১৮ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

১৮ আগস্ট ১৯৭১ বুধবার
কি ঘটেছিল

  • পাকসেনাদের তিনটি দল কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে হোমনার দিকে নৌকায় অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দল মুরাদনগর থেকে ৮ মাইল দূরে পাকসেনাদের নৌকাগুলোকে অ্যামবুশ করে। গেরিলাদের গুলিতে দু‘টি নৌকা পানিতে ডুবে যায় এবং এবং একজন ক্যাপ্টেনসহ ২৯ জন পাকসেনা ও ৫ জন রাজাকার নিহত হয়। এ অভিযানে মুক্তিবাহিনী প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করে।
  • মুক্তিবাহিনী সিলেট শহরের কদমতলী ঝালোপাড়ার কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একটি জীপ অ্যামবুশ করে। এতে একজন পাক অফিসারসহ ৩জন পাকসেনা নিহত হয়। সফল অভিযান শেষে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসেন।
  • নওগাঁর কুলফতেপুরে পাকহানাদাররা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায়। এতে ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন ও ১২ জন আহত হন।
  • মুক্তিবাহিনী কাংখালি থানায় অভিযান চালিয়ে ৫ জন পাকসেনা এবং কয়েকজন রাজাকার হত্যা ৪৫টি রাইফেল জব্দ করে।
  • মুক্তিবাহিনী কোটালীপাড়া থানা আক্রমণে ৩ জন পাকসৈন্য ও ১০ জন রাজাকার হত্যা করে। তারা একটি লঞ্চ, ৩টি বার্জ এবং ১২টি রাইফেল জব্দ করে।
  • সুন্দরবন মুক্তিবাহিনী সব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়া উদ্দিনের পরিকল্পনায় শ্যালা নদীতে পাকিস্তানী হানাদার বহনকারী গানবোট খুলনা যাওযার পথে আক্রমণ করা হয়। রকেট হামলায় গানবোটের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং কয়েকজন হানাদার নিহত হয়।
  • রাত ২টায় পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে একদল নৌবাহিনীর অফিসার পিআইএ এর গাড়ি করে ফেরার পথে গেরিলা সন্দেহে পাহারারত পদাতিক বাহিনীর সৈন্যরা নৌবাহিনীর অফিসারদের গাড়িতে গুলি চালায়। গুলিতে গাড়ির চালকসহ ৩-৪ জন নৌবাহিনীর অফিসার নিহত হয়। নৌবাহিনীর সৈন্যরা আত্মরক্ষার্থে পাহারারত পদাতিক বাহিনীকে গেরিলা সন্দেহে পাল্টা গুলি চালালে একজন অফিসারসহ সাত পদাতিক সৈন্য নিহত হয়। অপারেশন জ্যাকপট আক্রমণের পর বিমানবন্দর ও বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা আতঙ্কে ভুগতে থাকা হানাদার সৈন্যদের মধ্যে বেশ কয়েকটি ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটে এবং এর ফলে এই রাতে বিভিন্ন জায়গায় ১৭ জন পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়।
  • হংকংয়ের ভারপ্রাপ্ত পাকিস্তানী ট্রেড কমিশনার মহিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনে পদত্যাগ করেন। মহিউদ্দিন আহমেদ পাকিস্তান সরকারকে পূর্ববঙ্গে নির্মম গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত করে বলেন, কোন ব্যক্তির পক্ষে আর সম্ভব নয় এমন সরকারের প্রতিনিধিত্ব করা যারা গণহত্যায় জড়িত। আমরা নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারি না যেখানে দেশের হাজার হাজার মানুষ নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।
  • পাকবাহিনীর জুলুম-নির্যাতনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণ-পুরুষ জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের সেক্রেটারি জেনারেল ও ভারতীয় পার্লামেন্টের লোকসভার সদস্য আসআদ মাদানী একাত্তরের এই দিনে কলকাতার মুসলিম ইসস্টিটিউট হলে আয়োজিত জমিয়তের কনভেশন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে রেজুলেশন পাস করেন। (উল্লেখ্য, পাক বাহিনীর গণনির্যাতন বন্ধে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে মাওলানা আসআদ মাদানী অনন্য ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে বিশেষ করে তার নেতৃত্বে কলকাতায় সভা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতের মুসলমান সমাজে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রবল জনমত গঠনের লক্ষ্যে মাওলানা আসআদ মাদানী রাজধানী দিল্লীর বিশাল মহাসমাবেশসহ ভারতজুড়ে প্রায় ৩০০টি সমাবেশ করেন। মাওলানা আসআদ মাদানী পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা এলাকায় শরণার্থী শিবিরের ব্যবস্থা করেন এবং জমিয়তের পক্ষ থেকে নিয়মিত রিলিফ বিতরণের ব্যবস্থা করেন।)
  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত চেস্টার বোলস শেখ মুজিবুর রহমানের তথাকথিত বিচারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন: পাকিস্তানী সামরিক জান্তার সামরিক আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের যে গোপন বিচার চালাচ্ছে তা আগাগোড়া একটি প্রহসন মাত্র। পাকিস্তানী সামরিক জান্তার এটা একটা চরম ধৃষ্টতা। এ বিচার সকল রীতিনীতি ও আইন-কানুনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। ‘ওয়াশিংটন পোষ্ট’-এ একটি তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধে চেস্টার বোলস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে অতীতের সব ভুলত্রুটি সংশোধন করে পাকিস্তানের কাছে সামরিক অস্ত্র ও সমরসম্ভার বিক্রয় সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করা এবং পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক সাহায্য দান একেবারে বন্ধ করে দেবার আহ্বান জানান।
  • মার্কিন সিনেটের উদ্বাস্তু বিষয়ক কমিটির সভাপতি সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী বলেন, পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একমাত্র অপরাধ হলো তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। তাঁর বিচার আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে বিচারের ব্যাভিচার ও ন্যায়বিচারের প্রহসন মাত্র।
  • আদ্দিস আবাবা বেতার থেকে প্রচারিত এক খবরে বলা হয়, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে সাহায্য করার জন্যে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্যে সারাবিশ্বে প্রচার অভিযান শুরু করবে।
  • ‘ব্লিডিং বাংলাদেশ’ শিরোনামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি কর্তৃক সভাপতির বক্তব্যসহ একটি চিত্র-সংকলন প্রকাশ করে বলা হয়, এইটি ছবির মাধ্যমে নিপীড়িত বাংলাদেশের গল্প বলার প্রচেষ্টা। প্রতিটি ছবিই বাংলাদেশের দুঃখী নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের মাঝে পাকবাহিনীর রেখে যাওয়া হস্তক্ষেপের চিহ্ন যা আসল এবং প্রকৃত প্রমাণ। ছবির পাতাগুলো উন্মোচন করে যে, তারা আসলে খুবই সাধারণ লোক, যাদের একমাত্র দোষ ছিল যে তারা তাদের নিজেদের দেশকে ভালবাসতো। আর্মিদের তৈরি এই ধ্বংসলীলা হতে মুক্তভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছাধারীদের কেউই রক্ষা পায়নি-শিশু, নারী, বৃদ্ধ জনতা-সবাই আক্ষরিক অর্থেই নির্যাতিত হয়েছে, তাদের সাধারণ ঘরবাড়ি এবং সকল ধরনের সাধারণ আমানত হয় লুন্ঠিত হয়েছে অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এই ছবিগুলো সেইসব কথা বলে এবং এইসব ছবি যেই নৃশংসতাকে উন্মোচিত করেছে তা আমরা আমাদের ক্রুদ্ধ উন্মত্ত মানসিক অবস্থাতেও আদৌ কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি কি না তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহের উদ্রেক জাগায়।… এই ছবিগুলো আসলে নিপীড়িত বাংলাদেশের বিষয়ে প্রকৃত ঘটনার শুধু একটি ক্ষুদ্র অংশের প্রকাশ মাত্র। সেই দুঃখী দেশটিতে যা কিছু হয়েছে এবং এখনো যা ঘটে চলেছে তার সব কিছুর চিত্রধারণ করা সম্ভব হয়নি, এমনকি যে সব ছবি ধারণ করা হয়েছে এবং সেই দেশ হতে বাইরে তা পাচার করে দেয়া সম্ভব হয়েছে তার সবগুলো সংগ্রহ ও ছাপানো সম্ভব হয়নি।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.