বাঙালি সংস্কৃতি – পর্ব ১৬

Comments

ষোড়শ পর্ব

জুলফিকার নিউটন ।

সংস্কৃতির একটা সহজ সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। সংস্কৃতির অর্থ সব মানুষের কাছে এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে তারা ভিন্ন ভিন্ন অর্থ নিয়ে ধরা দেয়। তবে একটা কথা বেশ জোর দিয়েই বলা যায়। সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষের ধারণা সবসময় একরকম থাকে নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার নানা রূপান্তর ঘটেছে, তা নানা মাত্রিকতা অর্জন করেছে। কোনো একসময় সংস্কৃতির নির্মাতা বা নিয়ামক হিসেবে রক্ত বা রেসিজম বা বর্ণবাদকেই গুরুত্ব দেওয়া হতো। নাৎসিনেতা এডলফ হিটলার বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির ধারকবাহক রূপে নীল চোখের শ্বেতাঙ্গ নর্ডিক আর্য জাতির ধারণা তুলে ধরেছিলেন। অন্য কোনো এক সময় জলবায়ু, ভৌগোলিক পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ প্রভৃতিকে কোনো একটি জাতির সংস্কৃতি গঠনের প্রধান উপাদান রূপে বিবেচনা করা হতো। সংস্কৃতি গঠনে তার বিকাশে সামাজিক আচারআচরণ, ধর্মীয় রীতিনীতি, জীবিকার উপায়, শিল্প সাহিত্য ললিতকলা, পালাপার্বণ উৎসবাদিসহ জীবন উপভোগের যাবতীয় ব্যবস্থা যে বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল সেসত্যের প্রতি আগে তেমন দৃষ্টি দেওয়া হয় নি। 

অর্ধ শতাব্দী আগে মার্কিন লেখক ডেভিড পটার তাঁরপিপল অব প্লেন্টি’ (১৯৫৪) গ্রন্থে মন্তব্য করেন, ‘অনেক লেখক বর্ণবাদের ভ্রান্তিমূলক ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেন, অন্য অনেকে আবার বর্ণবাদের ভ্রান্তিকে পরিহার করেও পরিবেশের ব্যাখ্যা গ্রহণে বাধ্য হয়ে ভুল পথে অগ্রসর হন। ব্যক্তি এবং তার (প্রাকৃতিক) পরিবেশের মধ্যে সংস্কৃতি যে মাঝপথে একটি দেয়াল সৃষ্টি করে অথবা সমাজ নিজেই যে প্রায়ই একটা মধ্যবর্তী পরিবেশ তৈরি করে নেয় যা মূল কিংবা প্রাথমিক পরিবেশের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সে সত্যটি তারা অনুধাবন করে নি।অবশ্য বর্তমানে মনোবিজ্ঞানী, আচরণবাদী, সমাজতত্ত্ববিদ, নৃতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ প্রমুখ যে ব্যাপক অর্থে সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেন তাকেই আমরা গুরুত্ব দিই। এখন সংস্কৃতি বলতে একটা জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবনচর্চাকে বোঝায়। অর্থাৎ কোনো একটি জনগোষ্ঠীর ব্যাপক আচারআচরণ, তাদের আহার সমাজবিধি, শিশুনারীবৃদ্ধদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, জীবিকা অর্জনের পদ্ধতি, সামাজিক উৎসবাদি, সংস্কারকুসংস্কার, তাদের জীবনের হাজারো উপকরণ উপাচার, তাদের ধর্মবিশ্বাস, ধর্মপালনের রীতিপ্রকৃতি, তাদের ভাষা সাহিত্য সঙ্গীত চিত্রকলা নৃত্য ইত্যাদি সবকিছু মিলে সেজনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি নির্মিত হয়। এসব কিন্তু সর্বদা সমান গুরুত্বপূর্ণ কিংবা সমান প্রভাববিস্তারী হয় না। কোনো কোনো সময়ে সংস্কৃতির উপরোক্ত উপাদানসমূহের মধ্যে একটি বা বিশেষ কয়েকটি উপাদান অন্যান্য উপাদানগুলির চাইতে বেশি প্রভাববিস্তারী হয়ে ওঠে এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সার্বিক সংস্কৃতি নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এর পেছনে কাজ করে নানা ঘটনা পরিস্থিতির যোগসাজশ অবস্থান, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি। যেমন ১৯৫২ সালে তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তানের বাঙালির কাছে তাদের মাতৃভাষা তথা বাংলাভাষার মধ্যে সংস্কৃতির যেউপাদান নিহিত ছিল তাই তাদের সংস্কৃতির মুখ্য উপদান হয়ে ওঠে। তাদের সংস্কৃতির এই ভাষাভিত্তিক উপাদান, ভাষার প্রতি তাদের এই অনুরাগ, তাদেরকে শুধু যে পাকিস্তানি নয়া উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে তাই নয় তাদের চিত্তে বাঙালি জাতীয়তাবাদী, চেতনার স্ফুরণ বিকাশেও অন্যতম ভূমিকা পালন করে।

