২২ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

২২ আগস্ট ১৯৭১ রবিবার
কী ঘটেছিল

  • ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশ দল পাকসেনাদের একটি দলকে সোনাগাজীর রাস্তায় এন্টি-ট্যাঙ্ক মাইন পেতে অ্যামবুশ করে। মাইনের আঘাতে পাকসেনাদের তিনটি ট্রাক ধ্বংস হয় এবং সেই সঙ্গে ২০ জন পাকসৈন্য নিহত হয়। এ ছাড়াও অ্যামবুশ দলের গুলিতে প্রায় ৪০ জন পাকসেনা ও রাজাকার হতাহত হয়। একঘন্টা যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান পরিত্যাগ করে নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
  • ক্যাপ্টেন আবদুল হকের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা দল কুমিল্লার শালদা নদী এলাকায় অবস্থানরত পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষা ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে ৪ জন পাকসেনা নিহত ও ১১ জন আহত হয়।
  • কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ার পর আবুল হাসেমের নেতৃত্বে ও ইপিআর সদস্য ফরহাদের সহায়তায় ৪টি কোম্পানির সম্মিলিত প্রয়াসে শেরপুরের নালিতাবাড়ী ব্রিজটি ধ্বংস করা হয়।
  • সুবেদার মোবাসসারুল ইসলামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দল চারঘাট থানার মীরগঞ্জ বিওপি আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত আক্রমণে বিওপিতে অবস্থানরত সকল পাকসেনা নিহত হয়।
  • সুনামগঞ্জের কাছে জোয়াই এর নিভৃত পার্বত্য এলাকায় মুক্তিযাদ্ধাদের ২৮ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়।
  • পিটিআই-এর বরাত দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘ঢাকায় গ্রেনেড আক্রমণের কথা পরোক্ষে স্বীকার’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনী কর্তৃক খোদ ঢাকা শহরের বুকে গেরিলা আক্রমণ চালাবার যে সংবাদ ইতোপূর্বে ভারতে এসে পৌঁছেছিল পাকিস্তান পরোক্ষভাবে তা স্বীকার করেছে। আজ সকালে পাক বেতার থেকে বলা হয়, সামরিক আইন প্রশাসক এ বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নাশকতার কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। নাশকতার কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিলে পুরস্কার দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বেতার ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে যে ঢাকা শহরে গ্রেনেড ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দশ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সপ্তাহের গোড়াতে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে, মুক্তিফৌজের কমান্ডো দল ঢাকায় গবর্নরের বাসভবন, সিভিল সেক্রেটারিয়েট ও নিউ মার্কেটে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওপর হানা দিয়েছে।
  • বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের পরেও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে ঘোষণা করা হয়, পাকিস্তানের উন্নয়ন কাজে অর্থনৈতিক সাহায্য অব্যাহত রয়েছে।
  • পিটিআই-এর বরাতে ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকায় ‘আগরতলা হাসপাতালে গণহত্যার প্রমাণ’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্দোষ পূর্ব পাকিস্তানীদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অমানবিক নৃশংসতার একটি ছবি হিসেবে আগরতলার জেনারেল হাসপাতালকে উপস্থাপন করা যায়- পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকা ঘুরে আসার পর এমনটিই লিখেছেন একজন ইউএনআই সংবাদদাতা। ২৬০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীদের স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। যাদের বেশিরভাগই ছিল হিংস্র পাকবাহিনীর শিকার। হাসপাতালটিতে ৫৩০ জন রোগী আছেন, যা এর ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি।
  • সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান বলেন, বাঙালীরা জয়লাভ করেছে সারা পাকিস্তানের নির্বাচনে। এখন তাদের ওপর দোষারোপ করা হচ্ছে, তারা পাকিস্তান ভেঙে দিতে চায়। আরও বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচী পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে বিপজ্জনক। ৬ দফা যদি পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক হয়, তাহলে সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ কেন গোড়াতেই এর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেনি? ৬ দফার ওপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। এ ছাড়া ইয়াহিয়া খান যখন ঢাকা যান এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখন তিনি মুজিব সাহেবকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলে ঘোষণা করেছিলেন। ৬ দফা যদি পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক হয় তাহলে এসব কথার অর্থ কী? আসল কথা হলো, মুজিব সাহেব নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন এবং তারই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার কথা। সীমান্ত গান্ধী আরও বলেন, পাকিস্তানী জনসাধারণের কাছে আমি এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ সব সময়ই ধর্মের নামে আমাদের সঙ্গে হঠকারিতা করেছে। তারা ইসলামের কথা বলে, অথচ আজ পূর্ব বাংলায় যা ঘটছে তা কি ইসলাম ও পাকিস্তানের কল্যাণের জন্য করা হচ্ছে?
  • পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, জনগণ চায় পিপলস পার্টির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বেআইনী ঘোষিত হবার পর তার দলই এখন কেবল পাকিস্তানের বৃহত্তম দল নয়, জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল।
  • জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির মিয়া তোফায়েল নতুন করে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন দাবি করেন।
  • গফরগাঁও শান্তি কমিটির সদস্যরা রাজাকার বাহিনীতে দশ দিনের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষ করে সশস্ত্র অবস্থায় মিছিল করে।
  • সাবেক মন্ত্রী আজমল আলী চৌধুরী সিলেটে বলেন, সিলেট রেফারেন্ডামের মাধ্যমে পাকিস্তানে যোগদান করেছে। কাজেই পাকিস্তানবিরোধী হিন্দুস্তানী চক্রান্ত নস্যাৎ করে পাকিস্তানের অখন্ডতা বজায় রাখা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আব্দুল গফুর বিএ-কে আহ্বায়ক করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটি গঠিত হয়।
  • চট্টগ্রামের লালদীঘিতে এক জনসভায় নেজামে ইসলামের মহাসচিব মওলানা সিদ্দিক আহমদ বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তিদের তৎপরতা বন্ধ করার কাজে সেনাবাহিনীকে সাহায্য করা শুধু শান্তি কমিটির দায়িত্ব নয় এই দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের।
  • রংপুরে সাবেক এমএনএ সিরাজুল ইসলাম ও সাবেক এমপিএ আব্দুর রহমান এক যুক্ত বিবৃতিতে সেনাবাহিনীকে সমর্থনদানের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
  • ‘মুক্তিযুদ্ধ’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাতক্ষীরায় মুক্তিবাহিনী সীমান্ত এলাকার দুইটি পাকঘাঁটি দখল করিয়া বাংলাদেশের পতাকা উড়াইয়া দিয়াছে। ঘাঁটি দুটি হইল – কাকডাঙ্গা ও বৈকারী। এখান হইতে মুক্তিবাহিনী প্রচুর পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করিতে সক্ষম হয়।
  • স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র লন্ডনের ‘ডেইলী টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানায়, পশ্চিম পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা পন্থা স্থির করার উদ্দেশ্যে ইসলামাবাদ ও তেহরানে গোপনে গোপনে জোর কুটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এই তৎপরতার নায়ক ইরান। আর এর পেছনে সমর্থন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার। খবরে আরো বলা হয়েছে যে, পশ্চিম পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের সেক্রেটারী ইতিমধ্যেই তেহরান গিয়ে পৌঁছেছেন। সেখানে ইরানের উদ্যোগে তার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের গোপন সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা হবে।
  • যুক্তরাষ্ট্রের দি স্যাটারডে রিভিউ এদিন ’পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলে, পূর্ব পাকিস্তানের যে মানুষগুলো গত বছরের বন্যার কারণে এখনও গৃহহীন এবং ক্ষুধাপীড়িত, তারাই এখন আবার মনুষ্যসৃষ্ট এক দুর্যোগের শিকার। তাদের দেশ পরিণত হয়েছে এক অনুমোদিত বধ্যভূমিতে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ আজ প্রায় শূন্যের কোঠায়। যারা জরুরী চিকিৎসা বা অন্যান্য সাহায্যে এগিয়ে আসতে চেয়েছিল তাদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এই বিদ্রোহের উদগিরণ অবধারিত ছিল। যদিও সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষেই রায় এসেছিল। ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার জনতার এই রায়কে সম্মান দিতে শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং সামরিক বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে এর বাস্তবায়নকে বানচাল করেছে।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.