কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড: কানের সুরক্ষা না চিলের পেছনে দৌড় – করণীয় কি?

Comments

। লুৎফুল হোসেন ।

বর্ষা পেরিয়ে শরৎ গড়াতে থাকলেই এদেশে যত্রযত্র আগুন লাগার একটা প্রাদুর্ভাব যুগ যুগ ধরে দৃশ্যমান হয়ে আসছে। আগে গ্রামগঞ্জের আবহে খোলা হাওয়ার তোড়জোড় আর বর্ষার পর শুকনো গাছ-পাতার প্রতুলতা, অগ্নিনির্বাপণী ব্যবস্থা ও সুরক্ষা অবকাঠামোর অপ্রতুলতা – এসবই এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্তরণের ফলে আজ সেসবের অনেক উন্নয়ন ঘটলেও শহুরে বাতাস হাতড়ে খুঁজে ফিরবার মতো ঘনবসতিময় প্রতিবেশেও অগ্নিকাণ্ডের প্রাদুর্ভাব আর ভয়াবহতা আমাদের পিছু ছাড়ছে না, বরং আরো ভয়াবহ রকম জাঁকিয়ে বসেছে। একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা আমাদের স্তব্ধ করে দিয়ে যাচ্ছে ফি-বছর।

গত কিছু দিনে দেশে গড়ে প্রতিদিনই ঘটেছে ভয়াবহ অনেকগুলো অগ্নিকাণ্ড। প্রাণের ক্ষতি মোকাবেলায় কিছুটা উত্তরণ আমাদের ঘটলেও অগ্নিকাণ্ড ঘটবার প্রাদুর্ভাবটি মোকাবেলা করতে এখনও আমরা যেন পুরোপুরি ব্যর্থ। অগ্নিনির্বাপণে প্রতিবারই আগুন মানুষকে হারিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ইপিজেড এর অত্যাধুনিক সুযোগসুবিধা এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে সচল একটা রপ্তানিমুখি কারখানার সাততলার উপরে সূত্রপাত হওয়া আগুন আমরা নেভাতে পারিনি। পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে গোটা কারখানাটি।

গতকাল, ১৮ই অক্টোবর, দুপুর সোয়া দুইটায় আগুন লেগেছিল ঢাকায় দেশের বৃহত্তম, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে। বিমানবন্দরের আট নম্বর গেটের উত্তর পাশে কুরিয়ার ওয়্যারহাউজের পেছনে স্কাই ক্যাপট্যাল এয়ারলাইনসের ওয়ার্কশপ থেকে এই আগুনের সূত্রপাত বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়। অভ্যন্তরীণ অর্থাৎ দেশের ভিতর বিবিধ কার্গো ক্যারি করার এয়ারলাইন এটি। এদের জন্য নির্ধারিত চত্ত্বরে সূত্রপাত হওয়া আগুনটি দেড় ঘণ্টায় পাশের কুরিয়ার ওয়্যারহাউজে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তা ছড়ায় পাশের ডেঞ্জারাস গুডস ওয়্যারহাউসে। সেখান থেকে পাশের বণ্ডেড গুডস ওয়্যারহাউজে। তারপর সবার উত্তরে কমার্শিয়াল এণ্ড ট্যাক্সেবল গুডস ওয়্যারহাউসে। সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর রাত নয়টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে, বলা যায় পুড়ে ক্ষ্যান্ত হওয়ার পর। ততক্ষণে গোটা ইমপোর্ট ওয়্যারহাউজে আদৌ কোনো মালামাল সুরক্ষিত আছে এমনটা ভাববার অবকাশ আর অবশিষ্ট নেই।

পয়ত্রিশটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট এই আগুন নেভাতে অংশ নেয়। শুরুতে অংশ নেয় সিভিল এভিয়েশনের নিজস্ব দুটি ফায়ার স্টেশনের টিম। তাদের পরপরই বিমানবন্দরের বিভিন্ন এভিয়েশনের অগ্নি নির্বাপণী ইউনিট এবং সরঞ্জামও আগুন নেভাতে সচেষ্ট হয়। এমনকি সেনা ও বিমান বাহিনীও তাদের সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসে। তদুপরি অগ্নিকাণ্ডটি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সদর্পে লেলিহান শিখায় পুড়িয়ে গেছে সবকিছু।

শুক্র ও শনিবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাস্টমস কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকে। শনিবারে কিছু সময়ের জন্য কাস্টমস কর্মকাণ্ড সচল হলেও তা দুপুর দুইটায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে এক্সটার্নাল একটিভিটি বন্ধ থাকলেও বিমানবন্দরে ইন্টার্নাল একটিভিটি চব্বিশ ঘণ্টা চলমান থাকে, তা গতকালও সচল ছিল। অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়লে শুরু দিকেই স্বাভাবিকভাবে সকল প্রকার বিমান ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। তাই সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রথম চেষ্টা ছিল বিমানবন্দর দ্রুত সচল করা। প্রাথমিকভাবে সন্ধ্যা ছ’টায় সচল করার লক্ষ্যে ঘোষণা দিলেও অবশেষে বিমান চলাচল বন্ধ হবার ছয় ঘণ্টা পর রাত ন’টায় তা সম্ভব হয়। সচল হবার পর রাত ন’টা ছয় মিনিটে প্রথম বিমানটি বিমানবন্দর ছেড়ে যায়। ইতিমধ্যে অনেকগুলো ফ্লাইট চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে, ঢাকায় নামতে না পেরে। একটি ফ্লাইট কলকাতা বিমানবন্দরেও জরুরি অবতরণ করে।

গোটা ঘটনাকে ঘিরে এবং একের পর এক বড়ো বড়ো অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে নাশকতার প্রশ্ন সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। সোশাল ও মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতেও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন অনেকে। ঘটনা ও দুর্ঘটনার জেরে হাজারো প্রশ্ন মানুষের মনে আসবেই। এটা স্বাভাবিক। তাছাড়া একের পর এক দুর্ঘটনায় আগুনের কাছে আমাদের সকল প্রযুক্তি ও চেষ্টার হেরে যাওয়া দেখতে দেখতে মানুষের মনে প্রশ্নের এবং সন্দেহের উদ্রেক স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়াবে, এটা অস্বাভাবিক নয়। সাত ঘণ্টা পর বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং এর পেছনে সাফল্য ব্যর্থতা ঘিরে লাগাতার অগুন্তি বিশ্লেষণ আর ব্যবচ্ছেদ হওয়া স্বাভাবিক, আর তা চলতেও থাকবে মানুষের মনোযোগ অন্য কোনো দিকে ব্যস্ত না হয়ে পড়া অব্দি।

কিন্তু বারে বারে আগুনের কাছে হেরে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রশ্ন ও করণীয়ের পাশাপাশি দেশের মূল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডে এমন ভয়াবয় ক্ষয়ক্ষতির পেছনে কি কি ভুল, সক্ষমতার অভাব, সমন্বয় সংকট বা ঘাটতি, অবহেলা ও অসঙ্গতি ছিল তা খতিয়ে দেখা ভীষণ জরুরি। এই অগ্নিকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ক্ষতি মালামাল পুড়ে যাওয়া এবং অবকাঠামোগত ক্ষতি। কিন্তু এর পরোক্ষ ক্ষতি অপরিমেয়। আমদানিকারক যাদের মালামাল পুড়েছে বা নষ্ট হয়েছে, তাদেরকে যদি মালামালের ক্ষয়ক্ষতির সমানুপাতে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ও তথাপি তাদের আরো বহুবিধ ক্ষয়ক্ষতি রয়ে যাবে – উৎপাদন ব্যহত হওয়া, রপ্তানি ব্যহত বা বাতিল হওয়া থেকে শুরু করে এর হিসাব অনেক দূর বিস্তৃত। ফরোয়ার্ড লিঙ্কেজ এবং ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজে আরো অনেক স্টেকহোল্ডার এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সর্বোপরি এই অগ্নি নির্বাপণ ব্যর্থতা এভিয়েশন ইণ্ডাস্ট্রিতে এই বিমানবন্দরের এবং এর পরিচালনায় জড়িত সংস্থাসমূহের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। উল্লেখযোগ্যভাবে এই কোনো প্রাণহানি না ঘটলেও প্রবাসীদের একাধিক মরদেহ কফিনসহ ভস্মীভূত হয়েছে গতকালের এই অগ্নিকাণ্ডে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি যাদেরকে স্বজনের মৃতদেহটি অক্ষত পাওয়া থেকে বঞ্চিত করলো, তাদের এ ক্ষতি তো নিঃসন্দেহে অপূরণীয়।

মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শতভাগ নম্বর অর্জন করে প্রত্যয়ন পায়। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্ট (ডিএফটি) এ মূল্যায়নটি করেছে। এই মূল্যায়নে অগ্নি নির্বাপণ তথা নিরাপত্তার বিষয়টি অতি অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তার মানে প্রত্যয়ন পাওয়ার মতো ব্যবস্থা উপস্থিত ছিল। ঘটনাস্থলের ৫০ থেকে ১০০ মিটার দূরত্বে সিভিল এভিয়েশনের দুটি অগ্নি নির্বাপণী ইউনিটও আছে। দুর্ঘটনা ঘটার আধা ঘণ্টার ভিতর (বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী এবং মতান্তরে যদিও সময়ের তারতম্য আছে এবং তা অন্তত ১৫ মিনিট) ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট উপস্থিত হতে শুরু করে এবং একে একে আরো ইউনিট যোগ দিতে থাকে। তথাপি প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য ও মতামত অনুযায়ী অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হলে তা নির্বাপণে শুরুতে কিছু না কিছু অবহেলা ছিল। নিরাপত্তার প্রশ্নে এমনকি ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ইউনিটকে আট নম্বর গেটে বেশ কিছু সময় অপেক্ষমাণ থাকতে হয়েছে। ভিতরে (কুরিয়ার ওয়্যারহাউজেও) বিস্ফোরক দ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্র আছে এমন যুক্তিতে বিমানবন্দরে সংশ্লিষত লোকজনকে অগ্নি নির্বাপণে এগিয়ে আসতে বাধা প্রদান করা হয়েছে। প্রথমদিকে বেশ কিছু সময় ফায়ার সার্ভিস বাইরে থেকে দেয়ালে ও ছাদে পানি দিয়েছে অকার্যকরভাবে, কেননা তারা নিরাপত্তার প্রশ্নে অনুমতির অভাবে ভিতরে প্রবেশ করতে পারেনি। অথচ আগুনের সূত্রপাত এবং নেভানোর কার্যকর অবস্থান ছিল কমপ্লেক্সের ভেতরের দিকে। উল্লেখ্য অতীতেও এমন অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল যা যথাসময়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারায় আগুন এভাবে ছড়িয়ে গিয়ে এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু এবার পারলো। অথচ অতীতের চেয়ে আমাদের প্রযুক্তিগত এবং অগ্নি নির্বাপণের সক্ষমতা নিঃসন্দেহে বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার কথা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে অনুচ্চারিত প্রতিবন্ধকতাগুলো তাহলে কি ছিল যা আমাদের সক্ষমতাকে পকেটবন্দি করে রেখে ঘটনাটা এমন ভয়াবহ পরিণতিতে শেষ করলো। প্রথমতঃ যে প্রসঙ্গটি আসে তা হলো এই যে, বিমানবন্দরটি চলে একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে। জায়গার মালিক সিভিল এভিয়েশন, কর্তৃপক্ষ হলো বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, এখানে কাজ করে দেশি-বিদেশি অসংখ্য এয়ারলাইনস, অগণিত ক্লিয়ারিং ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট, অগণিত ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট; আর গ্রাউণ্ড হ্যাণ্ডেলিং এজেন্ট অর্থাৎ বিমানবন্দরের অপারেটর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, আবার আমদানিকৃত মালামালের অধিকারিক কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

সমন্বয়ের অভাব ঘিরে বিবিধ সংকট এই বিমানবন্দরে একটা কয়েক দশকের পুরোনো সমস্যা। জবাবদিহিতার অভাব এবং ট্রেড ইউনিয়নের চাপ এই বিমানবন্দরটিকে বিশ্বে সর্বাধিক মানবসম্পদ ব্যবহারকারী বিমানবন্দর (বিমান ও মানুষ অনুপাতে এভিয়েশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী) হিসেবে পরিচিতি দিয়ে এসেছে কয়েক যুগ আগে থেকেই। তথাপি এণ্ড কনজিউমারের কাছ থেকে উচ্চ হারে অপারেটিং কস্ট নেয়ার বিপরীতে মালামাল মিসহ্যাণ্ডলিং হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবার ঘটনা এখানে নৈমিত্তিক। যা গত এক দশকে অনেকটা সামলে এসেছে। তার আগে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল মালামাল চুরি যাওয়ার বিপদ। সেটা অবশ্য অনেকটাই সামলে এনেছেন কর্তৃপক্ষ। তবে অবকাঠামোগত সক্ষমতার অভাবে খোলা আকাশের নিচে মালামাল পড়ে থাকা ঢাকার এই বিমানবন্দরে একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা। অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত ঘাটতির পাশাপাশি ত্রিমুখী কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রিক সংকটও হয়তো সকল প্রকার সমস্যা ও সংকটে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রথম ও প্রধান অন্তরায় এখানে। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের মতো বিষয়ে এমন বিষয়ের প্রভাব কিছুমাত্রও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সম্প্রতি প্রত্যয়ন পেলেও এখানে কি স্মোক ডিটেক্টর, ফায়ার ডিটেক্টর, অটো ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম এসব যথাযথ মানে এবং পরিমাণে ছিল? যা যতটুকু ছিল তা কি আদৌ কার্যকর ছিল? গতকাল কিছু কি কাজে এসেছিল? আগ্নিকাণ্ডে নির্বাপণের জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে স্প্রিঙ্কলার ও ডিপ টিউবওয়েল – এসব কি ছিল? প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে তাদের বাহনে মজুদ পানি স্প্রে করার পর পানির জন্য বসে ছিল। পানির জোগান দিতে এরকম স্থাপনায় নিজস্ব ডিপ্ টিউবওয়েল থাকা প্রয়োজন অনেকগুলো। নামকাওয়াস্তে টারমাকে প্লেনে আগুন নেভানোর ড্রিল করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করে পূর্ণাঙ্গ ফায়ার ড্রিল আরো জোরালোভাবে হওয়া প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নে সকল সক্ষমতা অবকাঠামোয় জোগান দেয়ার পাশাপাশি সকল স্টেকহোল্ডারদের সবাইকে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সুপরিচিত করে সকলকে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা মোকাবেলায় সক্ষম করে তোলার প্রয়োজনকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এরকম ওয়্যারহাউজের কোন অংশে কি ধরণের পণ্য থাকছে এবং সে অনুযায়ী কোন অংশে কি ধরণের অগ্নি নির্বাপণী ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন তা যথাযথ প্রযুক্তিগত বিবেচনায় নিশ্চিত করা এবং সেইসব প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর তথ্য ও ব্যবহার সক্ষমতায় সঠিক লোকদের প্রশিক্ষিত রাখার বিকল্প নেই। তেমনটা থাকলে এরকম ভয়াবহতার অভিজ্ঞতা আমাদের নিতে হতো না। কেননা প্রত্যয়ন পাওয়ার চেয়ে বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ সত্যিকারের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা। এতসবের বাইরে কেউ কেউ আবার বলছে, বিমানবন্দর পরিচালনার ভার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যাস্ত করার অভিপ্রায় বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যটিও এমন অগ্নিকাণ্ডের পেছনের হেয়ু হতে পারে।

তবু কথা এই যে, চিলের পেছনে ছোটার চেয়ে কানের সুরক্ষা নিশ্ছিদ্র নিশ্চিত করাই এমন দুর্ঘটনার উত্তম প্রতিকার। সক্ষমতা, সতর্কতা ও সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের সকলকে প্রশিক্ষিত করে সর্বাঙ্গীন মোকাবেলা সামর্থ্য অর্জন এবং তা বজায় রাখার জন্য বছরে অন্তত দুইবার সবার অংশগ্রহণে ফায়ার ড্রিল করবার মধ্য দিয়ে সাধারণের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষেরও চর্চা হবে, চর্চায় থাকবে, সত্যিকারের দুর্ঘটনায় তা মোকাবেলা করার দ্রুত পদক্ষেপ ও কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টা। তেমনটা সত্যি সত্যি বিদ্যমান থাকলে এর হেতু স্রেফ দুর্ঘটনা হোক আর ষড়যন্ত্র হোক, কার্যত সবই সামলে যাবে। নতুবা একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত অবস্থায় তদন্ত প্রতিবেদনের জটিল কসরতে এরকম দুর্ঘটনা মোকাবেলার কিচ্ছুটি কোনোকালে হবে না।

তথাপি আশাবাদ, এবারের তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি আগামীতে এমন ঘটনা আর কখনো না হবার মতো নিশ্ছিদ্র নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণে করণীয় সকল নির্দেশনাগুলো পদক্ষেপ, প্রস্তাবনা ও পরামর্শ হিসেবে আসবে গতকাল রাতে গঠিত হওয়া উভয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। কেননা ভুলের অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ার উপায় শুধু অতীতের ভুলগুলো চিহ্নিত করা নয়, তা প্রতিরোধে ও নির্মূলে প্রয়োজনীয় কার্যকর প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ সুনিশ্চিত ভাবে চিহ্নিত করা, পরামর্শ প্রস্তাবনায় ও প্রয়োগে আনা। সেইসাথে আশা করছি, শুধু অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া ইমপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্সের পাশাপাশি গোটা বিমানবন্দরের সকল অংশ ঘিরে একটা চুলচেরা নীরিক্ষা ও প্রতিবেদন আসুক এবং তাতে এই স্থাপনা ও সেবাসমূহের বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞদের পাশাপাশি অগ্নি ও অন্যান্য বিপর্যয় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ জনরাও যুক্ত হোক।

১৯ অক্টোবর ২০২৫

লেখক:

Lutful Hossain
লুৎফুল হোসেন
কথাসাহিত্যিক, সাহিত্য সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

* বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট