৩০ আগস্ট, ১৯৭১

Comments

৩০ আগস্ট ১৯৭১ সোমবার
কী ঘটেছিল

  • ঢাকা শহরে গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে দিশেহারা পাকবাহিনী ২৯ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন গেরিলা আস্তানা ও বাড়ীতে হানা দিয়ে ধরপাকড় শুরু করে যা চলতে থাকে মধ্যরাত পেরিয়ে পরদিন ৩০ আগস্ট ভোর পর্যন্ত। এসময়ে গেরিলা বদিউল আলম বদি, আব্দুস সামাদ, সৈয়দ হাফিজুর রহমান হাফিজ, শাফী ইমাম রুমি, মাগফারউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আজাদ, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, আবু বকর, মাসুদ সাদিক ছুল্লু, আবুল বারক আলভী ও আলতাফ মাহমুদসহ বেশ কিছু সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করে। ২৯ ও ৩০ আগস্টের হানাদারদের অভিযানে ১/৩ দিলু রোডের হাবিবুল আলমের ও ৩৭০ রাজারবাগের আলতাফ মাহমুদের বাড়ী থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করে হানাদারেরা।
  • এদিন পাক হানাদারবাহিনী গোপন খবরের ভিত্তিতে ঢাকার গেরিলাদের ধোলাই খাল গোপন ঘাঁটি আক্রমণ করে। বিপুল পাকসৈন্যকে প্রতিরোধ যুদ্ধে গেরিলারা দীর্ঘক্ষণ টিকতে না পেরে ধোলাই খাল সাঁতরে নিরাপদ স্থানে চলে যায়। তবে দুজন যোদ্ধা আহত এবং কিছু অস্ত্র পাকবাহিনী দখল করে।
  • ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর ৫০ জন যোদ্ধার একটি দল সুবেদার আবদুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে এবং সুবেদার শামসুল হকের নেতৃত্বে এক সেকশন মুক্তিযোদ্ধা চালনা গ্রামে পাকবাহিনীর ডিফেন্সের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ চালায়। সারাদিনব্যাপী এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন, ১৫ জন সিপাই, ২৯ জন রাজাকার নিহত হয় এবং ১৩ জন রাজাকার ও কয়েকজন পাকসেনা পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনী পাকসেনাদের ৭টি বড় নৌকা মালামালসহ দখল করে এবং ৬টি এলএমজি, ম্যাগাজিন বাক্স ৬টি, এলএমজি ম্যাগাজিন ৭২টি, রাইফেল ১২টি ও ৮১০ টি বুলেট উদ্ধার করে।
  • ঢাকার হরিরামপুরের ঘাঁটি থেকে হানাদারবাহিনী রসদ নিয়ে লঞ্চে করে যাবার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে পড়ে এবং এতে বেশ ক’জন পাকসেনা হতাহত হয় এবং লঞ্চটির ব্যাপক ক্ষতি হলে হানাদারেরা রণে ভঙ্গ দেয়।
  • পাকবাহিনী বেগমগঞ্জ থানার সোনাপুর ও গোপালপুরের কাছে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের ওপর হামলা চালায়। মুক্তিবাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালালে ৩/৪ ঘন্টা প্রচন্ড গুলিবিনিময় হয় এবং পরে পাকসেনারা সঙ্গীদের মৃতদেহ ফেলে রেখেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা ২০টি অস্ত্র দখল করে, তবে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হারায়।
  • ঝিনাইদহ পাকসেনাদের দখলে চলে যাওয়ার পর দলে দলে ছাত্র-যুবক ভারতে গেরিলা ট্রেনিং এ যেতে শুরু করে। সীমান্তের কাছে আবাইপুরে মুক্তিযোদ্ধারা স্থায়ী ক্যাম্প গড়ে তোলে। পাকবাহিনী ও রাজাকাররা আবাইপুর আক্রমণের জন্য এগুতে থাকে। এ খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নদী পার হয়ে আলফাপুর খালের পাড়ে অবস্থান নেয়। পাকসেনারা নদী পার হবাব সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে পড়ে। সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। এ যুদ্ধে প্রায় ৫০ জন পাক সেনা ও রাজাকার নিহত হয়।
  • লাকসাম থেকে পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল চৌদ্দগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। পাকসেনাদের এই দলটি মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশ দলের ২০০ গজের মধ্যে পৌঁছালে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। সমস্তদিন গুলি বিনিময়ের পর পাকসেনারা সম্মুখে অগ্রসর হতে না পেরে পিছু হটে এবং আক্রোশে রাস্তার চারদিকের সমস্ত গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এই যুদ্ধে ২০ জন পাকসৈন্য নিহত ও অনেকে আহত হয়।
  • কুমারশৈল চা বাগানে পাকবাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে এবং বাংকার তৈরির কাজ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা এদের উপর আক্রমণ চালায় এবং দু’ঘন্টা যুদ্ধ চলার পরে পাকিস্তানীরা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং কুমারশৈল চাবাগান এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
  • বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী পটুয়াখালীর মহিষপুরের মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটিতে জল ও স্থলপথে হানাদাররা হামলা চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধ ও স্থানীয় জনগণের চারিদিক থেকে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি শুনে হানাদারেরা বিচলিত হয়ে পলায়নের পথ বেছে নেয়। যুদ্ধে বেশ ক’জন পাকসৈন্য, ১৪ জন রাজাকার নিহত ও বেশ কিছু আহত হয়। অপরদিকে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়।
  • খুলনার শরনখোলার পাকিস্তান বাজারে অবস্থান নেয়া একদল রাজাকারের উপর আক্রমণ চালায় মুক্তিফৌজের একটি দল। এতে ৩ জন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে এবং বাকিরা পালিয়ে যায়।
  • মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দল আড়াই হাজার থানা আক্রমণ করে। এই আক্রমণে থানার দারোগা নিহত হয়। থানার সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র গেরিলা যোদ্ধারা দখলে আসে এবং তারা নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
  • খুলনায় পাকবাহিনীর ৪০০ জন সৈন্য উকসা-গোবিন্দপুর মুক্তিবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটির ওপর হামলা চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় নয় ঘন্টা গোলাবিনিময় হয়। পরে পাকবাহিনীর একজন মেজর গুরুতর আহত হলে পাকসেনারা পালিয়ে যায়। এ যুদ্ধে ৮ জন পাকসেনা নিহত ও অনেক সৈন্য আহত হয়।
  • মার্কিন সিনেটের জুডিশিয়ারি সাবকমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রিফিউজি ক্যাম্প পরিদর্শনের পর বলেন, পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার পাঁচ মাসব্যাপী সংঘাতের ফলে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন বাঙালী ভারতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ভারতের কিছু শরণার্থী শিবিরে ঘুরে কেনেডি বলেন, ‘এটা ছিল সমসাময়িক সময়ের মানব দুর্দশার সব থেকে মর্মান্তিক চিত্র।’
  • বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিবের সঙ্গে সাক্ষাতকারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হচ্ছে একদিকে সাড়ে সাত কোটি মানুষ, অপরদিকে ইসলামাবাদের প্রতিহিংসাপরায়ণ, নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী সামরিক শাসকবর্গ। ভারতের জনগণ, সরকার ও পার্লামেন্ট বাংলাদেশের জনগণের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতা ও সহানুভূতির হাত প্রসারিত করেছে।’ এ সাক্ষাতকারে ইন্দিরা গান্ধী ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি প্রসঙ্গে বলেন, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বন্ধুত্ব অনেক বছর ধরে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, আমরা উভয়ে শান্তির জন্য কাজ করেছি এবং বর্ণবাদ এবং উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভারি শিল্পের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য আমাদের প্রোগ্রামে সাহায্য করেছে। আমাদের জনগণ সোভিয়েত ইউনিয়নকে বন্ধু হিসেবে দেখছে। এজন্যই চুক্তি আমাদের দেশে ব্যাপক প্রশংসা লাভ করেছে। পাকিস্তানের জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিতে তারা এই সমস্যাকে একটি ইন্দো-পাকিস্তান সমস্যায় রূপ দিতে চেষ্টা করছে। বিশ্বের বাকি দেশের কাছেও এমনটি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যুদ্ধের হুমকি থেকে বেপরোয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই আমরা কি করে এটাকে গুরুত্ব না দিয়ে থাকি?
  • পাকিস্তান সরকার বৃটেন ও বৃটিশ উপনিবেশগুলোর বিরুদ্ধে বৃটিশ সরকারের কাছে এক প্রতিবাদলিপি পেশ করে। প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, বৃটিশ সরকার ও হংকং প্রশাসন সেখানে আশ্রয় প্রার্থী বাঙালী বিদ্রোহীদের প্রতি নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করছে এবং বিদ্রোহীদের বৃটেনে থাকার অনুমতি দিয়েছে। বিদ্রোহীদের বিবিসি বেতার ও টেলিভিশন ব্যবহার করতে দেয়া হয়েছে। বহু বৃটিশ নাগরিক পাকিস্তানে ধ্বংসাত্মক কাজ চালানোর জন্য তহবিল সংগ্রহ ও অস্ত্র ক্রয় করতে বিদ্রোহীদের সাথে হাত মিলিয়েছে।
  • রাওয়ালপিন্ডিতে কাউন্সিল মুসলীম লীগের খাজা খয়রুদ্দিন ও মওলানা শফিকুল ইসলাম প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সাথে দেখা করেন।

বাঙালীয়ানা/এসএল

অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন –

আগস্ট ১৯৭১

জুলাই ১৯৭১

জুন ১৯৭১

মে ১৯৭১

এপ্রিল ১৯৭১

মার্চ ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.