১০ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

১০ আগস্ট ১৯৭১ মঙ্গলবার
কি ঘটেছিল

  • সিলেটে ক্যাপ্টেন রবের নেতৃত্বে পাঁচ কোম্পানী যোদ্ধা পাকবাহিনীর শাহবাজপুর রেলওয়ে স্টেশন অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রায় দু‘ঘন্টা যুদ্ধ শেষে মুক্তিবাহিনী শাহবাজপুর রেলওয়ে স্টেশনের একটি বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং দখলকৃত এলাকায় পাকিস্তানী পতাকা ধবংস করে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। এ পর্যায়ে হঠাৎ পাকসেনারা আর্টিলারি আক্রমণ চালায়। পাকবাহিনীর এ পাল্টা আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং পিছু হটে। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী প্রচুর গোলাবারুদ উদ্ধার করে তবে ইপিআর হাবিলদার কুতুব, নায়েক মান্নান ও মুজাহিদ হাবিলদার মোহাম্মদ ফয়েজসহ ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ৫ জন আহত হন।
  • ৪ নম্বর সেক্টরের ডাউকি সাব-সেক্টরে মুক্তিবাহিনী পাকহানাদার বাহিনীর সহযোগী রাজাকারদের চতুলবাজার ঘাঁটি আক্রমণ করে। এতে ৩ জন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দী হয় ও ২ জন নিহত হয়। অভিযান শেষে মুক্তিযোদ্ধা দল কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিজ অবস্থানে ফিরে আসে।
  • ক্যাপ্টেন সালেক এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সালদা নদীর পশ্চিমে কুমিল্লা সি এন্ড বি রোডের কাছে শিদলাই গ্রামে ঘাঁটি স্থাপন করেন।
  • মুক্তিবাহিনী দিরাই এলাকায় ডাকাতদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং ২১ ডাকাত নিহত হয়। এ ছাড়াও তারা ১টি হাল্কা  মেশিনগান, ৮টি রাইফেল, ২১টি শটগান, ৪টি গ্রেনেড এবং কিছু গোলাবারুদ জব্দ করে। দিরাই এলাকায় একটি পাক সমর্থকের বাড়ি ধ্বংস করে।
  • ৫ আগস্টে টাংগাইলের কাদেরিয়া বাহিনী পাক বাহিনীর এক ওয়্যারলেস বার্তা ধরে ফেলে। জানা যায় সদরঘাটে কয়েকটি বড় বড় জাহাজে অস্ত্র বোঝাই করা হচ্ছে। গন্তব্য বগুড়ার ফুলতলি, তারপর রংপুর। মুক্তিবাহিনী গুপ্তচর মারফত নিশ্চিত হয় যে কাদেরিয়া বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকার ভেতর দিয়ে ধলেশ্বরী নদী পথে যাবে জাহাজগুলো। কমান্ডার হাবিবুর রহমান ১০-১৫ জন সেরা যোদ্ধা বাছাই করে রওয়ানা হন সিরাজকান্দি ঘাট অভিমুখে। ১০ আগস্ট সিরাজকান্দি ঘাটে (বর্তমান যমুনা সেতুর অদূরে) এসে ভেড়ে ৭টি জাহাজ। কমান্ডার হাবিব মোতাহার, জিয়া এবং জামশেদকে নিয়ে জেলের ছদ্মবেশ ধরে জাহাজের কাছে গিয়ে তিনি মাছ ধরতে শুরু করলে এক পর্যায়ে টহল স্পিডবোটের মুখোমুখি হন। পাক বাহিনীর সাথে গল্পচ্ছলে কৌশলে জেনে নেন দরকারি তথ্য। জানা যায়, ভেতরে অন্তত ১ ব্যাটালিয়ন সেনা আছে। ক্যাম্পে রিইনফোর্সমেন্ট চান হাবীব, বদলে আসে এক রহস্যময়ী বার্তা। “এই মাত্র সর্বাধিনায়কের (কাদের সিদ্দিকী) কাছ থেকে নির্দেশ এসেছে, সুবিধামত অবস্থান থেকে শুধু আক্রমণ করো, আক্রমণ করা মাত্রই জাহাজের পতন ঘটবে”। আক্রমণের সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষায় থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা।
  • আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে শাহবাজপুরের সবুজপুর (লাটু) রেলওয়ে স্টেশন অপারেশনের মাস্টার প্লান প্রস্তুত করেন সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল চিত্তরঞ্জন দত্ত। পুরো এলাকা ৩১ পাঞ্জাবের এক প্লাটুন এবং এক প্লাটুন অস্ত্রধারী রাজাকার দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। এই দিনটিকে বেছে নেয়া হয় অপারেশনের জন্য। মুক্তিফৌজের দলে ৫টি কোম্পানি রাখা হয় অপারেশনের জন্য। রেকি কার্যক্রম শেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সামনা সামনি হামলা করার, এ ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না, কিন্তু সেটা হবে অনিয়মিত উপায়ে। ৫টার দিকে মুক্তিফৌজের সব কোম্পানি তাদের নিজ নিজ পূর্ব নির্ধারিত পজিশনে অবস্থান নেয়। শত্রুর বাঙ্কার অবস্থান মাটির এত গভীরে খনন করা ছিল যে, মিডিয়াম গানের শেলিং তেমন কোন ক্ষতি করতে পারছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা পুরো শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রু হননে। ১৫ মিনিটের মধ্যে শত্রু বাহিনী পিছু হটা শুরু করল। ৭টার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা শাহবাজপুর রেলওয়ে স্টেশনের একটা বড় অংশ থেকে হানাদারদের উচ্ছেদ করে। শত্রুর যেই অবস্থান থেকে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ আসছিল, সেখানে চার্জ করল মুক্তিযোদ্ধা দল। গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডো বাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। এরই মধ্যে খবর এলো হানাদার সৈন্যরা বাম দিকে জড়ো হচ্ছে। বড়লেখা থেকে সাপ্লাই লাইন বন্ধ করে দেয়ার এবং তাদের পুনরায় একত্রিত হতে বাধা দেয়ার যেই দলের দায়িত্ব ছিল, তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে এবং পাকিস্তানীরা, মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে আর্টিলারি শেলিং শুরু করেছে। লে. কর্নেল দত্ত নির্দেশনা দিলেন অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে। অবশেষে মুক্তিফৌজ পিছু হটে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসে। সেদিন ওখানে ৮ জন শত্রু সেনা নিহত এবং ৫০ জন আহত হয়। মুক্তিফৌজের ৬ জন শহীদ আর ৫ জন আহত হন। এই দিন চারটি চা বাগানসহ ২০ বর্গমাইল এলাকা শত্রুমুক্ত হয় এবং মুক্তিফৌজের দখলে আসে।
  • যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স বাংলাদেশ প্রশ্নে পাকিস্তান-ভারত পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ সদর দফতরে মহাসচিব উ’ থান্টের সাথে আলোচনা করেন। চারঘন্টাব্যাপী এ বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জর্জ ডব্লিউ বুশও উপস্থিত ছিলেন।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.