চিঠিপত্রে আত্মকথার প্রতিক্রিয়া

Comments

দেশ পত্রিকায় ‘সরগমের নিখাদ ‘ শিরোনামে শচীন দেব বর্মন নিয়মিতভাবে তাঁর আত্মকথা প্রকাশ করেন। এই নিয়মিত প্রকাশে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনের ঘটনা প্রবাহ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্যক্তি সেই পত্রিকাতেই এই আত্মকথা পড়ার প্রতিক্রিয়া জানান, আলোচনা করেন। সেই সব চিঠিপত্রের কয়েকটি নিয়ে বাঙালীয়ানার এই প্রকাশ।

=১=

শ্রীশচীন দেববর্মণের আত্মকথা ‘সরগমের নিখাদ’ প্রকাশ করার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন। রচনার মুখবন্ধ হিসেবে যে অন্তরঙ্গ আলোচনা শ্রীসলিল ঘোষ করেছেন সেটি তথ্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ নয়। অবশ্য এটা শ্রীবর্মণের স্মৃতিবিভ্রমের জন্যও হতে পারে। শ্রীদেববর্মণ এক জায়গায় বলেছেন, যতটুকু স্মরণ আছে, বাংলা ফিল্মে নয়টি ও হিন্দী ছবিতে সাতখানা মোট ষোলটি গান আমি আজ পর্যন্ত করেছি। হিন্দী ছবির তালিকাটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের, তাই মনে হয়, তালিকাটি সঠিক। বাংলা ফিল্মের নাম করেছেন চারটি। মধু বসুর ‘সেলিমা’ আর একটি চিত্রে (?) ওরে সুজন নাইয়া, ‘নন্দিনী’ আর ‘অভয়ের বিয়ে’। শ্রীদেববর্মণের কথা অনুসারে বাকি থাকে পাঁচটি। আমার এছাড়া কতকগুলি গানের কথা মনে পড়ছে – সেগুলি এই প্রসঙ্গে জানাই। ‘ছদ্মবেশী’ ছবিতে ‘বন্দর ছাড়ো যাত্রীরা সবে’, ‘জনম দুখিনী সীতা’ (সম্ভবত ভারতলক্ষ্মী পিকচার্সের ‘গৃহলক্ষ্মী’) আর একটি অপূর্ব গান বোধহয় শিল্পী গেয়েছিলেন ‘প্রতিশোধ’ ছবিতে – ‘কী মায়া লাগল চোখে সকালবেলায়’। আমার তালিকা সঠিক হলেও শিল্পীর কথামত বাকি থাকে আর দুটি – সে দুটি কি?

শ্রীসলিল ঘোষ শিল্পবিচারের জন্য শার্ঙ্গদেবের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন – উদ্ধৃতিটি শ্রীদেববর্মণের সৃষ্টির স্বরূপ নির্ধারণে নিশ্চয়ই যথাযোগ্য বিচার। কিন্তু আরও কিছু আছে যার জন্য এই সময়োপযোগী প্রকাশনার কৃতিত্ব আপনারা দাবি করতে পারেন। প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ-অতুলপ্রসাদ-দ্বিজেন্দ্রলাল-নজরুলের পরে এবং এদের সৃষ্টির শেষ পর্বে শ্রীদেববর্মণের প্রতিভার স্ফূর্তি। আরও উল্লেখযোগ্য – এই সৃষ্টি যৌথভাবেই স্বকীয়তার পরিচয় দেয়। পরবর্তীকালে কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই যৌথ সৃষ্টি চলে আসছে অর্থাৎ গীতিকার ও সুরকার ভিন্ন ব্যক্তি – কিন্তু সার্থকতার ছাপ এখনও খুব সামান্য। এই আলোচনায় এই সমস্যার মূলে কিছু সূত্র পাওয়া যাবে – যাতে এই সমস্যা সাফল্যের অন্তরায় না হয় তার শিক্ষা পাওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শ্রীদেববর্মণ এখনও প্রচন্ডভাবে সৃষ্টিশীল। আরও বিস্ময়কর তাৎপর্য হল, ৬৩ বছর বয়সেও যিনি ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’, ‘ও জানি ভোমরা কেন’ অথবা ‘ঘুম ভুলেছি নিঝুম এ নিশীথে’ সৃষ্টি করতে পারেন – তাতেই বোঝা যায় – “স্বর্গসভার মহাঙ্গন” থেকে ‘মাঝে মাঝে রঙীন ফুলের আলিম্পন’ তাঁকে বিচলিত করে বেশী। তাই তাঁর কাছে আমাদের আশাও বেশী।

দেবাশিস দাশগুপ্ত
কলিকাতা – ৩৩
দেশ: ৯ ফাল্গুন ১৩৭৬

=২=

গত ২১ শে ফেব্রুয়ারী ‘দেশ’ পত্রিকার আলোচনা-বিভাগে প্রকাশিত শ্রীদেবাশিস দাশগুপ্তের চিঠিখানি পড়লাম। ‘সরগমের নিখাদ’ – শীর্ষক শ্রীশচীন দেববর্মণের স্মৃতিকথায় উল্লেখিত প্রসঙ্গে বাংলা ছায়াছবিতে শ্রীবর্মণের স্বকন্ঠে গীত গানের সংখ্যা নিরূপণে শ্রীদাশগুপ্ত দুটি গানের মীমাংসা করতে পারেন নি বলে জানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি গানের সূত্র তিনি আমার এই চিঠি মারফৎ পেতে পারেন আশা করি।

যতদূর মনে পড়ছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রজনী’ অবলম্বনে গৃহীত বম্বে টকীজের ‘সমর’ কথাচিত্রে শ্রীদেববর্মণের স্বকন্ঠে গীত একটি গান ছিল, যার প্রথম ক’টি কথা ছিল এই রকম:

“সুন্দরী লো, সুন্দরী,

দল বেঁধে আয় গান করি,

আজ বাদে কাল যদি মরি

আর না দাগা দিস…..

ইত্যাদি ইত্যাদি”।

কৈশোরও নয়, নিতান্ত বাল্য বয়সে দেখা ঐ বাণীচিত্রের এই গানখানির সুর ও স্বর স্মৃতিতে আজও অম্লান। স্মৃতি যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করে, গানটি শ্রীদেববর্মণেরই স্বকন্ঠে গীত ব’লে আমার বিশ্বাস।

মিহিরকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
কলি ৩১
দেশ: ২৩ ফাল্গুন ১৩৭৬

=৩=

শ্রীশচীনদেব বর্মণের চলচ্চিত্রে গান করা সম্বন্ধে শ্রীদেবাশিস দাশগুপ্তের চিঠি (দেশ – ২১/২/৭০) পড়লাম। শচীনকর্তার জীবন সম্বন্ধে সঙ্গীত-রসিক পাঠক ও তার অনুরাগীরা এর মধ্যেই আমার নিকট নানা তথ্য পাঠিয়েছেন এবং প্রচুর কৌতূহল প্রকাশ করেছেন – যাতে খুবই আনন্দ বোধ করছি। বিভিন্ন তথ্যদানকালে শ্রীদেববর্মণের স্মৃতিবিভ্রম ঘটা অসম্ভব নয়। এ সম্পর্কে শান্তিনিকেতন থেকে বন্ধুবর শ্রীসুখময় মুখোপাধ্যায় যে সব তথ্য পাঠিয়েছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, শচীনদা শুধু ৯টি কেন, ১৩টি গান গেয়েছিলেন ১০টি বাংলা চলচ্চিত্রে। সেগুলি হল: ১৯৩৫ সনে মধু বসু পরিচালিত “সেলিমা” চিত্রে ভিখারীর কন্ঠে, ভিখারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ১টি গান গেয়েছিলেন; ১৯৪০ সনে সুকুমার দাশগুপ্ত পরিচালিত “রাজকুমারের নির্বাসন” চিত্রে ১টি গান (বাঁশুরিয়া রে কোথায় শিখেছো বাঁশি বাজান); ১৯৪১ সনে সুশীল মজুমদার পরিচালিত “প্রতিশোধ” চিত্রে ২টি গান (কি মায়া লাগল চোখে এবং অবোধ নেয়ে উজান বাইয়া যাও); সুকুমার দাশগুপ্ত পরিচালিত “এপার ওপার” চিত্রে ১টি গান (উদাসী রে বিদেশী রে ফিরে তুমি যাও); এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত “নন্দিনী” চিত্রে ১টি গান (চোখ গেল চোখ গেল কেন ডাকিস রে); ১৯৪২ সনে প্রফুল্ল রায় পরিচালিত “নারী” চিত্রে ১টি গান (কে যেন কাঁদিছে আকাশ ভুবনময়); গুণময় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত “জীবনসঙ্গিনী” চিত্রে ২টি গান (বাংলার মেয়ে বাংলার তুমি ও জনমদুখিনী সীতা) এবং সুশীল মজুমদার পরিচালিত “অভয়ের বিয়ে” চিত্রে ফকিরের কন্ঠে, ফকিরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ১টি উর্দূ গান (আয়ে দিল বেতর উসে ইয়াদ কিয়ে যা); ১৯৪৪ সনে হরি ভঞ্জ পরিচালিত “মাটির ঘর” চিত্রে ২টি গান (শ্যামরূপ ধরিয়া এসেছে মরণ ও কাল সাগরের মরণ দোলায়) এবং অজয় ভট্টাচার্য পরিচালিত “ছদ্মবেশী” চিত্রে ১টি গান (বন্দর ছাড় যাত্রীরা সবে)।

উপযুক্ত হিসাব অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে, শচীনদা ১০টি বাংলা চলচ্চিত্রে ১৩টি গান গেয়েছিলেন।

এছাড়া সুখময়বাবু আরও জানিয়েছেন যে, শচীনদা ৫টি বাংলা ছবিতে সুরারোপ করেছিলেন (যদিও তিনি – সে যুগে বাংলা ছবিতে তাঁকে কেউ সঙ্গীত পরিচালনার ভার দেয়নি বলে আমার নিকট আগে অভিমান প্রকাশ করেছিলেন)। সেই ছবিগুলি হল: ‘প্রতিশোধ’, ‘অভয়ের বিয়ে’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘মাটির ঘর’ ও ‘প্রতিকার’ (পরিচালক ছবি বিশ্বাস)। কারো কারো মতে ‘রাজকুমারের নির্বাসন’ ছবিরও সঙ্গীত পরিচালনা করেন শচীনদা। এটা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

এছাড়া শচীনদেব বর্মণ বলেছেন, “নন্দিনী” চিত্রে কাজী নজরুলের সুরে ‘চোখ গেল চোখ গেল’ গানটি ছাড়া অন্য কারো সুরে তিনি কখনো চলচ্চিত্রে গান করেননি। কিন্তু “জীবনসঙ্গিনী” চিত্রে দুটি গান তিনি গেয়েছিলেন (বাংলার মেয়ে ও জনমদুখিনী সীতা), তার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন শ্রীহিমাংশু দত্ত সুরসাগর, ওই গান দুটির সুর বোধ হয় তাঁরই দেওয়া। শচীনকর্তা হিমাংশু দত্তর সুরে অনেক গানই গেয়েছেন, চলচ্চিত্রের বাইরে।

আরও একটা কথা শচীনকর্তা বলেছেন, তাঁর কোন গান অন্য অভিনেতার মুখে প্লে-ব্যাক হয়নি। কিন্তু “রাজকুমারের নির্বাসন” ছবির ‘বাঁশুরিয়া রে’ ও “জীবনসঙ্গিনীর”র ‘জনমদুখিনী সীতা’ প্লে-ব্যাক হয়েছিল। কলকাতায় শচীন দেববর্মণ সুর-সংযোজিত শেষ ছবি “প্রতিকার” (১৯৪৪)। বোম্বাইয়ে তাঁর সুরে সংযোজিত প্রথম ছবি “বেগম” (পরিচালনা সুশীল মজুমদার)। শচীনদার মতে, ফিল্মিস্তানের হিন্দী ছবি “শিকারী” -তেই বম্বেতে তাঁর প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা।

হিন্দী ছবিতে শচীনদা স্বকন্ঠে যে গানগুলি গেয়েছেন সেগুলি হল: ১৯৪৬ সনে ফিল্মিস্তানের “আটদিন” (Eight Days) ছবিতে ‘উমীদ ভরা পঞ্ছি থা খোঁজ রহা সজনী’; বিমল রায়ের “সুজাতা” (১৯৫৬) ছবিতে ‘সুনো মেরে বন্ধু রে’ ও “বন্দিনী” (১৯৬০) ছবিতে ‘ওহী কৌন হায় তেরা মুসাফির’; শক্তি ফিল্মসের “আরাধনা” (১৯৬৯) ছবিতে ‘কাহেকো রোয়ে – সফল হোগি তেরা আরাধনা’; রালহান প্রোডাকশনের “তালাশ” (১৯৬৯) ছবিতে ‘মেরী দুনিয়া হ্যায় মা তেরী আঁচলমে’ এবং নবকেতনের “প্রেমপূজারী” (১৯৭০) ছবিতে ‘প্রেম কে পূজারী হ্যায় ম্যয় রস কে ভিখারী’।

এ বিষয়ে পাঠক আরও সব তথ্য জানালে বাধিত হব।

সলিল ঘোষ
বোম্বাই – ১৪
দেশ: ৩০ ফাল্গুন ১৩৭৬

আরও পড়ুন: রাজবাড়ির ঐতিহ্য ছিন্নকারী শচীন

=৪=

প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ শ্রীযুক্ত শচীনদেব বর্মণ সম্বন্ধে শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত সলিল ঘোষ মহোদয়কে আমি কিছু তথ্য পাঠিয়েছিলাম ১৪/৩/৭০ তারিখের ‘দেশ’ – এ প্রকাশিত পত্রে সলিলদা সেগুলি উল্লেখ করেছিলেন। শচীন দেববর্মণ যাতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন ও গান গেয়েছিলেন, এমন একটি বাংলা ছবির নাম সলিলদাকে জানাতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। ছবিটির নাম ‘রাজগী’। এই ছবিতে শচীনবাবু দুটি গান গেয়েছিলেন – (১) সাজে নওলকিশোর ও (২) ওরে বন্ধুরে মনের কথা কইবার। ‘রাজকুমারের নির্বাসন’ ছবির সংগীত পরিচালকও শচীনবাবুই। ‘রাজগী’ ও ‘রাজকুমারের নির্বাসন’কে নিয়ে শচীন দেববর্মণ কর্তৃক সুর-সংযোজিত কলকাতায় তোলা বাংলা ছবির সংখ্যা দাঁড়ালো সাত। শচীনবাবু বোম্বাইতে তোলা দুটি বাংলা ছবির সুর সংযোজনা করেছিলেন – (১) বন্বে [ম্ব] টকিজের ‘সময়’ ও (২) গুরু দত্ত ফিল্মসের গৌরী (অসম্পূর্ণ)।

সলিলদা তাঁর চিঠিতে ফিল্মিস্তানের ‘আটদিন’ ছবিতে গাওয়া শচীন দেববর্মণের একটি মাত্র গানের উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ঐ ছবিতে শচীনবাবুর একাধিক গান ছিল।

২৮/২/৭০ তারিখের ‘দেশ’ – এ প্রকাশিত ‘সরগমের নিখাদ’ এর কিস্তিতে দেখি শচীনবাবু বলছেন যে, অজয় ভট্টাচার্য কলকাতায় আসার পর কেবলমাত্র তিনিই শচীনবাবুর জন্য গান রচনা করতেন। কিন্তু অজয়বাবু জীবিত ও কলকাতায় থাকার সময়ও শচীনবাবু অন্য গীতিকারের লেখা গান গেয়েছেন; দৃষ্টান্তস্বরূপ শৈলেন রায়ের লেখা বিখ্যাত ‘প্রেমের সমাধি-তীরে’ (১৯৪০ সালে রেকর্ড হয়) গানটির উল্লেখ করতে পরি। ঐ কিস্তিতেই শচীনবাবু লিখেছেন যে, “খুব সম্ভব ১৯৪৭ সাল থেকে” তিনি হিজ মাস্টার্স ভয়েস এ রেকর্ড করেছেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পরও শচীনবাবু হিন্দুস্তান রেকর্ডে সাতটি গান (রেকর্ড নং H 1231, H 1320, H 1321, H 1328, H 1340, H 1384, H 1437) বেরিয়েছে। শচীনবাবু এইচএমভি-তে যোগদান করেন ঐ সালের অনেক পরে। ৭/৩/৭০ ও ১৪/৩/৭০ তারিখের ‘দেশ’ – এ কয়েকজন পত্রলেখক শচীন দেববর্মণের ফিল্মের গান সম্বন্ধে ভুল কথা লিখেছেন। শ্রীযুক্ত দিলীপকুমার বিশ্বাস (৭/৩/৭০ এ) লিখেছেন যে, শচীনবাবু ‘মরণ তোদের ডাকে আজ’ ও ‘সাজে নওল-কিশোর চাঁদের তিলকে আজ’ এই দুটি গান ফিল্মে গেয়েছিলেন। কিন্তু ‘মরণ তোদের ডাকে আজ’ বলে শচীনবাবুর গাওয়া কোন গান নাই; দিলীপবাবু বোধহয় ‘মাটির ঘর’ ফিল্মের ‘শ্যামরূপ ধরিয়া এসেছে মরণ’ গানটির ভাষাকেই গোলমাল করে ফেলে এইভাবে দাঁড় করিয়েছেন। ‘সাজে নওল-কিশোর’ গানটি অবশ্য শচীনবাবু ‘রাজগী’ ফিল্মে গেয়েছিলেন। শ্রীযুক্ত গোপালকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (৭/৩/৭০ এ) লিখেছেন শচীনবাবু জীবনে একটি মাত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত – ‘মিলন রাতি পোহাল’ – গেয়েছিলেন কোন ফিল্মে এ কথা সর্বৈব ভুল। শচীন দেববর্মণ কর্তৃক সুর সংযোজিত ‘প্রতিকার’ ফিল্মে (ঐ ফিল্মেই গোপালবাবু কর্তৃক উল্লেখিত ‘যদিও পরীরা ভুলেও কখনও রাতে’ গানটি ছিল) ‘মিলন রাতি পোহাল’ গানটি সন্নিবিষ্ট হয়েছিল বটে, কিন্তু গানটি শচীন দেববর্মণ গান নি, গেয়েছিলেন জনৈক মহিলা শিল্পী (তখন ফিল্মের প্লে-ব্যাক আর্টিস্টদের নাম বিজ্ঞাপিত হত না) – ঐ ফিল্মের ‘ডালিয়া’ নামে এক নারীী চরিত্রের গান এটি, ঐ চরিত্রের অভিনেত্রী ছিলেন শ্রীমতী বন্দনা। শচীন দেববর্মণ জীবনে কোনদিন কোন ফিল্মে বা রেকর্ডে রবীন্দ্রসঙ্গীত গান নি। শ্রীযুক্ত মিহিরকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (১৪/৩/৭০ এ) লিখেছিলেন যে, ‘সমর’ ছবির ‘সুন্দরী লো সুন্দরী’ গানটি শচীন দেববর্মণ গেয়েছিলেন। কিন্তু তা ঠিক নয়; ‘সুন্দরী লো সুন্দরী’ গানটি ছিল বহু নারী ও পুরুষের মিলিত কন্ঠে গীত ‘কোরাস’ গান, তার মধ্যে শচীন দেববর্মণের কণ্ঠ ছিল না। গানটির রেকর্ডেও অন্য শিল্পীদের নাম লেখা আছে। শচীনবাবু ‘সমর’ ছবির সুরকার, তার কোন গানের গায়ক নন।

সুখময় মুখোপাধ্যায়
শান্তিনিকেতন
দেশ: ১৪ চৈত্র ১৩৭৬

=৫=

শ্রীশচীন দেববর্মণ বাংলা কথাচিত্রে নিজ কন্ঠে অন্তত তেরটি গান গেয়েছিলেন। সেই গানগুলি হল এই – ‘ওরে সুজন নাইয়া’ (অজয় ভট্টাচার্য) – সাঁঝের পিদিম (১৯৩৫), ‘ওরে বন্ধুরে মনের কথা কইবার আগে’ (অজয় ভট্টাচার্য) – রাজগী (১৯৩৭), ‘বাশুরিয়ারে কোথায় শিখেছ বাঁশি বাজান’ (অজয় ভট্টাচার্য) – রাজকুমারের নির্বাসন (১৯৪০), ‘বিদেশীরে উদাসীরে, ফিরে যাও তুমি’ (অজয় ভট্টাচার্য) – এ পার ও পার (১৯৪১), ‘ওরে অবোধ নেয়ে’ এবং ‘কি মায়া লাগলো চোখে’ (প্রেমেন্দ্র মিত্র) – প্রতিশোধ (১৯৪১), ‘চোখ গেল চোখ গেল কেন ডাকিস রে’ (কাজী নজরুল) – নন্দিনী (১৯৪১), ‘কে যেন কাঁদিছে আকাশ ভুবনময়’ (প্রণব রায়) – নারী (১৯৪২), ‘জনমদুঃখিনী সীতা’ এবং ‘বাংলার মেয়ে, বাংলার বধূ গাহি যে তোমার গান’ (শৈলেন রাজ) – জীবন-সঙ্গিনী (১৯৪২), ‘বন্দর ছাড়ো যাত্রীরা সবে জোয়ার এসেছে আজ’ (অজয় ভট্টাচার্য) – ছদ্মবেশী (১৯৪৪), ‘কাল সাগরের মরণ দোলায়’ এবং ‘শ্যামরূপ ধরিয়া এসেছে মরণ’ (শৈলেন রায়) – মাটির ঘর (১৯৪৪)।

এর মধ্যে ‘চোখ গেল চোখ গেল’ গানটির সুরকার কাজী নজরুল, যদিও নন্দিনী কথাচিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন সুরসাগর হিমাংশু দত্ত। ‘কে যেন কাঁদিছে আকাশ ভুবনময়’ গানটির সুর রাইচাঁদ বড়ালের এবং তিনিই নারী কথাচিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। কিন্তু ‘উদাসীরে বিদেশীরে ফিরে যাও তুমি’ গানটির সুর শিল্পীর নিজেরই দেওয়া, যদিও এ পার ও পার কথাচিত্রের সঙ্গীত পরিচালক এবং তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন যথাক্রমে বিনোদ গঙ্গোপাধ্যায় এবং রাইচাঁদ বড়াল। আর দু্টি গানের সুর, যথা ‘জনম দুঃখিনী সীতা’ এবং ‘বাংলার মেয়ে, বাংলার বধূ’ দিয়েছিলেন সুরসাগর হিমাংশু দত্ত এবং তিনিই জীবন-সঙ্গিনী কথাচিত্রের সঙ্গীত পরিচালকও ছিলেন। বাকী গানগুলি সবই শিল্পী নিজের সুরেই গেয়েছেন। সুতরাং দেশ পত্রিকার ৭ই ফেব্রুয়ারীর সংখ্যায় (পৃষ্ঠা ১৭৮) শিল্পীর উক্তি – ‘এই গানটি (চোখ গেল, চোখ গেল) ছাড়া আমি অন্য কারো সুরে কোন গান চলচ্চিত্রে গাই নি, একমাত্র নিজের রচিত সুর ছাড়া’ – তথ্যের দিক থেকে নির্ভুল নয়, অবশ্য দীর্ঘদিনের ব্যবধানে শিল্পীর বিস্মৃতি ঘটা অসম্ভব নয়।

‘সাজে নওল কিশোর’ গানটি আমি যতদূর জানি কোন কথাচিত্রের নয়, তবে গ্রামোফোন রেকর্ডে ধৃত এর অপর পিঠের গানটি  ‘ওরে বন্ধুরে মনের কথা কইবার আগে’ রাজগী কথাচিত্র হতে গৃহীত। শিল্পীর হিন্দুস্তান গ্রামোফোন রেকর্ডে প্রকাশিত রেকর্ডের মধ্যে এই তেরটি গানও আছে এবং সম্ভবত আজও পাওয়া যায়।

কল্যাণবন্ধু ভট্টাচার্য
হাওড়া – ৪
দেশ: ১৪ চৈত্র ১৩৭৬

কৃতজ্ঞতা: সরগমের নিখাদ, আবুল আহসান চৌধুরী

বাঙালীয়ানা/এমএ/জেএইচ

আরও পড়ুন: রাজবাড়ির ঐতিহ্য ছিন্নকারী শচীন

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.