১৯ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

১৯ আগস্ট ১৯৭১ বৃহস্পতিবার
কী ঘটেছিল

  • সন্ধ্যার আঁধার নামার সাথে সাথে কুড়িগ্রামের চিলমারীর হানাদার পজিশনে ইস্ট বেঙ্গল ও মুক্তিবাহিনী থার্ড বেঙ্গল মেজর জামিলের নেতৃত্বে বীরদর্প আক্রমণে হানাদার বাঙ্কার দখল করে নেয়। বাঙ্কারেই হত্যা করা হয় ৪ হানাদারকে। রাতের আঁধারে যুদ্ধ আরও রক্তক্ষয়ী ও হিংস্র হয়ে ওঠে। পাকিস্তানী শক্তিশালী আর্টিলারির কাভার থাকা সত্ত্বেও চিলমারী থেকে পালাতে চায় ১ ব্যাটালিয়ন হানাদার। একদল মুক্তিযোদ্ধা সন্তর্পণে ক্ষিপ্র গতিতে গিয়ে পজিশন নেয় হানাদারদের পেছনে। ভোররাতে ইস্ট বেঙ্গলের যোদ্ধারা দ্রুত ঢুকে পড়ে পাকিস্তানী বাঙ্কারে, পজিশনে, ডিফেন্স লাইনে। ইস্ট বেঙ্গলের নির্ভীক যোদ্ধাদের নিশ্চিত লক্ষ্যভেদী আঘাতে ভেঙে পড়ে হানাদারদের বাঙ্কার, পাকিস্তানী ডিফেন্স। প্রাণভয়ে চিলমারী ডিফেন্স ছেড়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে প্রায় ৭০০ পাকসেনা কিন্তু ৭/৮ মাইল দূরে চিলমারী রেলওয়ের ষ্টেশনে বাধা পায় মুক্তিযোদ্ধাদের, পালাবার পথে প্রাণ যায় অসংখ্য হানাদারের।
  • ঢাকায় মুক্তিবাহিনী সাঁটুরিয়া থানা আক্রমণ করে। এ অভিযানে ৪ জন পাকসেনা ও ৫জন পুলিশ নিহত হয় এবং ১৪ জন পাকসেনা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দী হয়। থানা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করে।
  • মুক্তিবাহিনী ময়মনসিংহ-সিলেট- মৌলভীবাজার সেক্টরে কামালপুরের কাছাকাছি সড়ক সেতু ধ্বংস করে পাহারারত রাজাকারদের হত্যা করে।
  • দুপুর ১২ টায় পাকবাহিনীর তিনটি নৌকা শালদা নদী অবস্থান থেকে ব্রাহ্মণপাড়ার দিকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনী ছোট নাগাইশের কাছে নৌকাগুলোর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এতে পাকবাহিনীর দু‘টি নৌকা পানিতে ডুবে যায় ও ২০ জন পাকসেনা নিহত হয়। পিছনের নৌকাটি দ্রুত পারে ভিড়িয়ে পাকসেনারা নৌকা থেকে নেমে পড়ে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। প্রায় চারঘন্টা গুলি বিনিময়ের পর পাকসেনারা পিছু হটে।
  • বেলা ১টার সময় মুক্তিবাহিনীর কামানের গোলার আঘাতে পাকবাহিনীর শালদা নদী গুদামে অবস্থিত একটি বাঙ্কার ধ্বংস হয় ও ৮ জন পাকসেনা নিহত হয়।
  • খুলনার পাইকগাছায় মুক্তিবাহিনী পাকহানাদার বাহিনীর একটি লঞ্চকে অ্যামবুশ করে। এতে লঞ্চে অবস্থানকারী ২৬ জন পাকসেনার সকলেই নিহত হয় এবং লঞ্চটি বিধ্বস্ত হয়।
  • ঢাকার মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় হাবিব ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সামনে এদিন সকাল ১১টার দিকে গেরিলারা মাহবুব আহমদ শহীদের নেতৃত্বে একটি টয়োটা গাড়ি ১০ পাউন্ড বিস্ফোরকসহ বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে বেশ কিছু গাড়ী ধ্বংস হয় এবং কয়েকজন আহত হয়।
  • পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে: পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যপদে অধুনালুপ্ত আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত ৯৪ জন সদস্যের সদস্যপদ ব্যক্তিগত পর্যায়ে বহাল থাকবে।
  • ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র রবার্ট ম্যাকক্লক্সি বলেন, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে বলে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী যে অভিযোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার সাথে একমত নন।
  • ঢাকায় সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খান আওয়ামী লীগের ২৯ জন জাতীয় পরিষদ সদস্যকে সামরিক আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেয়। সদস্যরা হচ্ছেন: আবদুল মমিন, আবদুল হামিদ, জিল্লুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মৌলবী হুমায়ুন খালিদ, শামসুর রহমান, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, আলী আজম, আবদুস সামাদ আজাদ, মোহাম্মদ আবদুর রব, মোস্তফা আলী, এ কে লতিফুর রহমান চৌধুরী মানিক, দেওয়ান ফরিদ গাজী, মোহাম্মদ ইলিয়াস, ফজলুর রহমান, এ কে শামসুজ্জোহা, আবদুল করিম ব্যাপারী, এ ভুঁইয়া, শামসুল হক, কে এম  ওবায়দুর রহমান, মোল্লা জালাল উদ্দিন, শামসুদ্দিন মোল্লা, এম এ  গফুর, শেখ আবদুল আজিজ, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, এ মান্নান হাওলাদার, আবদুর রব সেরানিয়াবাত এবং এনায়েত হোসেন খান।
  • স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত বিশ্বজনমত অনুষ্ঠানে বলা হয়, পাকিস্তানের সাবেক এয়ার মার্শাল আসগর খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের নামে প্রহসনের তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি পাকিস্তানী সামরিক চক্রকে এই বলে হুঁশিয়ার করেছেন যে, পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাংলাদেশে যা করেছে এবং বঙ্গবন্ধুর বিচারের নামে প্রহসনে মেতে যা করতে যাচ্ছে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এর ফলে পাকিস্তানটাই তাসের ঘরের মতো এক মুহূর্তে হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়বে।
  • সাম্প্রতিক সময়ের উল্লেখ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বলা হয়, দু’ সপ্তাহ ধরে পাকিস্তানী জাহাজ আল-আহমাদী মার্কিন সমরাস্ত্র বহনের জন্য ফিলাডেলফিয়া বন্দরে ভেড়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু সেখানে পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয় এবং বিক্ষোভকারীরা ছোট ছোট নৌযান দিয়ে পাকিস্তানী জাহাজের সম্মুখে অবরোধ সৃষ্টি করে। ফলে পাকিস্তানী জাহাজটিকে ফিলাডেলফিয়া বন্দরে ভেড়ার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে বাল্টিমোরের দিকে অগ্রসর হয়।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.