২৮ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

২৮ আগস্ট ১৯৭১ শনিবার
কী ঘটেছিল

  • নওগাঁ শহরতলী থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পশ্চিমে, আত্রাই নদীর তীরবর্তী মান্দা এলাকার পাকুরিয়া গ্রামে সকালে পাকহানাদার বাহিনী পায়ে হেঁটে প্রবেশ করে। মিটিংয়ের কথা বলে গ্রামবাসীকে ধরে আনে স্কুল মাঠে। একই সঙ্গে বাড়িঘর লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রায় ৩০০-৪০০ গ্রামবাসীকে স্কুল মাঠে জিজ্ঞাসাবাদ করে, বাচ্চা ও বয়স্কদের ছেড়ে দেয়। বাঁশের ঝাড় থেকে কঞ্চি কেটে এনে বাকিদের প্রথমে বেধড়ক পেটায় তারপর সবাইকে কালেমা পড়তে বলে। এরপর পাক হানাদাররা লাইনে দাঁড় করিয়ে মেশিনগানের গুলিতে মুহূর্তের মধ্যে হত্যা করে ১২৮ জনকে।
  • এদিন ৫০ জন পাকিস্তানী সৈন্যকে নিয়ে ৩টি নৌকা পশ্চিম দিক থেকে নয়ানপুরের দিকে আসবার পথে মুক্তিফৌজ তিনটি নৌকাকেই ডুবিয়ে দেয় এবং ঐ ৫০ জন পাকিস্তানী সৈন্য ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
  • মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীকে ব্রাহ্মণপাড়া থেকে পাঁচটি নৌকায় শালদা নদী দিয়ে অগ্রসর হওয়ার পথে অ্যামবুশ করে। এই অ্যামবুশে পাকসেনাদের পাঁচটি নৌকা পানিতে ডুবে যায়। একজন ক্যাপ্টেনসহ ৩০ জন পাকসেনা হতাহত হয়। এ আক্রমণের ফলে পাকসেনাদের নদী পথে অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলোতে সরবরাহ পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
  • নোয়াখালী অঞ্চলে ফরিদগঞ্জ থানার রাওয়াল গ্রামে হানাদারদের উপর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গেরিলাদল অতর্কিত হামলা চালালে বেশ ক’জন পাকিস্তানী সৈন্য নিহত এবং ১০জন আহত হয়। এ আক্রমণে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
  • ২ নম্বর সেক্টরে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘এ’ কোম্পানির অধীন মুক্তিসেনাদের টহলদার দল মাধবপুর গ্রামের বাইরে কাঁচারাস্তায় অ্যামবুশ পেতে অপেক্ষায় থাকে। এগারোটার সময় পাকসেনাদের একটি জীপ এবং একটি ট্রাক অ্যামবুশের আওতায় এলে আক্রমণ চালিয়ে গাড়ি দুটির মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। এই অ্যামবুশে কয়েকজন পাকসেনা নিহত এবং ৬ জন আহত হয়।
  • মুক্তিযোদ্ধা নিজামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের কাছে একটি রেলওয়ে ট্র্যাকে মাইন স্থাপন করে। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে একটি পাকসেনা ও রাজাকারবাহী ট্রেন সেখান দিয়ে যাবার সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বেশ কিছু হানাদার নিহত হয়।
  • নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে রাজাকার ও পাকসৈন্যের একটি বড় দল মহেশপুরে আসবার খবর পেয়ে মুক্তিবাহিনী পুরো গ্রামের চারদিক থেকে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধে ৪ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং বাকি সৈন্যরা পালিয়ে যায়।
  • পাকসেনাদের একটি দল শাহবাজপুর রেলস্টেশন ঘাঁটি থেকে তাজপুরের দিকে অগ্রসর হলে তাদের ওপর আক্রমণ চালায় সিলেটের তাজপুরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা দল। এ আক্রমণে ৪ জন রাজাকার ও একজন পাকসৈন্য নিহত হয় এবং কয়েকজন আহত হয়।
  • খুলনায় একদল গেরিলা আশাশুনি থানা আক্রমণ করে এবং একদিন দুই রাত থানা অবরোধ করে রাখে। দ্বিতীয়দিন সাতক্ষীরা থেকে একদল পাকিস্তানী সৈন্য ও খুলনা থেকে পাকিস্তানী নৌবাহিনী আআশুনি এসে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর হামলা চালায়। গেরিলারা ১২/১৪ ঘন্টা আক্রমণ প্রতিহত করে। এ যুদ্ধে ১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও ২জন বন্দি হন পক্ষান্তরে পাকিস্তানী ৩ জন মিলিশিয়া ও ১৬ জন রাজাকার নিহত হয়।
  • চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ অন্তর্গত এলাকা হাসনাবাদে এদিন জহিরুল হক পাঠানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা অ্যামবুশ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত আক্রমণে ১০-১২টি নৌকাযোগে আগত পাকিস্তানী সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। ফলে ৫-৭ মিনিট মুক্তিযোদ্ধারা একতরফা আক্রমণ চালানোর পর পাকিস্তানীরা পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানীদের দূরবর্তী অবস্থান থেকেও গোলা গোলাবর্ষণ করা হতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ অব্যাহত রাখে। মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন যুদ্ধের একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকার মিলে ৯-১০ জন নিহত ও অনেকে আহত হয়।
  • দিনাজপুরে ক্যাপ্টেন দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একদল গেরিলা পাকিস্তানী সৈন্যদের অমরখানা অবস্থানের উপর ঝটিকা আক্রমণ চালায়। এতে একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। বেশ ক’জন পাকিস্তানী হতাহত হয়।
  • সিলেটের শাহবাজপুর ষ্টেশনের কাছে তাজপুর গ্রামে একদল মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নিয়ে টহলরত পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকারদের আক্রমণ করে। এতে ৪ জন রাজাকার নিহত ও আরও কয়েজন রাজাকার এবং ১ জন পাকিস্তানী সৈন্য আহত হয়।
  • কুমিল্লা জেলায় মুক্তিবাহিনী মাইজবার গ্রামে পাকসেনা তল্লাসী অভিযান চালায়। এই অভিযানে ৩৬ জন পাকসেনা নিহত হয়। অভিযান শেষে মুক্তিযোদ্ধারা নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
  • নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে রাজাকার ও পাকসৈন্য মিলে ১৫০ জনের একটি দল মহেশপুর লুটপাট করতে আসে। খবর পেয়ে মুক্তিবাহিনী পুরো গ্রামের চারদিকে অ্যামবুশ করে পাকসেনাদের ওপর আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধে ৪ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং বাকী সৈন্যরা পালিয়ে যায়।
  • মুক্তিবাহিনী সিলেটের জগন্নাথপুর থানার দিরাই ও শাল্লা এলাকা শত্রুমুক্ত করে সেখানে বেসামরিক প্রশাসন চালু করে। সালেহ চৌধুরী ঐ এলাকার আঞ্চলিক অধিনায়ক নিযুক্ত হন।
  • বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের ফলে পাকিস্তান সরকারের আবেদনে যে কমিশনের সদস্যপদ থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সদস্য মনোনীত হন।
  • জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জর্জ বুশ মহাসচিব উ’ থান্টের সাথে সাক্ষাৎ করে জানান, পূর্ব পাকিস্তানের মার্কিন সাহায্য সমন্বয়ের জন্য ‘মার্কিন টাস্ক ফোর্স’ গঠন করা হয়েছে।
  • সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ও ভারতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত চেস্টার বোন্স বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে শাস্তি দেয়া হলে পাকিস্তানের সব ধরনের মার্কিন সাহায্য বন্ধ করে দেয়ার জন্য দাবি জানিয়ে প্রচার অভিযান শুরু করেন।
  • পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আযম বলেন, শ্লোগান আওড়িয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবেলা করা যাবে না। সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করুন। রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিন।
বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.