। রাহমান চৌধুরী ।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কয়েকটা কথা না বললেই নয়। ইতিহাসবোধ ছাড়া এই অভ্যুত্থানকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। নানান কথার ফানুস উড়তে থাকবে। জুলাই আন্দোলনে পরিপূর্ণভাবে আস্থায় নিতে হলে চোখ রাখতে হবে ইউরোপের ইতিহাসের দিকে।
বিশ্ব ইতিহাসের দুই বিস্ময়কর সভ্যতা, প্রাচীন গ্রীস আর রোমের সভ্যতা। প্রাচীন গ্রীস আর রোমের ধর্ম তখন পৌত্তলিক ধর্ম। কত শত দেব-দেবতা তাদের। ঠিক তার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রচিন্তার বিস্ময়কর বিকাশ। বিশ্বে বর্তমানকালেও প্রাচীন গ্রীস আর রোমের মনীষীরা নানাভাবে নিত্যদিন আলোচিত। ধ্রুপদী সাহিত্য আর নাটকগুলো বর্তমানকালে মানুষকে নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়। প্রাচীন গ্রীস এবং রোমে শত শত দেব-দেবতার ধর্ম থাকলেও, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ছিল সকলের। ধর্ম পালন না করবারও স্বাধীনতা ছিল। ধর্ম ছিল প্রধানত একটা উৎসব আর মিলনমেলা। নিশ্চয় এই বিশ্বাস ছিল, বিভিন্ন দেবতারা মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। দুটো অঞ্চলেই দেব-দেবতার সংখ্যা ছিল এত যে সবাই সব দেবতার নাম জানতেন না। নাম জানতেন সবাই প্রধান দেবতা জিউস বা জুপিটারসহ যুদ্ধের দেবতা আর প্রেমের দেবতা কিংবা দেবীর। বহু মানুষ ছিলেন ধর্মে বিশ্বাস করতেন না। প্রাচীন রোমে সম্রাট টাইবেরিয়াসের আমলে একবার একলোক নালিশ করলেন সম্রাটের কাছে নাগরিকদের একজনের বিরুদ্ধে। বললেন, ‘সম্রাট, রাষ্ট্রের অমুক নাগরিক অমুক দেবীকে অসম্মান করে কথা বলেছেন। আপনি এর বিচার করেন।’ সম্রাট রাজ-দরবারে বসেই বললেন, ‘ক্ষমতাবান দেবী যদি ঐ ব্যক্তির উপর প্রতিশোধ না নেন, তাহলে আমি প্রতিশোধ নেবার কে? তিনি যদি নিজেকে অপসানিত হতে দেন তাহলে আমার কী করণীয় আছে?’ দরবারের সবাই সম্রাটের কথায় সায় দিয়ে হেসে দিলেন। নাট্যকার সেনেকা সেই যুগে বসে বলেছিলেন, মানুষের সকল দুর্ভোগের কারণ ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যা বুঝতে সাহায্য করবে সেই সমাজের বাক-স্বাধীনতাসহ মানুষের ভাবনাচিন্তা কত উপরের স্তরে ছিল। বাংলাদেশের মানুষের চিন্তাচেতনার জগত তার দু-তিন হাজার বছরে পরেও কি সেই স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে? বাংলাদেশের মানুষ কি প্লাটোর মতন, অ্যারিস্টটল, সিসেরো কিংবা জুলিয়াস সিজারের মতন চিন্তা করবার ক্ষমতা রাখে? বাংলাদেশের মানুষ কি প্রাচীন গ্রীস-রোমের রচিত মহাকাব্য বা নাটকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবার ক্ষমতা রাখে এত বছর পরেও? বাক-স্বাধীনতা কি আছে সেই যুগের মতন?
সিজার যখন ক্ষমতার উচ্চশিখরে, তিনি বন্ধুদের আমন্ত্রণ করেছেন নিজের প্রাসাদে। হঠাৎ যা ঘটলো, বাবুর্চি মূল খাবারটা রান্না করতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে আর ভয়ে কাঁপছে। খাবার আসছে না দেখে সিজার জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার অতিথিরা বসে আছেন খাবার দেওয়া হচ্ছে না কেন? বালিকা চাকরাণী এই প্রভু সম্পর্কে সামান্য ধারণা রাখতেন। বললেন, প্রভু খাবার পুড়িয়ে বাবুর্চি ভয়ে কাঁপছে। সিজার সামান্য উত্তেজিত না হয়ে হেসে বললেন, বাকি যা আছে তাই দাও। না হলে আপাতত কিছু খেজুর দাও। ততক্ষণে পুনরায় রান্না শেষ হয়ে যাবে। সিজার আর ক্লিওপেট্রা সখের বসে প্রাসাদের ভিতরে দুজনে “আন্তিগোণে” নাটক থেকে অভিনয় করতেন। সিজার হতেন রাজা ক্রেয়ন আর ক্লিওপেট্রা সাজতেন আন্তিগোণে। সিজারের গ্রিক ধ্রুপদী নাটকগুলোর সংলাপ কণ্ঠস্থ ছিল। সিজারের মতন ক্লিওপেট্রার পড়াশোনা ছিল বিস্ময় তৈরি করার মতন। বহুজন বিশ্বাস করতে পারবে না, তৎকালে জ্ঞানচর্চা মানে বহুজনের পুরো ইলিয়ড ওডিসি মহাকাব্য মুখস্থ ছিল। বিখ্যাত কবি ক্যাটুলাস ছিলেন সিজারের প্রতি ক্ষুব্ধ। ভিন্নদিকে সিজার বন্ধুদের বলতেন, ‘ক্লডিয়ার প্রেম না পেয়ে ওর মন ক্ষতবিক্ষত। প্রতিভাবান এই কবির প্রতি নজর রেখো। আমি তাঁর রচনার খুবই ভক্ত। সম্রাট টাইবেরিয়াস বা জুলিয়াস সীজারের সমপর্যায়ে বিবেচনা রাখেন, এমন শাসকের দেখা কি আমরা পেয়েছি কখনো।
শাসকদের মধ্যে একজনের দেখা তো পেয়েছিল ভারত, সে হলো জওহরলাল নেহরু। পরে মনে করা যাক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের কথা। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে ততটুকুই কি কখনো ঘটেছে। সারাবিশ্বের ইতিহাস তাঁর নখদর্পণে ছিল। কারাগারে দিনরাত বই পড়তেন আর কন্যা ইন্দিরাকে চিঠি লিখতেন। ইন্দিরাকে লেখা সেই চিঠিগুলো সংগ্রহ করে পরবর্তীকালে একটা বই প্রকাশিত হয়। বইটির নাম “বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ”। বইটি আসলে ইন্দিরাকে লেখা সেই চিঠিগুলোর সমাহার। জওহরলাল নেহরুর কারাগারের সময়কাল পর্যন্ত ‘বিশ্ব ইতিহাস জানার জন্য’ এমন বই দ্বিতীয়টি নেই। সারা ভারত উপমহাদেশে তো ছিলই না, বিশ্বেই আছে কিনা সন্দেহ। বুঝতে হবে, রাস্তায় স্লোগান দিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়ে সরকার পাল্টানো যায়, সমাজকে চূড়ান্তভাবে পাল্টানো যাবে না যদি না জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। কথাটা কার্ল মার্কস লেনিন মাওদের। মার্কস গ্রিক ধ্রুপদী নাটকগুলো পাঠ করেছিলেন গ্রিক ভাষা শিখে। নাটকগুলো পাঠ করবার জন্যই কেবল গ্রিক ভাষা পাঠ করেছিলেন। শেক্সপিয়ারের নাটকের সংলাপ ছিল তার পরিবারের সকলের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কণ্ঠস্থ। গ্যাটে, শিলার, বালজাক পড়েছেন নিবিষ্ট মনে। লিখে রেখে গেছেন, ইতিহাসের চেয়ে সাহিত্যপাঠ থেকে ইতিহাসকে অনেক বেশি উপলব্ধি করা যায়। তিনি অবশ্য সেই সব সাহিত্যের কথাই বলেছিলেন। মার্কস তৎকালের প্রতিটি বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তিনি এমনকি বিজ্ঞানচর্চার ত্রুটি নিয়ে যা লিখে রেখে গেছেন তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে বিশ শতকে এসে।
বুঝতে হবে কারা রাজনীতি করেছিলেন তখন, কারা ছিলেন পথপ্রদর্শক। ভ্লাদিমির লেনিন, তাঁর কালের সমস্ত প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর পড়াশুনা ছিল। মার্কসের বই পড়েননি কেবল, রাজনীতি বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সমস্ত চিন্তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তৎকালের রুশ সাহিত্যসহ সারাবিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যপাঠ করেছেন। ডানপন্থীদের কথা বাদ দিলাম, বাংলাদেশের বাম রাজনীতিক নেতাদের পড়াশোনার মান কী? সব সাহিত্য বাদ দিলাম, ভারতের উনিশ বিশ শতকের প্রধান সাহিত্য কজনের পাঠ করা আছে। মধুসূদন পড়েছেন কজন? বিশ শতকে কিংবা উনিশ শতকে তৎকালীন ইতিহাস, জাতীয়তাবাদের উপর পড়াশোনা আছে কজনের? সবাই কেবল শোনা কথা অন্যদের শোনাচ্ছে। মার্কসই বা পড়ে দেখেছেন কজন? পৃথিবীতে জ্ঞান বাদ দিয়ে বিপ্লব হয় না; সেটা মার্কস, লেনিন, স্তালিন, মাওসেতুংয়ের কথা। বামপন্থীরা মনে করেন নেতাদের এসব কথাকে পাত্তা না দিয়েই বিপ্লব করা সম্ভব। বক্তৃতাবাজিতে পারঙ্গমরা প্রতিদিন ক’ঘণ্টা অধ্যয়ন করেন? কথা হলো এসব বুঝতে না চাইলে, গত জুলাই আন্দোলনের ত্রুটিকে সম্যক উপলব্ধি করা যাবে না। চিৎকার করে যতই সমাবেশ মাত করা যাক। বিপ্লব মানেই শাণিত চিন্তা। নতুন চিন্তা বলতে চাই না এ কারণেই যে, এদেশের নতুন চিন্তা মানে প্রাচীন গ্রীস রোমের পুরানো চিন্তাগুলোর মতনই হোক না আগে। বাংলাদেশের নতুন চিন্তা মানেই, ইউরোপের রেনেসাঁ থেকে আধুনিক ইউরোপের নতুন রাষ্ট্রচিন্তা এবং বিজ্ঞানমনস্কতা। ইউরোপ ষষ্ঠ শতক থেকে সম্পূর্ণ অন্ধকার ডুবে গিয়েছিল, নতুন করে জেগে উঠেছিল দ্বাদশ শতকে। ইউরোপের তার পরের প্রতিটি স্তরই হলো এক-একটি বিপ্লব ১৯৫১ সাল পর্যন্ত।
প্রাচীন রোম যিশুখ্রিস্টের জন্মের বহু আগেই নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে প্রাচীন গ্রীসকে দখল করে বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তুলে ইউরোপে, পরে দখল করে ফিলিস্তিন, ভূমধ্যসাগর অঞ্চল এবং আফ্রিকার বহু এলাকা। সেই সময়ে প্রাচীন গ্রীসের চিন্তার প্রভাবেই বিরাট এক চিন্তার জগত গড়ে উঠেছিল রোম সাম্রাজ্যে। কত দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, নাট্যকার, কবির দেখা মিলেছিল। এক্ষেত্রে গ্রীসের অবদান ছিল অনেক। কিন্তু চতুর্থ শতকে এই সভ্যতার পতন আরম্ভ হলো যখন পৌত্তলিক ধর্ম বাদ দিয়ে খ্রিস্টধর্মকে সাম্রাজ্যের সরকারি ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে সম্রাট কনস্টানটাইন। পঞ্চম শতকে দাসবিদ্রোহের ফলে পশ্চিম রোমসাম্রাজ্য আক্রান্ত হলে, ষষ্ট শতকে ভয়াবহ ক্ষমতাশীল হয়ে ওঠে খ্রিস্টানদের প্রতিষ্ঠান চার্চ আর পুরোহিতরা। প্রাচীন যুগের পৌত্তলিক পূজা আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, এইবার নিষিদ্ধ করা হলো বাইবেলের বিশ্বাসের বাইরে সবরকম জ্ঞানচর্চা। যা কিছু বাইবেলের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক তাই নিষিদ্ধ হয়ে গেল। একমাত্র সত্য হলো বাইবেল, এর বাইরে যাওয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছিল। বিজ্ঞান, কাব্য, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সাহিত্য, নাটকচর্চা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। গ্রন্থাগার, বইপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হতে থাকলো। রাষ্ট্র বলে আসলে কিছু থাকলো না পবিত্র রোম সাম্রাজ্যে, সবকিছু চলে গেল চার্চের নিয়ন্ত্রণে। ঠিক এই ষষ্ঠ শতকে আরবে জন্মগ্রহণ করেন ইসলামের নবী, তিনি পরের শতকের শুরুতে ইসলাম ধর্মের প্রচার আরম্ভ করেন।
নবীর মৃত্যুর পর যখন মুসলমানরা বিভিন্ন দেশ জয় করতে থাকে, গ্রীস রোমের জ্ঞানভাণ্ডরকে যতটা সম্ভব রক্ষা করে তখনকার মুসলিম শাসকরা। গ্রীস রোমের বহু মনীষীদের প্রথম আশ্রয় দেন কুফার জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী শাসক ইয়াজিদ। সব মুসলমান শাসকরাই পরে গ্রীসের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে রসদ সংগ্রহ করেন, বিশেষ করে অ্যারিস্টটল সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল মুসলমান পণ্ডিতদের। যতদূর সম্ভব গ্রিক ও লাতিন রচনাগুলোকে আরবি ভাষায় অনুবাদ করে নেওয়া হলো। গ্রিক-লাতিন জ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত সেই সময়ের মুসলমান পণ্ডিতদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ইবনে সিনা এবং রুশদ। কারণ ইউরোপের প্রথমদিকে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুজনের রচনা ছিল বিপুলভাবে পাঠ্য। বাকি মুসলমানদের রচিত গ্রন্থ আরবি থেকে লাতিনে অনুবাদ করে পড়ানো হতো। কারণ সমগ্র ইউরোপ তখন সবেমাত্র কয়েকশো বছরের অন্ধকার থেকে জেগে উঠছে। আরব পণ্ডিতরা তখন তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। স্মরণ রাখতে হবে একদা গ্রিক লাতিন জ্ঞানভাণ্ডার থেকে গ্রহণ করেছিল আরবরা, ঠিক দ্বাদশ শতকে ঘটে ভিন্ন ঘটনা। ইউরোপ এবার ধার করতে থাকে আরব পণ্ডিতদের কাছ থেকে। এই সময়ে প্লাটো অ্যারিস্টটলের সঙ্গে ইউরোপকে পরিচয় করিয়ে দেয় আরবরাই। এর আগে আরবরা অনুবাদ করেছিল গ্রন্থের পর গ্রন্থ লাতিন বা গ্রিক থেকে। এইবার ইউরোপ হাজার হাজার পৃষ্ঠা লাতিনে অনুবাদ করতে থাকে আরবি থেকে। ঘটনাটা কীভাবে ঘটলো?
