১৯৮৮ সাল। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছে বরিশাল ক্যাডেট কলেজের মিজানুর রহমান শাওন, আরেকজন টিকাটুলির হুমায়ূন সাহেব এর বাড়ির প্রতিবেশী কবি আবু জাফর সঞ্চিতা (স্বপন ভাই) আর আমি। এই তিন বন্ধু মহাকাশ বার্তা প্রকাশ করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেবার ইচ্ছায় ঢাকার পরই চট্টগ্রাম যাত্রার উদ্যোগ নিল। ট্রেনে মহাকাশ বার্তা বিক্রি করতে করতে পৌঁছে গেল বীর চট্টলা। মাস্টারদা সূর্যসেন, বীরকন্যা প্রীতিলতার জন্মভূমি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান এর সাথে পরিচয় হল। কথা প্রসঙ্গে তিনি ড. জামাল নজরুল ইসলাম এর কথা বললেন। ড. জামাল নজরুল ইসলাম সেদিন ডিপার্টমেন্টে ছিলেন না। সারসন রোডের সাবজা যার বাসা। ছোট একটা টিলার উপর। স্বপ্নময় একটা পরিবেশ। সেদিনই বাসায় পৌঁছে গেল ক্ষুদে বন্ধুরা।
পরিচয় হল পৃথিবীর বিজ্ঞান জগতের অন্যতম একজন ড. জামাল নজরুল ইসলাম এর সঙ্গে। এরপর থেকে উনি নিয়মিতভাবেই আমাদের প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এসে অংশ নিতেন। মহাকাশ বার্তাতেও লিখেছেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাতায়াতের বিমান ভাড়া বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের দেবার কথা থাকলেও, ড. জামাল নজরুল ইসলাম কখনোই সেটা নেননি। বলতেন আমি ব্যবস্থা করে ফেলেছি। আমাদের সেমিনারগুলো বেশীর ভাগ সময়েই ধানমন্ডি ৭ নাম্বার রোডে অবস্থিত রাশান কালচারাল সেন্টারে হতো। এমনই এক সেমিনারের দিন ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়াতে সেন্টারের জেনারেটর তেল শূন্য হয়ে পরে। ফলাফল বিদ্যুৎ চলে যাওয়াতে অডিটরিয়াম সম্পূর্ণ অন্ধকার। সে সময় জামাল স্যার এর লেকচার চলছিলো। অন্ধকারে লেকচার শুনতে শ্রোতাদের অসুবিধা হবে কি? জানতে চান স্যার। শ্রোতাবৃন্দ যখন বলেন, না অসুবিধা নেই। জামাল স্যার সেই অন্ধকারেই বক্তব্য দেয়া চালিয়ে যান।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্রুনোর স্মরণে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন এর পক্ষ থেকে একটি পদক প্রবর্তন করা হয় ১৯৯০ সালে। বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিঃপদার্থ বিজ্ঞান চর্চার বিকাশে যে সমস্ত ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাদেরকে ব্রুনো পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৪ সালে ড. জামাল নজরুল ইসলাম স্যারকে ব্রুনো পদক দেয়া হয়। সে সময় বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি পত্রিকায় সে সংবাদ ছাপা হয়েছিলো। তখন পর্যন্ত জামাল স্যারকে বাংলাদেশের মানুষ জানতো না। সে কারণে পরবর্তিতে স্যারের জীবনী লেখকদের সেই পদক দেবার সংবাদটি দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
১৯৯০ সালে অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বার কে প্রথম এই পদক প্রদান করা হয়। ১৯৯২ ড. এ আর খান, ১৯৯৪ এ ড. জামাল নজরুল ইসলাম, ২০০৭ সালে মোজাম্মেল হক এবং ২০১৯ সালে আবু সালেহ মোহাম্মদ নুরুজ্জামানকে এই পদক দেয়া হয়।
২০০৬ সালে অ্যাস্ট্রোনমির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের পুনায় ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (IUCAA) যাই। IUCAA এর প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার এর সাথে দেখা। নারলিকারকে আমার পরিচয় দিতেই জানতে চাইলেন জামাল নজরুল ইসলাম কেমন আছেন? পরে জানতে পারি নারলিকার এবং জামাল স্যার খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন।
১৯৮৭ সালে বিজ্ঞান জাদুঘরের কর্মশালায় পরিচয় হয়ে শরীফ মাহমুদ সিদ্দিকীর সাথে। বছর কয়েক পর শরীফ আমাকে জানালো, সে জামাল স্যারে সাথে দেখা করে একটা কাজের কথা বলতে চায়। স্যার এর সাথে আমার পরিচয় যোগাযোগ থাকবার কারণে আমি যেন একটা চিঠি লিখে দেই। শরীফ চিঠি নিয়ে জামাল স্যারের সাথে দেখা করতে যায়। তারপর ইতিহাস। শরীফ বর্তমানে Deputy Registrar at Jamal Nazrul Islam Research Centre for Mathematical and Physical Sciences, University of Chittagong ।

বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের কাজে চট্টগ্রামে গেলেই ড. জামাল নজরুল ইসলাম স্যার এর বাসায় নিয়মিত যেতাম। একবার চট্টগ্রামে ড. জামাল নজরুল ইসলাম স্যার এর বাসায় কথা প্রসঙ্গে The Ultimate Fate of the Universe বইটা নিতে চাইলে স্যার বললেন, এক কপি আছে আপাতত। এক কাজ কর, এটা ফটোকপি করে নিয়ে আসো।
একমাত্র বই এর কপিটি দিতে জামাল স্যার কোন দ্বিধা করেননি। বইটি ফটোকপি করবার পর তাতে আমাদের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের জন্য শুভেচ্ছাসহ লিখে দিলেন। এমন নানা ছোট ছোট ঘটনা আছে স্যারকে নিয়ে।
মৃত্যুর আগে স্যারের কাছে অনুমতি চেয়েছিলাম ওনার বই প্রকাশের, মৌখিক অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এতো দ্রুত আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যাবেন, সেটা ভাবিনি।
আজকে জামাল নজরুল ইসলাম স্যারের ৮২তম জন্মদিনে আমাদের সবার প্রিয় জামাল স্যারকে স্মরণ করি। জামাল স্যার ওনার কাজের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানে আগ্রহী মানুষের মাঝে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান ইনন্সটিটিউট গড়ে উঠলেই ড. জামাল নজরুল ইসলামের আজীবন লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে। প্রিয় বিজ্ঞানী শিক্ষক জামাল নজরুল ইসলামের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক:

*প্রকাশিত এ লেখার তথ্য, মতামত, ভাষা ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই প্রকাশিত এ লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক