বাঙালি সংস্কৃতি – পর্ব ১৫

Comments

পঞ্চদশ পর্ব

জুলফিকার নিউটন ।

সংস্কৃতি কোনো উৎপাদিত শস্য বা নির্মিত সামগ্রী নয়। সংস্কৃতি ব্যক্তির সমাজের প্রতি মুহূর্তের ভাবচিন্তাকর্মআচরণে অভিব্যক্ত মানসিক চেতনা এবং জীবনাচারে প্রকটিত এবং নির্মিত সর্ব প্রকার ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় ভোগ্যউপভোগ্য বস্তু। তাই সংস্কৃতি মাত্রই প্রবহমান বিকাশমান। স্থিররূপে আবর্তিত সংস্কৃতি আচার মাত্র। শুনেছি, ইউরোপে বিভিন্ন কালের দেশের মনীষীর দেয়া সংস্কৃতির একশঘাটটিরও বেশি সংজ্ঞা প্রচলিত রয়েছে। কাজেই স্বল্প বিদ্যা নিয়ে কোন সংজ্ঞাই বেছে নেয়ার দেয়ার দায়িত্ব নেব না। তবে বাজার চালু কিছু ভুল ধারণার অপমোদনে ব্যক্তির মানসিক বিভ্রান্তি দূর করার এবং সমাজস্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে জরুরি মনে করছি। সংস্কৃতি কারো মৌরসী সম্পদ নয়, সংস্কৃতি হচ্ছে মানবউত্তরাধিকার। সংস্কৃতিমাত্রই মিশ্র প্রবহমান, দেশে কালে প্রজন্মে নব নব রূপে বিকাশমান।

সংস্কৃতিসভ্যতার বৃদ্ধি ঋদ্ধি ঘটে সৃষ্টিশীলতায় আবিষ্কারেউদ্ভাবনে চিন্তাচেতনামননের প্রসারে এবং ভিন্ন গোত্রের, গোষ্ঠীর, জাতির দেশের মধ্যে ভাবেরচিন্তারহাতিয়ারের, ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর বিনিময়ে আর অনুকরণেঅনুসরণে। যারা স্বাতন্ত্রপ্রিয় এবং বিচ্ছিন্নতায় আরণ্য বা বুনো জীবনে তুষ্ট তৃপ্ত, গ্রহণবিমুখ, শ্রেয়োচেতনারিক্ত তারা আজো আদি অবস্থায় মানসিক অবস্থানে রয়ে গেছে। আমরাও আবিষ্কার উদ্ভাবন করতে পারিনি বটে, কিন্তু গ্রহণেবরণে, অনুকরণেঅনুসরণে সভ্য সমাজভুক্ত হয়েছি রয়েছি। আমাদের বুনো জ্ঞাতিরা (সাওতালমুণ্ডা প্রভৃতি) আজো রয়েছে সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে। আমরা বিদেশেরবিজাতির বিভাষীর জ্ঞানবুদ্ধিবিজ্ঞানদর্শনশাস্ত্রপোশাকভাষাপ্রাশাসনিক ব্যবস্থা প্রভৃতি সব কিছু ধার করে অনুকরণেঅনুসরণে গ্রহণ করেই হয়েছি সভ্য, হচ্ছি উন্নত অগ্রসর।

মানবউত্তরাধিকারে অর্থাৎ যেকোন মানুষের সৃষ্টিতে রয়েছে প্রজাতি হিসেবে সর্বকালের সব মানুষের অধিকার তত্ত্বে যারা আস্থা রাখে, তারা যা কিছু সুন্দর কল্যাণকর তা নির্বিচারে নির্দ্বিধায় গ্রহণবরণ করে কেবল ঋদ্ধই হয়, হয় উপকৃত, থাকে গতিশীল। এর নামই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি প্রতি মুহূর্তেই বৃক্ষপত্রের মতো উন্মেষবিকাশশীল।

ভাষাই ভিত্তি বাঙালির জাতীয়তাবাদের। এই ভাষা রাজকীয় নয়, হচ্ছে ব্রাত্যজনের। বঙ্গভূমিতে আর্য এসেছে, এসেছে পাঠান মোগল, এলো ইংরেজ, হানা দিলো পাঞ্জাবী; এরা জয় করেছে দেশ, কিন্তু এদের কারো ভাষাই বাংলা ছিল না। বাঙালি যখন এদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে তখন তাকে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে তার ভাষা, যেটি তার ভরসা পরিচয়ের স্থল। ওই ভাষার বিজাতীয়করণের চেষ্টা হয় নি তা নয়, হয়েছে; কেউ ভেবেছে ভরে দেবে তাকে ইংরেজি বাগবিধি দিয়ে, কারও আকাঙ্ক্ষা ছিল আকীর্ণ করবে আরবীফার্সী শব্দে। এই সমস্ত কর্দম বালুকা ভাষার মূল প্রবাহকে স্তব্ধ করে দিতে পারে নি। জল এবং পানি নিয়ে ঝগড়া হয়েছে, অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতা আক্রমণ করেছিল ভূমিকে। কিন্তু বাংলাভাষার মূল প্রবাহ তেমনি রয়ে গেছে, যেমনটি সে আগে ছিল। রাষ্ট্র তাকে পর্যুদস্ত করতে পারে নি, সাম্প্রদায়িকতা পারে নি বিভক্ত করতে। অর্থাৎ বাঙালি বাঙালিই রয়ে গেছে, অন্যকিছু না হয়ে।

বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছে। এর রাষ্ট্রভাষা বাংলা। তবু ইংরেজি আছে, ইংরেজি শব্দ বাগবিধি প্রবেশ করছে বাংলায়, এবং অধিকাংশ মানুষ রয়ে গেছে অশিক্ষিত, তাদের জীবনে বাংলা ভাষা নেই। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্রের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব নেই, রাষ্ট্র নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সেই সব বিদেশী শক্তির ওপর, যাদের ভাষা বাংলা নয়। আর রাষ্ট্রের ভেতরে সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাড়ছে বৈষম্য, বেড়েই চলেছে, ক্রমাগত।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের মূল অবদান ভাষাকে কেন্দ্র করেই। ভাষা আমাদের পরিচয়ের চিহ্ন, চিহ্ন পারস্পরিক ভালোবাসারও। ভাষা ঐক্য চায় মানুষে মানুষে। সেই ঐক্য যেহেতু বৈষম্যপূর্ব অবস্থায় সম্ভব নয়, তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের সম্ভাবনা সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার জন্য অপেক্ষারত। আমরা পতঙ্গ, ভৃত্য, কিংবা দ্বৈত্য কোনোটাই হতে চাইবো না, চাইবো মানুষ হতে, তাই প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী হওয়া ছাড়া আমাদের জন্য অন্যকোনো উপায় নেই। তারা জাতীয়তাবাদী থাকে না যারা আত্মসমর্পণ করে সাম্রাজ্যবাদ কিংবা সামন্তবাদের কাছেকিংবা উভয়ের কাছেই, এক সঙ্গে। প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদ বিকশিত হলে রাষ্ট্র জনগণের অধীনস্থ হবে, কাজ করবে সে জনগণের পক্ষে।

গ্রীক দার্শনিক প্রোটাগরাস বলেছিলেন, মানুষই সব কিছুর মানদন্ড। সমষ্টিগত মানুষ নয়, ব্যক্তিগত মানুষ। প্রত্যেক মানুষই একেকটি মানদন্ড, তার নিজের মতো করে। মানবতাবাদের মূল কথাও এটিই। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীনতাই একমাত্র উপাদান নয়, সঙ্গে সঙ্গে দরকার ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির মৈত্রী, যেটি সম্ভব নয় বৈষম্য থাকলে। ব্যক্তি স্বাধীন হবে, কিন্তু মোটেই বিচ্ছিন্ন হবে না। পরস্পরের মিত্র হবে। সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের জীবনযাপনের পরিচয়, সেই পরিচয়ের অভ্যন্তরে থাকে অবৈরী দ্বন্দ্ব, প্রকৃতি, পরিবেশ প্রবৃত্তির সঙ্গে প্রকৃতি বাইরে থাকে, থাকে ভেতরেও।

সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ বন্দী করে রাখে মানুষকে, সাম্রাজ্যবাদ জাল ফেলে সূক্ষ্ম, সামন্তবাদ দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে, স্থল। মানুষ মুক্ত না হলে গণতান্ত্রিক হবে কি করে? আমাদের সংস্কৃতিতে ভূগোল বড় উপেক্ষিত। পুঁজিবাদ সামন্তবাদ উভয়েই ভূগোলবিমুখ। পুঁজিবাদ বলে স্বর্গ আছে পুঁজিবাদী দেশে, সামন্তবাদ বলে পাওয়া যাবে তাকে ইহলোকে নয়, পরলোকে। ফলে ভূগোল পড়ে থাকে পেছনে। এবং নীরবে সে প্রতিশোধ নেয়। খরার কালে নদী যায় শুকিয়ে, প্লাবন আসে বর্ষায়; কৃষকের অবস্থা দাঁড়ায় শোচনীয়।

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ভূমিতে দাঁড়াবে, কিন্তু উপেক্ষা করবে না বাইরের আলো হাওয়া এবং মানুষের মুক্তি ঐক্য সে গড়ে তুলবে ভেতর থেকে। সংস্কৃতির এই গুরুত্বটাকে উপেক্ষা করে আমরা এগুতে পারবো না, পারছি না। আমাদের রাজনীতিক দলগুলোর আদর্শে, উদ্দেশ্যে, লক্ষ্যে, কর্মসূচীতে দূরদর্শিতার পরিচয় মেলে না, দলগুলো ক্ষমতার খ্যাতির আর ভোটযোগাড়ের রাজনীতিকেই চরম পরম লক্ষ্য করেছে। দলে দলে কাড়াকাড়িমারামারিহানাহানির কারণও নিহিত এখানেই। ক্ষমতার লিন্দা, অর্থবিত্তের লোভ, গদী দখলের অপ্রতিরোধ্য কাঙ্ক্ষা, দর্পদাপট, প্রভাবপ্রতিপত্তি এবং মানমর্যাদা বাড়ানোর সার্বক্ষণিক প্রয়াস প্রভৃতিই আমাদের রাজনীতিক হালচালে প্রাধান্য পাচ্ছে। তাই মিলফ্যাক্টরিকারখানা বৃদ্ধি করে রফতানিপণ্য বৃদ্ধির প্রসারী আর্থবাণিজ্যিক বিকাশ দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অবক্ষয়ের অবসান কল্পে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ অথবা জনগণের মৌলবাদরক্ষণশীলতাপ্রগতিবিমুখতা বিদূরণ প্রয়াসপ্রভৃতি কোনটাই সরকারের চেতনারচিন্তার, কর্মের আচারণের অন্তর্ভুক্ত হয় না। যদিও ভাষণে, বিবৃতিতে আস্ফালনে নানা উন্নতিউৎকর্ষের বয়ান নিত্য শোনা যায়। দেশ এখন ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক, শৈক্ষিক, সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক, প্রাশাসনিক ক্ষেত্রে অবক্ষয়গ্রস্ত। এখন বাংলাদেশ সমস্যাজর্জরিত। নৈতিক চেতনা, আদর্শ, লক্ষ্যিকনিষ্ঠা নিয়ে রাজনীতিক দলগুলো দেশসেবী মানবপ্রেমী লোকেরা এর প্রতিকারে প্রতিবাদে প্রতিরোধে যথাপ্রয়োজনে যথাকালে যথাস্থানে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণে আন্তরিকভাবে প্রয়াসী না হলে সরকারী রাষ্ট্রিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকারের বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না।

(পরবর্তী পর্ব ৮ মে, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)

ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার

লেখক:
Julfikar Newton
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক অনুবাদক; ঢাকা

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট