১৯৯৮ সালের কোকাকোলা কাপ। হায়দারাবাদ লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ওয়ানডে খেলছে কেনিয়ার বিপক্ষে। সেই ওয়ানডেতে বাংলাদেশের এক অলরাউন্ডার বল হাতে প্রথমে ১০ ওভারে ৫৬ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিলেন আর পরে ব্যাট হাতে ওপেনিংয়ে নেমে ১১ চার ও এক ছক্কার সাহায্যে করলেন ৮৭ বলে ৭৭ রান। দুই ওভার হাতে রেখেই কেনিয়ার দেওয়া ২৩৭ রানের লক্ষ্য টপকে ম্যাচ জিতে গেল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ তাদের ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে জিতেছিল সেদিন কেনিয়ার বিপক্ষে। সে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন সেই অলরাউন্ডার মোহাম্মদ রফিক।

বাংলাদেশের প্রথম টেস্টজয়ী দলেও ছিলেন মোহাম্মদ রফিক। শুধু ছিলেন না সেই টেস্ট জয়ের পেছনে রফিকের অবদান ছিল অসামান্য। প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে ৯৮ বলে ৬৯ রান করা রফিক জিম্বাবুয়ের প্রথম ইনিংসও বলতে গেলে একাই ধসিয়ে দিয়েছিলেন, প্রায় ৪২ ওভার বল করে ৬৫ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে অপরাজিত রফিক করেন ১৪ রান।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই নিজেদের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ জেতে বাংলাদেশ। সে ম্যাচেও দলের অংশ ছিলেন রফিক। প্রথমে ব্যাট করে মাত্র ৫ বল খেলে ৩ চার মেরে দ্রুত দলকে ১৩ রান এনে দেন। পরে বল হাতে ৪ ওভার বল করে আঁটসাঁট বোলিং করে ২২ রান দিয়ে তুলে নেন ১টি উইকেট।
অবৈধ বোলিং একশনের গ্যাঁড়াকলে নিজের প্রথম টেস্টের পরই বাদ পড়েন রফিক। ৩ বছর বিরতির পর যখন ফেরেন তখন ফেরাটাও হয় স্মরণীয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হোম সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে নেন ৬ উইকেট।
জন্ম ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে ঢাকায়, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা জিঞ্জিরাতে। স্বাধীনতার পরপরই বাবাকে হারান। বেড়ে উঠেন মা-দাদীর সাথে যৌথ পরিবারে। ক্রিকেট খেলে আর মাছ ধরে কাটানো শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে একদিন হয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের মহাতারকা!
ছেলেবেলা থেকেই সংগ্রাম করে বেড়ে উঠা রফিকের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু বাংলাদেশ স্পোর্টিংয়ে ১৯৮৫ সালে একজন বাঁহাতি পেসার হিসেবে। ৮৮ তে যোগ দিলেন বাংলাদেশ বিমানে। কিন্তু পেসার হলেও বলকে টার্ন করানোর এক সহজাত প্রতিভা তার মাঝে ছিলো যা দেখে তার তৎকালীন সতীর্থ ওয়াসিম হায়দার তাকে পরামর্শ দেন স্পিন করার। আর তখনই পাল্টে যায় রফিকের খেলার ধরণ। হয়ে যান পুরোদস্তুর স্পিনার।
৯৪ এ সার্ক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে ভারতের এ দলের বিপক্ষে ২৫ রানে নিলেন ৩ উইকেট। জিতল দল।
১৯৯৭ এর আইসিসি ট্রফি জেতাতে তার অবদান অসামান্য। ১০ বোলিং গড়ে নিয়েছিলেন ১৯ উইকেট। সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ২৫ রানে ৪ উইকেট নিলেন। আর শুধুই কি বোলিং? ১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল আইসিসি ট্রফির ফাইনালে কেনিয়ার বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ওপেন করতে নেমে ১৫ বলে ২৬ রান।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার জীবনের প্রথম উইকেটটি ছিলো শচীন টেন্ডুলকারের। ওডিআইতে দুবার আর টেস্টে শচীনকে একবার আউট করেন রফিক।
আইসিএল খেলতে গিয়ে নিষিদ্ধও হয়েছিলেন। খারাপ সময় পেছনে ফেলে আবার ফিরেও এসেছিলেন মোহাম্মদ রফিক।
সেঞ্চুরীও আছে মোহাম্মদ রফিকের ঝুলিতে। করেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ১১১ রানের সেই ইনিংসটার কথা এখনো তার ভক্তদের স্মরণে আছে।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৩৩ টেস্ট ও ১২৫ ওয়ানডে খেলেছেন রফিক। টেস্টে তাঁর বোলিং গড় ৪০.৭৬ ও ওয়ানডেতে বোলিং গড় ৩৭.৯১। ব্যাট হাতে টেষ্টে স্ট্রাইকিং রেট ৬৫, মোট রান ১০৫৯ আর ওয়ানডেতে স্ট্রাইকিং রেট ৭১.৬, মোট রান ১১৯১ ।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কমতি ছিল এবং তা লুকোবার চেষ্টা করেননি কখনও। নিজে কষ্ট করে নৌকায় নদী পেরিয়ে শহরে আসতেন খেলতে, দেখতেন মানুষের যোগাযোগের অসুবিধা তাই আইসিসি কাপ জেতার পর প্রধানমন্ত্রী যখন জানতে চাইলেন “তুমি কি চাও” নিঃসংকোচে রফিক বলেছিলেন, ”বুড়িগঙ্গার ওইদিকে বাবু বাজারে একটা ব্রিজ হলে মানুষের যাতায়াতে অনেক সুবিধা হত”। প্রধানমন্ত্রী একটি ব্রিজ করে দিয়ে রফিকের আশা পূর্ণ করেছিলেন।
আইসিসি জেতায় সরকার প্রত্যেক খেলোয়াড়কে উপহার দিয়েছিল ৫ কাঠা জমি ও গাড়ী। রফিক নিজের এ উপহারের জমি দান করলেন স্কুল বানাতে আর গাড়ীটা বেচে সে অর্থে তুললেন স্কুল ঘর। অনেকেরই কাছেই অজানা এ তথ্য। কেননা মোহাম্মদ রফিকের এই অসামান্য কাজটি গুরুত্ব পায়নি খুব একটা গণমাধ্যমে।

রফিকের বলেন, “ভাই আমি তো লেখাপড়া কিছু শিখিনাই, আমি খুব গরীব ঘরের ছেলে ছিলাম। লেখাপড়ার গুরুত্ব আমি বুঝি। আমার এলাকার ছেলে-মেয়েরা যেন লেখাপড়া শিখে মানুষ হয় এবং সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় সেজন্যই এই কাজ করেছি”।
মোহাম্মদ রফিক যিনি মুলতান টেস্টে রশিদ লতিফ, অশোকা ডি সিলভার সব ন্যাক্কারজনক ঘটনার পরও জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে উমর গুলকে ম্যানক্যাডিং আউট করেননি। বলেছিলেন, “এভাবে আউট করে জিতলে সবাই আমাদের চোর বলতো! আমরা চোরের মত জিততে চাইনি!”
খেলা ছাড়ার পর বোলিং কোচ হিসেবে কয়েকটি ক্লাবের সাথে কাজও করেছেন। কিন্তু অনেকদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে কোন ডাক আসেনি। এ বাঁহাতি স্পিনার বোলিং কোচ হিসেবে বিগত হাই পারফরমেন্স (এইচপি) দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ রফিক সম্প্রতি।
বাঙালীয়ানা/এসএল