১৬ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

১৬ আগস্ট ১৯৭১ সোমবার
কি ঘটেছিল

  • ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহর থেকে ভোর পর্যন্ত চট্টগ্রাম, মংলা সমুদ্রবন্দর ও চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে মুক্তিবাহিনীর নৌকমান্ডোরা ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামে অভিহিত আক্রমণ পরিচালনা করে। এতে প্রায় ২২টি জাহাজ ও অন্যান্য নৌযান এবং পাকিস্তানী হানাদারদের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ ও খাদ্যসামগ্রী ধ্বংস হয়। অসংখ্য শত্রু সৈন্য হতাহত হয়। প্রতিটি একশন শেষে নৌকমান্ডোরা নিরাপদে তাদের স্থানীয় ডেরায় ফিরে যান।

বিশ্ব গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাসের বিস্ময় ‘অপারেশন জ্যাকপট’
বিস্তারিত পড়ুন এখানে

  • ক্যাপ্টেন জিয়ার নেতেৃত্ব ৫০ জনের একটি দল মঠবাড়িয়া থানা দখলের জন্য শরণখোলা রেঞ্জ অফিসের দিকে রওনা হয়। শরণখোলা রেঞ্জ অফিসে সুবেদার ফুলুর নেতৃত্বে ১০০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা ছিল। ভোরে ভোলা নদীর দু’পারে ১০ জন করে ২০ জন রেখে জিয়া সবাইকে সুন্দরবনের ভিতরে যাবার নির্দেশ দেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ফরেস্ট অফিসের উত্তর দিকে ৭টি পাকিস্তানী গানবোট এসে পড়ে। মোরলগঞ্জে পাকসেনা এবং রাজাকাররা চরমভাবে মার খাবার পর প্রতিশোধ নেবার জন্য গানবোটগুলো পাঠানো হয়েছিল। ৪টি গানবোট শরণখোলা রেঞ্জ অফিস অতিক্রম করে উত্তর দিকে যাবার পর পরবর্তী সময়ে ৩ খানা গানবোটের ওপর ভোলা নদীর দুই পাড় থেকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলিবর্ষণ করে। সুবেদার গাফফার রকেট লাঞ্চার থেকে গোলা নিক্ষেপ করলে একটি গানবোট বিধ্বস্ত হয়। গানবোটটি গুলি খেয়ে দক্ষিণ দিকে ৩ মাইল পর্যন্ত গিয়ে ডুবে যায়। পরবর্তীকালে পাঞ্জাবীদের ৪টি লাশ নদীতে ভাসতে দেখা যায়। বাদবাকি ৬টি গানবোট থেকে খানসেনারা মর্টার, হেভি মেশিনগান, লাইট মেশিনগান থেকে মুক্তিসেনাদের ওপর প্রবলভাবে গোলাবর্ষণ করে এবং মুক্তিযোদ্ধারা ঐ স্থান ত্যাগ করে ত্যারাব্যাকা হাটে একত্রিত হয়।
  • নরসিংদীর মনোহরদীতে ৩ নম্বর সেক্টরের হাবিলদার আজমল আলীর নেতৃত্বে পাকবাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি কটিয়াদী অ্যামবুশ নামে পরিচিত। সেখানে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডোরা বেশ কয়েকটি মোটর লঞ্চ ডুবিয়ে দেয়। ১৪৩ জন পাক সৈন্য নিহত ও অসংখ্য আহত হয়।
  • কুমিল্লা থেকে তিন মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী পাকসেনাদের কংসতলা অবস্থানের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে। তুমুল সংঘর্ষে কিংকর্তব্যবিমুঢ় পাকসেনারা পর্যুদস্তু হয়ে তাদের ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই সংঘর্ষে একজন অফিসারসহ ৩০ জন পাকসৈন্য হতাহত হয়। অভিযান শেষে মুক্তিযোদ্ধা দল নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
  • বগুড়ায় সৈয়দ ফজলুল আহসান দিপুর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী সারিয়াকান্দি থানার নিকটবর্তী রামচন্দ্রপুর গ্রামে পাকহানাদারদের একটি দলকে ধলাপাড়া ঘাটে আক্রমণ করে। এতে ৩০ জন পাকসেনা নিহত ও বহু আহত হয়। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধা হাতেম শহীদ হন এবং কাদের সিদ্দিকী আহত হন।
  • নিজামউদ্দিন লস্কর ময়নার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদল সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে জয়কলস সেতুর কাছে পাকহানাদারদের আক্রমণ করে। পাকসেনারা পাল্টা আক্রমণ চালায়। ১২ ঘন্টাব্যাপী এ যুদ্ধে ৯ জন পাকসেনা নিহত ও ১০ জন আহত হয়। যুদ্ধে অধিনায়কসহ ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।
  • ফেনীতে পাকবাহিনীর দু’টি শক্তিশালী প্লাটুন নাগাইশের দিকে অগ্রসর হলে সুবেদার নজরুল ও সুবেদার মুনিবের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী তাদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালায়। এতে ২৫ জন পাকসেনা নিহত হয়।
  • ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লীতে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্কটজনিত পরিস্থিতি স্বাধীনতার পর ভারতের জন্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিপুল শরণার্থীর চাপে ভারতের অর্থনীতি সঙ্কটের মুখে।
  • সামরিক শাসক ১৪ জন জাতীয় পরিষদ সদস্যকে ২২ আগস্ট সকাল ১০টার মধ্যে নাটোরে ২ নম্বর সেক্টরের উপ-সামরিক আইন প্রশাসকের আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেয়। জাতীয় পরিষদ সদস্যরা হচ্ছেন, রিয়াজউদ্দিন আহমেদ (রংপুর), মোশাররফ হোসেন চৌধুরী (দিনাজপুর), মতিউর রহমান (রংপুর), মাজহার হোসেন চৌধুরী (রংপুর) , মো. আজিজুর রহমান (দিনাজপুর), শাহ মাহতাব আহমেদ (দিনাজপুর), মুজিবুর রহমান (বগুড়া) , মোতাহার হোসেন তালুকদার (সিরাজগঞ্জ), আবদুল আউয়াল (রংপুর), আবদুল মোমিন তালুকদার (পাবনা), আবু সাঈদ (পাবনা), এ বি এম মোকসেদ আলী (দিনাজপুর) ও অধ্যাপক মো. ইউসুফ আলী (দিনাজপুর)।
  • ‘ওয়াশিংটন স্টার’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন শুরু করে পাকিস্তানের মূঢ় সামরিক চক্র এক প্রচন্ড ভুল করে বসেছে। ইয়াহিয়া আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের একথা বোঝা উচিত যে নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের মর্যাদা প্রশ্নাতীত।
  • ‘ক্রীশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা। পাকিস্তানের জঙ্গী সামরিক চক্র প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে যদি তার কিছু করে, তাহলে পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে যে চিরতরে বিদায় হবে তা নয় বরং মূল পাকিস্তানটাই চূর্ণ হয়ে যাবে।
  • যুগোশ্লাভ দৈনিক ‘বেলগ্রেড বোরবা’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার করতে গিয়ে ইয়াহিয়া তার নিজের সমস্যার সমাধানের সকল পথই রুদ্ধ করেছে। এখন অন্ধকারে মাথা কুটে মরা ছাড়া তার আর দ্বিতীয় কোন পথ নেই।
  • ‘জাকার্তা টাইমস’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান হলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতা। তার বিচার চালাতে গিয়ে ইয়াহিয়া পাকিস্তানের সর্বস্ব খোয়ানোর ঝুঁকি নিয়েছে। ইয়াহিয়া আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা ভুল ঘোড়ায় বাজি ধরেছে।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.