সংস্কৃতি যে একটি জটিল ধারণা সেসম্পর্কে রেমন্ড উইলিয়ামসকে উদ্ধৃত করা যায়। তিনি অবশ্য ইংরেজি কালচার শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাঁর বিবেচনায়ইংরেজি ভাষায় যে দুতিনটি জটিলতম শব্দ রয়েছে তার মধ্যে কালচার একটি। এর কারণ অংশত বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় এর জটিল ঐতিহাসিক বিকাশ, কিন্তু প্রধানত এই জন্য যে এখন কতিপয় স্বতন্ত্র বৌদ্ধিক জ্ঞানের শাখায় তা গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট বা ধারণা হিসাবে এবং কতিপয় স্বতন্ত্র পরস্পরবিরুদ্ধ চিন্তাপদ্ধতির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।সংস্কৃতি বা কালচারের জটিলতা আরো বৃদ্ধি পায় আমরা যখন উপলব্ধি করি যে এটা কখনোই স্থানু নিশ্চল নয়, না ধারণা হিসাবে, না ঘটনা হিসাবে। আরো একটি অসুবিধা আছে। সংস্কৃতিকে কি কখনো সম্পূর্ণভাবে জানা যায়? আবারও রেমন্ড উইলিয়ামসের উদ্ধৃতি দিই: ‘একটি সংস্কৃতি যখন অনুসৃত হয় তখন তা অংশত অজানা থাকে অংশত অনর্জিত থাকে। একটি সমাজের নির্মিতি সর্বদাই একটি অনুসন্ধানের বিষয়, কারণ চেতনা বা উপলব্ধি সৃষ্টির পূর্বে আসতে পারে না, আর অজানা অভিজ্ঞতার জন্য কোনো ফর্মুলা নেই। জন্যই একটি ভালো সমাজ, একটি জীবন্ত সংস্কৃতি, সবাইকে এবং যেকেউ চেতনার অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারে তার জন্য যে শুধু জায়গা করে দেয় তাই নয়, তাকে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করে। চেতনার অগ্রগতি সবার জন্য দরকার।

রেমন্ড উইলয়ামসএর উপরোক্ত মন্তব্যকে আমি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। চেতনা উপলব্ধির অগ্রগতিতে আমরা সবাই আগ্রহী। ওই পথেই আমরা এক বিশ্ব এবং একটি আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব এবং সংস্কৃতির নিরপেক্ষ অনুশীলন, ধারণা ঘটনা উভয় দিক থেকে, সেকাজে আমাদের সাহায্য করবে।

পর্যায়ে আরেকটি কথা বলতে চাই। ধারণা বা কনসেপ্ট হিসেবে সংস্কৃতির পুরোপুরি অর্থ বোঝা কঠিন হলেও একজন সংস্কৃতিবান ব্যক্তি বলতে সাধারণ মানুষ কী বোঝে তা নিয়ে তেমন কোনো জটিলতা বা মতদ্বৈধতা নেই। সাধারণভাবে তাঁকেই সংস্কৃতিবান বিবেচনা করা হয় যিনি শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত রুচির অধিকারী, সাহিত্যসঙ্গীতচিত্রকলানৃত্য প্রভৃতি সম্পর্কে উৎসাহী তার রসাস্বাদনে সক্ষম, যিনি নিম্নকন্ঠ এবং প্রায় কোনো অবস্থাতেই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারান না ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন সুপণ্ডিত যার পড়াশোনার পরিধি খুব বড়, যিনি বিভিন্ন ধরণের জ্ঞানের অধিকারী, তিনি কিন্তু স্বতঃসিদ্ধভাবে একজন সস্কৃতিবান ব্যক্তি না হতে পারেন। একজন পণ্ডিত ব্যক্তি রূঢ়, বদমেজাজি, অসহিষ্ণু হতে পারেন, অনেকে সময় হনও এবং সেক্ষেত্রে অনেকেই তাঁকে কালচারড বা সংস্কৃতিবান বলতে দ্বিধা করবেন। বিদ্যা আর কালচার এক বস্তু নয়। রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে একটি চমৎকার উক্তি আছে।

শেষের কবিতাউপন্যাসে তিনি নায়ককে দিয়ে এক জায়গায় বলিয়েছেন, ‘কমলহীরের পাথরটাকেই বলে বিদ্যে, আর ওর থেকে যে আলো ঠিকরে পড়ে তাকেই বলে কালচার। পাথরের ভার আছে, আলোর আছে দীপ্তি।

ভিক্টোরির যুগের ইংরেজ লেখক ম্যাথ্যু আর্নল্ডও তাঁরসংস্কৃতি নৈরাজ্যগ্রন্থে সংস্কৃতিবিষয়ে বলতে গিয়ে মাধুর্য আলোর কথা বলেছেন। সংস্কৃতির সঙ্গে সামাঞ্জস্য প্রীতিকর সংমিশ্রণের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। আমরা অনেক সময় বাংলায় কালচারএর প্রতিশব্দ হিসাবে সংস্কৃতির পাশাপাশি কৃষ্টিও ব্যবহার করি। রবীন্দ্রনাথ ছড়ার ভঙ্গিতে সংস্কৃতি বা কৃষ্টির ক্ষেত্রে সুসঙ্গতি সুসামঞ্জস্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেছেন,

নোনার স্থানে থাকবে নোনা মিঠের স্থানে মিষ্টি। সাহিত্য বা পাকশালাতে/এরেই বলে কৃষ্টি।

সমাজবিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ সাহিত্যিকরা সংস্কৃতির ধারণাকে অর্থবহ তাৎপর্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে একাধিক রূপক ব্যবহার করেছেন, যেমন আইন রূপে সংস্কৃতি, দার্শনিক প্রস্তাব রূপে সংস্কৃতি, ভাষা রূপে সংস্কৃতি, নাট্যক্রিয়া রূপে সংস্কৃতি ইত্যাদি, কিন্তু প্রতিটি রূপকেরই এথনোগ্রাফিক দৃষ্টিকোণ থেকে সীমাবদ্ধতা আছে। নৃতত্ত্বের যে শাখা ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যময় সংস্কৃতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাবর্ণনা তুলে ধরে তাকেই এখনোগ্রাফি বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এখনো কিন্তু অনেকে মনে করেন যে সংস্কৃতির ধারণাটি একটি নিষ্প্রয়োজনীয় ধারণা, বহু পণ্ডিত গবেষকের দীর্ঘ পরিশ্রমী প্রায়োগিক পরীক্ষানিরীক্ষার পর যার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা যাবৎ পাওয়া যায় নি তারই একটি পড়ে থাকা অংশ। কিন্তু সিদ্ধান্ত যথার্থ নয়। বেশ কিছুকাল যাবৎ, অন্তত বিগত পঁচিশ বছর ধরে, বিভিন্ন পণ্ডিত, বিশেষ করে নৃতত্ত্বের, সংস্কৃতির সূক্ষ্ম পরিশীলিত ধারণা দান করে আসছেন যা থেকে এথনোগ্রাফিক গবেষককুল যথেষ্ট লাভবান হয়েছেন।

সংস্কৃতির ছাত্রের সংস্কৃতির যৌথ প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া বিশেষ জরুরি। একটি মিথস্ক্রিয় সমাজের সদস্যদের মধ্যে সংস্কৃতি যে বহু বিষয়ের অর্থ সম্পর্কে ব্যাপক ঐকমত্য তুলে ধরে একথা সংস্কৃতির ছাত্রকে বুঝতে হবে। যেমন, ভাষার ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে এক ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে তর্কাতীতভাবে তাদের ভাষার ক্ষেত্রে ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করে। সমাজের বিভিন্ন মানুষ ভিন্নভাবে কথা বলতে পারে, বাস্তবক্ষেত্রে বলেও, কিন্তু তবু এক ভাষাভাষী মানুষ সহজেই পরস্পরকে বুঝতে পারে, তাদের প্রথম সাক্ষাতেই, অথচ ভিন্নভাষী মানুষের কোনো কথা তারা বুঝতে পারে না। এর একটাই কারণ। এক ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভাষার নিয়মকানুন, যেমন, উচ্চারণ, ব্যকরণবিধি, বাক্যগঠণপ্রণালী বিষয়ে একটা ঐকমত্য বিরাজ করে এবং ভাষার ক্ষেত্রে যা প্রয়োজ্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। বস্তুতপক্ষে ভাষা হলো সংস্কৃতির একটি প্রধান উপাদান। যে সত্যটি বাঙালির বিশেষ অভিজ্ঞতার অংশ।

সংস্কৃতির যৌথ প্রকৃতির কারণে একটি সমাজে ভাষাভিত্তিক অথবা ভাষাবর্জিত প্রতীকের অর্থ সম্পর্কে তার সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করে। সামাজিক জীবনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই ঐকমত্যের গুরুত্ব সুস্পষ্ট। কোনো একটি সমাজে হয়ত মাথা পাশাপাশি নাড়ালে বুঝতে হবে যে সে অমত প্রকাশ করছে বা নিষেধ করছে, ‘নাবলছে, আবার অন্যত্র ওই একই ভঙ্গি করলে অন্য সমাজের মানুষ ঠিক তার উলটোটা বুঝবে, অর্থাৎ সেহ্যাঁবলছে। আমরা ভাষাবর্জিত অন্যান্য প্রতীকী ক্রিয়ার কথাও ভাবতে পারি। যেমন গুরুজনের পদধূলি নেওয়া, প্রিয়জনকে আলিঙ্গন করে তারপর নিজের দক্ষিণ হস্ত বামবক্ষে স্থাপন করা, বিদায় নেওয়ার সময় একাধিকবার দেহ মাথা নুইয়ে অভিবাদন করা।

সংস্কৃতির যৌথ প্রকৃতি ছাড়া তার আরেকটি ধর্ম সম্পর্কেও আমাদের অবহিত থাকা প্রয়োজন। তা হলো সংস্কৃতির সাংগঠনিক দিক। একসময় মার্কিনী প্রয়োগবাদী নৃতাত্ত্বিকগণ সংস্কৃতিকে স্বয়ম্ভর এবং পৃথক পৃথক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বলে বিবেচনা করতেন। তাদের মতে বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে সেবৈশিষ্ট্যগুলি স্থান রূপরেখার দিক থেকে মিলে গিয়ে, যুগপৎ সংঘটিত হয়ে, বিভিন্ন সমাজে মূর্ত হতো। কিন্তু তাদের ধারণা বেশিদিনের জন্য গৃহীত হয় নি। এখন একটি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আচরণ প্রথাকে অন্যান্য প্রাথমিক বিষয় থেকে আলাদা করে দেখা হয় না। শুধু তাদের যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় নয়, যে সাধারণ জ্ঞান, মূল্যবোধ ধারণাবলির কাঠামোর আওতায় তারা বিশ্বকে অবলোকন করে নিজেদের কার্যাবলি চালিয়ে যায় এবং যে প্রাসঙ্গিক সংগঠিত বিষয়সমূহ তাদের প্রথা আচরণকে অর্থপূর্ণ করে তোলে সেসবও ভালো করে বুঝতে হবে, তা নাহলে সংস্কৃতি নিয়ে বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে না।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় তার স্বরূপ উপলব্ধির ক্ষেত্রে অনেক সময় অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সংস্কৃতির কোনো কোনো দিক আছে যা শুধু ইশারাইঙ্গিতে প্রকাশিত হয়, যা চাপা থাকে, আবার কোনো কোনো দিক আছে যা পরিষ্কার এবং পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত। একটি সমাজে এমন অনেক নিয়মকানুন, বিধিবিধান দার্শনিক পরামর্শ আছে যা পরিষ্কার পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত এবং সহজবোধ্য। মানুষ তা স্বতঃসিদ্ধভাবে মেনে নেয়। আবার একটি সমাজে অনেক সময় এমন কিছু নিয়মকানুন বিধিবিধান থাকে যা চাপা এবং পরিষ্কারভাবে ভাষায় প্রকাশিত নয়, যদিও সেই সমাজভুক্ত সদস্যদের কাছে তাদের ধ্যানধারণার সাংস্কৃতিক বিন্যাসে তারা মৌলিক ভূমিকা পালন করে। একটি সমাজের সংস্কৃতির স্বরূপ উপলব্ধির জন্য তার চাপা এবং সুপ্রকাশিত, ইমপ্লিসিট এক্সপ্লিসিট, উভয় উপাদানের প্রতি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

সংস্কৃতির বিবেচনায় কোনো একগুঁয়ে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের অবকাশ নেই। আমাদের বুঝতে হবে যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী পৃথক পৃথক অবস্থান থেকে তাদের যাত্রা শুরু করেছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবেশ তাদের সংস্কৃতির উদ্ভব বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। আমরা যদি তাদের এই যাত্রা শুরুর ক্ষণ অবসানের কথা মনে না রেখে ঢালাও ভাবে একগুঁয়েমি করে তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে মতামত দিই তবে তা নিতান্ত অসঙ্গত হবে।

যত আদিমই হোক না কেন, কোনো মানুষই সংস্কৃতিহীন নয়। সংস্কৃতি ছাড়া ব্যক্তি মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। সংস্কৃতিকে বুঝতে হলে আমাদের তাকে এক দিকে থেকে নয়, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। যেমন, আমরা সংস্কৃতিকে বর্ণনামূলকভাবে দেখতে পারি। বিভিন্ন বস্তু তৈরি করতে যেসব হাতিয়ারের প্রয়োজন হয় আমরা তার কথা বলতে পারি এবং বস্তুভিত্তিক সংস্কৃতির একটি ছবি আঁকতে পারি। এর মধ্যে অন্যায় বা অযৌক্তিক কিছু নেই, কিন্তু সংস্কৃতির বিচারে এটি একমাত্র পথ নয়, এমনকি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পথও নয়। আমরা বস্তুগত উপকরণের বাইরে বিবাহ, পরিবার, সন্তান পালন, মৃতের সৎকার, ধর্মাচরণ পদ্ধতি প্রভৃতি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবতে পারি এবং তার আলোকে উক্ত জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি। সর্বোপরি সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, আন্তসম্পর্কের মধ্যদিয়ে কীভাবে তারা একটি সাংগঠনিক রূপ গ্রহণ করে, তার উপলব্ধি সংস্কৃতির ছাত্রের জন্য অপরিহার্য।

(পরবর্তী পর্ব ২২ মে, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)

ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার

লেখক:
Julfikar Newton
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক অনুবাদক; ঢাকা

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট