হিন্দি ভাষার আগ্রাসন কংগ্রেসেরই পুরনো নীতি । রাহমান চৌধুরী

Comments

সারা ভারত জুড়ে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেয়ার যে কথা অমিত শাহ বলেছেন, সেটা নতুন কিছু না। জিন্নাহ যে হঠাৎ উনিশশো চল্লিশ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান প্রদেশগুলিকে নিয়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই স্বায়ত্বশাসিত একটি আলাদা ভূখণ্ড দাবি করেছিলেন, তার অন্যতম কারণ হিন্দি ভাষার আগ্রাসন। সাঁইত্রিশ সালে যখন কংগ্রেস প্রাদেশিক শাসন ক্ষমতা লাভ করে তখনো হিন্দিকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে তাদের শাসিত প্রদেশগুলিতে। জিন্নাহ তখন বুঝতে পারেন, কংগ্রেস সর্বদাই সংখ্যালঘুদের উপর এই আগ্রাসন চালাবে। কংগ্রেস মন্ত্রীসভাগুলি তখন উর্দুর পরিবর্তে হিন্দি ভাষা প্রচলন, কুরবানীতে গো হত্যা নিষিদ্ধ, জাতীয় পতাকা হিসাবে কংগ্রেসের পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ‘বন্দে মাতরম’ ব্যবহার করার নীতি ঘোষণা করে। মুসলিমরা যে ভারতের নাগরিক এটা যেন তাদের কাছে গ্রাহ্য ছিলো না। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা বহু ধর্ম এবং ভাষাভাষী মানুষের ভারতবর্ষে হিন্দুত্বের জয়গান গাইছিলো। কংগ্রেসের এইসব প্রচারের মধ্যে ভাষাগত বিষয় এবং গো-রক্ষা প্রধান হয়ে ওঠে। [সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুরঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়]

হিন্দি ভাষার প্রসার বা হিন্দিকে রাষ্ট্রীয়ভাষা করাটা ছি‌লো হিন্দু, জৈন, পার্শি ধর্মাবলম্বী বড়ো ব্যবসায়ীদের স্বার্থবাহী। বহু টাকা ব্যয় করেছিলো এইসব ব্যবসায়ীরা উর্দুর বিরুদ্ধে হিন্দি ভাষার প্রসারের জন্য। কংগ্রেসের হিন্দি ভাষা প্রচলনকে কেন্দ্র করে মাদ্রাজে আপত্তি ওঠে, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম পরিচালিত হয়। হিন্দি ভাষা সকলের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়ায় মাদ্রাজ বা তামিল নাড়ুতে স্বাধীনতার পরেও সেই সংগ্রাম বহুকাল ধরে চলেছিলো। স্বাধীনতার পর মাত্র এক ভোট বেশি পেয়ে হিন্দি রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃত পেয়েছিলো। হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছিলেন মাদ্রাজের শ্রীরামালু। তিনি ছিলেন গান্ধীবাদী নেতা, হিন্দু ভাষার বিরুদ্ধে তেলেগুভাষা নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের দাবিতে তিনি অনশন করে প্রাণ দেন। [সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুরঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়] জিন্নাহ দীর্ঘদিন হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সুসম্পর্ক চাইলেও, কংগ্রেসের সঙ্গে একটি সু সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও তিনি সাঁইত্রিশ সালে বুঝতে পারেন তা সম্ভব নয়। তিনি নিজের দীর্ঘদিন মতাদর্শ থেকে এই সময় সরে দাঁড়ান।

জিন্নাহ উনিশশো পাঁচ সালে কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। উনিশশো চোদ্দ সাল থেকে উনিশশো উনিশ সাল পর্যন্ত তিনি হয়ে দাঁড়ালেন কংগ্রেসের প্রথম সারির আলোচিত নেতাদের একজন। কিন্তু গান্ধী যখন মুসলমানদের ধর্মীয় খিলাফত আন্দোলনকে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে চান, জিন্নাহ আপত্তি জানিয়ে কংগ্রেস ত্যাগ করেন। জিন্নাহ চাননি কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিতরে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে কট্টোর ধার্মিকদের হাতে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে। গান্ধী মুসলমানদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এবং মুসলমানরা গো-হত্যা করবে না এই শর্তে খিলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। মুসলমানরা গো-হত্যা করবে না বলাতে গান্ধীর পরামর্শে হিন্দুরা খিলাফতকে সমর্থন করেন। জিন্নাহ এ ধরনের ধর্মীয় আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া পছন্দ করেননি। কংগ্রেসের অন্য নেতারা প্রথম গান্ধীর বিরোধিতা করলেও, সাধারণ মানুষের মধ্যে গান্ধীর জনপ্রিয়তা দেখে সকলে তাঁর কাছে নতজানু হলেন। জিন্নাহ নীতি বিসর্জন না দিয়ে কংগ্রেস ছাড়লেন।

জিন্নাহ উনিশশো তেরো সাল থেকে কংগ্রেসের পাশাপাশি মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। তিনি মুসলিম লীগ আর কংগ্রেসকে সম্পূর্ণ এক লক্ষ্যে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে যুক্ত করার জন্য দুই দলের মধ্যে উনিশশো ষোল সালে লখনৌ চুক্তি সম্পাদনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন। লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেস পশ্চাদপদ মুসলমানদের কিছু ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নেন। কংগ্রেস-মুসলিম লীগ এরপর যৌথ সংগ্রামে শামিল হয়। জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন এই শর্তে যে, মুসলিম লীগ কংগ্রেসের লক্ষ্যের বিরুদ্ধে যাবে না। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ব্রিটিশদের পক্ষাবলম্বন করবে না। লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেসের তৎকালীন প্রধান নেতা গোখলে খুব খুশি হয়েছিলেন। জিন্নাহ বিশ্বাস করতেন, ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে জয়ী হতে হলে ভারতের হিন্দু-মুসলমানকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। জিন্নাহ উনিশশো চল্লিশ সাল পর্যন্ত এই বিশ্বাসকে অন্তরের গভীরে লালন করতেন। কিন্তু বিশ সালে গান্ধী কংগ্রেসের হাল ধরলে ঘটনা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। কংগ্রেসে তখন নতুন নেতা হয়ে এসেছে নেহরু, আবুল কালাম আজাদ, বল্লভভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, মোহাম্মদ আলী প্রমুখ।

জিন্নাহ কংগ্রেস ত্যাগ করলেও মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি উনিশশো চব্বিশ সাল থেকে উনিশশো ত্রিশ-বত্রিশ সাল পর্যন্ত নানাভাবে কংগ্রেস আর মুসলিম লীগকে এক মঞ্চে রেখে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চালাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু কংগ্রেসের দিক থেকে সেভাবে সাড়া লাভ করেননি। কংগ্রেসের উপর তখন হিন্দু মহাসভার প্রভাব ভয়াবহ। কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয় অনেক সদস্যরাই ছিলেন হিন্দু মহাসভার সদস্য। জিন্নাহ যেখানে চাইতেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, হিন্দু মহাসভা সেখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচারে ব্যস্ত ছিলো। হিন্দু মহাসভার বিনায়ক দামোদর সাভারকর উনিশশো তেইশ সালে তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ গ্রন্থ প্রকাশ করেন যেখানে সুস্পষ্টভাবে তিনি হিন্দুদের পৃথক জাতিসত্তা বলে প্রচার করেন। [অশোককুমার মুখোপাধ্যায়, ‘ভারতে সাম্প্রদায়িকতা: স্বরূপ, উৎস ও উত্তরণ’]

জিন্নাহ ভারতের স্বরাজ লাভের স্বার্থে তবুও হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা বাদ দেননি। সুকান্ত পাল লিখেছেন, মনে রাখতে হবে কংগ্রেস ত্যাগ করার পর জিন্নাহর কার্যাবলীর মূল কেন্দ্র হয়ে উঠলো মুসলিম লীগ। হিন্দু-মুসলমান ঐক্য এবং স্বরাজ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু তখনো একই ছিলো। মুসলমানদের পশ্চাদপদতা এবং হিন্দুদের বিরাট সংখ্যাধিক্যের কথা চিন্তা করে তিনি হিন্দু মুসলমানদের জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলতে লাগলেন। [সুকান্ত পাল: ভারতে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ] জিন্নাহ চাইতেন পশ্চাদপদ মুসলমানদের জন্য সকল ক্ষেত্রে কিছু আসন সংরক্ষণ যাতে তারা সামনে এগিয়ে আসতে পারে। গান্ধী মনে করতেন, হিন্দু মুসলমান সকলকে যোগ্যতার মাপকাঠির বিচারে চাকরি বাকরি সহ সকল ক্ষেত্রে সুযোগ পেতে হবে। তিনি সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষণে বিশ্বাস করতেন না।

জিন্নাহ মনে প্রাণে সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, ছিলেন না ধার্মিক ব্যক্তি। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী ছিলেন। জিন্নাহ ভারতের শাসনতন্ত্র রচনার ক্ষেত্রে চাইতেন, প্রদেশগুলির হাতেই থাকবে সকল ক্ষমতা। তিনি মনে করতে কেন্দ্রের হাতে থাকবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আর বিদেশ দফতর, আর সকল ক্ষমতা প্রদেশগুলিকে দিয়ে দিতে হবে। কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভা মনে করতো, শাসনতন্ত্রে সকল ক্ষমতা থাকবে কেন্দ্রের হাতে। দরকার হলে কেন্দ্র প্রদেশের উপর যে কোনো আইন চাপিয়ে দিতে পারবে, প্রাদেশিক সংবিধান স্থগিত করার ক্ষমতা রাখবে। জিন্নাহর সঙ্গে কংগ্রেসের এই সব মত পার্থক্য দূর হয়নি। জিন্নাহ মনে করতেন, হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য না হলে দাঙ্গা যেমন বন্ধ হবে না। ব্রিটিশ সরকার হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ বাধিয়ে রাখবার সুযোগ নেবে। জিন্নাহ সংখ্যাগুরু কংগ্রেসকে এই সব যুক্তির পক্ষে না আনতে পেরে হতাশ হয়ে পড়েন। গান্ধী বলতেন. ভারতে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার কথা। হিন্দু মহাসভার সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনি চাইতেন, ভারতের গোমাতাকে রক্ষা করার জন্য গো হত্যা বন্ধ করতে। ধর্মনিরপেক্ষ এবং সকল সংখ্যালঘুর স্বার্থ সংরক্ষণ করার প্রশ্নে, সংখ্যাগুরু হিন্দুদের সঙ্গে পেরে উঠবেন না মনে করেই জিন্নাহ বত্রিশ সালে ভারতের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে চাইলেন।

মুসলমান সমাজের বিভিন্ন জনের অনুরোধে তিনি রাজনীতিতে পুনরায় প্রবেশ করলেন। জিন্নাহ উনিশশো চৌত্রিশ সালের এপ্রিল মাসে ভারতে ফিরলেন। লিয়াকত আলী সহ মুসলিম লীগের কতিপয় ব্যক্তির অনুরোধে তিনি ভারতে ফিরে এসে মুসলিম লীগের হাল ধরলেন। জিন্নাহ ফিরে আসার পর জিন্নাহকে বিপুলভাবে সম্বর্ধনা দেওয়া হলো। মুসলিম লীগের বিবাদমান দুই পক্ষ জিন্নাহর নেতৃত্বে একত্রিত হলেন এবং জিন্নাহকে মুসলিম লীগের সভাপতি করা হলো। জিন্নাহ সাংবাদিকদের নিকট বললেন, ‘লীগ বেশ স্বাস্থ্যসম্পন্ন এবং সুস্থই আছে। আর আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে ভারতের স্বার্থ সাধনের জন্য মুনলমানরা আর সব সম্প্রদায়ের তুলনায় পিছিয়ে থাকবে না।’ জিন্নাহ ততদিনে বুঝে নিয়েছেন, মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কারো দয়া নয়, কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা নয়, নিজেদের শক্তি অর্জন করতে হবে। তিনি আরো বললেন, ‘হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সম্পূর্ণ সহযোগিতা ও মৈত্রী স্থাপনার চেয়ে আর কোনো কিছু আমার কাছে সুখকর নয় এবং আমার এই বাসনাপূর্তির ব্যাপারে আমার মনে হয় মুসলমানদের অবিচল সমর্থন রয়েছে।’ জিন্নাহ চৌত্রিশ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও বলছেন যে, ‘প্রথমে আমি একজন ভারতবাসী, তারপর মুসলমান।’ তিনি পঁয়ত্রিশ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেও বললেন, ‘হিন্দু-মুসলমানরা যতদিন না একত্রিত হয় ততদিন ভারতবর্ষের পক্ষে আশার কিছুই দেখি না।’ [শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, জিন্না:পাকিস্তান নতুন ভাবনা] জিন্নাহই একমাত্র বারবার সকল কিছুর আগে হিন্দু-মুসলমানদের ঐক্যের কথা বলছেন।

জিন্নাহ উনিশশো চৌত্রিশ সালে ভিন্ন এক মানুষ, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কংগ্রেসে যেহেতু আর ফিরবার উপায় ছিলো না, তাই তিনি মুসলিম লীগকে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে দাঁড় করাতে চাইলেন। তিনি মুসলিম লীগকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী এবং স্বাধীনতাকামী জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেবার কথা ভাবলেন। কিন্তু তিনি কারো সঙ্গে বিরোধের কথা বললেন না। যশোবন্ত সিংহ দেখাচ্ছেন যে, জিন্নাহ যে মুসলিম লীগের দায়িত্ব নেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, সেটা কোনো সচল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিলো না। যাঁরা নেতৃত্বে ছিলেন তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন খেতাবধারী মানুষ, নবাব কিংবা জমিদার। সঙ্গে আর ছিলো সুযোগ সন্ধানীর দল, যাঁরা চিরকালই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে ঘোরাফেরা করে। এই নেতৃত্ব মুসলিম স্বার্থ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন বটে কিন্তু সবার আগে ছিলো নিজেদের স্বার্থচিন্তা। জিন্নাহ সেরকম ছিলেন না। যশোবন্ত সিংহ মনে করেন, জিন্নাহ ছিলেন ষোল আনা রাজনীতিক। [যশোবন্ত সিংহ, জিন্না ভারত দেশভাগ স্বাধীনতা] নিজের স্বার্থচিন্তা তিনি করেননি। সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্যই কিছু করতে চেয়েছিলেন। তিনি সেজন্য বিলাত থেকে ফিরে এসে মুসলিম লীগের সভাপতি হবার পর কংগ্রেসের সভাপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ এবং পরবর্তীতে জওহরলাল নেহরু সঙ্গে কয়েকবার আলোচনায় বসেন। যার মূল কথা ছিলো, প্রদেশগুলির হাতে স্বায়ত্বশাসন আর পশ্চদপদ মুসলমানদের জন্য কিছু আসন সংরক্ষণ যা‌তে হিন্দু মুসলমান‌দের ম‌ধ্যে সম্প্রী‌তি রক্ষা হয়।

সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক নিরাপত্তার দাবিকে জিন্নাহ সাম্প্রদায়িকতা মনে করতেন না, সংখ্যালঘুদের স্বাভাবিক ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিসঙ্গত দাবি বলে মনে করতেন। কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে রাজেন্দ্রপ্রসাদ বা নেহরুর তা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিলো না। কারণ তারা চাইতেন সকল ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে থাকবে। ভিন্নভাবে তারা মনে করতেন, ভোটের মধ্যে দিয়ে সকল সিদ্ধান্ত হবে, কোনো আসন সংরক্ষিত থাকবে না। সংখ্যলঘু মুসলমান‌দের স‌ঙ্গে ঐক্য করা নি‌য়ে তা‌দের মাথা ব্যথা ছি‌লো না। ম‌নে কর‌তো সংখ্যালঘু মুসলমান‌দের উপর নির্ভর করার কিছু ‌নেই তা‌দের। কারণ তারা সংখ্যাগুরু, ফ‌লে জিন্নাহর কথা ম‌তো হিন্দু মুসলমা‌নের মিলন তা‌দের কা‌ছে গুরুত্ব পায়‌নি। কং‌গ্রেস জান‌তো মুসলমা‌নের ভোট ছাড়াই তারা ক্ষমতায় যে‌তে পার‌বে। পঁচিশ শতাংশ মুসলমানরা যে এক‌টি শ‌ক্তি এটা তাঁরা ম‌নে কর‌তেন না। ফলে মুসলিম লী‌গের স‌ঙ্গে কংগ্রেসের কোনো আপস হলো না। উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে ভারতে প্রথম বয়স্ক ভোটাধিকার প্রথা চালু হয়। সম্পদের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে মাত্র আঠারো শতাংশ মানুষকে ভোটাধিকার দেয়া হয়। উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালের ভারত শাসন আইনে নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা পূর্বের পঁয়ষট্টি লাখ থেকে বাড়িয়ে করা হলো তিনকোটির কাছাকাছি। ভারত শাসন আইনের তিরানব্বই ধারা অনুযায়ী গভর্ণর কোনো প্রদেশের শাসনভার অধিগ্রহণ ও অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিচালনা করতে পারতেন। নতুন শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন কিছুটা দেয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা থেকে গেল।

নতুন সংবিধানে প্রাদেশিক ক্ষেত্রে ভারতীয়দের ক্ষমতা ভোগের সুযোগ সৃষ্টি হলেও কেন্দ্র সম্পূর্ণরূপে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় মূল ক্ষমতা ব্রিটিশদের হাতেই থেকে যায়। সন্দেহ নেই, প্রথমদিকে নেহরু উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালের ভারত শাসন আইনের তীব্র বিরোধী ছিলেন এবং নির্বাচন বয়কট করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বিড়লা ও গান্ধীর তরফ থেকে বলা হলো কংগ্রেস নির্বাচনে অংশ নেবে। ব্যবসায়ীরা নির্বাচনের জন্য পাঁচলক্ষ টাকা চাঁদা দেন। নেহরু নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি মেনে নিলেন। নেহরু তখন যুক্তি দেখালেন যে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ ভোটার ও ভোটদানে বঞ্চিত মানুষের কাছে তাদের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া যাবে। কংগ্রেস তখন যাবতীয় সংগ্রামের পথ বর্জন করে উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। [সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুরঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়, আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাস ] ব্যবসায়ীদের চাপে পড়ে কংগ্রেস এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

মুসলিম লীগ নির্বাচন করবার সিদ্ধান্ত নেয় এবং নির্বাচনী ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। নির্বাচনী ঘোষণায় তারা চোদ্দটি ধারার উল্লেখ করে। লীগের সেই কর্মসূচী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে মাত্র দুটি ধারায় মুসলমানদের স্বার্থসংক্রান্ত বিষয় স্থান পেয়েছিলো। দুটোর প্রথমটি হলো মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকারগুলি রক্ষা করা আর দ্বিতীয়টি মুসলমানদের সাধারণ অবস্থার উন্নয়ন। বাকি সবগুলিই ছিলো ভারতের জনগণের স্বার্থসংক্রান্ত দাবি। যেমন যাবতীয় দমনমূলক নীতিকে প্রত্যাহার করা, জাতিগঠন মূলক কাজে অধিকতর অর্থ বরাদ্দ, কুটির শিল্পসহ যাবতীয় শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা, গ্রামীণ জনগণের সামাজিক শিক্ষাগত ও আর্থিক উন্নয়নের ব্যবস্থা, প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা, করভার হ্রাস করা, সর্বত্র সুস্থ জনমত এবং জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকে বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। [মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায়, জাতীয়তাবাদী জিন্নাহ] মুসলিম লীগের নির্বাচন সংক্রান্ত ভূমিকা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে রামগোপাল মন্তব্য করেন, ‘এ সময় মুসলিম লীগ সাম্প্রদায়িকতার কথা একরকম বলেইনি এবং নির্বাচনের কর্মসূচীর ব্যাপারে নিজেকে প্রায় কংগ্রেসের সমপর্যায়ে উন্নীত করে।’ শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রথম দাবিটি ছাড়া এতে এমন কোনো কর্মসূচী নেই যার সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী কোনো ভারতবাসীর অসহমত করার কারণ থাকতে পারে।’ [শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়] মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, কংগ্রেস যে নির্বাচনী ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছিলো তার সাথে লীগের ঘোষণাপত্রের তেমন কোনো পার্থক্য ছিলো না।

মুসলিম লীগের নির্বাচনী ঘোষণাপত্রে এবং ব্যক্তিগত ভূমিকার দ্বারা জিন্নাহ কংগ্রেসের প্রতি যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাকে প্রত্যাখ্যান করে কলকাতার প্রকাশ্য জনসভায় নেহরু বলেন, ‘যতই উদার চেহারা নিয়ে দেখা দিক না কেন কংগ্রেস কোনো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উপর নির্ভর করতে পারে না।’ [ মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায়] জওহরলালের মুসলিম লীগকে সাম্প্রদায়িক দল বলার পিছনে যুক্তি ছিলো না। বরং কংগ্রেসের নেতা গান্ধী ভারতে যেভাবে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন, হিন্দুদের আরাধ্য দেবী গো-মাতাকে রক্ষার জন্য গো-হত্যা নিবারণ করতে চাইতেন, সেটা ছিলো ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার বিপরীত। গান্ধীর দৃঢ় ধারণা ছিলো যে ধর্ম ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। তিনি লিখেছেন, ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নেই এই কথা যিনি বলেন, তিনি ধর্ম কি তাহা জানেন না, সে কথা আমি সবিনয়ে অথচ নিঃসঙ্কোচে বলিতে পারি।’ [মো. ক. গান্ধী, আত্মকথা অথবা সত্যের প্রয়োগ] কংগ্রেস বিশ্বাস করে ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির বা রাষ্ট্রের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তার পরেও নিজেদের বলছে অসাম্প্রদায়িক, ভিন্ন দিকে মুসলিম লীগের বক্তব্যে, সংখ্যালঘু মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা রক্ষার কথা বলা হয়। কিন্তু ধর্মীয় কোনো দাবি দাওয়া ছিলো না। বিচার করলে দেখা যায় মুসলিম লীগ ছিলো অসাম্প্রদায়িক আর কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক। কারণ কংগ্রেসের গান্ধী রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা আর গোমাতা রক্ষার কথা বলেছিলেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র হবার কথা ধর্মনিরপেক্ষ। কংগ্রেসের নেতা গান্ধী বলতেন ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কে কথা, বলতেন রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার কথা। জিন্নাহ বা মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত এই ধরনের কথা বলেনি। মুসলিম লীগ তাহলে সাম্প্রদায়িক দল হলো কী করে? কংগ্রেসই বরং সেই অপরাধে অভিযুক্ত। সোভিয়েত ইউনিয়নের গবেষক দেবিয়াৎকিনা সবকিছু বিচার করার পর লিখেছেন, গান্ধীকে নির্দ্বিধায় পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অবলম্বনকারী নেতা বলে গণ্য করা যায় না। [এফ. টি. দেবিয়াৎকিনা, ‘ভারতের জাতীয় মুক্তিআন্দোলনে ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদ] তিনি আরো লিখেছেন, মুসলিম লীগের প্রথম কর্মসূচীতে এই মর্মে আবেদন জানানো হয়েছিলো যে, ভারতীয় মুসলমানরা যেন নিজেদের প্রধান প্রধান লক্ষ্যে স্থির থেকে অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি সদ্ভাব পোষণ করে। লীগ যে ভারতীয় মুসলমানদের ভারতীয় জাতির অংশ বলেই গণ্য করতো, এটা তার প্রমাণ বলে ধরে নেয়া যায়। লীগ মুসলমান ভূস্বামী, ব্যবসায়ী এবং হস্তশিল্পীদর অধিকার রক্ষায় অগ্রণী হয়েছিলো কিন্তু লীগের দূরদর্শী নেতারা ভালো করেই জানতেন যে ব্রিটিশ শাসন সকল ভারতীয়দের অধিকারেই হস্তক্ষেপ করেছে। সেই কারণে তাঁরা সকল ভারতীয়র সঙ্গে সহযোগিতার উপর জোর দিতেন। [এফ. টি. দেবিয়াৎকিনা]

সাইত্রিশ সালের নির্বাচন অনুষ্টিত হলো। কংগ্রেস বৃহৎ প্রদেশ সমূহের পাঁচটিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং চারটিতে একক বৃহত্তম দল হবার কৃতিত্ব অর্জন করলো। কংগ্রেস এগারোশো একষট্টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে লাভ করলো সাতশো এগারোটি আসন। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো অন্য জায়গায়। মুসলিম আসনগুলিতে কংগ্রেস প্রার্থীরা ভালো করতে পারলো না। কংগ্রেস দলে খুব বেশি মুসলমান ছিলো না সেটা প্রমাণ হয় নির্বাচনেই। প্রদেশিক আইনসভা সমূহে মুসলমানদের জন্য চারশো বিরাশিটি আসন সংরক্ষিত ছিলো। কংগ্রেস মাত্র আটান্নটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, কারণ সবগুলি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো মুসলমান কংগ্রেস দলে ছিলো না। যা প্রমাণ ক‌রে কয়‌গ্রেস মুসলমান সদস্য করার ব্যাপা‌রে অাগ্রহী ছি‌লো না। কংগ্রেস আটান্নটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ছাব্বিশটিতে বিজয়ী হয়। মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত মোট আসনের মাত্র পাঁচ শতাংশের কিছু বেশি তারা লাভ করেছিলো। ফলে কংগ্রেস নিজেকে মুসলমানদের প্রতিনিধি বলতে পারে না। কংগ্রেস দলের প্রতি মুসলমানদের যে খুব বেশি সমর্থন ছিলো না নির্বাচ‌নে সেটা প্রমাণিত হলো। নির্বাচনে মুসলিম লীগের অবস্থা হয়েছিলো যথেষ্ট খারাপ। মুসলমানদের জন্য চারশো বিরাশিটি সংরক্ষিত আসনে মুসলিম লীগ বিজয়ী হয়েছিলো মাত্র একশো তেরোটি আসনে। কংগ্রেসের ছাব্বিশটি বাদ দিলে বাকিগুলি পেয়েছিলো মুসলমানদের প্রাদেশিক স্থানীয় দলগুলি। ফলে মুসলিম লীগ যে দাবি করতো তারা মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী দল সেটাও তখন সত্যি প্রমাণিত হলো না। ভার‌তের মুসলমানরা সব সাম্প্রদা‌য়িক ছি‌লো, বা মুস‌লিম লী‌গের স‌ঙ্গেই ছি‌লো ঘটনা তা প্রমাণ ক‌রে না। নির্বাচনের আগে জিন্নাহর ইচ্ছাতেই কথা হয়েছিলো, ফলাফল যাই হোক, মুসলিম লীগ আর কংগ্রেস মিলে সরকার গঠন করবে।

যখন নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা চলছে, অার রায় তা‌দের প‌ক্ষে অাস‌ছে, তখনই রাজেন্দ্রপ্রসাদ একটি সংবাদ বিবৃতিতে বললেন, ভারতের আইনসভাগুলিতে কংগ্রেস কোনো গোষ্ঠী বা দলের সঙ্গে হাত মেলাবে না। যখন খালেকুজ্জামান কংগ্রেসের সঙ্গে যৌথ মন্ত্রীসভা গঠনের কথা বললেন, যুক্তপ্রদেশে জওহরলাল দুজন মুসলিম লীগ বিধায়ককে মন্ত্রীসভায় নিতে রাজী হন এই শর্তে মুসলিম লীগ ছেড়ে এসে তাঁদের কংগ্রেসে যোগ দিয়ে কংগ্রেসের কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। [সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুরঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়] শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেন, যদি কংগ্রেসের মনে সৎ উদ্দেশ্য থাকতো জওহরলাল লীগকে ‘কঠোর শর্ত’ দেওয়ার কথা ভাবতেন না এবং ভূতপূর্ব কংগ্রেস সদস্য খালিকুজ্জামান এতোটা এগোতে রাজি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সহযোগিতার হাত প্রত্যাখান করা হতো না।

কংগ্রেস হাতে ক্ষমতা পেয়ে মুসলিম লীগ বা মুসলমানদের স‌ঙ্গে পূর্ব প্র‌তিশ্রু‌তি ভঙ্গ ক‌রে নতুন যেসব শর্ত দিয়েছে তা প্রমাণ করে অদূর ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি তাদের ব্যবহার আরো কতোটা নির্মম হবে। জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের জন্য এই প্রস্তাব ছিলো অসম্মানজনক। নিজেদের বিজয়ের সাফল্যে কংগ্রেস বা তার নেতারা মুসলিম লীগ বা জিন্নার প্রতি সামান্য সম্মান বা রাজনৈতিক সৌজন্য দেখাতে পারেননি। যশোবন্ত সিংহ লিখছেন, কংগ্রেস এবং লীগের মধ্যকার জোট সংক্রান্ত আলোচনা ভেঙে গেল এই কারণে যে নির্বাচনী সাফল্যের অহঙ্কারে কংগ্রেস জোট গঠনে যে শর্ত দিয়েছিলেন মুসলিম লীগ নেতা খালিকুজ্জামানের পক্ষে তা মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিলো। মুস‌লিম লীগ সদস্য‌দের দল ছে‌ড়ে কংগ্রে‌সে যোগদান কর‌তে বলা হ‌য়ে‌ছি‌লো, অার লী‌গের সব কর্মসূচী বা‌তিল কর‌তে বলা হয়। খালিকুজ্জামান শর্তগুলি পাঠ করার পর আজাদকে বলেছিলেন, ‘মওলানা, আমি একজন মুসলিম লীগ প্রতিনিধি হিসেবেই আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি, ভিন্ন কোনো পরিচয়ে নয়। অথচ আপনি কিনা আমাকে মুসলিম লীগের মৃত্যুদণ্ডাদেশে সই করতে বলছেন। খুব আশ্চর্য্য! এই শর্তগুলির মধ্যে এমন আপত্তিজনক কথা রয়েছে যাতে আমি স্বাক্ষর করতে পারি না।’ নির্বাচনের স্বল্প আগেও খালিকুজ্জামান ছিলেন কংগ্রেসের সদস্য এবং কংগ্রেসের বর্তমান আচরণে তিনি বিস্মিত হন। যশোবন্ত সিংহ মন্তব্য করেন, ‘সংশয় হয় যুক্তপ্রদেশের মুসলিম লীগকে গ্রাস করে নেওয়াই কংগ্রেসের আসল উদ্দেশ্য ছিলো কি না। অথচ এমন লক্ষ্য কেবল অনুচিত নয়, অসম্ভব ছিলো। ফল হলো উল্টো, মুসলিম লীগের প্রতিপত্তি উত্তরোত্তর বাড়তে লাগলো, যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো দেশভাগ।’[যশোবন্ত সিংহ]

কংগ্রেস নেতৃত্বের ভুল পদক্ষেপ জিন্নার চিন্তাকে ভিন্ন পথে নিয়ে গেল। হিন্দু-মুসলমান সহযোগিতার পথ জিন্নাহ চাইলেও কংগ্রেস চায়নি। তবুও উনিশশো সাঁইত্রিশের নির্বাচরে পর জিন্নাহ ভেঙে পড়েননি বরং নতুন উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে যান। জিন্নাহর মানসিকতা কংগ্রেসের আচরণে বিশেষভাবে পাল্টে যায়। তিনি বুঝতে পারেন হিন্দুদের কাছ থেকে মুসলমানরা সুবিচার পাবে না। কংগ্রেস যে আসলে প্রধানত হিন্দুদেরই প্রতিনিধিত্ব করছে জিন্নাহর কাছে সেটা স্পষ্ট হলো। জিন্নাহ একা নন, বাংলা পাঞ্জাব আর আসামের মুসলমানরা তা সমানভাবে উপলদ্ধি করলেন। কৃষক প্রজা পার্টির ফজলুল হক পর্যন্ত কংগ্রেসের প্রতি গভীরভাবে আস্থা হারিয়ে ফেলেন। বিভিন্ন প্রদেশের ধর্মনিরপেক্ষ নেতারা এই সময়ে সকল মুসলমানকে সংখ্যালঘু হিসেবে নিজেদের অধিকার সংরক্ষণে মুসলিম লীগে যোগদান করতে বলেন। কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনের পর ব্যক্তিগতভাবে জিন্নাহর জনপ্রিয়তা মুসলিম জনমানসে বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তিনি ভারতীয় মুসলমানদের নেতারূপে অভিনন্দিত হন। জিন্নাহ তথা লীগ এই সময় থেকে প্রচার করতে শুরু করে কংগ্রেস হিন্দুদের প্রতিষ্ঠান। [মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায়] জিন্নাহর এই বক্তব্য যে সর্বাংশে মিথ্যা ছিলো না তার প্রমাণ পাওয়া যায় কংগ্রেস সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সহ অন্যান্যদের বক্তব্যে।

কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক চিন্তার পরিচয় পাওয়া যাবে নির্বাচনকে ঘিরে ভিন্ন দুটি ঘটনায়। কংগ্রেস নেতা নারিমানের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো? পরবর্তীকালে আবুল কালাম আজাদ তাঁর ‘ভারত স্বাধীন হলো’ গ্রন্থে জানাচ্ছেন, বোম্বাইয়ে নারিমান ছিলেন স্থানীয় কংগ্রেসের নেতা। প্রাদেশিক সরকার গঠনের প্রশ্নে পদমর্যাদা এবং দলীয় কাজের ভিত্তিতে নারিমানকেই নেতৃত্বদানের আহ্বান জানানো হবে এই ছিলো সাধারণের প্রত্যাশা। নারিমানকে নেতৃত্বে দিতে বলার মানে এই ছিলো যে, যোগ্যতার জোরে একজন পার্শী মুখ্যমন্ত্রী হবেন যেখানে কংগ্রেসের প্রাদেশিক পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য হিন্দু। সরদার প্যাটেল আর তাঁর সহযোগীবৃন্দ কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁদের মনে হচ্ছিলো যে, কংগ্রেসের হিন্দু সমর্থনকারীদের এ গৌরব থেকে বঞ্চিত করা অন্যায় হবে। সেই কারণে নারিমানকে বাদ দিয়ে বোম্বাই প্রাদেশিক নেতা বি জি খেরকে দৃশ্যপটে আনা হলো এবং বোম্বাই প্রাদেশিক পরিষদের নেতা হিসেবে তাঁকে নির্বাচিত করা হলো। কংগ্রেসের সভাপতি জওহরলাল বা গান্ধী কেউ এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেননি। নারিমান এইরকম সিদ্ধান্তে দুঃখে ভেঙে পড়লেন এবং কংগ্রেস ছেড়ে দেয়ার কারণে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটলো। [মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম]

বিহারেও ঘটেছিলো অনুরূপ ঘটনা। নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে সৈয়দ মাহমুদ ছিলেন প্রদেশের প্রধানতম নেতা। তিনি সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস কমিটিরও তিনজনের একজন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং সে কারণে প্রদেশের বাইরে ও ভিতরে উভয় স্থানে তাঁর প্রভাব ছিলো। কংগ্রেস যখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলো তখন এটা ধরেই নেয়া হয়েছিলো যে মাহমুদ নেতা নির্বাচিত হবেন এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের অধীনে বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হবেন। কিন্তু তাঁর পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রীর মনোনয়ন পেলেন কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য কৃষ্ণ সিংহ ও অনুগ্রহ নারায়ণ সিংহ। তাঁদের ডেকে পাঠানো হলো বিহারে। বোম্বাইয়ে সর্দার প্যাটেল যে ভূমিকা পালন করেছিলেন বিহারে সেই একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ। ভারত স্বাধীন হলো গ্রন্থে আজাদ স্বীকার করছেন, কংগ্রেস তার প্রতিশ্রুত আদর্শ পুরোপুরি মেনে চলতে পারেনি। অনুতাপের সাথে স্বীকার করতে হবে যে, কংগ্রেসের জাতীয়তাবোধ তখনো সাম্প্রদায়িক বিবেচনার উর্ধ্বে উঠে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘুত্বের পরিবর্তে মেধার ভিত্তিত্বে নেতা নির্বাচন করার পর্যায়ে যেতে পারেনি। [মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম] জিন্নাহ যে নির্বাচনের পর কংগ্রেসকে হিন্দুদের দল বলেছিলেন তা মিথ্যা বলেননি।

যশোবন্ত সিংহ লিখেছেন, কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গিয়েছিলো। নিজের সাফল্য সম্পর্কে আগে নিশ্চিত ছিলো না বলেই নির্বাচনী আাঁতাতে গিয়েছিলো। যখন ক্ষমতা পেল ‘সংখ্যায় ছোট, সুতরাং অপ্রাসঙ্গিক’ সহযোগীকে ক্ষমতার ভাগ দেওয়া দরকার থাকলো না। এটা একেবারেই বিশুদ্ধ সংখ্যাগুরুবাদ। তিনি আরো বলেন, যার বাস্তব পরিণাম হয়েছিলো ভয়ংকর। [যশোবন্ত সিংহ] হিন্দু শব্দটা হয়ে দাঁড়ায় ‘সাম্প্রদায়িক’ চরিত্রের অভিজ্ঞান। সুতরাং ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’-র প্রতিকূল। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতা’-র সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে মেলানো যা। কংগ্রেসের চরিত্রধর্মে তারই প্রকাশ ঘটেছিলো। গান্ধী আশ্রমের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিচিত্র নারায়ণ শর্মা এক চিঠিতে বলেন, ‘নির্বাচনে কংগ্রেস প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। আর কংগ্রেসের স্বার্থপরায়ণতা বৃদ্ধি পেল। জওহরলাল সেই প্রবাহে ভেসে গেলেন। বলা যায় কংগ্রেসের “অহং”-এর সর্বোচ্চ মাত্রা ছিলো তাঁর ভিতরেই। এই কারণে সে সময়ে মুসলমানদের উপেক্ষা করা হয়েছিলো। আর তার দুষ্পরিণাম হলো প্রবল। পাকিস্তানের জন্মের মূলে এই কারণ। দীর্ঘদিন যাবৎ আমার এই অভিমত পাকিস্তান সৃষ্টির মূল দায়িত্ব আমাদের, হিন্দু সম্প্রদায়ের। কংগ্রেসেরও।’ [ বিচিত্রনারায়ণ শর্মার ১৪ই জুলাই ১৯৮৪ সালে লেখা পত্র ]

কংগ্রেসের প্রত্যাখ্যান জিন্নাহর মনে দারুণ আঘাত দিয়েছিলো। জিন্নাহ উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের অক্টোবর মাসে মুসলিম লীগের লখনৌ অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘মুসলমানদের বিশেষত বিগত দশ বছর ধরে ভারত থেকে আরো বেশি বিচ্ছিন্ন করে তোলার জন্য কংগ্রেসের বর্তমান নেতৃত্বই দায়ী। যেখানে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং যেখানে পরিস্থিতি তাঁদের সহায়ক, সেখানেই তাঁরা মুসলিম লীগের সঙ্গে সহযোগিতা করার ব্যাপারে নারাজ থেকেছে এব নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ বা তাঁদের কর্মসূচীতে স্বাক্ষর করার দাবি করেছে।’ লখনৌ অধিবেশনে জিন্নাহ পূর্ণ স্বরাজের ডাক দিলেন যেখানে মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে। সন্দেহ নেই, এই সময় থেকেই মুসলিম লীগ শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। কারণ মুসলিম লীগ ছিলো সংখ্যালঘু মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী দল, যারা ধর্মীয় কোনো বক্তব্য রাখেনি বা ইসলাম ধর্ম পালন বা প্রত্যাখান নিয়ে কথা বলেনি। সাম্প্রদায়িকতা বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের যথেষ্ট দায় ছিলো। সাম্প্রদায়িকতা বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে কংগ্রেস মন্ত্রসভাগুলিরও যথেষ্ট দায়িত্ব ছিলো, কংগ্রেস তার নিজেস্ব প্রতিবেদনে সে কথা স্বীকার করে। সেখানে বলা হয়, “একথা সত্য যে আমাদের কংগ্রেসী হিন্দু বন্ধুরা খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছেন।” [সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুরঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়]

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘু, দুই বর্গের মনোভাবই স্পষ্ট ধরা পড়লো। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো কংগ্রেসের চিন্তাধারা। এই দল দেশে একটি একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভিমুখে যেতে চাইছিলো, তার আশা ছিলো অন্য দলগুলিকে কংগ্রেসের মধ্যে নিজেদের মিশিয়ে দেবে। ভিন্ন দিকে ছিলো মুসলিম ভারতের ঐক্যের ধারণা। যশোবন্ত সিংহের গ্রন্থে বলা হয়েছে, জিন্নাহ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বাস্তব রাজনীতির কিছু মূল্যবান শিক্ষা পেলেন, যে শিক্ষা তিনি রাজনীতির তত্ত্ব চর্চা করে কোনো দিনই পেতেন না। তিনি এবং মুসলিম লীগ ‘আদর্শবাদী হিসেবে নির্বাচনে গিয়েছিলেন। নির্বাচন তাঁদের বাস্তববাদী করে তুললো। ভারতের ক্ষেত্রে এবং তার ভাবী স্বাধীনতার পক্ষে যার তাৎপর্য ছিলো সুদূরপ্রসারী। উনিশশো সাইত্রিশ সালের নির্বাচন এবং কংগ্রেসের নির্বাচন পরবর্তী আচরণ প্রথমবার সম্প্রদায়-মনস্ক মুসলিমদের বিস্মিত এবং স্তম্ভিত করে দিয়েছিলো। তাঁরা বুঝতে পারলেন, বর্ণ হিন্দুরা নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ কিন্তু মুসলমানরা দুর্বল, বিভক্ত এবং বিচ্ছিন্ন।’ জওহরলাল বা গান্ধী বা কংগ্রেস যতোই নীতিগত যুক্তি খাড়া করুক না কেন, মুসলিম লীগের সঙ্গে জোটে না যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত তাঁরা নিয়েছিলেন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য তার পরিণাম হলো ভয়াবহ। [যশোবন্ত সিংহ] মুসলমানরা নিজেরা এইবার মিলিতভাবে ভিন্ন পথে হাঁটতে শুরু করলেন। যদি কংগ্রেস মুসলিম লীগকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করতো, তাহলে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা সহজ হতো এবং পরবর্তীতে যেসব হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়েছে সেগুলি এড়ানো যেতো। দু-পক্ষ মিলে দাঙ্গাগুলিকে সহজে রোধ করতে পারতো। বলা বাহুল্য ‘সংখ্যালঘুদের ন্যায়সঙ্গত স্বার্থ’ দেখার দায়িত্বটি প্রধানত কংগ্রেসেরই ছিলো কিন্তু কংগ্রেস ঠিক উল্টো পথেই হাঁটলো।

জিন্নাহ নির্বাচন পরবর্তী লখনৌ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বর্তমান কংগ্রেস নেতৃত্ব বিশেষ করে গত দশ বছর ধরে এমন নীতি নিয়ে চলেছে যা ভারতের মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে এবং এ নীতিগুলি পুরোপুরি হিন্দু নীতি।’ জিন্নাহ আরো বললেন, ‘যখন থেকে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠ ছয় প্রদেশে মন্ত্রী সভা গঠন করেছে তখন থেকেই তারা কথায় ও কাজে বুঝিয়েছে তাদের কাছ থেকে মুসলমানরা সুবিচার পাবে না।’ [মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায়] নির্বাচনের পর জিন্নাহ তবুও শেষ চেষ্টা করেছিলেন হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যাতে ঐক্য বজায় থাকে। তিনি নির্বাচনের পর এই বিষয়ে সাহায্য চেয়ে গান্ধীর কাছে প্রকাশ্যেই আবেদন জানান। গান্ধীর উত্তর ছিলো হতাশাব্যঞ্জক। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কিছু করতে পারলে খুশি হতাম কিন্তু আমি সম্পূর্ণ অসহায়। হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ব্যাপারে আমার বিশ্বাস আজও সমান উজ্বল কিন্তু আমি কোনো দিবালোক দেখতে পাচ্ছি না, আমার সামনে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, এবং এই বিপদের সময়ে আমি কেবল ঈশ্বরের কাছে আলোকভিক্ষা চাইছি।’ ইতিহাস প্রমাণ করে, গান্ধীর ঈশ্বর কংগ্রেসকে প্রজ্ঞার আলো দিয়ে পথ দেখাতে আগ্রহী ছিলেন না। [মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায়] কং‌গ্রে‌সের মুনশি লিখেছিলেন, যখন নির্বাচনের পর যুক্তপ্রদেশে যৌথ মন্ত্রীসভা গঠিত হলো না ‘তখন ব্যাপারটাকে খুব বড় কিছু বলে মনে হয়নি। কিন্তু ঘটনবলী যেদিকে চললো তাতে বছর দশেকের মধ্যে বোঝা গেল যে, ভারত ভাগের প্রহর গোণা শুরু হয়ে গেছে।

জিন্নাহ কিন্তু হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ব্যাপারে তখনো আশা ছাড়তে পারছেন না। জিন্নাহ এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, সামগ্রিক ভারতের বিকাশ এবং উন্নয়ন আর ইংরেজদের পরাজিত করতে হলে হিন্দু-মুসলমানদের এক পতাকার নীচে আসতে হবে। জিন্নাহর ব্যক্তিগত বন্ধু ও তদানীন্তন কংগ্রেস নেতা দেওয়ান চমনলাল এবং অপর একজন কংগ্রেস নেতা রায়জাদা হংসরাজ উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের পঁচিশে সেপ্টেম্বর গান্ধীকে এক পত্রে লেখেন যে, জিন্নাহ সাম্প্রদায়িক সমস্যা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্বন্ধে কেবল আলোচনা করতেই প্রস্তুত নন, তিনি একটা বোঝাপড়াতেও উপনীত হতে ইচ্ছুক। পত্রের অনুলিপি কংগ্রেস সভাপতি জওহরলালকে আটাশে সেপ্টেম্বর পাঠিয়ে তিনি গান্ধীকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ জানান। চমনলালে পত্রে অসন্তুষ্ট হয়ে নেহরু ত্রিশে সেপ্টেম্বর গান্ধীকে লেখেন যে, ‘এই সময়ে আপনার ও জিন্নাহর মধ্যে একটি সাক্ষাৎকার কেবল নিরর্থকই হবে না, ক্ষতিকারকও হতে পারে। গান্ধী অক্টোবরে প্রথম দিকে বল্লভভাইকে লিখিত এক পত্রে জানান, ‘বর্তমানে জিন্নাহর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকারের কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। জওহরলাল এটা চায় না।’ [শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়]

কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনের পর ব্যক্তিগতভাবে জিন্নাহর জনপ্রিয়তা মুসলিম জনমানসে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বাংলা এবং পাঞ্জাবে জিন্নাহ তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না। নির্বাচনের পর পর তিনি দ্রুত সেখানে সর্বজন প্রিয় নেতা হয়ে উঠলেন। ফলে উনিশশো আটত্রিশ সালের মধ্যে সারাদেশে মুসলিম লীগের একশো সত্তরটি নতুন শাখা স্থাপিত হয়। উত্তর প্রদেশে নব্বইটি এবং পাঞ্জাবে নতুন করে চল্লিশটি শাখা গঠিত হলো। শুধুমাত্র উত্তর প্রদেশেই এই সময়ে এক লক্ষ মানুষকে নতুন করে লীগের সদস্য করা হয়। শ্রিগালের উদ্ধৃতি মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, যদি নির্বাচনের পর জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগকে গুরুত্ব দেওয়া হতো তাহলে হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংহতি সুদৃঢ় হতো এবং তাতে পরিণামে দেশভাগের দুর্ভাগ্য এড়ানো যেতো। [মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায়] জিন্নাহর প্রস্তাব কংগ্রেসের দ্বারা প্রত্যাখান হওয়ার পর ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল তাঁর দিনলিপিতে লিখেছিলেন, পাকিস্তান ছিলো কংগ্রেসের সৃষ্টি, কারণ প্রদেশগুলিতে মোর্চা সরকার গড়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অস্বীকৃতি মুসলমানদের আতঙ্কিত করেছিলো এবং তাদের চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিলো। ভিপি মেনন বহুদিন পরে লিখেছিলেন, প্রাদেশিক শাসনতন্ত্র থেকে অন্যান্য সমস্ত দলকে বাদ রাখার কংগ্রেস নীতির পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যালঘুরা বুঝতে পেরেছিলো যে আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুদের কোনো ইচ্ছাই পূরণ করবে না। তিনি বলেন, এটাই ছিলো জিন্নাহর পাকিস্তান দাবির প্রকৃত শক্তি। [ সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুরঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়]

কংগ্রেস দলের বাইরের যে-সকল মুসলিমরা বিরোধী দলের আসনে বসেছিলেন, হঠাৎ উপলব্ধি করলেন যে তাঁরা প্রায় সম্পূর্ণ শক্তিহীন হয়ে পড়েছেন। বিদ্যুৎচমকের মতো হঠাৎ খেয়াল করলেন, কংগ্রেস যদি একটি মুসলিম আসন না পেয়ে নিছক সংখ্যাগুরু হিন্দুর ভোটের জোরে আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাহলে তারাই সরকার গঠন করতে পারে। ফলে সংখ্যগুরু হিন্দু প্রদেশে মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র্য ভোট কাজেই আসবে না। স্বতন্ত্র্য নির্বাচন ব্যবস্থা বিসর্জন না দিলে তারা সরকারের বাইরে থেকে যাবে আর স্বতন্ত্র্য ভোট ব্যবস্থা বিসর্জন দিলে তারা নির্বাচিতই হবে না। সংখ্যাগুরুবাদী কংগ্রেস শাসিত ভারতে মুসলমানদের, বস্তুত কোনো সংখ্যালঘুদেরই স্থান থাকবে না। ভবিষ্যতে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখার পক্ষে এটা খুব বিপজ্জনক। সংখ্যাগুরুদের কাছে সর্বদাই সংখ্যালঘুদের মাথা নত করে থাকতে হবে। সাঁইত্রিশ সালের নির্বাচন এবং কংগ্রেসের মুসলমানদের সঙ্গে মিলিতভাবে সরকার গঠন না করার ভিতরেই দিয়ে মুসলমানরা এই সত্য উপলব্ধি করেছিলো। কংগ্রেসের মুসলমানদের সঙ্গে জোট সরকার গঠন না করা মারাত্মক ভুল হিসেবে প্রমাণিত হলো। [ সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুরঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়] জিন্নাহ এই সময় থেকেই স্পষ্ট করে বলতে থাকলেন, নিজেদের আত্মমর্যাদা, সম্মান নিয়ে এবং হিন্দুদের সমকক্ষ হয়ে ভারতে মুসলমানদের বসবাস করতে হলে প্রথম শর্তই হবে নিজেদের একত্রিত হওয়া।

জিন্নাহ যদিও পাকিস্তানের কথা বলেননি উনিশশো চল্লিশ সালের লাহোর প্রস্তাবে। পাকিস্তান শব্দটাই ছিলো না দাবির ভিতরে। দাবি ছিলো ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরে মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা ভূখণ্ড। কিন্তু পত্রিকাগুলি পাকিস্তান প্রস্তাব বলে খবর ছাপিয়ে দেয়। মুসলিম লীগের বাৎসরিক অধিবেশনে তিনি ঘোষণা দেন যে, সমানে সমান না হলে কিংবা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভীতিবোধ না থাকলে দুটো দলের মধ্যে সম্মানজনক বোঝাপড়া সম্ভব হতে পারে না। দুর্বল পক্ষের এক তরফা শান্তির আবেদনে কেবল দুর্বলতাই প্রকাশ পায়। ক্ষমতার দ্বারা দল পরিচালনা করতে না পারলে রক্ষাকবচ এবং সমঝোতা দাবির মূল্য ছেঁড়া কাগজের টুকরোর মতই হয়। রাজনীতির অর্থই হচ্ছে ক্ষমতা, যা কেবল ন্যায়বিচার, সুন্দর ব্যবহার এবং সদিচ্ছার জন্য চিৎকার করলেই লাভ করা যায় না। তিনি আরো ঘোষণা করেন, ‘এতদিন মুসলমানদেরকে ভুলবশত সংখ্যালঘু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আসলে তারা সংখ্যালঘু নয়। জাতীয়তার যেকোনো সংজ্ঞা অনুসারে মুসলমানরা একটি জাতি। ব্রিটিশ ভারতের মানচিত্র অনুযায়ী বাংলা, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু, বেলুচিস্তানের মতো এদেশের বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে মুসলমানরা, সেখানে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। সুতরাং ভারতের সমস্যাকে জিন্নাহ্ আন্তঃসাম্প্রদায়িকতা নয়, আন্তঃজাতিগত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। জিন্নাহ জানিয়ে দিলেন, ভারতের মুসলমানরা শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নয়, ভিন্ন একটি জাতি। কথাটা আগেই হিন্দু মহাসভার মুখ থেকে বের হয়েছিলো। তেইশ সাল থে‌কে হিন্দু মহসভা যে‌ে‌দ্বিজা‌তি ত‌ত্ত্বের কথা বল‌তে শুরু ক‌রে, জিন্নাহ মুসলমানদের স্বার্থে এবার সেটা মেনে নিলেন।

জিন্নাহ যেসব বক্তব্য দেন, বা যা উপলব্ধি করেন তারজন্য দায়ী ছিলো হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের রাজনীতি। কংগ্রেস মন্ত্রীসভাগুলি তখন উর্দুর পরিবর্তে হিন্দি ভাষা প্রচলন, কুরবানীতে গো হত্যা নিষিদ্ধ, জাতীয় পতাকা হিসাবে কংগ্রেসের পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ‘বন্দে মাতরম’ ব্যবহার করার নীতি ঘোষণা করে। বি‌শেষ ক‌রে রাজা গোপালাচারীর নেতৃ‌ত্বে কং‌গ্রেস সরকার তা‌মিল প্র‌দে‌শের বিদ্যাল‌য়ে বাধ্যতামূলকভা‌বে হি‌ন্দিভাষা‌কে পাঠ্য বিষয় ক‌রে। জোর যার মূল্লুক তার, কং‌গ্রেস এই নীতি প্র‌য়োগ ক‌রে। ফলে মাদ্রা‌জে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদ‌র্শিত হয়। সাভারকার সাঁইত্রিশ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদের তত্ত্বকে এক সম্পূর্ণ ও সর্বব্যাপী রূপ প্রদান করেন। তিনি ভারতে হিন্দুজাতির অস্তিত্ব বিষয়ক তত্ত্বের মূল বক্তব্য প্রকাশ করেন। তিনি বললেন, সেই তত্ত্বের বনিয়াদ হলো পারস্পরক সম্পর্কযুক্ত চারটি বিশ্বাস: হিন্দু, হিন্দুধর্ম, হিন্দুত্ব এবং হিন্দুরাজ। সাভারকারের মতে হিন্দুস্তানে উদ্ভুত যে কোনো ধর্মের মানুষই হিন্দু। যেমন হিন্দু, শিখ, বুদ্ধ, জৈন। কিন্তু মুসলমান আর খ্রিষ্টানরা নয়। সেই সঙ্গে তিনি দাবি তোলেন যে হিন্দুরাই হিন্দুরাষ্ট্রের পুরোদস্তুর নাগরিক। হিন্দুদের পবিত্র ভূমির উপর দাবি উত্থাপনকারী মুসলমানদের তিনি “বিদেশী” আখ্যা দিয়ে ‘অখণ্ড ভারত’ ধ্বনি তোলেন। সাভারকারের মতে, স্বাধীন ভারতই জাতি-রাষ্ট্র একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র অথবা হিন্দুরাজই হতে পারে। [এ. জি. বেলস্কি] কিছুদিন পর বলা হলো, হিন্দুরাই ‘প্রথম শ্রেণীর নাগরিক’ আর মুসলিম সম্প্রদায় হলো ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’। অতএব সর্বাগ্রে মুসলিমদের ভারত থেকে বিতাড়িত করতে হবে।’ [সুজিত সেন, ‘সাম্প্রদায়িকতা: সংজ্ঞা ও বিভিন্ন ধরন-সম্পর্কিত কিছু কথা] মুসলমানদের ভারতে থাকতে হলে, হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেই থাকতে হবে।

কংগ্রেসের নেতা গান্ধী সাভারকারের বক্তব্য প্রসঙ্গে কী বললেন। হিন্দুজাতি বিষয়ক প্রশ্ন সম্বন্ধে কোনো কথা না বলে শুধু মন্তব্য করেন যে, ভারতভূমিতে ইংরেজদের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকে হিন্দু এবং মুসলমানরা এক জাতি। যদি ভারতে কোনো রাষ্ট্র বা হিন্দু রাষ্ট্র্রই গঠিত হয় তাহলে হিন্দুধর্মের পরমতসহিষ্ণুতা সেখানে মুসলমান এবং খ্রিষ্টানদের স্থানও পাকা করে দেবে।[এ. জি. বেলস্কি] গান্ধী সরাসরি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে শক্ত বিরোধিতা উপস্থাপন করেন না। হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর আপত্তি নেই। কিন্তু হিন্দুরাষ্ট্রে তিনি মুসলমান এবং খ্রিষ্টানদের হিন্দুধর্মের পরমত সহিষ্ণুতার মতো উদারতার উপর ছেড়ে দেবেন। গান্ধীর হিন্দু পরমত সহিষ্ণুতা যা বর্তমানে প্রমাণ হলো, মুসলমানদের গরুর মাংস খাবার জন্য হত্যা করা হবে। হিন্দু মহাসভার হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে গান্ধী দুশ্চিন্তাগ্রস্থ নন। তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ যদি মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করা হয় তাই নিয়ে। তিনি ধর্মান্তরিতকরণ বা হিন্দু মহাসভার দৃঢ়ভাবে শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে বিরোধিতা করে বলেন যে, এটা করা হলে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক হানাহানির পথই প্রশস্ত হবে।

জিন্নাহর পক্ষে কি এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের অার মুসলমানদের বন্ধু ভাবা সম্ভব ছিলো? য‌দি হিন্দু বল‌তে সকল হিন্দু‌কে বোঝা‌নো হয়‌নি, বর্ণ হিন্দু‌দের কথা বলা হ‌চ্ছে। জিন্নাহ হিন্দু‌দের নি‌য়ে কখ‌নো কো‌নো নে‌তিবাচক মন্তব্য ক‌রেন‌নি, কিন্তু কং‌গ্রেস‌কে বল‌তেন, অাস‌লে এটা হিন্দুদের প্র‌তিষ্ঠান, যেখা‌নে মুসলমান‌দের‌কে ‌হিন্দু‌দের সমান নাগ‌রিক হি‌সে‌বে মূল্যায়ন করা হয় না। বহু বছর পর এখন কি সে কথার প্রমাণ হা‌তেনা‌তে মিল‌ছে না? ভার‌তের সকল হিন্দুরা যে সাম্প্রদা‌য়িক নয়, জিন্নাহ সেটা বেশ ভা‌লোভা‌বেই জান‌তেন। কিন্তু কং‌গ্রেস অার হিন্দু মহাসভা যে বর্ণ হিন্দু‌দের স্বার্থ রক্ষা কর‌ছে সেটা নি‌শ্চিত ছি‌লেন। মুসলমান‌কে সবসময়রএরা হেয় চো‌খে দেখ‌তেন। যারা জিন্নাহকে সাম্প্রদায়িক বলেন, তাদের কাছে প্রশ্ন, হিন্দু মহাসভার বক্তব্য আর কংগ্রেস সরকারের কার্যক্রম, যেখানে হিন্দি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, কংগ্রেসের পতাকাকে ভারতের পতাকা বানাতে চাওয়া হচ্ছে, তা মাথা নত করে জিন্নাহ মেনে নি‌লেই কি তি‌নি অসাম্প্রদা‌য়িক হ‌য়ে যে‌তেন?সেটাই কি জিন্নাহর মে‌নে নেওয়া দরকার ছিলো? হিন্দু মহাসভা যখন আজ হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দিতে চাইছে, তার বিরুদ্ধে কি প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে না? জিন্নাহ সেদিন একই ধরনের প্রতিবাদ করেছিলেন। সেটা কি সাম্প্রদা‌য়িকতার প্রকাশ ছি‌লো? বিশেষ একটি অঞ্চলের ভাষা কারো উপর চাপিয়ে দেওয়া চলে না। বহুজন প্রশ্ন তুলবেন জিন্নাহ কেন তবে উর্দু চাপিয়ে দিতে চাইলেন পাকিস্তানে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, গুজরাটি জিন্নাহর মাতৃভাষা উর্দু ছিলো না। পাকিস্তানের কোনো প্রদেশের ভাষাই উর্দু ছিলো না। জিন্নাহর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে সমালোচনা করার পর মনে রাখতে হবে, জিন্নাহ হয়তো মনে করেছিলেন যে, কোনো প্রদেশের বিশেষ ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে, বাকি প্রদেশ সেটা চাপিয়ে দেয়া মনে করবে। তিনি সেজন্য নিরপেক্ষ একটা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলেন, যা কোনো প্রদেশের মাতৃভাষা নয়। হডসন উনিশশো সাঁইত্রিশ থেকে উনিশশো উনচল্লিশ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোতে মুসলমানদের প্রতি নেতিবাচক আচরণকে দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং পাকিস্তান দাবি উত্থাপনের মুখ্য কারণ হিসেবে বর্ণনা করেন।

যশোবন্ত সিংহ দেখাচ্ছেন, কংগ্রেস দু বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকলো। সেই দু বছরের অভিজ্ঞতা মুসলমানদের মনে সাধারণভাবে কংগ্রেসের প্রতি অনুকূল মনোভাব জাগায়নি। লীগ যতো অভিযোগ তুলেছিলো সেগুলির কোনটা কতোখানি সত্য সেই তর্কে না গিয়েও বলা যায়, সাধারণভাবে সমস্ত শ্রেণীর মুসলমানদের ধারণা হয়েছিলো, ‘হিন্দুরাজ’ এসে গেছে। মুসলমানরা এও বুঝলো ক্ষমতার ভাগ পেতে হলে অন্য উপায় খুঁজতে হবে। সংখ্যালঘুর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা অতিক্রম করে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার সামর্থ অর্জন করতে হবে। সেখান থেকেই মুসলমানদের মনে সমতার ধারণাটি উঠে এসেছিলো। নির্বাচনী গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার যতোই গুরুত্ব থাক সংখ্যালঘুদের সমস্যার তা সমাধান দেবে না। এ থেকেই কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে বড় রকমের বিচ্ছেদ শুরু হলো। মুসলিম সমাজের নিরপেক্ষ মানুষের সমর্থন জিন্নাহর দিকে চলে যাওয়ার পিছনে এটা একটা বড় কারণ ছিলো। য‌শোবন্ত সিংহ তাই ব‌লেন, কংগ্রেসের চরমপত্রের ফলাফল ছিলো, দুই শিবিরের পথ দুদিকে চলে যাবে, যা পরিণতিতে জন্ম নেবে পাকিস্তান। জিন্নাহ কিন্তু নি‌জে এ পা‌কিস্তান চান‌নি।

হিন্দু মহাসভা এই সময় জনপ্রিয় হতে থাকে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হিন্দু সাম্প্রদায়িক হতে বাধা নেই।[সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুরঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়] মুসলমানরা নি‌জে‌দের সংখ্যালঘু জন‌গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার কথা বল‌লেই সেটা হ‌য়ে যায় সাম্প্রদা‌য়িক রাজনী‌তি! বলা যায় যে কংগ্রেসের মন্ত্রীসভাগুলির আমলেই ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়েছিলো। কুপল্যান্ড দেখিয়েছেন, উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের অক্টোবর থেকে উনিশশো উনচল্লিশ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটটি কংগ্রেস শাসিত প্রদেশে ষাটটি এবং তিনটি অকংগ্রেসী শাসকদের রাজ্যে পঁচিশটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। উনিশশো উনচল্লিশ সালে আঠারোই অক্টোবর নেহরু রাজেন্দ্রপ্রসাদের কাছে স্বীকার করেন, ‘এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ এবং মুসলিম জনতার কংগ্রেস বিরোধী মনোভাব রোধ করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি’। কুপল্যান্ড মনে করেন, হিন্দু-মুসলিম বিরোধ কংগ্রেসের হাত ধরেই ঘটেছিলো। কংগ্রেস তার শাসনে ব্রিটিশ রাজের উত্তরাধিকার বহন করার কাজটি খোলাখুলি করেছিলেন।

কংগ্রেস মন্ত্রীসভা যে এই সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আনতে ব্যর্থ হয়েছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কংগ্রেসের এই দু বছরের শাসনকালে ব্রিটিশ ভারতে পঁচাশিটি বড় ধরনের দাঙ্গায় দুই হাজারের বেশি মানুষ বলি হয়েছিলো। লক্ষ্য করার ব্যাপার হলো, এ সময় যে সব দাঙ্গা হয়েছিলো তা ছিলো ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। কংগ্রেস মন্ত্রীসভা যদি আরো কিছুদিন কার্যকর থাকতো তাহলো হয়তো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরো বৃদ্ধি পেত এবং ভারতে গৃহযুদ্ধ আসন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিলো। [মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায়] কংগ্রেসের শাসনের বিরুদ্ধে এই সময় অভিযোগ শুধু মুসলিম লীগ নয়, কংগ্রেসের কৃষাণ সভা, শ্রমিক দল, সাম্যবাদী দল সকলেই একবাক্যে কংগ্রেসের শাসনের বিরোধিতা করে। সুভাষ বসু নিজেই যার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। টাটা বিড়লার মতো প্রতিষ্ঠানের হয়ে শ্রমিকদের উপর বারবার আক্রমণ চালায় কংগ্রেস তার শাসনে, জমিদারদের পক্ষে আক্রমণ চালায় কৃষকদের উপর। শেখর ব‌ন্দ্যোপাধ্যায় দেখাচ্ছেন, কংগ্রেসের জন‌প্রিয়তা ক‌মে সদস্য সংখ্যা এ সময়কা‌লে কমে পয়তা‌ল্লিশ লাখ থে‌কে প‌নে‌রো লাখ হ‌য়ে দাঁড়ায়।

ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সামাজিক পটভূমি গ্রন্থে দেশাই দেখান যে, কংগ্রেসের নির্বাচনী ইস্তেহারে শ্রমিকদের ধর্মঘট করবার অধিকার স্বীকৃত হয়েছিলো। ক্ষমতায় যাবার পর কংগ্রেস সরকার কর্তৃক এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা হয়। শ্রমিকরা ধর্মঘট করলে নানাভাবে নির্যাতন চালানো হয়, শ্রমিকদের গ্রেফতার করা হয়, বিচারে শ্রমিকদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, সরকারের নির্দেশে শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশ গুলি বর্ষণ করে শ্রমিকদের হত্যা করে। ‘রাজবন্দী মুক্তি দিবস’ পালনকালে শ্রমিকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। কৃষকরা নিজ দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করলে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কংগ্রেস সরকার কালাকানুন প্রয়োগ করে। কংগ্রেসদের শাসনে বিভিন্ন প্রদেশে কৃষকদের অসন্তোষ বাড়ছিলো। প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কংগ্রেস সরকারের ব্যথতার জন্য নানাভাবে সরকার সমালোচিত হচ্ছিলো। সমালোচিত হচ্ছিলো মুসলিম লীগ দ্বারা ততটা নয়, যতোটা নিন্দিত কংগ্রেসরই বামপন্থীদের দ্বারা। [এ আর দেশাই, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সামাজিক পটভূমি] কিন্তু এইসব নিন্দা বা সমালোচনাকে সামান্য ধার্তব্যের মধ্যে আনেনি প্রাদেশিক সরকারগুলি। হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস তখন যে হিন্দুত্ব আর রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলছিলো, হিন্দি চাপিয়ে দিতে চাইছিলো, তাতে করে হিন্দু মুসলিম বিরোধ ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব ছিলো না।

কংগ্রেসের উগ্র আচরণ আর হিন্দুত্বের ধারণাগুলি চাপিয়ে দেয়ার কারণেই জিন্নাহ বাধ্য হলেন, ভিন্ন পথের কথা ভাবতে। কিন্তু তিনি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর ভিতরে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস কিছুতেই প্রদেশগুলির স্বায়ত্ব শাসনের দাবি মেনে না নিলে জিন্নাহ ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশ ভাগ মেনে নিতে বাধ্য হলেন। জিন্নাহ যে স্বায়ত্বশাসনের কথা বার বার বলেছিলেন, প্রদেশগুলিতে ভারত সে স্বায়ত্বশাসন না দেয়ার ফল আজ কী দাঁড়াচ্ছে? কেন্দ্রের একজন মন্ত্রী সকল প্রদেশে হিন্দিভাষা চাপিয়ে দেয়ার কথা বলতে পারছে। যখন যে কোনো প্রদেশে সেনাবাহিনী পাঠাতে পারছে। দরকার হলে প্রদেশগুলির সংবিধান স্থগিত করে দিতে পারছে। জিন্নাহর দাবি মতো প্রদেশগুলি স্বায়ত্বশাসন পেলে এই কথা অমিতশাহ আজ বলতে পারতো না যে, সকল প্রদেশে তিনি হিন্দিকে চাপিয়ে দেবেন। কিছু বলার আগে কেন্দ্রকে তখন প্রদেশগুলির সঙ্গে বসে কথা বলতে হতো। প্রত্যেক প্রদেশ তখন নিজের মতামত জানাতে পারতো আর নিজের প্রদেশে তা বহাল রাখতে পারতো। প্রদেশের জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করবার কথা কেন্দ্র তাহলে চিন্তাই করতে পারতো না।

লেখক পরিচিতি:
রাহমান চৌধুরী, লেখক, শিল্প সমালোচক
Raahman Chowdhury

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.