বিচারিক থিয়েটার: শেখ হাসিনা মামলায় পর্যুদস্ত আইন 

Comments

। এস এম মাসুম বিল্লাহ ।

শেখ হাসিনা মামলার রায় পড়া শুনছিলাম। বারবারই নানান শব্দ কানে লাগছিলো। শেষের দিকে একটা বাক্য শুনে হতচকিত হয়ে গেলাম। বিচারক বলছেন, ‘উই ডিসাইডেড টু ইনফ্লিক্ট ডেথ সেন্টেন্স টু শেখ হাসিনা।’ শাস্তি আরোপের জন্য আইনের ভাষার এই নৈমিত্তিক প্রয়োগ বিচারের মানকে তো প্রশ্নবিদ্ধ করেই, পাশাপাশি বিচারকদের বিচার-মানস সম্পর্কেও একটা ধারণা দেয়। ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি আরোপ তো ‘সিদ্ধান্তে’ উপনীত হবার বিষয় নয়, এটি ‘বিচারিক মন’ দিয়ে নিমগ্নভাবে নিরুপণ করার বিষয়। 

‘আমরা শাস্তি আরোপের সিদ্ধান্ত নিলাম’-কথাটি বিচারকের দ্বেষী মনকে নির্দেশ করে। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটি ক্ষুদ্র মনে হলেও, এর মাত্রিকতা গভীর। বিচার চলার মাঝে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রসিকিউশনকে বলতে শোনা গেলো, “শেখ হাসিনার যে অপরাধ তাতে তাঁকে ১৪০০ বার ফাঁসি দেয়া উচিত।” অন্যদিকে, সরকারের আইন উপদেষ্টাকে বলতে শোনা গেলো, “শেখ হাসিনার যে অপরাধ, তা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর থেকেও মারাত্মক।” সেটিই দেখা গেলো জাজ সাহেবদের এরকম প্রতিশোধপ্রবণ ভাষিক প্রকাশে। এর আগেই বিচারকেরা, বিচার চলাকালে দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার একটি কথিত অডিও বক্তব্যের সূত্র ধরে, আদালত অবমাননার ছুঁতোয় ছয় মাসের দণ্ড দিয়ে বসলেন। সেদিন থেকেই কিন্তু তাঁরা এই বিচার চালানোর আর অধিকারী নন। এটি বিচার করা নয় (Justicing), বরঙ বিচারকে ধাওয়া করা। অনেকটা গ্রামের সালিশে অভিযুক্তকে কড়া করে শাসিয়ে দেবার মতো। 

এতে “দোষী সাব্যস্ত না হওয়া অবধি একজন আসামি নির্দোষ”–আইনের এই স্বীকৃত নীতি হোঁচট খেলো। বিরাগ, অনুরাগ এবঙ প্রতিহিংসার প্রকাশ পেলো। ট্রাইবুনালের শাস্তি কঠামোতেও এর প্রতিফলন সুস্পষ্ট–‘কোটা মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা পাবে না তো রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে’- প্রধানমন্ত্রীর এই কথার জন্যই মৃত্যু না হওয়া অবধি যাবজ্জীবন দিয়ে বসলেন আদালত। সেটি ছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তৈরি করা অভিযোগসমূহের প্রথমটি। 

ট্রাইবুন্যাল শাস্তিতে তাতে তালি পেলেন না। অবশ্য জজ সাহেবরা দর্শকদের সহানুভূতি পাচ্ছিলেন। ইংরেজি উচ্চারণ করতে যে কষ্ট হচ্ছিলো তাঁদের, তাতে করে যেকোনো শ্রোতাই নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারেননা। বিচারের এমন বড় স্তরে তাঁদের প্রথম রায় বলে কথা! অবশ্য আদালত কক্ষে উপস্থিত প্রসিকিউশন এবং জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত দর্শকরা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যখন ট্রাইব্যুনাল অন্য অভিযোগগুলোতে শেখ হাসিনার ফাঁসির ‘সিদ্ধান্ত’ ঘোষণা করলেন। তাঁরা করতালি দিলেন, উল্লসিত হলেন। বাকি অভিযোগগুলো কি? জুলাই আন্দোলনে ঢাকার চানখাঁরপুলে পাঁচজনের মৃত্যু, আশুলিয়ায় ৫-৬ জনের মৃত্যু, রংপুরের আবু সাঈদের মৃত্যু এবং আন্দোলন দমনে’প্লেন, ড্রোন ও লেথাল অস্ত্র ব্যবহারের অর্ডার’। বলাই বাহুল্য, শেষেরটা আলাদা কোনো চার্জ হতে পারেনা, কারণ, এগুলো কোনো অপরাধ করার উপায় মাত্র। অর্থাৎ প্রসিকিউশন ‘চার্জটাও’ ঠিকমতো ‘ফ্রেম’ করতে পারেনি। 

