গতকাল বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পুরান ঢাকার হৃষিকেশ দাস রোডের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন ক্রয় প্রস্তাবের অনুমোদন করা হয়েছে। প্রায় ৩৩২ কোটি টাকা দিয়ে রোজ গার্ডেন কিনতে যাচ্ছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু হয়েছিল এ বাড়িটিতে। ভবনটি বর্তমানে ব্যক্তিমালিকাধীন পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন

সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে কমিটির সভাপতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন- পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুসারে সরকার ‘সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে’ বর্তমান মালিকদের কাছ থেকে রোজ গার্ডেন কিনবে। এতে ব্যয় হবে ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ দুই হাজার ৯০০ টাকা।

মুসলিম লীগের প্রগতিশীল একটি অংশের উদ্যোগে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এই রোজ গার্ডেনেই গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে এ দলের নতুন নাম হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। এই বাড়িটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৩১ সালে হৃষিকেশ দাস নামে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পুরান ঢাকার হৃষিকেশ দাস রোডে ২২ বিঘা জমির ওপর একটি বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। বাগানে প্রচুর গোলাপ গাছ থাকায় এর নাম হয় রোজ গার্ডেন। এছাড়া বাগানটি সুদৃশ্য ফোয়ারা, পাথরের ভাস্কর্য দিয়ে সজ্জিত ছিল। মূল ভবনের দ্বিতীয়তলায় পাঁচটি কামরা আর একটি বড় নাচঘর আছে। নিচতলায় আছে আটটি কামরা। ভবনটির মোট আয়তন সাত হাজার বর্গফুট। উচ্চতায় ৪৫ ফুট। ছয়টি সুদৃঢ় থামের ওপর এই প্রাসাদটি নির্মিত। প্রতিটি থামে লতাপাতার কারুকাজ করা। প্রাসাদটির স্থাপত্যে করিন্থীয়-গ্রিকশৈলী অনুসরণ করা হয়েছে।

ভবন নির্মাণের কিছুদিন পর হৃষিকেশ দাস দেউলিয়া হয়ে যান।  তখন ১৯৩৭ সালে রোজ গার্ডেন বিক্রি করেন খান বাহাদুর আবদুর রশীদের কাছে। এর নতুন নামকরণ হয় ‘রশীদ মঞ্জিল’। কাজী আবদুর রশীদ সেখানে প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয় রোজ গার্ডেন।

মৌলভী কাজী আবদুর রশিদের কাছ থেকে ১৯৬৬ সালে রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান তার বড় ভাই কাজী হুমায়ুন বশীর। এ কারণে সে সময় ভবনটি ‘হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি’হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

১৯৭০ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল স্টুডিও ও মোশন পিকচার্স লিমিটেডকে রোজ গার্ডেন ইজারা দেয়া হয়। এরপর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৮৯ সালে রোজ গার্ডেনকে সংরক্ষিত ভবন ঘোষণা করে। পরে ১৯৯৩ সালে রোজ গার্ডেনের অধিকার ফিরে পান কাজী আবদুর রশিদের মেজো ছেলে কাজী আবদুর রকীব। ১৯৯৫ সালে তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী লায়লা রকীব ওই সম্পত্তির মালিক হন। ৮৭ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেন নানা হাতবদল হয়ে একটি ঐতিহাসিক জাদুঘরে রূপ নিতে যাচ্ছে

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.