২৩ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

২৩ আগস্ট ১৯৭১ সোমবার
কী ঘটেছিল

  • কুমিল্লায় মেজর জাফর ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদল চিয়ারা গ্রামে অবস্থানরত পাকসেনাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে পাকসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং ২৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। কিছু পাকসেনা আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
  • মুক্তিবাহিনী কুমিল্লায় পাকসেনাদের জগন্নাথদিঘী ঘাঁটি আক্রমণ করে। এই আক্রমণে পাকবাহিনীর চারটি বাঙ্কার ধ্বংস হয় ও অনেক পাকসেনা হতাহত হয়। আক্রমণ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
  • ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর ৪র্থ বেঙ্গলের ‘এ’ ও ‘সি’ কোম্পানী পাকসেনাদের নয়ানপুর রেলস্টেশন অবস্থানের ওপর উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে মর্টার ও ১০৬-রিকয়েললেস রাইফেলের সাহায্যে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে পাকবাহিনীর কয়েকটি শক্ত বাঙ্কার বিধ্বস্ত হয়এবং অনেক পাকসৈন্য হতাহত হয়।
  • কুমিল্লায় পাকসেনাদের একটি নৌকা সেনেরবাজারের পাশ দিয়ে চলতে থাকলে মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশ দল শত্রু নৌকাটির ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে ৭ জন পাকসৈন্য নিহত হয়। অবশিষ্ট সেনারা নৌকাটিকে দ্রুত পশ্চিম তীরে ভিড়িয়ে নৌকা থেকে নেমে গ্রামের দিকে পালিয়ে যায়।
  • ৭ নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন ইদ্রিস ও সুবেদার মেজর মজিদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদল পাকবাহিনীর কানসাট অবস্থানের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। প্রায় চারঘন্টা স্থায়ী এই ভয়াবহ যুদ্ধে পাকবাহিনীর প্রচুর সৈন্য হতাহত হয় ও ব্যাপক ক্ষতি হয়।
  • মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ পত্রিকায় শত্রুর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীর প্রতি বাংলাদেশ সরকার আহ্বান জানিয়ে বলে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের যে সংগ্রাম তা হলো সর্বাত্মক মুক্তির সংগ্রাম। এই সংগ্রামে জয়ী হতে হলে বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতার নয়নমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশানুসারে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। জনসাধারণকে বলা হচ্ছে, আপনারা সামরিক সরকারকে কোন প্রকার ট্যাক্স দেবেন না। আপনাদের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারই একমাত্র বৈধ সরকার। নির্দেশনামায় বলা হয়েছে, খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ বর্জন করুন। আপনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা, মনে রাখবেন আপনার সক্রিয় সহযোগিতা আমাদের বিজয়কে আরও নিকটবর্তী করে তুলবে।
  • টাইমস ম্যাগাজিনে বলা হয়, ‘যদিও পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার জন্য মুজিবকে অভিযুক্ত করা হয়, প্রকৃত পক্ষে তিনি পাকিস্তানের পূর্ণ বিভক্তি চাননি এবং ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি যতক্ষণ না রক্তগঙ্গা শুরু হয়।’
  • ঢাকায় প্রাদেশিক সরকারের জনৈক মুখপাত্র বলেন, বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত সব সদস্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ৮৮ জন এমএনএ ও ৯৪ জন এমপিএ-র বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই সঙ্কট মুহুর্তে অর্পিত দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে তাদের দ্বিধাবোধ করা উচিত নয়। সরকার তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
  • লাহোরে পূর্ব পাকিস্থান জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আযম বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় চরদের (মুক্তিযোদ্ধা) প্রধান শিকার জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের (আওয়ামী লীগ) বিরোধীতা করার জন্য সেখানে বহু জামায়াত কর্মী দুষ্কৃতকারীদের (মুক্তিযোদ্ধা) হাতে প্রাণ হারিয়েছে। একমাত্র জামায়াত ইসলামী প্রদেশের প্রতিটি অংশে দুষ্কৃতকারীদের মোকাবেলা করছে।
  • লন্ডনে পিডিপি নেতা মাহমুদ আলী বলেন, ‘আমি প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলছি, পত্র-পত্রিকায় যা প্রকাশিত হয়েছে পরিস্থিতি ঠিক তার বিপরীত। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যে সব প্রশ্ন তুলেছেন তা ঠিক নয়। ২৪ বছরের পাকিস্তানী শাসনে দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। মিল, কলকারখানা, ডকইয়ার্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান বাঙালী অফিসারদের দ্বারা পরিচালিত হয়। কেন্দ্রেও বাঙালীরা উচ্চ পদে রয়েছে।
  • হাতিয়ার নলচিরা বাজার জামে মসজিদে এলাকার দালালরা মিলিত হয়ে মাহমুদুর রহমানকে সভাপতি, সৈয়দ আহমদ খানকে সম্পাদক এবং মৌলভী ছালেহউদ্দিনকে যুগ্ম সম্পাদক করে নলচিরা ইউনিয়ন শান্তি কমিটির কার্য নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়।
  • নিউজ উইকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যখন সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমেইকো গত সপ্তাহে নয়াদিল্লী গেলেন, স্থানীয় কূটনীতিক গোষ্ঠী বলতে গেলে খেয়ালই করেনি। কিছু ভিনদেশী দূতদের ভারতীয় কর্মকর্তাগণ আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে গ্রোমেইকোর সফরে তেমন বিশেষ কিছু ফলতে যাচ্ছে না। তবে আগমনের এক দিনের মধ্যেই রাশিয়ার এক নম্বর কূটনৈতিক গ্রোমেইকো জানিয়েছেন যে তিনি ভারতের রাজধানীতে জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসেছেন। নয়াদিল্লীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পতাকাখচিত টেবিলে বসে গ্রোমেইকো সফল স্বাক্ষর করেন ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার বিশ বছরের শান্তি, বন্ধুত্ব, ও সহযোগিতার এক চুক্তিতে। বাহ্যিকভাবে চুক্তির কথাগুলো এত স্থুল ছিল যে, এক পশ্চিমা বিশ্লেষকের মতে, এটি কার্যত যে কোন কিছুই বোঝাতে পারে। তবে এই চুক্তির গুরুত্ব অল্পই নির্ভর করছে, এতে কি বলা হয়েছে বা এর দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে তার ওপর। আরেকটি পরাশক্তির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ভারত তার জোটবদ্ধ না হওয়ার নীতি থেকে অনেকখানি দূরে সরে এসেছে। দৃঢ়ভাবে ভারতের সমর্থনে এগিয়ে এসে রাশিয়া পাকিস্তানকে যে কোন বেপরোয়া পদক্ষেপ নেয়ার বিরুদ্ধে সাবধান করে দিল। অবশ্য, এর মাধ্যমে মস্কো খোলামেলাভাবে চীনের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান ঘোষণা করল এবং দক্ষিণ এশিয়াতে হঠাৎ করেই শক্তির ভারসাম্য বদলে দিল। একই ধারাবাহিকতায়, এ চুক্তি এতদাঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব প্রতিপত্তি খর্ব হওয়ার প্রতিফলন। আর সেই অর্থে, ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি পিকিং আর ওয়াশিংটনের মধ্যে বিরাজমান সুসম্পর্কে আজ অবধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিপর্যয় বলে গণ্য করা যেতে পারে।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.