দাবি করা হয়, জুলাই আন্দোলনে ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে। সংখ্যাটি নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। এখানে দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট ১১-১২ জন হত হবার জন্য অভিযোগ আনা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, বাকি হত্যাকান্ডগুলোর জন্য কে বা কারা দায়ী? কেউ হয়তো বলবেন যে, ট্রাইব্যুনালে আরো মামলাতে তাঁকে জড়ানো হবে। কিন্তু আইনের ‘ডাবল জিওপার্ডি’ নীতি অনুযায়ী একই বিষয়ে আবার তো তাঁকে আর জড়ানোর সুযোগ নেই। বিভিন্ন হিসাব থেকে দেখা যায়, জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কমপক্ষে সাড়ে পাঁচশত অধিক সাধারণ দণ্ড আইনে নিচের আদালতে হত্যা মামলা হয়েছে। সেই মামলাগুলো যদি দেশের স্বাভাবিক আদালতে চলতে পারে (যেটি ব্রিটিশ আইনজীবী জন ক্যামেগ সম্প্রতি হাউস অব লর্ডসের একটা সেমিনারে বলেছেন)। তাহলে এই মামলাগুলো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে করার যৌক্তিকতা কি? এতগুলো সাজানো ফৌজদারী মামলা এটাই ধারণা দেয় যে, রাষ্ট্র আসলে মনে করে এখানে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংগঠিত হয়নি বরং দেশীয় আইনে ফৌজদারি অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে, যার প্রকৃত আসামি অনির্ণীত বা তর্কসাপেক্ষ। 

এবার আমি মামলার আরো একটু গভীরে প্রবেশ করি। প্রথমে বলে নিই, অধ্যাপক ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন একটি আইনি শূন্যতায় দাঁড়িয়ে আছে। এই আইনি শূন্যতায় গঠিত আদালত, প্রসিকিউশন, বিচারক এবং আইনি সংশোধনী সবগুলোই বেআইনি। এবং কোন আইনগত ফলাফল বহন করে না। তারপরেও যেহেতু বিচারটি হয়েই যাচ্ছে, এবং চাই বা না চাই আমাদেরকে দর্শক হিসেবে সেটা দেখতে হচ্ছে, সুতরাং ভ্রান্তি দূর করবার জন্য একটু গভীরে গিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে। 

আসামির অনুপস্থিতে বিচার হয়েছে (trial in absentia)। অনুপস্থিতিতে বিচার ১৯৭৩ সালের আইন অনুমোদন দিলেও, তা শুধু কঠোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনুমোদিত: কার্যকর নোটিশ, স্বেচ্ছায় অনুপস্থিতি, অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব, এবং প্রত্যাবর্তনের পর পূর্ণ পুনর্বিচারের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। এসব মানদণ্ড আইসিসি, রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়া, সিয়েরালিওন প্রভৃতি ট্রাইবুনালের একাধিক মামলায় সাব্যস্ত আছে। এর কোনোটিই মানা হয়নি। রাষ্ট্রনিযুক্ত একজন আইনজীবী ছিলেন যিনি আসামিকে ডিফেন্ড করা নয় বরং অভিনয়ে বেশি লিপ্ত ছিলেন। অভিযুক্তের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই হয়নি তাঁর। রাজনৈতিক বৈরি পরিবেশে আত্মরক্ষা করতে কেইই বা আসবে। যখন অন্তর্বর্তী প্রশাসন ভয়, নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের পরিবেশ তৈরি করে, তখন অনুপস্থিতি কখনও স্বেচ্ছায় বলা যায়না। তাই বিচারটি অবৈধ ও পরিত্যাজ্য। 

যে আইনটি প্রয়োগ করা হচ্ছে তার নাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন। আইনটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে করেছিলেন। আইনের উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধ, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ ইত্যাদির বিচার করা। লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় ‘সহযোগী’ বাহিনীর সদস্যরা। যাদরেকে আমরা রাজাকার, আলবদর ও আলশামস নামে জানি। এখন, নতুন প্রেক্ষাপটে তারাই আদালতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সুতরাং, এটি রিভেঞ্জ বা প্রতিশোধমূলক বিচার মঞ্চ। 

২০১৩ সালে কাদের মোল্লা মামলার রায়ের ৭৮ নম্বর অনুচ্ছেদে আমাদের উচ্চ আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ১৯৭৩ সালের আইনের আওতা হচ্ছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং এই আইনটিকে বর্তমানে সংঘঠিত কোন অপরাধের ক্ষেত্রে জোর করে বিস্তৃত করবার কোন আইনগত ভিত্তি নেই। বিশেষ করে বর্তমান আইনগতভাবে বিতর্কিত সরকার এই আইনটিকে যথেচ্ছভাবে চারবার সংশোধন করেছে। সংসদের অনুপস্থিতিতে অধ্যাদেশের অপব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের মতন একটি মৌলিক আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে যেগুলো লক্ষ্যভেদী বর্ণচোরা অসাংবিধানিক সংশোধনী। 

এ সকল সংশোধনীর মাধ্যমে একদিকে আইনের আওতা যেমন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে করা হয়েছে, তেমনি সংশোধন করা হয়েছে সেনাবাহিনীর ইন্টেলিজেন্সকে টার্গেট করে, অপরাধের ভূতাপেক্ষা কার্যকারিতা নীতির লঙ্ঘন করে, মানবতাবিরোধী অপরাধের উপাদান পরিবর্তন করে, এবং দোষী সাব্যস্ত না হওয়া অবধি নির্দোষতার অনুমান–আইনের এই প্রতিষ্ঠিত নীতি লঙ্ঘন করে। তাহলে দেখা গেল যে, সংশোধনীগুলো করা হয়েছে ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের পরে। কোন ফৌজদারি আইন নিজের ইচ্ছে খুশি মতো পরিবর্তন করে আগে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচার বা য্যুৎসই ব্যক্তি ও সংগঠনকে বিচারের আওতায় আনা যায়না। এটি আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের ‘নুলেম ক্রিমেন’ (nullem crimen) নীতির লঙ্ঘনও বটে। সুতরাং যে আইন দিয়ে বিচার করা হয়েছে সে আইনটিই জিঘাংসামূলক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যার আইনগত কোন ভিত্তি নেই। 

এবারে আসি অভিযোগকারী পক্ষ বিষয়ে যাকে আমরা আইনের ভাষায় প্রসিকিউশন বলে ডাকি। প্রসিকিউশন টিমের প্রায় প্রত্যেক সদস্যই জামায়াত সংশ্লিষ্ট। দলের প্রধান উকিল তাজুল ইসলাম ইতোপূর্বের ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের সহকারী ছিলেন, পরে রাজ্জাক সাহেব লন্ডনে চলে গেলে, ট্রাইব্যুনালে জামাতে ইসলামী নেতাদের প্রধান আইনজীবী হন। যিনি একই আদালতে পূর্বে ডিফেন্স টিমের আইনজীবী ছিলেন তিনি এখন বনে যাচ্ছেন প্রসিকিউশন টিমের প্রধান হিসেবে। এটি আইনজীবীর জন্য যে মৌলিক নৈতিক নীতিমালা এবং নিরপেক্ষ বিচারের যে পূর্ব শর্ত তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি জামাতে ইসলামীর ভ্রাতৃ-প্রতিষ্ঠান এ.বি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং চিফ প্রসিকিউটার হবার পরও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সমাবেশে তাঁকে দেখা গিয়েছে। বিচারের মানদণ্ডে এগুলো অভব্য। অধ্যাপক আসিফ নজরুল এদেরকেই খুঁজে বের করেছেন ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের জন্য। 

এবারে বিচারকদের নিয়ে কিছু বলা যাক। যাঁরা ট্রাইবুনালের বিচারক হয়েছেন তাঁদের কেউই প্রকৃত অর্থে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে লেখাপড়া করেননি। এমনকি তাঁদের হাইকোর্টে বিচার করার অভিজ্ঞতাও নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাইকোর্টের সমমর্যাদা সম্পন্ন একটি আদালত। এই আদালতের চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তজা মজুমদার জেলা জজ হিসেবে অবসর নিয়েছেন ২০১৯ সালে। অর্থাৎ তাঁর সাধারণ সিভিল আইন বা ফৌজদারী আইনে বিচার করবার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে বিচার করবার কোন অভিজ্ঞতা তাদের নেই। অন্য একজন বিচারক শফিউল আলম মাহমুদ দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন জমে উঠলে তিনি ঢাকায় এসে সে সকল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এবং এর পুরস্কার হিসেবে ট্রাইবুনালের জাজ হিসেবে ডাক পান। 

মজার বিষয় হলো তাঁদেরকে প্রথমে নিয়োগ দেয়া হয় “অতিরিক্ত জাজ” হিসেবে সংবিধানের ৯৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। অতিরিক্ত জাজ সাহেবেরা প্রবেশন ভিত্তিতে নিয়োগ পান, তাঁদের পদোন্নতি বা চাকরি স্থায়ীকরণ পারফরমেন্সের উপরে নির্ভর করে। গত এক বছরে ‘মব ভায়োলেন্সের’ ফলশ্রুতিতে নিয়োগ পাওয়া হাইকোর্টের যে ২২ জন জজের চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে এই ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়া এই দুই বিচারকও আছেন। 

তাঁদের চাকরি কনফার্ম করা হয়েছে রায় দেবার এক সপ্তাহ আগে। অথচ গত এক বছরে তাঁরা আর  কোন রায়ই দেননি। তাহলে কথা হলো, কোন রায়ের ভিত্তিতে তাঁদের পারফরম্যান্স বিবেচনা করে পদোন্নতি দেয়া হলো? এটাও শেখ হাসিনা মামলার রায়ের আগে বিচারকদেরকে প্রদত্ত একটি প্রলোভন। এ ধরণের প্রলোভন সংবিধানের ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদ, বিচারিক স্বাধীনতার জাতিসংঘের ১৯৮৫ সালের নীতিমালা এবং বিচারিক শুদ্ধতার ব্যাঙ্গালোর নীতিমালার (২০০২) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।  

এই মামলায় যে প্রমাণভিত্তি দেখানো হয়েছে তা ভয়াবহভাবে অপ্রতুল। প্রসিকিউশন বলছে যে, তাঁরা দশ হাজার পাতার প্রামাণ্য দলিলপাতি আদালতে জমা দিয়েছেন। এটি সত্যি যে, ২০২৪ সালের সহিংস ঘটনার প্রামাণ্য আরো বেশি হতে পারে। কিন্তু দশ হাজার কেন, দশ লক্ষ পাতার সাক্ষ্যও আইনে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত হবে, যদি আপনি দেখাতে না পারেন যে, অভিযুক্তের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার ক্রিমিনাল সম্পর্ক আছে। ভিকটিমের পারিবারিক বিবরণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, তিনটি “প্রসিকিউশন-যাচাইকৃত” অডিও ক্লিপ, প্রধানমন্ত্রীর “রাজাকারের নাতিপুতি” প্রেস ব্রিফিং এবং পুলিশ প্রধানের (পরবর্তীকালে রাজসাক্ষী) সাক্ষ্য— এগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণের উচ্চ মানদণ্ড পূরণ করে না। যে প্রমাণগুলোর কথা, বাজারে রায়ের আগে অপরিপুষ্টভাবে সোশালমিডিয়াতে প্রচিলত ছিল, আদালত যেন হুবহু সেগুলোরই ‘শ্যাডো’ করলেন তাঁর পঠিত রায়ে। 

রায় শুনে মনে হলো, শুধু রাজসাক্ষী মামুনের কথার উপর আদালত অন্তত পঞ্চাশভাগ নির্ভর করেছেন। কোন রাজসাক্ষী নিজেই কোনো মামলায় একজন আসামি থাকেন। সে যখন পক্ষ ত্যাগ করে নিজেই সাক্ষী দিতে চায় বুঝতে হবে যে, তাঁকে আর বিশ্বাস করা চলে না। আইন এ ধরণের সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেবার অনুমতি দিলেও তাঁকে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলে। আব্দুল্লাহ আল মামুন ক্ষমার বিনিময়ে বা কম দণ্ড পাবার প্রতিশ্রুতিতে রাজসাক্ষী হয়েছেন। অভিযোগ আছে, তাঁকে বলপ্রয়োগ করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য আদায় করা হয়েছে। প্রথমত শেখ হাসিনার তাঁকে “কমান্ড” দেবার কোনো কথা নয়, দ্বিতীয়ত, যদি প্রধানমন্ত্রী কোনো নির্দেশনা দিয়েও থাকেন, সেটা  জাতীয় কোর কমিটিতে দেবার কথা। তাহলে, কোর কমিটির আর কোনো সদস্যদের দিয়ে যদি সেই সাক্ষ্য সমর্থিত (corroboration) করা না হয়, তবে আইন অনুযায়ী সেই সাক্ষের উপর আর নির্ভর করা চলেনা। রাজসাক্ষীর এরকম অনুসৃত বিধান সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের আত্মঅপদস্থতা-বিরোধী নীতির (protection against self-incrimination) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কমন ‘ল নীতি অনুযায়ী, বেআইনিভাবে প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণের উপর নির্ভর করাও স্বতঃসিদ্ধ নয় (fruit of a poisonous tree)। 

আরও উদ্বেগজনক ছিল জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার দপ্তরের (OHCHR) অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন এবং হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের মন্তব্যের ওপর ট্রাইব্যুনালের নির্ভরতা। তুর্ক প্রতিবেদনের সাবধানী ভাষা অতিক্রম করে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ সাংবাদিকদের বলেন যে, শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন। ড. ইউনুস ও আসিফ নজরুলের উপস্থিতিতে তুর্কের অমন মন্তব্য ছিল অযাচিত ও কূটনৈতিক আইনের চরম বরখেলাপ। তাঁর কথা উদ্বৃত করা মানে হলো আইনের জায়গায় সাংবাদিকতা দাঁড় করানোর সমতুল্য। OHCHR রিপোর্ট জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল কর্তৃক ম্যানডেটেড নয়।  বরং তা ছিল ড. ইউনুস কর্তৃক কমিশনকৃত এবং যাচাইকৃত একটি প্রতিবেদন, যা অসত্য তথ্যে বা ভ্রান্তিকর  তথ্যে পরিপূর্ণ। সম্প্রতি ওই রিপোর্টের প্রতিটা তথ্য চ্যালেঞ্জ করে নিউইয়র্ক থেকে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে । 

একটি কথা পরিষ্কার করা দরকার, মানবাধিকার ওই অফিস মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের তদন্তের জন্য ম্যানডেটেড ছিলোনা। তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল,জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনে ৬১ নম্বর পাতায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা তার জন্য যোগ্য কর্তৃপক্ষ দিয়ে অধিকতর তদন্ত করতে হবে। সেই অধিকতর তদন্ত বস্তুনিষ্ঠ স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানের কোন উদ্যোগ নিয়ে করা হয়নি। অথচ ট্রাইব্যুনাল এই দুর্বল এবং বেআইনি রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে রায় প্রদান করেছেন।

রায়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর আইনি বিশ্লেষণ ও ঘটনার সাথে আইনের সংশ্লেষ (appreciation of law with fact)। ১৯৭৩ সালের আইনে বলা আছে যে, যদি একই উদ্দেশ্যে অপরাধীরা একসঙ্গে মিলে অপরাধ করে তবে তাঁকে ‘যৌথভাবে’ অথবা ‘ব্যক্তিগতভাবে’ দায়ী করা যাবে। আইনে ব্যবহৃত ‘জয়েন্টলি’ শব্দের উপরে ভিত্তি করে আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের তুলনামূলকভাবে বিতর্কিত একটি মতবাদ জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ বা জেসিই প্রয়োগ করে শেখ হাসিনার দায় নির্ধারণ করেছেন। বলাই বাহুল্য, জেসিই-এর ভুল প্রয়োগ মতবাদটিকে ম্লান করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জেসিই-এর তিনটি মৌলিক সমস্যা স্বীকৃত হয়ে আছে:

১) এই মতবাদ উদ্দেশ্য ও সজ্ঞানের সীমারেখা মিশিয়ে ফেলে;
২) এই মতবাদ অন্যদের অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধের দায় আর একজনের উপরে চাপায়;
৩) এই মতবাদ প্রকৃত ভূমিকা নির্বিশেষে সব অংশগ্রহণকারীকে সমানভাবে দায়ী করে। 

এসব কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা ট্রাইবুনালগুলো হয় জেসিই বাতিল করে দিয়েছেন অথবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছেন বা অবলম্বন করেছেন। জুলাইয়ের মতো জটিল, বহুপক্ষীয় ঘটনার ক্ষেত্রে উল্লিখিত এই ত্রুটিগুলো আরও প্রকট। রংপুর, চাঁনখারপুল ও আশুলিয়ার ঘটনাগুলো পৃথক পরিস্থিতিতে সংঘটিত হয়েছে— আশুলিয়ার ঘটনা এমনকি শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর সংঘটিত হয়েছে। তবু সেগুলোকে একক জেসিই-এর খণ্ডচিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে— যা মতবাদটির অপপ্রয়োগ।

হেলিকপ্টার, ড্রোন বা গুলি ব্যবহারের প্রশ্নটিও ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের বর্তমান মিত্র কিছু ছাত্রনেতা শেখ হাসিনা পদত্যাগ না করলে প্রকাশ্যে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতির কথা বলেছেন। জামায়াতের এক প্রভাবশালী নেতা জানিয়েছেন যে, হাসিনা নিজেও লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। গত এক বছরে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও থেকে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ধ্বংস করবার জন্য আন্দোলনকারীদের এবং তাদের সাথে অনুপ্রবেশকারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিপ্রয়োগ দেশে প্রচলিত ফৌজদারি আইন এবং পুলিশ রেগুলেশন অনুমোদন দেয়। 

এক্ষেত্রে তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগ লিগ্যালিটি, যৌক্তিকতা ও আনুপাতিক হয়েছে কিনা। যাত্রাবাড়ী ও সিরাজগঞ্জে বীভৎস্যভাবে করা পুলিশ হত্যা করেছে তা আজও  অজানা রয়ে গেলো। পুরো তদন্তটিই তো মানুষের কাছে দৃশ্যমানভাবে প্রতিীয়মান হয় এমনভাবে পরিচালনা করা হয়নি। হাইকোর্ট বিভাগ নিজেও সে সময় সারাদেশ আলোড়ন সৃষ্টি করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে পুলিশের নিয়ন্ত্রিত শক্তি ব্যবহারের ও আত্মরক্ষায় গুলি করার আইনি বৈধতা স্বীকার করেছিল। 

ট্রাইব্যুনালের রায়ে প্রতিটি শক্তিপ্রয়োগকে পূর্বপরিকল্পিত এবং শীর্ষ পর্যায় থেকে কমান্ড বা আদেশ হিসেবে দেখানো এবং অপরাধ হিসেবে চিত্রিত করা— এই বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হেলিকপ্টার ব্যবহার নারায়ণগঞ্জ ও মহাখালী একটি ভবনের উপরে আটকে পড়া পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে শেখ হাসিনা তাঁর অনলাইন বক্তব্যে নানানসময়ে নিশ্চিত করেছেন। হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর ঘটনা সমর্থিত নয়, এমনকি সে সময় র‍্যাব এর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ভাবে বিবৃতি দিয়ে এটিকে খন্ডন করা আছে। আর অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে ড্রোন ব্যবহারের ব্যাপারটিও আইনসিদ্ধ। ড্রোন ব্যবহারের লক্ষ্য কি ছিল তা একটি উদ্দেশ্যগত প্রশ্ন, যেটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়েছে কিনা তা ট্রাইব্যুনালের এই উপস্থিত রায় থেকে প্রতীয়মাণ হয়নি। 

ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার দায় নির্ধারণ করবার জন্য সহজপাচ্য আর একটি মতবাদের উপর নির্ভর করেছেন। তাহলো উপরের জনের দায়, মানে যিনি শীর্ষ পদে আছেন তিনি আদেশ দিয়ে অপরাধ করেছেন অথবা উৎসাহ দিয়েছেন অথবা অপরাধ সজ্ঞানে রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আক্রমণের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই অভিযুক্তের মেন্স রিয়া বা দুষ্টমন (guilty mind) প্রমাণ করতে হবে। শুধুমাত্র কতকগুলো খন্ডিত কথার উপর নির্ভর করে এই দুষ্টমন বা গিল্টি মাইন্ড নির্ধারণ করা যায় না। আন্তর্জাতিক আইনে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনটি কঠোর উপাদান প্রয়োজন:

১) কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে প্রকৃত ঊর্ধ্বতন–অধস্তন সম্পর্ক;
২) অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জ্ঞাতসার;
৩) প্রতিরোধ বা শাস্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতা।

জুলাইয়ের ঘটনাবলিতে এর কোনোটিরই স্পষ্ট উপস্থিতি নেই। তবু অস্পষ্ট রাজনৈতিক মন্তব্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য (এ এস এম মকসুদ কামাল) ও দুজন রাজনৈতিক সহকর্মীকে (হাসানুল হক ইনু ও ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস) দেওয়া ফোনকলকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন তা সামরিক নির্দেশ। এটি মতবাদের উল্টো প্রয়োগ। এসব ফোনকল-এর বক্তব্যের সত্যতা সন্দেহজনক। 

এমনকি যা বলা হচ্ছে, তার কোনোটিই হত্যাকাণ্ডের আদেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা চলেনা। যে কথাটি বিশেষভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছে তাহলো অধ্যাপক মকসুদ কামালের সাথে শেখ হাসিনার কথিত “যেভাবে রাজাকারদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তাঁদেরকেও ঝুলানো হবে” এরকম একটা বাক্য। এই কথাকে হত্যার নির্দেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি এক ভয়ঙ্করভাবে অলস ও অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত। চাঁনখারপুলে ঘটে যাওয়া ঘটনা, আশুলিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যু এবং ড্রোন ও হেলিকপ্টার এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সাথে ঢাকা ভার্সিটির ভিসির সাথে এই ফোন কলগুলোর সংযোগ কি তা অনুমান করা কষ্টকর। 

মানবতা বিরোধী অপরাধ প্রমাণের অন্যতম মানদন্ড হলো অপরাধটিকে ব্যাপক (widespread) ও সিস্টেমেটিক (systematic) হতে হয়। জুলাইয়ের সহিংসতার ধরণ ‘ব্যাপক’ ছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণের জন্য ‘পদ্ধতিগত’ চরিত্রও দেখাতে হয়। সেই পদ্ধতিগত রূপ কোথা থেকে এসেছে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী? নাকি পরিস্থিতির সুযোগে নেয়া বিচ্ছিন্ন সক্রিয় দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠী থেকে? পূর্ণ রায় প্রকাশিত হলে এই প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে (রায় নাকি প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু পাবলিক ডোমেইনে কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা)। আপাতত এটুকু মন্তব্য করা সমীচীন হবে যে, জুলাইয়ের ১৫ তারিখ থেকে প্রতিদিন, প্রতিঘন্টায় ঘটনার পালাবদল ঘটছিল ক্ষণে ক্ষণে। সেক্ষেত্রে সরকারকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবার জন্য প্রতিনিয়ত সাবধানী হতে হচ্ছিল এবং একপর্যায়ে কারফিউ জারি করতে হয়েছিল।

আন্দোলনকারীরা তখন সরকারের সাথে আলোচনার ফলাফল উপেক্ষা করে, সকলের অংশগ্রহণে সিদ্ধান্ত হওয়া দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালতের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রতিনিয়ত দাবী দাওয়া বাড়িয়ে যাচ্ছিল। তখন এটি সাধারণ আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে সন্ত্রাসী উপাদান যুক্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে আক্রমণের পদ্ধতিগত প্যাটার্নের যে স্ট্যান্ডার্ড সেটি প্রয়োগ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পদ্ধতিগত কোন আক্রমণ যদি হয়ে থাকে সেটা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তরফ থেকে নাকি আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়া সন্ত্রাসী মদতপুষ্ট গোষ্ঠীর তরফ থেকে (মেটিকুলাস?) সেটি সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্যভাবে তদন্ত হওয়া দরকার। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনাকে ফৌজদারীভাবে দায়ী করার জন্য ‘সিস্টেমেটিক’ উপাদানটি পূর্ণ হয়নি এবং শেখ হাসিনা মামলায় সেটি ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। 

অবাক করা ব্যাপার হলো সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর “মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা…” মন্তব্যের জন্য তাঁকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা হাস্যকর ও অগ্রহণযোগ্য। এটি এই বিচারের মানকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, বরং বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মানকে একদম নিচু স্তরে নামিয়ে এনেছে। প্রধানমন্ত্রীর উক্তিটির যে প্রেক্ষাপট ছিল সেটি উপলব্ধি করতে আদালত ব্যর্থ হয়েছেন। যাহোক, কারও কাছে উক্তিটি সময়ের দাবিতে অপরিমিতিবোধসম্পন্ন, আবার কারও কাছে “অ্যাফারমেটিভ এ্যাকশন” সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় মৌলিক নীতির দৃঢ় প্রতিরক্ষা। উক্তিটি যতই মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করুক না কেন, এটি কোন ফৌজদারি দায় আনায়ন করেনা। এটি আদালতের বিচারমানসকে অত্যন্ত হাস্যস্পদ করে তুলেছে। 

স্পষ্ট করে বলা দরকার: জুলাইয়ের ঘটনার জন্য সামগ্রিক জবাবদিহি প্রয়োজন। মৃত্যু, আগুন, গুলি, অগ্নিসংযোগ, লিঞ্চিং, পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ধ্বংস, পুলিশ হত্যা— এর সবই ঘটেছে। কিন্তু এগুলো ছিল বহুস্তরীয় ঘটনা— রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় উভয় পক্ষই যুক্ত ছিল। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিশেষত এত দীর্ঘ জনজীবনসম্পন্ন রাজনৈতিক নেত্রীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ফৌজদারি দায় আরোপের আগে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘের ম্যান্ডেটেড তদন্ত প্রয়োজন— যার সময়সীমা নমনীয়ভাবে ৫ আগস্টের আগে ও পরে হতে হবে।

দেখা যাচ্ছে, বিতর্কিত বৈধতার সরকারের অধীনে দ্রুত রায় ঘোষণায় আন্তর্জাতিক আস্থা তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচারের শুদ্ধতার প্রক্রিয়া ও আরোপিত শাস্তি ইত্যাদি নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেেছেন। হাউস অব লর্ডসের সদস্য লর্ড কার্লাইল ট্রুথ এন্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন গঠন করতে বলছেন। ভারতের কাছে বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করেছে। কিন্তু ভারতের বহিঃসমর্পন অনুশীলন অনেকগুলো বিবেচনা দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়। বহিঃসমর্পন আইন, পররাষ্ট্র নীতি, জনমত, নন-রিফোলমো নীতি, রাজনৈতিক সংশ্লেষ, বিচার পদ্ধতির স্বচ্ছতা, সর্বোপরি অভিযুক্তের মানবাধিকার এসব বিবেচনা নিয়ে তাঁরা কাজ করে। এদিক দিয়ে দেখলে বলা যায় যে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে বাংলাদেশের অনুরোধে ভারতের সাড়া দেবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে প্রদান করা রায় ও আপিলের অনিশ্চয়তা জটিলতা আরও বাড়াচ্ছে।

বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে আইনের শাসন, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে দেখতে চায়। রায়ের কার্যকর অংশ শুনে আমার মনে হয়েছে যে, আইনই যেন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াল এবং ব্যর্থ প্রমাণিত হলো। দ্রুত, আক্রমণাত্মক ও মতবাদগত আনুগত্যহীন এই রায়টি যেভাবে নেয়া হলো তার প্রভাব সুদূরপ্রসারি। ১৯৭৩ সালের আইনে প্রতিফলিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন আরও স্থির, অভিজ্ঞ হাতে প্রয়োগের দাবি রাখে। বাংলাদেশ আরও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার দাবি রাখে,এমনকি জুলাই আন্দোলনের যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারাও এই রায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলেন। আইনগত শূন্যতা, লিগ্যাল অটোক্রেসি, রাজনৈতিক সাজানো বিচার মঞ্চ, স্বচ্ছতা ও পদ্ধতিগত সুরক্ষার লঙ্ঘন এবং সবশেষে আইনের অপপ্রয়োগ শুধু শেখ হাসিনা নন, বাংলাদেশের ভাগ্যকেও মেঘে ঢেকে দিয়েছে।

লেখক
Masum Billah_Edited
এস এম মাসুম বিল্লাহ, পিএইচডি
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ভিজিটিঙ রিসার্চার, কোট দ্য জুর বিশ্ববিদ্যালয়, নিস, ফ্রান্স

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট