স্মৃতি ! অসংখ্য হবি’র মধ্যে তাঁর অন্যতম নেশা ছিলো মাছ ধরা। ধানমন্ডি লেক-এ বন্ধুরা সবাই মিলে এ্যাংলার্স এসোসিয়েশান গড়ে তুলেছিলেন। প্রয়াত নজরুল সঙ্গীত গুরু সুধীনদাশ গুপ্তসহ অনেক বিখ্যাত মানুষ ওই ‘সৌখিন মৎস শিকার সমতি’র সদস্য ছিলেন। কাজী’দার একটা জিপ ছিলো। সেই জিপে চড়ে মাছ ধরতে চলে যেতেন কতো দূর-দুরান্তে! টিকেট কেটেও মাছ ধরতে যেতেন তাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে!  

জীবনযাপনে তিনি তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ‘মাসুদ রানা’র মতোই ছিলেন। ছিলেন অতলান্তিক সাগরের মতো গভীর এবং রহস্যময়। ২-২ বোরের লাইসেন্সধারী পিস্তল রাখতেন সাথে। বড়ো ভাইদের ওই গ্যাং-এ সবচেয়ে কম বয়সী ছিলেন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট লুড্ডু খাঁন। তিনিও  লাইসেন্সধারী পিস্তল ক্যারী করতেন। 

আমাদের বাড়ীতে তখন ১০টা জর্মন স্পীৎজ। একবার পার্ভো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৩টে প্যারালাইজড হয়ে যায়। ওদের কষ্ট দেখে আমাদের নীদ হারাম হয়ে যায়। ধানমন্ডি ২৭ নাম্বার রোড়ের ভেট ড. আলীও সেই সময় ব্যক্তিগত কাজে ঢাকার বাইরে ছিলেন। বাস্তব সমস্যার কারণে ওদের ‘ফুলবাড়িয়া পশু হাসপাতাল’-এও  নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিলো না। ওই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ হিসেবে কাজী’দা ‘মার্সি কিলিং’ সাজেস্ট করেন। বলেন, যুদ্ধক্ষত্রে ঘোড়া আহত হলে ওদের গুলি করে মেরে ফেলাই রেওয়াজ। এতে করে ওদের কষ্ট কমে যায়। ওয়র ফিল্ডে মারাত্মক আহত সোলজারদের ক্ষেত্রেও কখনো কখনো ওই নিয়ম মানা হয়।  

এক সন্ধ্যায় কাজী’দা আর লুড্ডু খাঁন এলেন ওই মহান দায়িত্বটি পালন করার জন্য। খুব কাছ থেকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে লুড্ডু ভাই ওদের পরপারে পাঠিয়ে দিলেন। চলচ্চিত্রে বহুবার গুলি করে মানুষ ও প্রাণী হত্যা দেখেছি কিন্তু নিজগৃহে স্বচক্ষে সেই প্রথম দেখি। আমাদের বাড়ীর রেড অক্সাইডযুক্ত ফ্লোরের ওপর মর্ক-মিন্ডি-স্যান্ডির তাজা রক্ত জমাট বেঁধেছিলো বহুক্ষণ। পরে, চটের ব্যাগে ভরে ওদের নিথর দেহগুলো রায়ের বাজার বিলে রেখে আসা হয়। এরপর, আমি কয়েকদিন ভাত খেতে পারিনি। ঘুমের মধ্যেও ২-২ বোরের গুড়ুম গুড়ুম গুড়ুম শব্দ শুনতে পেতাম।

সেই কাজী’দার উৎসাহে ১৯৮৪-১৯৮৮ পর্যন্ত আমি ‘সেবা প্রকাশনী’র মান্থলি ডাইজেস্ট ‘রহস্য পত্রিকা’র মহিলা পাতা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করি। কাজী’দাকে বলেছিলামঃ আমি আমার পাতায় রান্না-বান্না, রূপ চর্চা এসব ফানি এবং সিলি বিষয় নিয়ে লিখতে পারবো না। উনি বলেছিলেনঃ বিষয় নির্বাচনের ওপর তোমার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকলো। ‘রহস্য পত্রিকা’য় কাজ করার সময় কোনদিন সম্পাদক সাহেব (কাজী’দা) আমার পাতায় কাঁচি চালাননি । ‘রহস্য পত্রিকা’র মহিলা পাতার তখন প্রচুর পাঠক, প্রচুর চিঠি আসতো। ব্যাগে ভরে সেসব চিঠি আমাকে ‘সেবা’র কর্মচারিরা বাড়ী পৌঁছে দিয়ে যেতো। ওই চিঠিগুলো পড়ে তার ভেতর থেকে বাছাই করে কয়েকটার জবাব দিতে হতো প্রতি সংখ্যায়। ‘রহস্য পত্রিকা’ এখন বের হয় কিনা জানিনা। ৮৮- সালে ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেবার পর সময় কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না বলে ‘সেবা প্রকাশনী’ থেকে আমি বিদায় নিই।   

একজন মেধাবী, সুক্ষ্ম রুচিবোধসম্পন্ন স্মার্ট বাঙালি পুরুষ ছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। কী মিষ্টি-মধুর সুরেলা কন্ঠ তাঁর। পাকিস্তান পিরিয়ডে ‘উর্দু’ এবং ‘বাংলা’ সিনেমায় প্লেব্যাক সিঙ্গার ছিলেন। যদি গানটাকে নিয়েই থাকতেন তাহলেও তাঁর জীবন কেটে যেতো অনায়াসে। কিন্তু কাজী’দা ছিলেন এক সপ্নবান সুপারম্যান।

খুব ঠোঁটকাটা মানুষ ছিলেন তিনি। একবার বলেই ফেলেছিলেন, আমার বোনগুলো রবীন্দ্র সঙ্গীতটাকে চিবিয়ে একেবারে শেষ করে দিলো! পরিবারের অমতে সাবিনা-নিলুফার ইয়াসমিনের বড়ো বোন ফরিদা ইয়াসমিনকে বিয়ে করেছিলেন। দু’জনেই তখন রেডিওর এনলিস্টেড আর্টিস্ট। কিন্তু রেডিওতে গান গেয়ে আর কয় পয়সা উপার্জন হয়? কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. কাজী মোতাহার হোসেনের পুত্র হিসেবে পরিবারে অভাব ছিলো না বটে তবে অভাব আর অর্থাভাব এক বিষয় নয়। কাজী আনোয়ার হোসেনের আত্মসম্মানবোধ ছিলো প্রবল। শুনেছি, সেই সময় অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে মাত্র ১২ টাকা হাতে নিয়ে তিনি ‘সেবা প্রকাশনী’ শুরু করেন।

আমার বড়ো ভাইয়ের ৬৫ তম জন্মদিনে তাঁর ‘ওল্ডফ্রেন্ডস এসোসিয়েশান’কে আমি ইনভায়েট করেছিলাম। ওয়াহিদুল হক ভাইও এসেছিলেন। প্রায় ৫০ বছর পর রেস্টুরেন্টের আলো-আঁধারির ওই পার্টিতে কাজী’দার সাথে ওয়াহিদ ভাইয়ের দেখা (একদার শ্যালক-দুলাভাই তাঁরা)। অথচ এই ঢাকা শহরেই দু’জনের বসবাস। পরষ্পরকে বুকে জড়িয়ে ধরে আমার দিকে ফিরে ওয়াহিদ ভাই বলেছিলেন- লায়লার জন্যই এটা সম্ভব হলো।

সময়টা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। মহামারীর ছোবল জেরবার করে দিচ্ছে। চারদিক থেকে ক্রমাগত স্বজনদের অসুস্থতার খবর আসছে। জানিনা সামনে আমাদের জন্য আরো কী অপেক্ষা করছে!

ফটো ফিচার সৌজন্য: প্রথম আলো

লেখক:

লায়লা আফরোজ, আবৃত্তিশিল্পী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা

বাঙালীয়ানা/এসএল

*প্রকাশিত এ লেখার তথ্য, মতামত, ভাষা ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই প্রকাশিত এ লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট