।। অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ।।
পৃথিবীর কোনো জাতি কি তার গৌরবগাঁথা ইতিহাস ঐতিহ্যকে অগৌরব বলে প্রচার কোরে, তাকে অস্বীকার কোরে, পদদলিত কোরে, ধ্বংস কোরে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য কোরে উন্নতি করতে পেরেছে?
আমার মা যদি চরিত্রহীনও হয় তবু আমি আমার মায়ের সম্ভ্রম রক্ষার্থে জীবন দেবো, সারা পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবো। এই বাংলাদেশই আমাদের দেশ মাতৃকা।
দেশ মাতৃকার বুকের উপরে তাঁর বীরশ্রেষ্ঠ সাত সন্তানের পুনর্বার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে। দেশ মাতৃকার গৌরবময় ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সেই ইতিহাস সৃষ্টিকারী শ্রেষ্ঠ সন্তানদের চরম অপমান আমাকে দ্রোহী করে।
আমার দেশ মাতৃকার ঐতিহ্যগত সম্মান বিসর্জনের বিনিময়ে অট্টালিকার চন্দন পালঙ্কে শুয়ে সুখ অনুভব করার মতো সুখ-বিভোরতা আমি চাই না।
আমি আমার জীর্ণ কুঁড়েঘরের মাটিতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে চালের ফুটো দিয়ে মুক্ত আকাশ দেখতে চাই। ভাঙা বেড়ার ফুটো দিয়ে ঢোকা মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে চাই। জীর্ণ চালের ফুটো দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢোকা ভরা চান্দের মুক্ত আলোতে আলোকিত হতে চাই। বৃষ্টির জলের মুক্ত ধারায় স্নাত হতে চাই।
শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু এক নয়, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এক নয়। আওয়ামী লীগ মানে শেখ পরিবারের দল নয়, এটি জনমানুষের দল। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের একার নয়, তিনি সমগ্র জাতির। বিবিসি জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য, ভাষা শহিদদের ভাস্কর্য, মুজিবনগরের ঐতিহ্য ও ভাস্কর্য আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরের আন্দোলন সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাস আমাদের স্বাধীনতার অংশ, আমাদের পরিচয়ের ভিত্তি। এগুলোকে অসম্মান করা, এগুলোকে বিতর্কিত করা মানে নিজের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা।
নিজের শেকড়কে অস্বীকার করে কোনো দেশ, কোনো জাতি বড়ো হতে পারেনি। সে অপচেষ্টাও কোনো জাতি কখনো করেনি। এই জাতির একটি ধারাবাহিক ইতিহাস আছে। সূর্যসেন, তিতুমীর, ফজলুল হক, ভাসানি, সোহরাওয়ার্দী, মুজিব এরা সবাই সেই ইতিহাসের অংশ। একজনকে অস্বীকার করলে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থাকে না। সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে হত্যা করার ২৪১৫ বছর পরে এথেন্সের আদালত ভুল স্বীকার করেছে। বঙ্গবন্ধুও একদিন আবার ফিরে আসবে। এ ইতিহাস মুছে ফেলার নয়, এ ইতিহাস মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যকে অসম্মান কোরে, বাংলার স্বাধীনতাকে অসম্মান কোরে, ধর্মীয় সম্প্রীতিকে অসম্মান কোরে সমৃদ্ধশালী হওয়া সম্ভব নয়। ফলে ৫ই আগস্টের তথাকথিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার পর বাংলার স্বাধীনতা, বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য, ধর্মীয় সম্প্রীতিকে অসম্মান করার যে মচ্ছব চলছে, আমি তা দেখতে চাই না। এ তাণ্ডবনৃত্য, ইতিহাস ধ্বংসের প্রলয় নাচন। এমন দৃশ্য দেখে ভালো থাকার পরিবর্তে, সাতনরি হার গলায় দিয়ে আনন্দে ঢলে বেড়ানোর পরিবর্তে, আমি গলায় রশি দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে চিরতরে ঢলে পড়তে চাই । এমন অসুর নৃত্য দেখার চেয়ে নিথর দেহের সেই মুদিত আঁখি অনেক ভাগ্যবান।
এই দেশের লাল-সবুজ পতাকার লাল বৃত্তে আমার বাবার রক্ত-
আমাকে হত্যা করো।
এই দেশের লাল-সবুজ পতাকার সবুজ জমিনে আমার বাবার স্বপ্ন-
আমাকে হত্যা করো।
লেখক:

অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান
গল্পকার, লেখক ও গবেষক