তৃতীয় পর্ব
। আনিস আহমেদ ।
১৯৬৬ সাল থেকেই তদনীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ শুরু হয়, ছয় দফা প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করার বিরুদ্ধে। তবে সেই প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ আরও অনেক তীব্র হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করায়। সেই সময়ে, বিশেষত ইত্তেফাক পত্রিকায়, এই মামলার প্রতিদিনের বিবরণী প্রকাশিত হতো এবং তাতে এ রকমটি প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল যে তাঁর বিরুদ্ধে আরোপিত কথিত দেশদ্রোহিতার জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতে পারে।
শেখ মুজিব কিন্তু একটুও শঙ্কিত ছিলেন না, সামান্যতম ও মনোবল হারাননি। যারাই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে তিনি নির্ভয়ে তাঁর সংগ্রাম অটুট রাখার কথা জানান। আটষট্টি সাল পেরিয়ে উনসত্তর সালে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয় যা ছিল মূলত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিন্ন আন্দোলন। এতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় আওয়ামী পার্টি ও পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি এবং তাদের শিক্ষার্থী শাখা ও সাংস্কৃতিক শাখাসমূহ, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের নিপীড়নমূলক সামরিক সরকার ও রাজনৈতিক দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। কবি, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রীর সম্মিলিত দাবি ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল বন্দির নিঃশর্ত মুক্তি।
আন্দোলনকে বেগবান ও সর্বদলীয় আন্দোলনে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ছাত্র শাখা, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ছাড়াও যুক্ত হয় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) এবং ডাকসুর ছাত্রনেতারাও। এই পরিষদ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, এই ১১ দফা প্রস্তাব সেটির উপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়।
এই সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলনকে তীব্রতর করে তোলে। ২০ জানুয়ারি এই পরিষদের ডাকা ধর্মঘটের সময়ে বামপন্থি ছাত্র নেতা আসাদ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান (তাঁরই স্মৃতিতে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রবেশ পথে একদা আইয়ুব গেটের নামকরণ করা হয় আসাদগেট)। সেই সময়ে মোট ৬১ জনকে হত্যা করা হয়, তাদের মধ্যে ছিল ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত ছাত্র মতিউর। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার একজন আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে হত্যা করা হয় এবং তার হত্যাকাণ্ড এই আন্দোলনকে তীব্রতর করে তুলে। এই ঘটনার তিনদিন পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুজ্জোহা পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই আন্দোলন যে উত্তাল উচ্চতায় পৌঁছায় তাতে পাকিস্তান সরকার কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আটক থাকা শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান। পরের দিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে গণ-সম্বর্ধনা দেওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে) এবং সেখানে ছাত্রনেতা ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ডাকসু তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করলেন। সেই থেকে শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সকলের কাছে বঙ্গবন্ধু নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং তাঁর অবিরাম সংগ্রামের জন্য তিনি সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের কাছে সম্মান ও শ্রদ্ধার মানুষ হয়ে ওঠেন।
এবার আইয়ুব খান সকল রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক ডাকেন। বঙ্গবন্ধুও ওই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন কিন্তু তাঁর ৬-দফা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায়, মুজিব সেই বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসেন। অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব পদত্যাগ করেন, পাকিস্তানে জারি হয় সামরিক শাসন, প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি সত্তর সালে নির্বাচনের তারিখ দেন। তবে সেই প্রসঙ্গ আগামীতে। এখানে কেবল একটি কথা বলা জরুরি যে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৬-দফা প্রস্তাবকে এতটা যে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার মূল কারণ এর মধ্যে নিহিত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এবং প্রয়াত ড. নুরুল ইসলামের অবদান ছিল এই ৬-দফা প্রস্তাব তৈরিতে। আর সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন আওয়ামী লীগের তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ।
(পরবর্তী পর্ব ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এ প্রকাশিতব্য)
লেখক:

আনিস আহমেদ
শিক্ষক, নিবন্ধকার ও বেতার সাংবাদিক; ওয়াশিংটন ডিসি
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক
ঐতিহাসিক সেই ভাষণের শ্রুতিলিখন পাঠ করুন:
মহাকাব্য: ৭ মার্চ ১৯৭১
উত্তাল মার্চের আর সব দিনগুলো:
পড়ুন –১ মার্চ ১৯৭১
২ মার্চ ১৯৭১
৩ মার্চ ১৯৭১
৪ মার্চ, ১৯৭১
৫ মার্চ, ১৯৭১