বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

Comments

। অমিত রঞ্জন দে ।

গণঅভ্যুত্থান শব্দটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চিত্তভূমিতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত, ব্যাপক ও সিদ্ধান্তমূলক (এসপার-কি ওসপার) আন্দোলনের চিত্র ভেসে ওঠে। আমাদের এ ভূখণ্ডের মানুষ অজস্র গণআন্দোলনের ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এ পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। তাকে লড়তে হয়েছে সামন্ত প্রভু, জমিদার-জোতদার ও ব্রিটিশ রাজত্ববাদের বিরুদ্ধে। লড়াই করতে হয়েছে ভাষা ও দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য লড়তে হয়েছে। এই লড়াই বা আন্দোলন কখনও কখনও রূপ নিয়েছে কমবেশি গণঅভ্যুত্থানে।

জনগণের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে গণঅভ্যুত্থান অবশ্যই শক্তিশালী একটি মাধ্যম। বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তৎপরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারসমূহকে সোজাপথে হাঁটায় বাধ্য করতে এ দেশের জনগণকে মুখোমুখি হতে হয়েছে একাধিক গণঅভ্যুত্থানের। এসব গণঅভ্যুত্থানে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির কি মিলেছে সে সব বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, ষড়যন্ত্র, বিপর্যয়, মোহগ্রস্ততা, সংগ্রাম, বিজয়, সংস্কৃতি, অর্থনীতির বিকাশÑ কোনো কিছুরই ধারাবাহিকতা এখনও দাঁড়ায়নি। ফলে জাতিকে মুখোমুখি হতে হয়েছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের।

বাংলাদেশের ইতিহাসে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সম্মিলিত সে অভ্যুত্থানে পতন হয়েছে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি সংগঠনের দমন-পীড়নের কারণে কোটা সংস্কারের দাবি রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে। অনেকেই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে জুলাই মাসের মধ্যে ব্রাকেটবন্দি করতে চান। কিন্তু এটি একদিনের, এক মাসের বা ৩৬ দিনের বিষয় না। এটি দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনেরই অংশ। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক, কোটাবিরোধী, ধর্ষণবিরোধী, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা বিলের মতো কালো আইনের বিরুদ্ধে মানুষের যে সংগ্রাম তারই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। তবে ১৫ জুলাই ২০২৪ ছাত্রলীগ যখন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায় তখন মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ গণসংগ্রামে রূপায়িত হয়।

২০০৯ সালে বিশ্বাসযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। সুযোগ ছিল দেশকে মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল ধারায় ফিরিয়ে আনার। কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে সরে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়’ লিপ্ত হয় এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের খেলা শুরু করে। দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত করতে যে ধরনের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আনা দরকার ছিল তার কোনো কিছুই না করে পূর্ববর্তী শাসকদের অনুসৃত লুটেরা পুঁজিবাদী ধারাতে দেশ পরিচালনার পথ বেছে নেয়। তারা দেশব্যাপী সহিংসতা ও নৈরাজ্য পরিস্থিতি উস্কে দেয়। সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ও স্বৈরাচারী আচরণ ক্রমান্বয়ে অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যায়।

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম শুরু করেছিল সেই সংগ্রামই বৈষম্যবিরোধী এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। মাত্র দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে এই সংগ্রামই দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে। দীর্ঘদিনের অন্যায়, অবিচার, দম্ভ, মানুষের প্রতি অবজ্ঞাসহ নানা কারণে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে এবং দ্রুতই গণবিক্ষোভে পরিণত হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

এই গণঅভ্যুত্থান ঊনসত্তর বা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মতো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে রাজনৈতিক মৈত্রী, জোট বা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হয়নি। অংশগ্রহণকারী ছাত্র নেতৃত্ব ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানামুখী সৃজনশীলতা এই আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ছাত্রদের আন্দোলনে যুক্ত হয়ে একে একে রাজপথে নামেন গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর, বেসরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে আরও অন্যান্য দাবি। নানা প্রত্যাশা ও লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন সাধারণ মানুষ। ফলে তা গণআন্দোলনে রূপ লাভ করে এবং গণআন্দোলনের শুরুতে রাজনৈতিক কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকলেও এবং খুব সাধারণ লক্ষ্যে তা পরিচালিত হলেও দেয়ালে দেয়ালে চিত্রিত গ্রাফিতি এবং জনসমাবেশ থেকে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে সেটাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত মূল আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়।

যদিও এ ধরনের মিশ্র চরিত্রের শক্তির সমন্বয়ে সংগঠিত গণঅভ্যুত্থানের গতিপথ ও ভবিষ্যৎ পরিণতি নির্ভর করে আন্দোলনের ক্রমবিকাশমান শক্তিভারসাম্য ও নেতৃত্বের চরিত্রের ওপর। আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী, অংশগ্রহণকারী ও আন্দোলনের সুবিধাভোগীদের মধ্যে নানামাত্রিক দ্বন্দ্ব ছিল এবং এখনও আছে। এই আন্দোলনে প্রগতিশীল শক্তি যেমন ছিল তেমনি সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবও ছিল। আন্দোলন শেষে সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব বলয় সম্প্রসারিত হচ্ছে। এদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে অসহিষ্ণু বা নিপীড়ক একেকটা পক্ষ আবির্ভূত হচ্ছে। তারাও ক্ষমতাচ্যুত সরকারের ন্যায় মানুষের মতপ্রকাশে বাধা তৈরি করছে, সহিংসতা সৃষ্টি করছে, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস চালাচ্ছে, নারীর প্রতি ভীষণ অসহিষ্ণু আচরণ, ধর্ষণ ভয়ানক মাত্রা নিয়েছে। 

এদের দাপটে এবং দেশের ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, নাজুক প্রশাসনিক অবস্থার সুযোগে সামাজিক ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও গণতন্ত্র পরিপন্থি শক্তির উল্লম্ফন ঘটেছে। আজ দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ, জাতীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধকেও পদদলিত করার অপচেষ্টা ক্রমান্বয়ে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারা জাতীয় সংগীত ও সংবিধানকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। আজকে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষ ভয়াবহ বিপদের মুখে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে মব তৈরি করে প্রকাশ্যে মাজার ভাঙা হচ্ছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। নানা ধরনের প্র্রোপাগান্ডা চালিয়ে দেশের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। 

সেই অস্থিরতার সুযোগ বিগত কয়েকটি সরকারের মতো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একই কৌশলে হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনা ঘটেই চলেছে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা আরও অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে মব সন্ত্রাস, অর্থাৎ যাকে তাকে যেকোনোভাবে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে।

ফলে হতাশার চোরাবালিতে পতিত হওয়ার চিত্রই ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আজকে শুধু গণঅভ্যুত্থানের মালিকানা নয়- দেশের মালিকানাও একটি ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে। যেসব ন্যায্য দাবি ও প্রত্যাশা নিয়ে সর্বস্তরের জনগণ ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে নেমেছিল, নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেও পিছপা হয়নি, সেগুলোর প্রায় কোনোটিই পূরণ হয়নি। নিশ্চিত হয়নি জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনার ন্যায়বিচারও। বরং, অভ্যুত্থানে সক্রিয় একটি গোষ্ঠী অভ্যুত্থানের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গোছানোর ষড়যন্ত্রের নেমেছে। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার-তা হলো, প্রজন্ম ও প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো স্থির বিষয় নয়; যুগে-যুগে প্রজন্মের রুচি-রূপ এবং দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়। কিন্তু ইতিহাস তার জায়গায় ঠিকই থেকে যায়, থেকে যায় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তাই ক্ষমতার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন। যার মধ্যদিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অর্থে বৈষম্য নিরসন করে সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।

লেখক পরিচিতি:
Amit Dey
অমিত রঞ্জন দে
লেখক, সাধারণ সম্পাদক – বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী; ঢাকা

*প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট