ঊনবিংশ পর্ব
। জুলফিকার নিউটন ।
সংস্কৃতি নিয়ে কথা হলেই আপ্তবাক্য; সংস্কৃতি জীবন থেকে উঠে আসে। জানা কথা। মানুষের ব্যাপার সবই যে জীবন থেকে উঠে আসে, সে কথাটা কি খুব জাঁক করে বলার। অর্থনীতি জীবন থেকে উঠে আসে, রাজনীতি জীবন থেকে উঠে আসে, সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্প জীবুন থেকে উঠে আসে। খুন, জখম, ধর্ষণ, সন্ত্রাস কি জীবনের বাইরে? জীবন থেকেই তো উঠে আসে এসব। কোনোকিছু যখন বোঝাতে যাই; কিন্তু নিজেরাই ঠিক বুঝতে পারি না, তখনই বুলি আওড়াই, বাগাড়ম্বর করি, এক কথায় সব কথার মুখ বন্ধ করে দিতে চাই; জীবন থেকে উঠে আসে। বাঙালি সংস্কৃতি বাঙালি জীবনের প্রতিফলন। বাংলার গান, বাংলার কাব্য-সাহিত্য বাঙালির জীবন থেকেই উঠে এসেছে। এসব কথা বললে যতটা বোঝা যায়, না বললেও ঠিক ততটাই বোঝা যায়। কোথা থেকে আসে বলি, কী আসে তা বলার চেষ্টা করি না। পরিচয়, প্রকৃতি, স্বভাব বিচার করে দেখি না। বিশ্লেষণ, তুলনামূলক বিচারের দিকে যেতে চাই না।
সংস্কৃতি শব্দটা একটা সর্বধারক ‘হোল্ড অল’ শব্দ- কাঁথা-বালিশ, ঘটি-বাটি, জুতো, ছাতা, মোজা, বঁটি, কাটারি সবই এর মধ্যে বেশ এঁটে যায়। সংগীতের সঙ্গে সাহিত্যের, কাব্যের সঙ্গে নাট্যের, নাট্যের সঙ্গে নৃত্যের, নৃত্যের সঙ্গে ভাস্কর্যের, ভাস্কর্যের সঙ্গে স্থাপত্যের, চিত্রকলার সঙ্গে মৃৎশিল্পের যত পার্থক্যই থাকুক না কেন কিংবা এদের পরস্পরের মধ্যে যত তফাতই খুঁজে পাওয়া যাক না কেন, এদের সবাইকে ঠেসেঠুসে সংস্কৃতির মধ্যে ঢোকানো যায়। সংস্কৃতির ভেতর ঢুকে এর ল্যাজা ওর মাথায়, এর ধড় তার ঠ্যাং-এর ভেতরে গিয়ে কীচক-বধ কাণ্ড ঘটুক না- এক কথাতেই সব সমস্যার নিরসন হয়ে যাবে; সংস্কৃতি জীবন থেকে উঠে আসে। এমন উদার অতিব্যস্ত কথনের ফলে খুব সহজেই আমাদের একটা দায়মুক্তি ঘটে যায়-এক ধরনের দার্শনিক মোহমুক্তি। উঁচু-নিচু, চড়াই-উৎরাই দেখার দরকার নেই, কাম্য-অকাম্য, ভালো-মন্দ, আকাঙ্ক্ষিত-অনাকাঙ্ক্ষিত, শ্রেয় বা পরিত্যাজ্য ইত্যাদি বিচারের বালাই নেই। প্রায় ভুখা লাভের মতো ব্যাপার। প্রতিতুলনা দিলে ব্যাপারটা এ রকম দাঁড়ায়, বাগানের এককোণে তাজা বিশাল এক গোলাপ ফুটেছে, তার সৌগন্ধে নিশ্বাসের বায়ু পরিপূরিত আর তার দুদিন পর ওই গোলাপ গাছেরই নিচে খুন করে খুনিরা একটি মানুষের লাশ রেখে গেছে। পচে উঠেছে সেই লাশ, ভয়ানক দুর্গন্ধে নিশ্বাসের বায়ু তখন বিষাক্ত-কলুষিত। কোন গন্ধটি ভালো? কোনোটি ভালো নয়। কোনোটিই মন্দ নয়। যে জিনিশ থেকে যে গন্ধ আসার তাই আসছে। গোলাপ। গন্ধের বাহাদুরি কিছু নেই, পচা চামড়ার গন্ধেও দোষের কিছু নেই। এই হলো জীবন থেকে উঠে আসা। যেমন জীবন, তেমনি তার গন্ধ। যেমন জীবন তেমনিই তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতি-অপসংস্কৃতির মধ্যে তফাত নেই। অপসংস্কৃতি বা কুসংস্কৃতি বলতেও-কিছু নেই।
‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি
এই অবস্থানটি বড় দায়হীন। এই অবস্থান যাঁরা নিতে পারেন তারা সবই সমর্থন করতে পারেন, অনর্গল কথা বলতে পারেন, অবিরাম পরিবর্তমান বাস্তবের কথা বলে সূর্যের তলায় যা কিছু আছে সবই সমর্থন করতে পারেন। এঁরা কিছুতেই অবাক হন না, আহত হন না। এই মুহূর্তের জীবন আধুনিক। অতএব সংস্কৃতি আধুনিক। আবার এখনকার জীবন যেহেতু আধুনিকতায় সাবেকিকতায় চালেডালে মেশানো সংস্কৃতিও তাই গাধা-ঘোড়ায় খচ্চর-সংস্কৃতি।
উপরের কথাগুলো যত হালকা চালেই বলি না কেন, স্পষ্ট দেখতে পাই এ রকম একটা অবস্থান নেওয়ার মানুষের কিন্তু অভাব নেই। তাঁরা কিছুই করতে চান না, নিরপেক্ষতা আর মোহহীনতার নাম করে যাঁরা সুবিধামতো ভেসে বেড়াতে পারেন, তাঁদের পক্ষে এই অবস্থানই সবচেয়ে আরামের। রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিবেত্তা, শিল্পবেত্তা শুধুমাত্র পরিবর্তনের কথা বলে, কালের সঙ্গে তাল মেলানোর কথা বলে, বিশ্বায়ন, মুক্তবাজারের অজুহাতে সুচের ছ্যাঁদায় উট ঢুকিয়ে দিতেও কসুর করেন না। স্বাচ্ছন্দ্যে বলা চলে যে, জনমানবশূন্য প্রান্তরে কিংবা গিরিখাতের কিনারায় দাঁড়িয়ে হিন্দি ছবির একশো যুবক-যুবতী যে নাচ নাচে, তাই হচ্ছে আধুনিক নৃত্যকলা, একটি গান গাওয়ার জন্যে গায়িকা যখন শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, জিনস আর গেঞ্জি পরে মুহুর্মুহু দেখা দেয় সেটিই হচ্ছে নতুন দৃশ্যসংগীত। যা কিছু আসে, চলে যায়, কিছুমাত্র চিহ্ন রাখে না, বিস্মৃতির অতলে ডুব দেয় সবই পরিবর্তনশীল জীবন ছকের অন্তর্ভুক্ত এবং অবশ্যই সংস্কৃতি। শুধু সংস্কৃতি কেন, তার নানা শাখা-প্রশাখা সংগীত, সাহিত্য, শিল্প, অর্থনীতি, রাজনীতি, ইতিহাস সমাজতত্ত্ব ঘূর্ণায়মান সময়ের আবর্তনের মধ্যে দেখা দেয়, মিলিয়ে যায়। দেখা দেয় স্বকীয় হিশেবে, অনন্য হিশেবে।
অথচ এ কথা তো মিথ্যে নয় যে, জীবনই উৎস। মানবিক যা কিছু আছে, সবকিছুর লগ্নতা তো তারই সঙ্গে। জীবন ধরাছোঁয়ার বাইরে অস্পষ্ট অতি সাধারণীকৃত একটা ধারণা হলেও তারও নির্দিষ্টতা আছে বৈকি। ব্যক্তির মধ্যে তা নির্দিষ্ট, ভাষার মধ্যে নির্দিষ্ট, সম্প্রদায়ের মধ্যে নির্দিষ্ট, সমাজের মধ্যে নির্দিষ্ট, জাতির মধ্যে নির্দিষ্ট, দেশকালের মধ্যে নির্দিষ্ট। সে নির্দিষ্ট কোনো একটা কাঠামোর মধ্যে আর সেভাবেই তাকে অতিক্রম করার উপায় নেই। এ কথা ঠিক, আবার এ কথা ঠিকও নয়। কোনো নির্দিষ্টতা দিয়েই জীবনকে চিরকালের জন্যে বেধে ফেলা যায় না। তবু মানব সংসারের সবকিছু চিনতে গেলেই স্থানকালের কোনো একটি নির্দিষ্টতা স্থির না করে উপায় থাকে না। বাঙালি সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতি থেকে নির্দিষ্ট করলেই তবে চেনা যায়। প্রাচীন বাঙালি সংস্কৃতিকে স্থানকালের চৌহদ্দিতে সুস্থির করতে পারলে তবেই তাকে চেনা যাবে, তখন দেখা যাবে সেই সংস্কৃতি নির্দিষ্টতার মধ্যে ঘটেপটে, সংগীতে, সাহিত্যে, কাব্যে, কথায়, জীবনের সঙ্গে লেপটে লেগে আছে। তাকে কিছুতেই আলাদা করা সম্ভব নয়। যদি ঘট না থাকে, পট না থাকে, চাল না থাকে, চুলো না থাকে, যদি না থাকে খাদ্য, জীবন যদি ভীষণ নিষ্ঠুর হয়, যদি মানুষের খাদ্য মানুষের মাংস হয়ে যায়, যদি সন্তান বেচে পেট ভরাতে হয়, তখন সংস্কৃতির সব কিছুতেই তার ছাপ পড়ে। যখন দিঘিতে জলের চেয়ে পাঁকের পরিমাণ বেশি হয়ে যায়, কুয়োর মধ্যে পড়ে কিছুতেই বেরিয়ে আসা যায় না তখন সেই পাঁক সংস্কৃতিকেও পঙ্কিল করে তোলে। তখন সংস্কৃতি দেখা দেয় জীবনের বিকার হিশেবে, তাকে কুষ্ঠের মতো পরিত্যাগ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। জীবন থেকে উঠে আসাতেই তো এমন হয়। বাগানে লাশ ফেলে গেলে যেমন লাশের গন্ধই পেতে হয়।বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে যখন কথা বলি আর তাকে বাংলাদেশী সংস্কৃতির সঙ্গে লড়িয়ে দিতে চাই, তখন আসলে কিছুই করি না, বিশাল সংস্কৃতির ভবনে দাঁড়িয়ে বাড়ির ভেতরের আসবাবপত্র, অমূল্য, দুর্মূল্য, সস্তা সম্পদগুলির খবর আর কিছুই নেওয়া হয় না। বাংলাদেশী সংস্কৃতি যেমন, বাঙালি সংস্কৃতিও তেমনি শূন্যগর্ভ একটা শব্দ। বিচিত্র ঐশ্বর্যের আর খোঁজ নেওয়া হয় না। বিশাল বাংলার হাজার বছরের নানা পর্যায়ের, নানা স্তরের জাগতিক জীবন বিন্যাস খুঁটিয়ে না দেখলে বাঙালির কাব্য কী বুঝব, সংগীত কী বুঝব, পোশাক-আশাক, খাদ্য, পানীয়, গৃহ, গৃহ-স্থাপত্য, মাটির মায়া, তৈজসপত্র, পুঁথি এসবের কী বুঝব। এসবের কী ভালবাসব তা কি দূরে ছুড়ে ফেলব কীভাবে বুঝব। জীবনের দিকে তাকাতেই হবে, জীবনলগ্ন করে দেখতেই হবে। কেন প্রান্তবাসীর চর্যাগীতি, কেন বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস, কেন দোভাষী পুঁথি, কেনই কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কাশীরামের মহাভারত, কেনই বা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, গীতগোবিন্দ, ময়মনসিংহ গীতিকা আর কেনই বা আঠারো শতকের শেষের দিকে খিস্তি-খেউড়, ঝুমুর গান, খেমটা নাচ, যাত্রাপালা, কবিগান এসব সন্ধান না করলে বাঙালি সংস্কৃতির কী বোঝা যাবে? তাকে কি কেবল ছোট করে বছরে নামিয়ে সংকুচিত করে ‘আমরা আর আমাদের’ বলে ফেলে দেব?
(পরবর্তী পর্ব ১২ জুন, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)
ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার
লেখক:
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক
‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি