১৮৯৩ সালের এপ্রিল মাসে এক তরুণ গুজরাটি কাঠিয়াওয়ারি উকিল দক্ষিণ আফ্রিকায় ডারবানে পৌঁছলেন। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেছেন কিন্তু মুখচোরা স্বভাবের কারণে ভারতে প্র্যাকটিস জমেনি। আফ্রিকা নিবাসী ব্যবসায়ী, দাদা আবদুল্লা তাঁকে উকিল নিয়োগ করেছেন। কিন্তু তাঁর মূল কাজ আসলে দোভাষীর, আইনি বিষয়গুলি ইংরেজি থেকে কাঠিয়াওয়ারি এবং কাঠিয়াওয়ারি থেকে ইংরেজিতে ব্যাখ্যা করা।
সে দেশে তখন জাতি বিদ্বেষ তীব্র, ভারতীয় অভিবাসীরা তার শিকার, তার আঁচ লাগে এই যুবকের গায়েও। প্রিটোরিয়া যাওয়ার পথে প্রথম শ্রেনীর টিকিট থাকা সত্ত্বেও তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হল পিটারমারিটজবারগে। সারারাত ওয়েটিং রুমে কাটালেন যে তরুণ তিনি কিছুকালের মধ্যেই হয়ে উঠবেন আফ্রিকা নিবাসী ভারতীয়দের প্রতিনিধি। তিনি গান্ধী, নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা, যা সত্যাগ্রহকে হাতিয়ার করে জাতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
২১ বছর পরে সেদিনের সেই তরুণ যখন ভারতে এসে পৌঁছচ্ছেন, তখন তিনি গান্ধী, যার সক্রিয় অসহযোগ ও সত্যাগ্রহ সারা পৃথিবীকে এক নতুন প্রতিবাদ, প্রতিরোধের পথ দেখাচ্ছে, অহিংসার মন্ত্র প্রয়োগ করে দেখাচ্ছে এক পরিবর্তিত ধারা। ভারতে ফিরে কংগ্রেসের ১৯১৫’র অধিবেশনের পর গান্ধী চম্পারণের নীলচাষী, শহুরে ও গ্রামীণ খেতমজুরদের নিয়ে অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুললেন। এই প্রথম কংগ্রেস বড় স্তরের অহিংস অসহযোগ গণ আন্দোলন গড়ে তুলল, যেখানে শুধু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষ নন, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করল। গান্ধী গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে প্রায় ১০০০০ চাষী ও খেতমজুরের বয়ান নথিভুক্ত করলেন, নতুন নেতার পথে ১৯২১-এ আরম্ভ হল অসহযোগ আন্দোলন। তাঁর পরনে সাধারণ চাষীর পরিধান, খাটো ধুতি, চাদর। গান্ধী হয়ে উঠলেন গান্ধী মহারাজ। এই দিনগুলিতে তাঁর প্রিয় স্লোগান ‘বন্দে মাতরম’, ‘আল্লাহু আকবর’। যাকে তিনি বলেন হৃদয় মথিত করা আবেগের বহিঃপ্রকাশ।
তিনি মনে মনে জানতেন অহিংস সত্যাগ্রহীদের ওপর পুলিশি নিপীড়ন সারা বিশ্বে এমনকি বিলেতেও জনমানসে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে, শুধু তাই নয় সাধারণ পুলিশ বাহিনীকে ‘ডিমরালাইজ’ করে দেবে। অতএব এরপর সারাজীবন তিনি স্থিত থাকবেন এই অহিংসা ও সত্যের পথে, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে বিপুল জনগণের জাগ্রত আত্মশক্তির ওপরে তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন।
মাঝখানের ঘটনাবহুল সময় পার করে, বিখ্যাত লবণ সত্যাগ্রহ ও ডাণ্ডি মার্চ পার হয়ে, ভারত ছাড়ো আন্দোলন পার করে যখন স্বাধীনতা এল, দ্বিধাবিভক্ত, রক্তস্নাত, দাঙ্গাবিদ্ধস্ত দুটি দেশের স্বাধীনতা, তখন ১৫ অগাস্ট গান্ধীজি দিল্লির উৎসব থেকে বহুদূরে কলকাতায়। এর আগে তিনি ঘুরে এসেছেন নোয়াখালী, দেখে এসেছেন কিভাবে ধর্মের নামে যারা একসঙ্গে পাশাপাশি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল, তাঁরা পরস্পরের টুঁটি টিপে ধরেছে, দেখে এসেছেন রক্তস্রোত, আর দেখে এসেছেন উদ্বাস্তু, ছিন্নমূল মানুষের স্রোত। কলকাতায় দাঙ্গা থামানোর জন্য বেলেঘাটায় আশ্রয় নিয়েছেন মুসলিম এক ভদ্রলোকের বাড়িতে, সুরাবরদিকে পাশে নিয়ে অনশন করেছেন, সাময়িকভাবে থেমেছে হিংসা। তাঁর প্রার্থনা সভায় একই সঙ্গে উড়েছে দুই নবীন দেশের পতাকা।
গান্ধী বলেছেন,
পাকিস্তানের কাছে, উপমহাদেশের কাছে ভারতকে প্রমাণ করতে হবে যে ধর্মের কারণে ভারতে কোন মানুষ বিপন্ন হবে না, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষালয় ও ধর্মস্থান গুলি সুরক্ষিত থাকবে।
মৃতের শহর দিল্লিতে পৌঁছচ্ছেন গান্ধী, আবারও অনশন শুরু করছেন। ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে অসহায় প্রায় একাকী গান্ধী আবারও বলছেন,
ধর্মের নামে হানাহানি কোন ধর্মেই মান্য নয়, ঈশ্বর মানবিকতার পক্ষে। দুটি দেশকে বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলতে হবে নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
পাশাপাশি চলেছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আর এস এসের বিক্ষোভ। কিন্তু দাঙ্গার আগুন অনেক শান্ত। ১৯৪৮ এর সংঘর্ষ বন্ধ হয়েছে। ১২ জুন অনশন ভঙ্গ করলেন গান্ধীজি, তিনি কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, পরিকল্পনা করছেন কাশ্মীর যাত্রার, বলছেন, সেখানকার অধিবাসীরাই স্থির করবেন কোন দেশের অংশ হবেন তাঁরা। বিক্ষোভ চলছে তাঁর প্রার্থনা সভার বাইরে, যেখানে একই মঞ্চে পড়া হচ্ছে গীতা, কোরআন, গ্রন্থসাহেব। আর তার পরেই ৩০ জুন তাঁর বুকে বিদ্ধ হচ্ছে তিনটি বুলেট। অহিংসার অনন্তযাত্রীর যাত্রা শেষ হয় না তবু, কারণ এখনও রাত তমসাচ্ছন্ন, তাঁর কথাগুলির অনুরনণ থেকে যায় আমাদের মনে।
বাঙালীয়ানা/এজে