১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায় অতুলপ্রসাদ সেনের জন্ম। তাঁদের আদি নিবাস ছিল ফরিদপুরের বর্তমান শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মগর গ্রামে। বাল্যকালে পিতৃহীন হয়ে অতুলপ্রসাদ ভগবদ্ভক্ত, সুকণ্ঠ গায়ক ও ভক্তিগীতিরচয়িতা মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের আশ্রয়ে প্রতিপালিত হন। পরবর্তীকালে মাতামহের এসব গুণ তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।
বাবা রামপ্রসাদ সেন ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন, মহর্ষিই রামপ্রসাদকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে সাহায্য করেন। ঢাকার বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, ঋষি কালীনারায়ণ গুপ্তের মেয়ে হেমন্তশশীর সঙ্গে বিয়ে হয় উদার, বুদ্ধিমান তরুণটির। জন্মাবধি অতুলপ্রসাদ দেখেছেন উনিশ শতকীয় সংস্কারমুক্ত খোলা একটা আকাশ। বাবা রামপ্রসাদ নববিধানের, দাদু কালীনারায়ণ ভারতীয় ব্রাহ্মসমাজের সদস্য ছিলেন। শ্বশুর-জামাতার মতান্তর মনান্তরে রূপ নেয়নি কখনও। শিশু অতুল দেখেছেন রবিবারের প্রার্থনায় দু’জনেরই প্রণত যোগদান। কালীনারায়ণের কাছে আসতেন বহু দীনজন। দানসামগ্রী যা কিছু শিশু অতুলের হাত দিয়ে দেওয়াতেন মাতামহ। অতুলপ্রসাদ বড় হতে হতে দেখেছেন, দাদু একটা কালো পাথরের থালায় ভাত খান, নিজের হাতে থালা ধুয়ে তাতেই ভাত বেড়ে দেন লক্ষ্মীবাজারের বাড়ির বহু দিনের পুরনো মেথরকে, সে খেয়ে উঠলে নিজে সেই থালা ধুয়ে রাখেন ফের। উচ্চবর্ণের, সচ্ছলতার গুমোর ভেঙেছিল রোজকার সহজ শিক্ষায়, আমৃত্যু সেই শিক্ষা ভোলেননি।

অতুলপ্রসাদ সেন
অতুলপ্রসাদ সেন অতুলপ্রসাদ ১৮৯০ সালে প্রবেশিকা পাসের পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন করেন।
রামপ্রসাদের মৃত্যুর পর অতুলপ্রসাদের মা হেমন্তশশীর দ্বিতীয় বার বিয়ে হয়— চিত্তরঞ্জন দাশের জ্যাঠামশাই, ব্রাহ্ম নেতা দুর্গামোহন দাশের সঙ্গে। তরুণ অতুলপ্রসাদ বাড়ির বড় ছেলে, ছোট তিনটি বোন ঘরে। কলকাতায় বড়মামা কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্তের বাড়িতে থাকেন তখন, অভিমানে মায়ের কাছেই ঘেঁষেন না। অভিমান থেকে এসেছে জেদ, প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ে, পরে বিলেত গিয়ে হতে হবে ব্যারিস্টার। একা নিজের ঘরে মায়ের জন্য কাঁদেন, তখন কাছটিতে এসে বসে মামার মেয়ে হেমকুসুম। সান্ত্বনা দেয়, প্রেরণা জোগায়। বড় হতে হবে জীবনে, অনেক বড়। হেমকুসুমের সঙ্গ অতুলপ্রসাদকে থিরথির করে কাঁপায়।
তিনি কলকাতা ও রংপুরে আইন ব্যবসা শুরু করেন এবং পরে লক্ষ্ণৌতে স্থায়িভাবে বসবাস করেন। সেখানে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং আউধ বার অ্যাসোসিয়েশন ও আউধ বার কাউন্সিলের সভাপতি নির্বাচিত হন।
ব্যারিস্টারি পরীক্ষা পাশ করে ছেলে দেশে ফিরেছে, হেমন্তশশী-দুর্গামোহন খুব খুশি। মায়ের কাছে যেতে তবু পা সরে না, মাঝে কী এক দুর্লঙ্ঘ্য বাধা। পরিস্থিতি জটিলতর হল, যখন অতুলপ্রসাদ-হেমকুসুম ঠিক করলেন, বিয়ে করবেন। আত্মীয়রা শিউরে উঠল। মামাতো-পিসতুতো ভাইবোন, বিয়ে হবে কী! ব্রিটিশ বা হিন্দু, কোনও আইনেই এ বিয়ে সিদ্ধ নয়। সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহ পরামর্শ দিলেন, বিয়ে করতে হলে বিদেশে গিয়ে করো। স্কটল্যান্ডে গ্রেটনাগ্রিন গ্রামের গির্জায়, সেখানকার নিয়মে বিয়ে করলেন হেমকুসুম-অতুলপ্রসাদ। বিংশ শতাব্দীর শুরুর বছরটি তখন চোখ মেলেছে সবে।
বিয়ে হল, কিন্তু দেশে ফেরা? কিছু দিন চেষ্টা করেছিলেন, বিলেতেই যদি থাকা যায়। রোজগার বড় বালাই। দুই পুত্র দিলীপকুমার-নিলীপকুমার জন্মেছে, সংসার চালাতে হবে। সাত মাসের মাথায় জ্বরে নিলীপকুমার মারাও গেল। কাজ জুটছে না, হেমকুসুম গয়না বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। কলকাতায় ফিরলেন, কিন্তু প্র্যাকটিস জমানো মুখের কথা নয়। মুখ ফিরিয়ে-থাকা পরিজন-বন্ধুর মাঝে বাঁচাও মুশকিল। ব্যারিস্টার বন্ধু মমতাজ হোসেন বুদ্ধি দিলেন, লক্ষ্ণৌ চলুন। উত্তরপ্রদেশের নবাবি নগর, ঠুমরি-টপ্পা-শায়েরির লক্ষ্ণৌয়ে বহু বাঙালির বাস; গোমতীর তীর আলো করছেন শিক্ষা-সাহিত্য-শিল্পে। গুণীর কদর করে লক্ষ্ণৌ, মানীর মান রাখে। অতুলপ্রসাদ লক্ষ্ণৌ এলেন, ক’জন বন্ধুও এগিয়ে এলেন সাহায্যে। লক্ষ্ণৌ বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হলেন, প্র্যাকটিস শুরু করলেন লক্ষ্ণৌ কোর্টে।
লক্ষ্ণৌ নগরীর সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গেও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। অতুলপ্রসাদ প্রবাসী (বর্তমানে নিখিল-ভারত) বঙ্গ-সাহিত্য সম্মিলন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি ঐ সম্মিলনের মুখপত্র উত্তরার একজন সম্পাদক এবং সম্মিলনের কানপুর ও গোরখপুর অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন।
রাজনীতিতে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও প্রথমে কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন, পরে লিবারেলপন্থী হন। অতুলপ্রসাদ তাঁর সমগ্র জীবনের উপার্জিত অর্থের বৃহদংশ স্থানীয় জনকল্যাণে ব্যয় করেন; এমনকি তিনি তাঁর বাসগৃহ ও গ্রন্থস্বত্বও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে দান করে যান।
সেই যুগে ৩৩ হাজার টাকা দিয়ে লক্ষ্ণৌয়ের কেশরবাগে বিরাট বাড়ি করেছিলেন অতুলপ্রসাদ। গাইয়ে-বাজিয়েদের আসর বসত সেখানে। বড় ভালবাসতেন ঠুমরি, নিজের গানে ঠুমরির চলন-ঠাট এনেছিলেন অনায়াস দক্ষতায়। দিলীপকুমার রায়, পাহাড়ী সান্যাল, সাহানা দেবীকে সেই গীতিসম্পদ শিখিয়ে, বিলিয়ে গিয়েছেন নিজে হাতে ধরে।

অতুলপ্রসাদ সেনের লক্ষৌয়ের বাড়ি
বাংলাভাষীদের কাছে অতুলপ্রসাদ প্রধানত একজন সঙ্গীতজ্ঞ ও সুরকার হিসেবেই পরিচিত। তাঁর গানগুলি প্রধানত স্বদেশীসঙ্গীত, ভক্তিগীতি ও প্রেমের গান এ তিন ধারায় বিভক্ত। তবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের বেদনা সব ধরনের গানেই কম-বেশি প্রভাব ফেলেছে। এজন্য তাঁর অধিকাংশ গানই হয়ে উঠেছে করুণরস-প্রধান। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রপ্রতিভার প্রভাববলয়ের মধ্যে বিচরণ করেও যাঁরা বাংলা কাব্যগীতি রচনায় নিজেদের বিশেষত্ব প্রকাশ করতে সক্ষম হন, অতুলপ্রসাদ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। সমকালীন গীতিকারদের তুলনায় অতুলপ্রসাদের সঙ্গীতসংখ্যা সীমিত হলেও তাঁর অনেক গানে সাঙ্গীতিক মৌলিকত্ব পরিলক্ষিত হয়; আর সে কারণেই তিনি বাংলা সঙ্গীত-জগতে এক স্বতন্ত্র আসন লাভ করেন। তাঁর গানগুলি অতুলপ্রসাদের গান নামে প্রতিষ্ঠা পায়।
১৯০২ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত অতুলপ্রসাদ আইনব্যবসা উপলক্ষে লক্ষ্ণৌতে অতিবাহিত করেন। সে সময় তাঁর বাংলোতে প্রায় সন্ধ্যায়ই গানের আসর বসত। সে আসরে গান শোনাতে আসতেন আহম্মদ খলিফ খাঁ, ছোটে মুন্নে খাঁ, বরকৎ আলী খাঁ এবং আব্দুল করিমের মতো বিখ্যাত ওস্তাদগণ। ভালো সঙ্গীতের আসর পেলে তিনি আদালত ও মক্কেলের কথা ভুলে যেতেন। অতুলপ্রসাদ অধিকাংশ গান লক্ষ্ণৌতেই রচনা করেন। তাঁর গানের সংখ্যা মাত্র ২০৬ এবং সেসবের মধ্যে মাত্র ৫০-৬০টি গান গীত হয়। অতুলপ্রসাদের মামাতো বোন সাহানা দেবীর সম্পাদনায় ৭১টি গান স্বরলিপিসহ কাকলি (১৯৩০) নামে দু খন্ডে প্রকাশিত হয়। তাঁর অপর গানগুলিও গীতিপুঞ্জ এবং কয়েকটি গান নামে দুটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। ১৯২২-২৩ সালের দিকে কলকাতা থেকে প্রথম অতুলপ্রসাদের গানের রেকর্ড বের হয় সাহানা দেবী ও হরেন চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। পরে যেসব শিল্পী তাঁর গান গেয়েছেন তাঁরা সুর-তালের ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন করায় তা নিয়ে কিছুটা বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়।
বাংলা সঙ্গীতে অতুলপ্রসাদই প্রথম ঠুংরির চাল সংযোজন ছাড়া রাগপ্রধান ঢঙে বাংলা গান রচনা শুরু করেন। উল্লেখ্য যে, বাংলায় ঠুংরি গীতধারার প্রথম প্রচলন করেন লক্ষ্ণৌর বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্। অতুলপ্রসাদের বিশেষত্ব এ যে, তিনি বাংলা গানের সুর-তালের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখেই হিন্দুস্থানি রীতির প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় তিনি উত্তর ভারতে কাটান। সেজন্য ওখানকার সাঙ্গীতিক পরিমন্ডলের সঙ্গে মিশে গিয়ে তিনি হিন্দুস্থানি গীতিপদ্ধতিকে রপ্ত করতে সমর্থ হন। তাই বাংলা গানে হিন্দুস্থানি ঢঙের মিশ্রণ ঘটানো তাঁর পক্ষে সহজ হয়েছিল। অতুলপ্রসাদের এ প্রয়াস বাংলা গানে একদিকে যেমন নতুনত্ব এনেছে, অন্যদিকে তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ উন্মুক্ত করে বাংলা গানের জগতে এক বন্ধনমুক্ত শৈল্পিক আবহ নির্মাণে সক্ষম হয়েছে। হিন্দুস্থানি লঘু খেয়াল, ঠুংরি ও দাদরা সঙ্গীতের সুষমামন্ডিত সুরের সঙ্গে অতুলপ্রসাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। হিন্দুস্থানি সুর সংযোজনায় বাংলা গানের কাব্যিক মর্যাদা কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে কেউ কেউ মত প্রকাশ করলেও একটি স্বতঃস্ফূর্ত সাঙ্গীতিক ভাব তাঁর সকল গানে পরিলক্ষিত হয়। যেখানে সুর সঙ্গীতের অন্তর্নিহিত মাধুর্য নিয়ে কথার ভাবকে ছাড়িয়ে গিয়েছে সেখানেই অতুলপ্রসাদের সার্থকতা। তাঁর ঠুংরি ও দাদরা ভঙ্গির গানগুলি শৈল্পিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে।
অতুলপ্রসাদের কয়েকটি জনপ্রিয় গান
হও ধরমেতে ধীর
হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর,
হও উন্নত শির, নাহি ভয় |
ভুলি ভেদাভেদ জ্ঞান, হও সবে আগুয়ান,
সাথে আছে ভগবান,—হবে জয় |
নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান,
বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান্ ;
দেখিয়া ভারেতে মহা-জাতির উত্থান—জগজন মানিবে বিস্ময়!
তেত্রিশ কোটি মোরা নহি কভু ক্ষীণ,
হতে পারি দীন, তবু নহি মোরা হীন!
ভারতে জনম, পুনঃ আসিবে সুদিন—ঐ দেখ প্রভাত-উদয়!
ন্যায় বিরাজিত যাদের করে, বিঘ্ন পরাজিত তাদের শরে ;
সাম্য কভু নাহি স্বার্থে ডরে—সত্যের নাহি পরাজয় ||বাংলা ভাষা
মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!
তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা!
কি যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,
( এমন কোথা আর আছে গো! )
গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা ||
ঐ ভাষাতেই নিতাই গোরা, আনল দেশে ভক্তি-ধারা,
( মরি হায়, হায়রে! )
আছে কৈ এমন ভাষা এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা ||
বিদ্যাপতি, চণ্ডী, গোবিন, হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন :
( আরও কত মধুপ গো! )
ঐ ফুলেরই মধুর রসে বাঁধলো সুখে মধুর বাসা ||
বাজিয়ে রবি তোমার বীণে, আনলো মালা জগত্ জিনে!
( গরব কোথায় রাখি গো! )
তোমার চরণ-তীর্থে আজি জগত্ করে যাওয়া-আসা ||
ঐ ভাষাতেই প্রথম বোলে, ডাকনু মায়ে ‘মা, মা’ ব’লে ;
ঐ ভাষাতেই বলবো হরি, সাঙ্গ হ’লে কাঁদা হাসা ||ভারত-লক্ষ্মী
উঠ গো, ভারত লক্ষ্মী! উঠ আদি জগত-জন-পূজ্যা!
দুঃখ দৈন সব নাশি’, কর দূরিত ভারত লজ্জা |
ছাড়গো, ছাড় শোক-শয্যা, কর সজ্জা
পুনঃ কমল-কনক-ধন-ধান্যে!
জননি গো, লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে ;
কাঁদিছে তব চরণ তলে, ত্রিংশতি কোটি নরনারী গো |
কাণ্ডারি! নাহিক কমলা, দুখ লাঞ্ছিত ভারতবর্ষে,
শঙ্কিত মোরা সব যাত্রী, কাল-সাগর-কম্পন-দর্শে,
তোমার অভয়-পদ-স্পর্শে, নব হর্ষে,
পুনঃ চলিবে তরণী শুভ লক্ষ্যে |
জননি গো, লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে ;
কাঁদিছে তব চরণ তলে, ত্রিংশতি কোটি নরনারী গো |
ভারত-শ্মশান কর পূর্ণ পুনঃ কোকিল-কূজিত কুঞ্জে,
দ্বেষ হিংশা করি চূর্ণ, কর পূরিত প্রেম-অলি-গুঞ্জে
দূরিত করি পাপ-পুঞ্জে, তপঃ-পুঞ্জে,
পুনঃ বিমল কর ভারত-পূণ্যে |
জননি গো, লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে ;
কাঁদিছে তব চরণ তলে, ত্রিংশতি কোটি নরনারী গো |জল বলে চল, মোর সাথে চল
জল বলে চল, মোর সাথে চল
তোর আঁখিজল, হবে না বিফল, কখনো হবে না বিফল।
চেয়ে দেখ মোর নীল জলে শত চাঁদ করে টল মল।
জল বলে চল, মোর সাথে চল।
বধু রে আন তরা করি, বধুরে আন তরা করি,
কূলে এসে মধু হেসে ভরবে গাগরী,
ভরবে প্রেমের হৃদ কলসি, করবে ছল ছল।
জল বলে চল, মোর সাথে চল।
মোরা বাহিরে চঞ্চল, মোরা অন্তরে অতল,
সে অতলে সদা জ্বলে রতন উজল।
এই বুকে, ফোটে সুখে, হাসিমুখে শতদল,
নহে তীরে, এই নীরে, গভীরে শীতল।
জল বলে চল, মোর সাথে চল।নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন
নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন,
তুই সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন।
মূঢ় মন, সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন।
নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন।
লাগে নি যার পায়ে ধুলি, কি নিবি তার চরণ ধুলি,
নয়রে সোনায়, বনের কাঠেই হয় রে চন্দন।
মূঢ় মন, হয় রে চন্দন।
নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন।
এ মোধন মায়ের মতন, দুঃখীটুতেই অধিক যতন,
এ ধনেতে ধনি যে জন, সেই তো মহাজন।
মূঢ় মন, সেই তো মহাজন।
বৃথা তোর কৃচ্ছসাধন, সেবাই নরের শ্রেষ্ঠ সাধন,
মানবের পরম তীর্থ দীনের শ্রীচরণ।
মূঢ় মন, দীনের শ্রীচরণ।
মতামতের তর্কে মত্ত, আছিস ভুলে পরম সত্য,
সকল ঘরে সকল নরে আছেন নারায়ণ।
মূঢ় মন, আছেন নারায়ণ।
নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন।ওগো নিঠুর দরদী
ওগো নিঠুর দরদী, ও কি খেলছ অনুক্ষণ।
তোমার কাঁটায় ভরা বন, তোমার প্রেমে ভরা মন,
মিছে খাও কাঁটার ব্যথা, সহিতে না পার তা আমার আঁখিজল,
ওগো আমার আঁখিজল তোমায় করেগো চঞ্চল
তাই নাই বুঝি বিফল আমার অশ্রু বরিশন।
ওগো নিঠুর দরদী।
ডাকিলে কও না কথা, কি নিঠুর নিরবতা।
আবার ফিরে চাও, তুমি আবার ফিরে চাও,
বল ওগো শুনে যাও
তোমার সাথে আছে আমার অনেক কথন।
এ কি খেলছ অনুক্ষণ,
ওগো নিঠুর দরদী।বল, বল, বল সবে
বল, বল, বল সবে, শত বীণা-বেণু-রবে,
ভারত আবার জগত-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে |
ধর্মে মহান্ হবে, কর্মে মহান্ হবে,
নব দিনমণি উদিবে আবার পুরাতন এ পুরবে!
আজও গিরিরাজ রয়েছে প্রহরী,
ঘিরি তিনদিক নাচিছে লহরী,
যায়নি শুকায়ে গঙ্গা গোদাবরী, এখনও অমৃতবাহিনী |
প্রতি প্রান্তর, প্রতি গুহা বন,
প্রতি জনপদ, তীর্থ অগণন, কহিছে গৌরব-কাহিনী |
বিদুষী মৈত্রেয়ী খনা লীলাবতী,
সতি সাবিত্রী সীতা অরুন্ধতী,
বহু বীরবালা বীরেন্দ্র-প্রসূতি, আমরা তাঁদেরই সন্ততি ||
ভোলেনি ভারত, ভোলেনি সে কথা,
অহিংসার বাণী উঠেছিল হেথা,
নানক, নিমাই করেছিল ভাই, সকল ভারত-নন্দনে |
ভুলি ধর্ম-দ্বেষ জাতি-অভিমান,
ত্রিশকোটি দেহ হবে এক প্রাণ, একজাতি প্রেম-বন্ধনে ||
মোদের এ দেশ নাহি রবে পিছে,
ঋষি-রাজকুল জন্মেনি মিছে,
দুদিনের তরে হীনতা সহিছে, জাগিবে আবার জাগিবে |
আসিবে শিল্প-ধন-বাণিজ্য,
আসিবে বিদ্যা-বিনয়-বীর্য, আসিবে আবার আসিবে ||
এস হে কৃষক কুটির-নিবাসী,
এস অনার্য গিরি-বনবাসী,
এস হে সংসারী, এস হে সন্ন্যাসী, —মিল হে মায়ের চরণে |
এস অবনত, এস হে শিক্ষিত,
পরহিত-ব্রতে হইয়া দীক্ষিত, —মিল হে মায়ের চরণে |
এস হে হিন্দু, এস মুসলমান,
এস হে পারসী, বৌদ্ধ, খৃষ্টিয়ান্, —মিল হে মায়ের চরণে |
এমন কয়েকটি গান হলো: ‘কি আর চাহিব বলো’ (ভৈরবী/টপ খেয়াল), ‘ওগো নিঠুর দরদী’ (মিশ্র আশাবরী-দাদরা/টপ ঠুংরি), ‘যাব না যাব না ঘরে’ (ঠুংরি) ইত্যাদি। তাঁর রাগপ্রধান গানের মধ্যে ‘বঁধু ধর ধর মালা’ (কালিংড়া), ‘তবু তোমায় ডাকি বারে বারে’ (সিন্ধু কাফি) ইত্যাদি গান আজও সঙ্গীতবোদ্ধাদের নিকট সমান প্রিয়। অতুলপ্রসাদ রাগপ্রধান ঢঙে বাংলা গানে যে সুর সংযোজন শুরু করেন, তা পরে একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে বিকশিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামের গান এবং রাগপ্রধান অঙ্গের অন্যান্য আধুনিক গান এভাবে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে গড়ে ওঠে। অতুলপ্রসাদের অপর কৃতিত্ব ধ্রুপদ ও কীর্তনের সুরসমন্বয়ে সঙ্গীত রচনা, যেমন ‘জানি জানি হে রঙ্গ রানী’ (তিলক প্রমোদ)। তাঁর গানে খাম্বাজরাগের বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এ ছাড়াও নটমল্লার, নায়কী কানাড়া, কাফি, পিলু প্রভৃতি রাগের মিশ্রণেও তিনি গান রচনা করেছেন। অতুলপ্রসাদের কীর্তন, বাউল এবং রবীন্দ্র আঙ্গিকে রচিত স্বদেশী গানগুলি বাংলা সঙ্গীতের জগতে মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, যেমন: ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর’, ‘উঠ গো ভারত লক্ষ্মী’ ইত্যাদি।
ছোটবেলায় ঢাকা ও ফরিদপুরে বাউল, কীর্তন ও মাঝি-মাল্লাদের ভাটিয়ালি গানের মূর্ছনা অতুলপ্রসাদের হূদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছিল। সে সুরের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত তাঁর বাউল ও কীর্তন ঢঙের গানগুলিতে বাংলার প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়া যায়। অতুলপ্রসাদ প্রেম, ভক্তি, ভাষাপ্রীতি, দেশপ্রেম প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক বহু গান রচনা করেছেন। ১৯১৬ সালে লক্ষ্ণৌয়ে সর্বভারতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে স্বেচ্ছাসেবকদের অধিনায়ক হিসেবে তিনি যে দেশাত্মবোধক গানটি রচনা করেন, তাতে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের সুর আছে: ‘দেখ মা এবার দুয়ার খুলে/ গলে গলে এল মা/ তোর হিন্দু-মুসলমান দু ছেলে’। ‘মোদের গরব, মোদের আশা/ আ মরি বাংলা ভাষা’ গানটিতে অতুলপ্রসাদের মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। এ গান বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের মধ্যে অফুরন্ত প্রেরণা জুগিয়েছে। গানটির আবেদন আজও অম্লান। এভাবে বাণীপ্রধান গীতি রচনা, সুললিত সুর সংযোজন, সুরারোপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রচলন ও করুণরস সঞ্চারের মাধ্যমে অতুলপ্রসাদ বাংলা সঙ্গীতভান্ডারকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।
লক্ষ্ণৌয়ে প্রবাসী বাঙালীদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ধারাটি ফলবতী রাখতে শুরু হয়েছিল প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন (এখন নাম নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন)। লক্ষ্ণৌ, ইলাহাবাদ, কাশী, নানা শহরে হত প্রবাসী বাঙালিদের সভা। বাংলা থেকে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ সহ বহু সারস্বত। অতুলপ্রসাদ ছিলেন এই সাহিত্যযজ্ঞের ঋত্বিক। গুণিজনসংবর্ধনার আয়োজন করেছেন, সভামুখ্য হয়েছেন। সাহিত্য সম্মেলনের পত্রিকা ‘উত্তরা’ প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন নিজের অর্থ দিয়ে। লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য, উপাচার্য থেকে অধ্যাপক সকলেই তাঁর গুণমুগ্ধ। লক্ষ্ণৌয়ের রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের সঙ্গে যোগ ছিল গভীর। সেবাশ্রমে বাবা-মায়ের নামাঙ্কিত ‘রামপ্রসাদ হল’, ‘হেমন্তশশী শুশ্রূশালয়’ তৈরি করে দিয়েছিলেন নিজ ব্যয়ে, উদ্বোধনের দিন নিজে কীর্তন গেয়েছিলেন। রোগীদের জন্য বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে কয়েকশো টাকার ওষুধ আনিয়ে দিয়েছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আনুকূল্যে। মৃত্যুর আগে নিজের ইচ্ছাপত্রে মাসিক ২৫ টাকা বরাদ্দ করে গিয়েছেন সেবাশ্রমের ওষুধের জন্য!
জন্মস্থান মগর গ্রামে তিনি ১৯২৭ সালে জ্যাঠা গুরুপ্রসাদ সেন ও বাবা রামপ্রসাদ সেনের নামে পঞ্চপল্লী গুরুরাম উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিদ্যালয়ে অতুলপ্রসাদ সেনের কিছু বই ও একটি ছবি আছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের মাঠে অতুল প্রসাদের একটি ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়েছে।

স্ত্রী হেমকুসুমের সাথে পুত্র দিলীপ
তাঁর দাম্পত্যজীবন দীর্ণ ছিল যন্ত্রণায়। স্ত্রী হেমকুসুম লক্ষ্ণৌতেই দীর্ঘকাল আলাদা বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। অতুলপ্রসাদ তাঁর মা হেমন্তশশীকে নিজের কাছে এনে রাখতে চান, রেখেওছেন, তাতে হেমকুসুমের মত ছিল না। অতুলপ্রসাদ সবার এত কাছে, কাজে থাকেন, তাঁর কাছে থাকেন না, তাই অভিমান। অথচ দু’জনের মধ্যেই ভালবাসার পূর্ণপাত্র। এমনও হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনা, হেমকুসুম এসে সমস্ত আয়োজন করেছেন হাসিমুখে নিজে হাতে, অনুষ্ঠান-শেষে ফিরে গিয়েছেন অভিমানী ভাড়াবাড়িতেই, অতুলপ্রসাদের ঘরে নয়। সুশিক্ষিতা হেমকুসুমের গলায় বিচ্ছেদকালে ঠাঁই পেত অতুলপ্রসাদেরই গান। অতুলপ্রসাদও বহু বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন চোখের জলে, গান লিখে-গেয়ে।
১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট লক্ষ্ণৌতে অতুলপ্রসাদ সেনের মৃত্যু হয়।
তথ্য সৌজন্য: বাংলাপিডিয়া ও আনন্দবাজার
ছবি: আনন্দবাজার
বাঙালীয়ানা/এসএল