২০ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

২০ আগস্ট ১৯৭১ শুক্রবার
কী ঘটেছিল

  • পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ইন্সট্রাক্টর ফ্লাইট লেফটেনেন্ট মতিউর রহমান নিয়মিত কাজের আড়ালে একটি বিমান ছিনতাই করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের পরিকল্পনা অনুযায়ী এদিন করাচীর মাসরুর বিমান ঘাঁটি থেকে সকাল ১১.১৫ মিনিটে পাঞ্জাবি পাইলট রাশেদ মিনহাজসহ টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান ছিনতাই করে ভারত অভিমুখে উড্ডয়ন করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে অপর পাইলট মিনহাজের জ্ঞান ফিরে এলে তার সঙ্গে কন্ট্রোল নিয়ে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সিন্ধুর বেদিনে বিমানটি বিধ্বস্ত হলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফ্লাইট লেফটেনেন্ট মতিউর রহমান শাহাদাতবরণ করেন।

বিস্তারিত পড়ুন:
দেশপ্রেম ও বীরত্বের প্রতীক মতিউর রহমান

  • রাত ১টায় নরসিংদী গেরিলা ইউনিটের ডিমোলিশন পার্টি নরসিংদী ইউনিট কমান্ডার ইমাম উদ্দিনের নেতৃত্বে তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ লাইন উড়িয়ে দেয়। বিস্ফোরণের ফলে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা প্রায় ১০ মাইল দূর থেকে দেখা যায় এবং ৬-৭ মাইল দূর থেকে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যায়। এর বিস্ফোরণের ফলে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যায়।
  • পাঁচদিন পাঁচরাত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা কুড়িগ্রামের চিলমারী এলাকা পাকহানাদার মুক্ত করে। আনন্দে উদ্বেলিত জনগণ চিলমারীর রণক্ষেত্রে এসে দেখতে থাকে বাঙ্কারে বাঙ্কারে পড়ে থাকা শতাধিক হানাদার ও রাজাকারের লাশ।
  • মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশ দল কুমিল্লার এক মাইল উত্তরে পাক বর্বরদের একটি টহলদার প্লাটুনকে অ্যামবুশ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত আক্রমণে পাকসেনারা হতচকিত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করে। এই অ্যামবুশে ১১ জন পাকসেনা নিহত ও তিনজন আহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের একটি মেশিন গান ও কয়েকটি জি-৩ রাইফেল দখল করে।
  • মাসুদ হোসেন আলমগীর নোবেলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দল সারিয়াকান্দি থানার আওলাকান্দী গ্রামের পূর্ব পাশে যমুনা নদীতে একটি পাকমিলিটারী লঞ্চকে আক্রমণ করে। রকেট লাঞ্চারের আঘাতে লঞ্চটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং সকল আরোহী নিহত হয়।
  • পান্ডব চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সুনামগঞ্জে পাকবাহিনীর মুসলিমপুর অবস্থান আক্রমণ করে। এক ঘন্টারও অধিক সময় যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ কৌশল পরিবর্তন করে এবং জিরানপুর গ্রামে এসে অবস্থান নেয়।
  • মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার ২১ আগস্ট ১৯৭১ সংখ্যার সাম্প্রতিক যুদ্ধ প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তিবাহিনী খুলনায় পাকবাহিনীর শ্যামনগর অবস্থানের ওপর তিনটি কলামে যথাক্রমে ক্যাপ্টেন হুদা, লে. বেগ এবং নায়েব সুবেদার আবদুল গফুর ও হাবিলদার সোবাহানের নেতৃত্বে তীব্র আক্রমণ চালায়। তুমুল যুদ্ধের পর পাকসেনারা তাদের অবস্থান ত্যাগ করে এবং শ্যামনগর মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। এ সংঘর্ষে মুক্তিবাহিনী ৪ জন পাকসেনার লাশ উদ্ধার করে ও ৪ জনকে আহত অবস্থায় বন্দী করে। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার ইলিয়াসসহ ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে যায়।
  • রাওয়ালপিন্ডিতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দফতর থেকে এক প্রেসনোটে বলা হয়।, বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান প্রখ্যাত আইনজীবী এ কে ব্রোহীকে বিশেষ সামরিক আদালতে তাঁর পক্ষ সমর্থনের জন্য মনোনীত করেছেন। প্রেসনোটে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ প্রধান গত ১১ আগস্ট বিশেষ সামরিক আদালতে প্রথম উপস্থিত হবার জন্য আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তিনজন আইনজীবীর নামের তালিকা প্রদান করেন। ১১ আগস্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগে শেখ মুজিবুর রহমানের রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার শুরু হয়েছে। মামলার সমস্ত শুনানি গোপন রাখা হবে।
  • সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খান ১৩ জন জাতীয় পরিষদ সদস্যকে সামরিক আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেয়। এঁরা হচ্ছেন: নূরজাহান মোর্শেদ, মিজানুর রহমান চৌধুরী, এম ওয়ালিউল্লাহ, কাজী জহিরুল কাইয়ুম, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, খোরশেদ আলম, নূরুল ইসলাম চৌধুরী, মোহাম্মদ ইদ্রিস, মোস্তাফিজুর রহমান, খালেদ মোহাম্মদ আলী, খাজা আহমদ, নূরুল হক এবং মোহাম্মদ হানিফ।
  • জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয কমিটির এক বৈঠকের প্রস্তাবে বলা হয়, ভারতীয় যুদ্ধবাজ ও তাদের চরদের যোগসাজশে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ব্যক্তিদের দমন করার কাজে সরকার যে সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, মজলিশে শুরা তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে।
  • পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান খান আবদুল ওয়ালী খান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পৌঁছে সেখানকার একটি ইংরেজী পত্রিকা ‘নিউ ওয়েভ’-এর সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকারে বলেন, পাকিস্তানের রাজনীতি এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়-পাকিস্তান ছিন্নভিন্ন টুকরো টুকরো হয়ে যাবেই। পাকিস্তানের রাজনীতি এখন যেভাবে চলছে তাতে সমূলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করার আর কোন উপায় নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যা করছে তা প্রাগৈতিহাসিক বর্বরতাকেও হার মানায়। তবে পাকিস্তানী সৈন্যদের পক্ষে বাংলাদেশকে দখলে রাখা আদৌ সম্ভব নয়। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী যদি মনে করে থাকে যে, চরম অত্যাচার চালিয়ে, গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রেখে বাংলাদেশের বীর জনগণকে দাবিয়ে রাখতে পারবে তাহলে তারা চরম ভুল করবে। ওয়ালী খান বলেন, ধর্ম যে ভিন্ন সংস্কৃতির দুটি জাতির রাষ্ট্রীয় বন্ধন হতে পারে না, তা চিরকালের মতো প্রমাণিত হয়ে গেল। ধর্মকে রাষ্ট্রীয় বন্ধন বলে যারা ভাবতো এবার তাদের মোহমুক্তি চিরদিনের মতো ঘটে গেল। তিনি বলেন, আমার কাছে বাঙালীদের প্রতিরোধ আন্দোলনের গুরুত্ব এখানেই। পিন্ডির বর্তমান পরিস্থিতির উল্লেখ করতে গিয়ে ওয়ালী খান একটি উপমা দিয়ে বলেন, ‘দুধের কলসী ভেঙ্গে গেছে। দুধ চারিদিকে গড়িয়ে পড়ছে। আর তার চারপাশে বসে তারা কাঁদছে।’ পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন: পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ যে কেবল অন্ধকারাচ্ছন্ন তা নয়, বিপজ্জনক।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.