স্মৃতি পিপীলিকা

Comments

। ইরাজ আহমেদ ।

“ স্মৃতি পিপীলিকা তাই আমার রন্ধ্রে সঞ্চিত করে মৃত মাধুরীর কণা
সে ভুলে ভুলুক কোটি মন্বন্তরে আমি ভুলিবো না, কভু ভুলিবো না।”

কে কাকে ভুলে যায়? কে মনে রাখে? মাথার উপরে অনন্ত মহাকাশে জন্ম নেয়া আর মরে যাওয়া কোটি নক্ষত্রের স্মৃতি কোথায় লেখা আছে? একটি নক্ষত্র কি পাশ থেকে পুড়ে ছাই হওয়া আরেকটি নক্ষত্রের স্মৃতি মনে রাখে? রাখে না। রাখা সম্ভব না বৈজ্ঞানিক ভাবে। নক্ষত্রদের তো মন বলে কিছু নেই। কিন্তু মানুষ মনে রাখে। মানুষের মনের ভিতরের প্রেক্ষাগৃহে স্মৃতি তার নিজেরই অভিনীত আশ্চর্য এক ছায়াছবি যা মনে রয়ে যায়।

পিপীলিকা শব্দটা মনের পর্দায় অগণিত পায়ে চলাচলের একটা ছবি ফুটিয়ে তোলে। পিঁপড়ার মতো ধারাবাহিক এবং নিরন্তর এক চলাচল তার সার্বিক গতি নিয়ে এগিয়ে আসছে অথবা পিছিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে। কাল কার সঙ্গে কথা হলো মনে নেই অথচ চল্লিশ বছর আগে সকালবেলা কে বলেছিল, অপেক্ষা কোরো, তার স্মৃতি ঠিক মনে আছে। পিঁপড়ার এই চলনের সঙ্গে কবি সুধীন দত্ত তাঁর কবিতায় জুড়ে দিয়েছিলেন স্মৃতি শব্দটা। তাঁর কবিতার পরের চরণেই তো আছে মৃত মাধুরীর কণা সঞ্চয়ের কথা। সেই মৃত মাধুরী ব্যথার অথবা আনন্দের। হাহাকার অথবা কোনো প্রাপ্তির। সুধীন দত্ত অবশ্য তাঁর ওই নির্দিষ্ট কবিতাটিতে স্মৃতি পিপীলিকার সঙ্গে মৃত মাধুরীর সঞ্চয়ন যুক্ত করে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার হাহাকারের তীব্র আক্ষেপকেই ফুটিয়ে তুলেছেন।

স্মৃতির ভিতরে বহু অলিগলি। সেখানে সাজানো ঘরবাড়িতে সাজানো থাকে বহু ছবি। সেই ঘরবাড়ির ভিতরের আবহ আর মানুষ ভেসে থাকে চিন্তার প্রবাহে। তাদের কখনো আপ্রাণ চেষ্টায় জমিয়ে রাখি কখনও। আবার খুইয়েও ফেলি। কবির মতো মনের মধ্যে বারবার বলি, ‘সে ভুলে ভুলুক কোটি মন্বন্তরে/ আমি ভুলিব না, কভু ভুলিব না।কিন্তু মনে থাকে কি?

আচমকা কোথাও একটা হ্যারিকেন দেখে টুক করে মনের পুকুরে ভেসে ওঠে শেষবার হ্যারিকেন জ্বালবার স্মৃতি। মাথার ভিতরে আবার সেই পিপীলিকাদের চলাচল শুরু হয়। দলবদ্ধ হয়ে খুলির নিচে নরমে হেঁটে আসে কবে সময়ের এক ফুঁয়ে নিভে যাওয়া সময়ের নানান আবহ। অন্ধকারে ফসলের মাঠ, হিজল গাছের ছায়া, গ্রামের ঘর, কাচের চিমনির ঘেরাটোপে মৃদু নড়তে থাকা আগুনের শিখা সামান্য আলো ফেলে রেখেছে টেবিলে; জানালা দিয়ে গন্ধরাজ ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে… ব্যাস, এটুকুই হয়তো সঞ্চয়। কয়েক সেকেন্ড পরেই পুরো ছবিটা আবার নির্বাপিত আয়ুহীন অন্ধকারে। স্মৃতি পিপীলিকা কোন রন্ধ্রে জমিয়ে রাখে এইসব মৃত মাধুরীরর কণা কে জানে? কিছুদূর জানে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের কাছে এই মনে পড়া-না-পড়ার রহস্যের ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু মানুষের মন কি গবেষণার অভিসন্দর্ভের কাছে পুরোটা নির্ভরশীল? ঘাসের চেয়েও দ্রুত সঞ্চরণশীল মানুষের মন কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়, স্মৃতির বইয়ের কোন পৃষ্ঠা পলকে উল্টে আবার পলকেই বন্ধ করে ফেলে তার খবর বিজ্ঞানের কাছেও হয়তো নেই। কত স্মৃতি জোর করে ভুলে যেতে চায় মানুষ। কত ঘটনার কবর তার মনের মধ্যে খোঁড়া আছে! আবার কত স্মৃতির চিতা পুড়ছে তো পুড়ছেই। চাইলেও ভুলতে পারা যায় না। কিন্তু মানুষ ভুলে যায়। জন্মের স্মৃতি আমার মনে নেই। অসুখের ঢেউ এসে মনের ভিতর থেকে একটু একটু করে সরিয়ে নিয়ে যায় জমিনের নিশানা; গতকালের স্মৃতিটুকুও তখন আর মনে পড়তে চায় না। চিকিৎসকরা এ অসুখের নাম দিয়েছেন ডিমেনশিয়া। পৃথিবীর বহু মানুষই স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার এই রোগে ভুগছে এখন। মনের দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে কিছু স্মৃতি ফিরে পাবার কী অসহায় চেষ্টা! দাগগুলো ছিলো, মানুষের মুখ ছিলো, শব্দ, সম্পূর্ণ বাক্য, ভালোবাসা সব ছিলো। সবকিছুর পৃথক পৃথক স্মৃতি সাজিয়ে রাখা ছিলো প্রকষ্ঠে। কিন্তু সব ক্ষয় হয়ে মুছে গেছে। ফেলে যায়নি মনে করবার সূত্রটুকুও। পৃথিবীতে এখন মানুষের এই বিস্মৃতির অসুখ প্রবল ভাবে রাজত্ব করছে। লোপাট করে দিচ্ছে আমাদের সব মনে রাখাগুলো।

সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমায় শর্মিলা ঠাকুরের একটি সংলাপ ছিলো, ‘মনে…রেখে দেব’। কী গভীর প্রত্যয়, অস্পষ্ট ভালোবাসার কী ভীষণ টান সবকিছূ ধরে রাখার। মনের মধ্যে সব ধরে রাখার আকুতি! নায়ক ছবিটি সেখানে শেষ হয়েছিলো মানুষের জীবনে আরও কিছুটা গল্প সেখান থেকেই শুরু হয়। সে গল্পের পরিণতি অজানা। সিনেমার সেই চরিত্রটির সঙ্গে জীবনের পথে একা হয়ে থাকা অভিনেত্রীর আর দেখা হয়েছিলো? আমরা জানি না। কিন্তু আমরা ভাবতে ভালোবাসি, সেই অখ্যাত নারী চরিত্রটি প্রখ্যাত অভিনেতাকে মনে রেখে দিয়েছিলেন।

আমরা ভাবতে ভালোবাসি। মনে রাখতে চাই অঙ্কের ফর্মূলা থেকে শুরু করে প্রেমিকার মুখ। কিন্তু সব তো মনে থাকে না। বিস্মৃতি এ প্লাস বি হোল স্কোয়্যারের সূত্র মনে রাখার চাইতেও ভয়ানক। খসে পড়া নক্ষত্রের স্মৃতি মনে পড়ে না আর। রাত্রিবেলা ঘুম ভেঙে গ্রামের পুকুরে অসংখ্য জোনাকি পোকা আলো নিভিয়ে ফিরে গেলে থেকে যায় শুধু জীবনানন্দ দাশের কবিতার অন্ধকার আর মুখোমুখি বসিবার অবসর। আমাদের মনে পড়ে শুধু মৃত মাধুরীর কণা। মহাকাশে ছড়ানো কয়েকটি নক্ষত্র হয়তো।

লেখক:
Iraz Ahmed 1
ইরাজ আহমেদ
কবি ও কথাসাহিত্যিক, ঢাকা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট