২১ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

২১ আগস্ট ১৯৭১ শনিবার
কী ঘটেছিল

  • ইরাকে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত, এ এফ এম আবুল ফতেহ বাংলাদেশের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন। এ এফ এম আবুল ফতেহ এদিন পর্যন্ত পদত্যাগকারী সর্বজ্যেষ্ঠ পাকিস্তানী কূটনীতিক। তিনি আট মাস আগে বাগদাদের রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন এবং তার আগে প্যারিস, ওয়াশিংটন, প্রাগ, নয়াদিল্লী ও কলকাতায় কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত তিনি ছিলেন নয়াদিল্লীর চ্যান্সেলর এবং পরে ডেপুটি হাইকমিশনার। তারপরের দু’বছর কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন।
  • টরেন্টোতে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা অক্সফাম আয়োজিত একটি বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। স্যার হিউ কিনলেসাইড এতে সভাপতিত্ব করেন এবং সহ-সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক জন কেনেথ গ্যাল্ব্রেথ। এই সম্মেলনে অংশ নেন রেভারেন্ড ই জনসন, এন সি ডাল, জি পাপানেক, জে টি থরসন, জেনারেল জে এন চৌধুরী, প্যাট্রিক পি ডরমেট, নায়াল ডরমেট, চেষ্টার রনিং, জেমস ব্যারিংটন, হানা পাপানেক, বেরনার্ড ব্র্যান, জন হোমস, অজিত ভট্টাচার্য, নুরুল হোসেন, রেভারেন্ড ইয়ন ই ম্যাকয়, জেনার্ড লেসে, থমাস এ ডাইন, রেভারেন্ড আর্নেষ্ট লং, জুডিথ হার্ট, কর্নেলিয়া রোড, ষ্ট্যানলি উলপার্ট, রবার্ট ড্রফম্যান, হর্নার এ জ্যাক। এই সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবগুলো সুবিখ্যাত ‘টরেন্টো ডিকলারেশন’ হিসেবে পরিচিত।
  • ২১ আগস্ট মধ্যরাতে এম এ আজিজের নেতৃত্বে গেরিলা আব্দুল্লাহ, মেহমুদ, মান্নান, দুলাল, ইন্ডিয়ান ফারুক, খালেদ ৪টা ইন্ডিয়ান স্টেন, ১টা রিপিট ফায়ার এস এল আর, ২টো এস এল আর, ৪টা এন্টি পারসোনাল মাইন ও কয়েকটা গ্রেনেড নিয়ে গ্রীন রোডের মাঝামাঝি অংশে একতলা বিল্ডিং-এর ছাদের অবস্থান থেকে পূর্বে রাস্তায় বিছিয়ে রাখা মাইন বিস্ফোরণ, গ্রেনেড ও গুলি বর্ষণ করে পাকিস্তানী সেনাদের দুটি ট্রাক ও একটি জীপ ধ্বংস করে। পরদিন বিবিসি রেডিওর সংবাদে বলা হয় গেরিলাদের আক্রমণে ২ জন কর্নেল, ২ জন মেজর, ১ জন ক্যাপ্টেনসহ ২৩ জন নিহত, ৪২ জন আহত হয়। গেরিলারা নির্বিঘ্নে তাদের গোপন আস্তানায় ফিরে যায়।
  • মুক্তিবাহিনীর একটি টহলদার দল কুমিল্লার উত্তরে গাজীপুর রেলওয়ে সেতুর কাছে পাকবাহিনীর একটি দলকে অ্যামবুশ করে। এই আক্রমণে একজন লেফটেন্যান্টসহ ৬ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং অবশিষ্ট পাকসেনারা পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাপ দখল করে।
  • মুক্তিফৌজ এদিন কুষ্টিয়া জেলার চুঁয়াডাঙ্গার ২২ কিলোমিটার উত্তরে আলমডাঙ্গায় পাক বাহিনীর সরবরাহ ঘাঁটি আক্রমণ করে। এতে ৭০ জন পাকসেনা নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। মুক্তিফৌজের আক্রমণে বেসামাল হয়ে পাকবাহিনী অস্ত্রশস্ত্র ফেলে ঘাঁটি ত্যাগ করে। সরবরাহ ঘাঁটিটি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয় বলে খবরটি নিশ্চিত করে কলকাতার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা।
  • পাকবাহিনীর এক কোম্পানি সৈন্য নরসিংদির কাছে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা অবস্থানের দিকে অগ্রসর হলে পথিমধ্যে গেরিলা দল তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। প্রায় একঘন্টা গোলাগুলির পর পাকসেনারা পিছু হটে।
  • সুন্দরবনে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। যুদ্ধে মুক্তিসেনাদের নেতৃত্ব দেন রাইফেলস-এর ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা।
  • মার্কিন সিনেটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য রিপাবলিকান দলের চার্লস পার্সি মন্তব্য করেন, পাকিস্তানের মৃত্যু হয়েছে। আর কোন অবস্থাতেই দ্বিখন্ডিত পাকিস্তানকে জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। সিনেটর চার্লস পার্সি আরো বলেন, বাঙালী জাতি আজ যে ইস্পাত কঠিন সংকল্প নিয়ে লড়াই করছে তা একটি বিরাট ও মহৎ সংকল্প। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, শেখ মুজিবের বিচার প্রহসনে তারা যদি আর এক পা অগ্রসর হয় তাহলে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তারা যদি তথাকথিত বিচারে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণদন্ড দেয়, তাহলে পৃথিবীর কেউ-ই তাদের ক্ষমা করবে না।
  • পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন আনসার অধ্যাদেশ ১৯৪৮ বাতিল করে ‘রাজাকার অধ্যাদেশ ১৯৭১’ জারি করে। রাজাকার অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ১৯৫৮ সালের আনসার এ্যাক্ট বাতিল করে আনসার বাহিনীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। আনসার বাহিনীর এ্যাডজুট্যান্টদের পরিণত করা হয় রাজাকার এ্যাডজুট্যান্টে। ২১ আগষ্ট রাজাকার অর্ডিন্যান্সের ব্যাখ্যায় বলা হয়, রাজাকার বাহিনীতে নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের পূর্ব পাকিস্তান সরকার ট্রেনিং এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করবে। ব্যাখ্যায় আরো বলা হয়, অর্ডিন্যান্সের বিধান মতে প্রাদেশিক সরকার সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে সকল রাজাকার অথবা নির্দিষ্ট সংখ্যক রাজাকারকে প্রাদেশিক পুলিশ বাহিনীর অন্তর্ভূক্তির আদেশ দিতে পারবে।
  • জাতিসংঘের মহাসচিব উ’ থান্ট আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচার বন্ধ রাখার জন্য যে বিবৃতি দেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় পরিষদ তার সমালোচনা করে বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব এ ব্যাপারে ক্ষমতা বহির্ভুত হস্তক্ষেপ করেছেন। পরিষদে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার অনুষ্ঠান পাকিস্তান সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিবের হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার নেই।
  • জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে মওলানা আবদুর রহিম জানান, হানাদার বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। তিনি বাঙালীর ওপর ৬০ ও ৭৮ নং সামরিক বিধিকে আরো নির্মমভাবে প্রয়োগের সুপারিশ করেন।
  • সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সী কোসিগিন পাকিস্তানী ফ্যাসিবাদী সামরিক চক্রের এই ঘৃণ্য দুরভিসন্ধি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বাংলাদেশে গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও নারী নির্যাতনের নায়ক পাকিস্তানের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়াকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, সাবধান! ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানো পাকিস্তানের পক্ষে আত্মহত্যার সামিল হবে।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.