। সন্দীপ দে ।
এবারের শীতে কলকাতা মহানগরী উদ্বেল হয়েছিল এক গানের জাদুকরের প্রাণের সুরের সম্মোহনীতে। শুধু কলকাতা কেন, কলকাতা ছাড়াও কাছে-দূরের আরও কয়েকটি শহরও ভেসেছিল তাঁর গানের উতল প্রবাহে। তিনি বাংলা গান ও বাংলা সংস্কৃতির এক স্বঘোষিত একনিষ্ঠ অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক – বাংলা গানের বিশ্বপথিক – গানের তাপস – মহীতোষ তালুকদার তাপস।
সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্টের বস্টন শহর থেকে তিলোত্তমা কলকাতায় এসে গানের কথা,সুর ও ছন্দের উত্তাল আবহে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার ডালি উপহার দিয়ে গেলেন এ রাজ্যের মানুষকে। তাঁর সৃষ্টির এই বিশাল উদ্যোগ একদিকে যেমন ছিল অভিনব,আবার অন্যদিকে হয়ে উঠেছিল খুবই আকর্ষণীয়। তিনি একক প্রচেষ্টায় সমাজ মাধ্যম সূত্রে কলকাতায় কয়েকশো সংগীতপ্রেমী বিভিন্ন বয়সের পুরুষ-মহিলাকে সমবেত করেছেন,তাঁদের চারদিন ধরে তালিম দিয়ে বাংলা ভাষার বেশ কয়েকটি বিখ্যাত গান সমবেতভাবে পরিবেশনের মাধ্যমে এক অনন্য কীর্তির স্বাক্ষর রেখে গেলেন।
তাঁর এই অভিনব উদ্যোগে কলকাতা মহানগরীর বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন দূরবর্তী সুন্দরবন সংলগ্ন কাকদ্বীপ, বাঁকুড়া শহর, বর্ধমান, আসানসোল, রানিগঞ্জ, শিলিগুরিসহ নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার শিল্পীরাও । এমনকী ত্রিপুরা, আসাম এবং আন্দামান থেকেও অনেকে এসেছিলেন এই উদ্যোগে শামিল হতে।

কলকাতায় গানের মহড়ায়। ছবি: বিপুল রায়।
আরও চমকপ্রদ ঘটনা হলো শুধু এঁরাই নন, গানের তাপস মহীতোষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন সুইডেন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা ও বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন গান পাগল মানুষ । তাঁরা সকলেই এসেছেন সোৎসাহে নিজের অর্থ খরচ করে। দুই বাংলাসহ বিশ্বের নানা দেশের সংগীতপ্রেমী কয়েকশো মানুষের মিলন সমারোহে এই উদ্যোগ তাই এক অনন্যমাত্রা পেয়েছিল। গানের তাপসের প্রচেষ্টায় এতজন শিল্পীর মিলিত সংগীত আয়োজনের সার্থক নামকরণ হয়েছিল ‘সুরবন্ধন’।
সকলেরই জানা, রামমোহন, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, সত্যজিৎ-এর স্মৃতি বিজড়িত কলকাতা শহর শুধু ভারতে নয়, গোটা বিশ্বে সমাদৃত অন্যতম এক সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। এই মহানগরী একদিকে যেমন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনে, মানুষের অধিকারের সপক্ষে, সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের দাবিতে উত্তাল গণ আন্দোলনের সাক্ষ্য বহন করছে; তেমনি নানা সামাজিক বিপর্যয়ে,অপহ্নবে মুমূর্ষু বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার জয়গানে মেতেছে; আবার বিগত কয়েকশো বছর ধরে অগণ্য প্রতিভাদীপ্ত মানুষের উজ্জ্বল সৃষ্টির প্রভায় ও প্রগতি চেতনার উন্মীলনে এই কলকাতা মহানগরী বিশ্বের মানচিত্রে অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতির ভুবনে কলকাতার অবদান অসীম। এই কলকাতা শহর সংগীত জগতের অগ্রগণ্য শিল্পীদের অসামান্য প্রতিভার স্মৃতিও সযত্নে বয়ে নিয়ে চলেছে। এমনই এক ঐতিহ্যময় শহর কলকাতায় সংগীত তাপস মহীতোষের নেতৃত্বে ‘সুরবন্ধন’-এর অনুষ্ঠান এক ব্যতিক্রমী ও স্বতন্ত্র নজির হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

কলকাতা বই মেলা প্রাঙ্গণে। ছবি: ফেসবুক থেকে।
বাংলা গানের পথিক মহীতোষ বুকভরা আবেগ, অফুরান প্রাণস্পন্দন আর অপার ভালোবাসার সম্ভার নিয়ে এসে অগণিত মানুষের শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করে ফিরেছেন। এখানে এই বিরাট সংগীত আয়োজনের ভাবনা তাঁর মনে ডানা মেললো কী করে- এর উত্তর মেলে তাঁরই এক সাক্ষাৎকারে। সেখানে তিনি বলেছেন, মাস ছয়েক আগে তিনি কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পান এবং তাতে রাজিও হন। তারপর তাঁর নিজেরই কথায়, “তারপরই মনে হলো, কলকাতায় যখন যাচ্ছি, সেখানকার বন্ধুদের সঙ্গে জ্যামিং (এক হওয়া) করি। এই ভেবে ফেসবুকে পোস্ট দিই। আমার ধারণা ছিল ২০ থেকে ৩০ জনকে পাব। কিন্তু সেই পোস্টে অভূতপূর্ব সাড়া পেলাম। শত শত মানুষ পোস্ট শেয়ার করলেন, গান গাওয়ার আগ্রহের কথা কমেন্ট করে জানালেন। তারপর তো আর মুখ ফিরিয়ে নেবার উপায় নেই।” (‘প্রথম আলো’, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪)
সমাজ মাধ্যমে তাঁর এই আহ্বানে প্রায় সাড়ে আটশোর বেশি বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ গান গাইতে ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। তার থেকে সাড়ে তিনশোর বেশি শিল্পীকে নিয়ে শুরু হয় বৃন্দগানের মহড়া। তিনি কলকাতা আসেন ২৬ জানুয়ারি। তার আগে শিল্পী নির্বাচন, মহলা কক্ষ ঠিক করা, স্বেচ্ছাসেবক নির্বাচন, মহড়ার সময়-নিয়মকানুন, অংশগ্রহণকারী শিল্পী ও স্বেচ্ছাসেবকদের ‘সুরবন্ধন’ লোগো সংবলিত পোশাকের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে মহীতোষ ফেসবুক বার্তা ও ভিডিও বার্তা দেন। প্রথম অনুষ্ঠানের আগে পর্যন্ত এমন ৭৭ টি চিঠি তিনি পোস্ট করেন ফেসবুকে। সব মিলিয়ে সুরবন্ধনের এই সংগীত সমারোহকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। তারই উজ্জ্বল প্রতিভাস লক্ষ করা যায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে।
প্রথম অনুষ্ঠান হয় সল্টলেকে আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তক মেলার সমাপ্তি দিনে (৩১ জানুয়ারি, ২০২৪) উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। সেদিন উপস্থিত হাজারো মানুষ মহীতোষ তালুকদার তাপসের নেতৃত্বে নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের অনুপম সমন্বয়ে ‘সুরবন্ধন’-এর কয়েকশো শিল্পীর উদ্দীপনাময় অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। সেদিন খোলা আকাশের নিচে বইমেলা প্রাঙ্গণে যেন বাংলা গানের উত্তাল তরঙ্গ প্রবাহিত হয়েছিল। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ কলকাতার সূর্য সেন মঞ্চ, ২ ফেব্রুয়ারি কল্যাণীর আইআইএসইআর-এর আর এন টেগোর অডিটোরিয়াম , ৩ ফেব্রুয়ারি আউশগ্রামের বননবগ্রাম বাউল আশ্রম, ৪ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি হাট, ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতা প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণ, ৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতা সংলগ্ন নিউটাউনের ইকোপার্কে অনুষ্ঠান হয়। সমাপ্তি অনুষ্ঠান হয় কলকাতার ঐতিহ্যমণ্ডিত মহাজাতি সদনে। এদিনের অনুষ্ঠানে মহীতোষসহ শিল্পীদের শুভেচ্ছা ও প্রণোদনা জাগাতে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সুরকার ও শিল্পী কল্যাণ সেন বরাট, প্রতুল মুখোপাধ্যায় সহ আরও অনেকে।

কলকাতা ইকোপার্কের অনুষ্ঠানে। ছবি: বিপুল রায়।
মহীতোষ তালুকদার তাপসের নেতৃত্বে এমন অভিনব আঙ্গিকে বাংলা গান পরিবেশনের সূচনা হয়েছিল আমেরিকার বুকে ২০০৩ সালে। তখন এম আই টি’র ক্রেসগি অডিটোরিয়ামে শতকণ্ঠে হাজার বছরের বাংলা গানের অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন। এরপর নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে প্রবাসী কয়েকশো বাংলাভাষী শিল্পীকে জড়ো করে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেন। এছাড়া আমেরিকার অন্যান্য শহরেও আরও কয়েকটি অনুষ্ঠান হয়েছে তাঁর নেতৃত্বে। ১৯৯১ সালে তিনি ঢাকা থেকে আমেরিকা পাড়ি দিয়েছিলেন অ্যাকাউন্টেন্সিতে দ্বিতীয় মাস্টার্স করতে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি চলতে থাকে তাঁর গানের চর্চা। ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানে কিছুদিন একটি যৌথ ব্যবসায় অংশীদার ছিলেন। সেই পাট চুকিয়ে অবশেষে তিনি আমেরিকার রোড আইল্যান্ড রাজ্যের রাজধানী প্রভিডেন্স শহরে মেয়রের অফিসে অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে যুক্ত হন। মা ও পুত্র আগামীকে নিয়ে তাঁর সুদীর্ঘ ৩২ বছরের প্রবাস জীবন। দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটালেও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর রয়েছে নাড়ির টান, রয়েছে বাংলা গানের প্রতি অনিঃশেষ ভালোবাসা। তাই গানের দুর্বার আকর্ষণে পেশাকে কোনোরকমে সামলে বার বার ছুটে যান গানের আবহে, আঙুল ছোঁয়ান হারমোনিয়মের রিডে।
গানের প্রতি তাঁর দুর্নিবার ভালোবাসা জন্ম নেয় ছেলেবেলায় বাড়ির পরিবেশে। বলতে গেলে সেখানেই তাঁর মনে গানের অঙ্কুরোদগম হয়। কৈশোরে ‘খেলাঘর’ সংস্থায় তাঁর গান শেখা শুরু। ৮/৯ বছর বয়সে সুইডেনে আন্তর্জাতিক শিশু কিশোর মেলায় খেলাঘরের শিল্পী হিসেবে অংশ নেন। পারিবারিক যোগসূত্রের মাধ্যমে প্রগতিশীল গণ সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘উদীচী’তে যোগদান করেন। সেখানে কলিম শরাফি, শেখ লুৎফর রহমান, সুখেন্দু চক্রবর্তী, অজিত রায়, আব্দুল লতিফ, প্রমুখ বিশিষ্ট সংগীত শিল্পীর কাছে গণসংগীতের তালিম নেন। এছাড়াও তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সংগীত প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’-এও কিছুদিন গান শিখেছেন। মা অঞ্জলি তালুকদারের কাছে আসতেন তাঁর সহযোদ্ধা প্রগতিশীল নারী সংগঠন ‘মহিলা পরিষদ’-এর নেত্রীরা। এছাড়া তাঁদের ঢাকার বাসায় যাতায়াত ছিল ‘উদীচী’র প্রখ্যাত গণসংগীত রচয়িতা, শিল্পী ও সুরকারদের। এই আবহেই মহীতোষের মধ্যে ছোট্ট বয়সেই উন্নত সাংস্কৃতিকবোধের যেমন উন্মেষ হয়, তেমনি প্রগতি চিন্তা ও মননও দানা বাঁধতে থাকে। এই বিপুল সঞ্চয়কে অবলম্বন করেই তাঁর সংঘবদ্ধভাবে পথচলা, তাঁর নিজের ভাষায় ‘ঝাঁকে চলার’ সূচনা। যা তাঁকে একদিকে যেমন বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট ও দায়বদ্ধ করেছে, অন্যদিকে মানুষের প্রতি ভালোবাসায়-মমত্ত্ববোধে মনের গভীরে দৃপ্ত চেতনাবোধের সঞ্চার করেছে। এই লক্ষণই প্রতিভাত হয় তাঁর গান নির্বাচন থেকে সামগ্রিক উপস্থাপনায়। ‘সুরবন্ধন’-এর কলকাতা পর্বে গানের তালিকা লক্ষ করলে এর স্পষ্ট সমর্থন মেলে। এখানে পরিবেশিত হয়েছে, ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (গুরুসদয় দত্ত), ‘একবার বিদায় দে মা’ (পীতাম্বর দাস বাউল), ‘ভয় কি মরণে’ (মুকুন্দ দাস), ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ (ডি এল রায়), ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ (লালন ফকির), ‘কারার ঐ লৌহকপাট ‘(নজরুল ইসলাম), ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ (আবদুল গাফফার চৌধুরী), ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান’ (শাহ আবদুল করিম), ‘কান্দে হাসন রাজার মন’ (হাসন রাজা), ‘আজ যত যুদ্ধবাজ’ (শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়)’, ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ (সলিল চৌধুরী), ‘আমি বাংলায় গান গাই’ (প্রতুল মুখোপাধ্যায়্ প্রভৃতি বেশকিছু জনউদ্দীপক গান।

কলকাতা ইকোপার্কের অনুষ্ঠানে। ছবি: ফেসবুক থেকে।
শুধুমাত্র বাংলা গানের টানে, দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধায় এত মানুষকে মেলাবার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে তাঁরই। বিভিন্ন বয়সের কয়েকশো নারী-পুরুষকে সমবেত করে একই সুর-লয়-তাল-ছন্দে তালিম দেওয়াও এক দুঃসাধ্য কাজ। অথচ এই কঠিন কাজটি অবলীলায় করেছেন মহীতোষ। এই মহড়া প্রত্যক্ষ করাও এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। যার সাক্ষী হবার সুযোগ হয়েছিল এই প্রতিবেদকের। একদিন সন্ধ্যায় তাপসের সৌজন্যে সল্টলেকের ভারতীয় বিদ্যাভবন স্কুলের অডিটোরিয়ামে হাজির হয়েছিলাম গানের মহড়ায়। দেখেছি তাঁর আরোপিত নিয়মানুবর্তিতা, কঠোর শৃঙ্খলা, নিষ্ঠা, অনুশাসনের পাশাপাশি চিরাচরিত ঢঙে ধমক, হাসি, মশকরা, প্রশংসা, নানা কথার মাধ্যমে সবাইকে উদ্বুদ্ধ ও প্রাণিত করার মধ্যদিয়ে গানের মহড়া যেন পরিণত হয়েছে এক অসাধারণ সংগীত উৎসবে। তিন শতাধিক অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সমবেত গানের মহড়ায় সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখা অনুপম দক্ষতা ছাড়া সম্ভব নয়। যা কঠোর নিষ্ঠায় অর্জন করেছেন তাপস। অসীম ধৈর্য,অফুরান প্রাণশক্তি, অতুলনীয় পরিচালন ক্ষমতা ও অপূর্ব শরীরী ভঙ্গিমার সমন্বয়ে তাপসের মহড়া পরিচালনার দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ! একমাত্র তা প্রত্যক্ষ করলেই এই অনুভব ও অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব।

শান্তিনিকেতন সোনাঝুরি হাটে। ছবি: ফেসবুক থেকে।
মহড়ার সময়ে প্রাণের আবেগে-উচ্ছ্বাসে, গভীর মগ্নতায়, গানের বাণীর প্রণোদনায়, সুর ও ছন্দের উন্মাদনায় নিজেকে যেন ভাসিয়ে দেন তাপস। তখন মনে হয় তিনি নিছক একজন সংগীত প্রেমী শিল্পী নন; পল রোবসন-মুকুন্দ দাস বা সলিল চৌধুরী-হেমাঙ্গ বিশ্বাসদের সুযোগ্য উত্তরসূরি ঋজু মেরুদণ্ডের অসামান্য এক সংগীত যোদ্ধা।
মহড়ার তীব্র ব্যস্ততার মধ্যে ক্ষণিকের বিরতিতে সামান্য আলাপচারিতার জন্য আমার মতো একজন সামান্য মানুষকেও যখন তিনি বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তখন অনুভব করেছি প্রাণের আবেগ-উচ্ছ্বাসে গানের উন্মদনায় শীতের রাতেও তাঁর গায়ের ফতুয়াটি ঘামে আর্দ্র হয়ে উঠেছে। উপলব্ধি করেছি গান যে বাস করে তাঁর বুকের গভীরে। কলকাতাসহ এ রাজ্যের মানুষের হৃদয়ে তাঁর নেতৃত্বে এই সংগীত সমারোহের স্মৃতি সজীব থাকবে বহুকাল। এই গান পাগল মানুষটি তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের জন্য বাংলা গানের ভুবনে অতিক্ষুদ্র হলেও নিজের স্থায়ী আসন করে নেবেন, এবিষয়ে এই প্রতিবেদকের অন্তত কোনো সংশয় নেই।

প্রতিবেদকের সাথে মহীতোষ মজুমদার তাপস। ছবি: ফেসবুক থেকে।
আজ গোটা বিশ্ব হিংসা, হানাহানি, বিভেদ-বিসংবাদে দীর্ণ। বিশেষ করে এই উপমহাদেশ আক্রান্ত উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও সন্ত্রাসের হিংস্র থাবায়। লগ্নি পুঁজির লোলুপতায় ও প্রতিক্রিয়ার শক্তির কুটিল চক্রান্তে সমস্ত মানবিক মূল্যবোধ, ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, দীর্ঘদিনের লালিত সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের বন্ধন সব কিছুই যেন আজ শিথিল হতে বসেছে। এই সার্বিক সংকটের মুহূর্তে বাংলা গানের বিশ্বপথিক এক ক্ষ্যাপা বাউল বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সন্ধানে গানের মধ্য দিয়ে যে লড়াইয়ের শব্দ উচ্চারণ করেন, সবাইকে আলোর অভিযাত্রায় যেতে উদ্দীপ্ত করেন, তিনিই তো হতে পারেন প্রকৃত অর্থেই গানের তাপস, সংগীত যোদ্ধা মহীতোষ তালুকদার তাপস। যার জীবনবোধে সত্য হয়ে ওঠে লালন ফকিরের সেই অমোঘ বাণী, “মানুষ তত্ত্ব যার সত্য হয় মনে/ সে কি অন্য তত্ত্ব মানে।/মাটির ঢিপি কাঠের ছবি/ভূত ভবিষ্যৎ দেবা দেবী/ ভোলে না সে এসব রূপী/মানুষ ভজে দিব্য জ্ঞানে।”…. তাই আনন্দ-বিষাদ-প্রতিকূলতার মধ্যেও শোনা যায় তাপসের প্রাণের উচ্চারণ – জীবন সুন্দর, আনন্দম !
লেখক:
সন্দীপ দে, যুগ্মসম্পাদক, বাঙালীয়ানা