ক্রসেড ছিল এর পেছনে। সম্পূর্ণ অন্ধকারে বাইবেলের বিশ্বাসে ডুবে থাকা ইউরোপের মানুষ ক্রসেডের মাধ্যমে মুসলাম বা আরব সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে। আরবদের মাধ্যমে জ্ঞানসাধনার প্রতি আগ্রহী হতে আরম্ভ করে দশম-এগারো শতকে। আরবদের কাছ থেকেই জানতে পারে প্রাচীন গ্রীস ও রোমের বিপুল জ্ঞানভাণ্ডারের কথা। কিছুটা জানতে পারে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বাইটিয়ান থেকে। ফলে ইউরোপে দ্বাদশ শতকে গড়ে উঠতে আরম্ভ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম ইতালিতে, পরে ফ্রান্সে। মনে রাখতে ইতালির সিসিলি এবং গ্রীস ছিল আরবদের উপনিবেশ। আরবদের সঙ্গে এভাবে নতুন ইউরোপের জ্ঞানের আদানপ্রদান চালু হলো। দ্বাদশ শতকে ভার্জিলের ঈনিড পাঠ করে দান্তে লিখলেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ডিভাইন কমেডি, যার লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল সারা ইউরোপে। সেটাই ছিল তখন সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আলেচিত গ্রন্থ। আরবদের কারণে অ্যারিস্টটল হয়ে উঠলো সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি। এই যে এভাবে করে আরবদের হাত ধরে প্রাচীন গ্রীস ও রোমের জ্ঞানভাণ্ডার ফিরে এলো ইউরোপে, এটাকেই বলা হয় পুনর্জন্ম বা পুনর্জাগৃতি বা রেনেসাঁ। মনে রাখতে হবে এই রেনেসাঁস আরম্ভ হয়েছিল ইতালিতে যার রাজধানী রোম। জ্ঞানের জগতে আরবরা দশম-দ্বাদশ শতকে ইউরোপকে সমৃদ্ধ করেছিল, সেই আরবরা আবার তখন থেকে অন্ধকারে ডুবতে আরম্ভ করেছিল কট্টরপন্থী রক্ষণশীল মুসলমানদের জন্য। জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চায় মুসলমানদের সেই অন্ধকার পর্ব এখনো চলছে প্রায় এক হাজার বছর হতে চললো।
যদি প্রশ্ন করা হয়, সপ্তম শতক থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত পাঁচশো বছর ধরে আরবরা মৌলিকভাবে যে জ্ঞানের ভাণ্ডার সৃষ্টি করতে পারছিল, সারা বিশ্বের জ্ঞানের ইতিহাসে যা আজও আলেচিত, বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাজগত কি সেইটুকু জ্ঞান বিতরণ করতে পারছে? জবাব পারছে না। কারণ সৃষ্টিশীলতা, বিজ্ঞানে মৌলিক অর্জন নেই বাংলাদেশের। সপ্তম শতক-দ্বাদশ শতক পর্যন্ত আরবরা যে সৃজনশীলতার প্রমাণ রাখতে পেরেছিল, আজকের বাংলাদেশ যদি সেইটুকু রাখতে না পারে, তাহলে এই দেশের শিক্ষার মান কোথায় পড়ে আছে? এই শিক্ষা নিয়ে কি আসলে বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে খুব বেশি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব? না জানাটা তত বড় বাধা নয়, কিন্তু জানতে চাইছে না কেউ। না জানতে চাওয়াটাই সবচেয়ে বড় বাধা। দ্বাদশ শতক পর্যন্ত অন্ধকারে থাকার পর, ইউরোপ কীভাবে জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চায় এগিয়ে গিয়েছিল চিন্তা করতে গেলে বিস্মিত হতে হবে।
লেখক পরিচিতি:
রাহমান চৌধুরী
লেখক, শিল্প সমালোচক; ঢাকা