দেশভাগের অজানা অধ্যায়: পর্ব- এক । নাজমুল হুদা

Comments

(তারুণ্যের ভাবনা বিভাগের লেখা সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব ভাবনা। এ বিভাগের মতামতের সাথে বাঙালীয়ানা’র ভাবনার কোন সম্পর্ক নেই এবং লেখার জন্য সকল দায় লেখকের – সম্পাদক)

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নাকি ভারতবর্ষের বিভাজন? সে আপনি যেভাবেই হিসাব করুন গল্পটা কিন্তু খুব বেশী স্বাভাবিক ছিলনা। গল্পের অসংখ্য কারিগর ছিল, নায়ক ছিল, আবার ভিন্ন প্রেক্ষিতে সেই নায়কেরাই কখনও কখনও ‘ভিলেইন’ হিসেবে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছেন! আমরা আজ এই সত্তুর বছর পরে এসে ‘জাজমেন্ট’ করতে না পারলেও খানিক অলিগলি খুজে ইতিহাসের পরম্পরা সাজাতেই পারি, তাইনা?

‘দেশভাগ’ গল্পের শুরুটা গান্ধীজি, নেহেরু কিংবা জিন্নাকে দিয়ে নয়। এর পেছনে ছিল বৃটিশদের কূটকৌশল, ছিল হিন্দু- মুসলিম বিভাজন, ছিল উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনা, ছিল প্রান্তিক পর্যায়ে তখনও টিকে থাকা ‘সামন্ত’ প্রথার ব্যাপক প্রভাব!

আমরা কোথা থেকে শুরু করবো? ১৮২২ সালের ওয়াহাবীবাদের উত্থান? নাকি সিপাহী বিদ্রোহ? নাকি চরমপন্থীদের উগ্র আচরন? নাকি ১৮৮৫ সালের কংগ্রেসের সৃস্টি? নাকি হিন্দু মহাসভা? নাকি ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম? এভাবে ইতিহাসের পরম্পরা টানতে গেলে শুরুটাই হবে না কারন সেক্ষেত্রে আরো পাশ্চাতে যেতে হবে। হয়ত সেক্ষেত্রে ‘মুগল সম্রাজ্য’ নয়তো ‘আর্য- অনার্য’ বিতর্ককেও সামনে নিয়ে আসতে হবে। সুতরাং খুব বেশী দূরে না গিয়ে বৃটিশ তিনজন ‘কলোনিয়ালের’ দৃষ্টিতে দেখে আসি বৃটিশদের সাথে তখন হিন্দু – মুসলমানের সম্পর্ক কেমন ছিল!

উইলিয়াম হান্টার( বৃটিশ সিভিলিয়ান) তার ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলিমস’ বইয়ে [বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭০ সালে] লিখে যান…

“ভারতীয় মুসলমানেরা হচ্ছে এদেশে বৃটিশ শক্তির বিরুদ্ধে চিরন্তন বিপদ। কোন না কোন কারনে তারা আমাদের শাসন প্রনালী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শিষ্ঠভাবাপন্ন হিন্দুরা যেখানে আমাদের প্রবর্তিত পরিবর্তনগুলি আনন্দের সঙ্গে মেনে নিয়েছে, সেখানে মুসলমানরা সেগুলিকে তাদের প্রতি ভীষন অবিচার হিসেবেই ধরে নিয়েছে।”

এই কয়েকলাইন থেকে বোঝা যায় এই ‘সিভিলিয়ান’ ব্যাপকতর ভাবে মুসলিমদেরকে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধচারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন পুরো বই জুড়ে!

তাহলে এবার চলুন দেখে আসি আরেকজন বৃটিশ লিওনার্দো মোজলের লিখিত বইয়ের কিছু লাইন। তার লেখা ‘ দ্যা লাস্ট ডেজ অফ দ্য বৃটিশ রাজ’ বইয়ে তিনি কি লিখেছেন? বইয়ের ‘স্মৃতিচারন’ চ্যাপ্টারে তিনি লিখেছেন…

“মনোভঙ্গীর দিক থেকে ভারতে কার্যরত বৃটিশ কর্মচারীদের বেশীরভাগই ছিলেন মুসলিম সমর্থক। কারন, মুসলমানদের সাথে তারা খুব সহজেই মেলামেশা করতে পারতেন। হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানরা ছিল কম রক্ষনশীল এবং সঙ্গপ্রিয় (হিন্দুদের মতে অবশ্য তোয়াজ প্রিয়)।”

এখানে মোজলের ভাষ্যমতে ‘মুসলিম- বৃটিশ’ রিলেশন খুব ভালো ছিল যা উইলিয়াম হান্টারের ভাষ্যের সম্পুর্ণ বিপরীত। তাহলে আসলে তখন কি ঘটেছিল? এ উত্তর খুজতে অর্থাৎ ‘হিন্দু- মুসলমান’ আর ‘বৃটিশ’দের রিলেশনের জায়গাটা কি ছিল অথবা সেই ‘ভাল- খারাপ’ সম্পর্কের গোড়া খুজতে আমাদের যেতে হবে ১৮২১ সালে!

তখনও ভারতবর্ষ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে অর্থাৎ ভারতবর্ষ তখনো বৃটিশ পার্লামেন্টের শাসনাধীন হয়নি!
সেই সময়ে অর্থাৎ ১৮২১ সালে এক ইংরেজ অফিসার বললেন…

“ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, অসামরিক এবং সামরিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে বিভেদ সৃষ্টি কর এবং শাসন কর'( Devide et empera)!”

এর প্রায় চল্লিশ বছর পরে মোম্বাইয়ের গভর্নর এলফিনস্টোনের কন্ঠেও আমরা একই কথার প্রতিধ্বনি শুনি। তিনি তার রাজকর্মচারীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন যে রোমানদের মত ইংরেজ শাসকদেরও ভারতবর্ষে ভেদনীতি অনুসরন করে রাজ্য শাসন করা দরকার। [দেশ বিভাগ- ভবানী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়]

এই তিন ইংরেজ ভদ্রলোক(!)এর বয়ানেই খানিক হলেও বোঝা যায় ‘দেশবিভাগ’ কেন হয়েছিল? আর কারাইবা এই বিভাজনের নাটের গুরু ছিল!

‘দেশভাগ’ আমাদের কি দিয়েছে? কাটাতার, কলকাতা কিলিং, আসাম-নোয়াখালি-পাঞ্জাবের দাঙ্গা, রক্ত আর দিনশেষে দুইভাগ হয়ে যাওয়া আমার কালিপদ কাকা নইলে নওয়াজ উদ্দিন চাচার সংসার!

এ ক্ষোভ মানতে পারেননি অন্নদাশংকর রায়, তিনি ক্ষেপে উঠেছেন তিনি ধিক্কার দিয়েছেন কলমের খোচায়…

“তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো,
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো !
তার বেলা?

ভাঙ্গছ প্রদেশ ভাঙ্গছ জেলা
জমিজমা ঘরবাড়ী,
পাটের আড়ত্ ধানের গোলা
কারখানা আর রেলগাড়ী !
তার বেলা ?

চায়ের বাগান কয়লাখনি
কলেজ থানা আপিস-ঘর,
চেয়ার টেবিল দেয়ালঘড়ি
পিয়ন পুলিশ প্রোফেসর !
তার বেলা ?

যুদ্ধ জাহাজ জঙ্গী মোটর
কামান বিমান অশ্ব উট,
ভাগাভগির ভাঙ্গাভাঙ্গির
চলছে যেন হরির-লুট !
তার বেলা ?

তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো,
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
বাঙলা ভেঙে ভাগ করো !
তার বেলা?

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.