দ্বিতীয় পর্ব
। আনিস আহমেদ ।
৬ দফা ছিল বাঙালি জাতির জন্য মুক্তির সনদ বা ম্যগনা কার্টা। ৬ দফার মধ্যে আমাদের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। যাঁরা এখন বলেন যে মুক্তিযুদ্ধে কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুর কোনো অবদান নেই, তাঁরা ভুলে যান যে এই ৬ দফা না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হতো না।
যদিও ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যাকে পাকিস্তানিরা প্রধানত প্রত্যাখ্যান করে, এর পরই ৬ দফাকে কেন্দ্র করে একদিকে আন্দোলনের সূচনা হয়, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর উপর নিপীড়ন -নির্যাতন বেড়ে যায়। ১৯৬৬ সালে ২১ এপ্রিল তাঁকে ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিবকে সাময়িক মুক্তি দিয়ে ৯ মে তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হলো পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনের অধীনে। তদানীন্তন শাসকশ্রেণী তাঁকে ও তাঁর সহকর্মীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতের দালাল বলে আখ্যায়িত করা হলো। কিন্তু সব ধরনের দমন-নিপীড়নকে অস্বীকার করে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন জনতা রোষে ফেটে পড়লো। ঢাকা শহরে ব্যাপক আন্দোলন ঘটে গেল। এই আন্দোলনকে দমন করতে, নিরস্ত্র মানুষের মিছিলের উপর সশস্ত্র পুলিশ আক্রমণ চালালো, প্রাণ হারালেন কয়েকজন। তবু মানুষ থাকলো বঙ্গবন্ধু প্রণীত ৬ দফার প্রতি নিরাপোষ। শেখ মুজিব তখনও পাকিস্তানে প্রতিরক্ষা আইনের অধীনে কারারুদ্ধ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহানের প্রস্তুত করা ৬-দফা প্রস্তাবে এমন কিছু ধারা ছিল যা প্রকৃতপক্ষেই অভিন্ন পাকিস্তান রক্ষার জন্য একটা বড় রকমের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার এ কথাও সত্যি যে ৬-দফা প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কথা বলা হয়নি। কিন্তু এই প্রস্তাবে বাঙালির জন্য যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিকদর্শন ছিল, সে কথা মানতে পারেনি তদানীন্তন পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী, মানতে পারেনি এমনকী পশ্চিম পাকিস্তানের কথিত উদারপন্থি দলগুলোও। অথচ বাংলাদেশে ৬-দফা প্রস্তাবের পক্ষে আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং তা অব্যাহত থাকে সত্তরের নির্বাচন পর্যন্ত। নির্বাচনী ইশতেহারে মূল স্থান পায় এই ৬-দফা । তবে সে প্রসঙ্গে যাবার আগে এই ৬-দফা প্রস্তাব বঙ্গবন্ধুর জীবনে যে এক দুর্বিষহ সমস্যা সৃষ্টি করেছিল, সেটির দিকেও আলোকপাত করা দরকার।
এবার পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান এবং তার সরকার অনুভব করলো যে শেখ মুজিবর রহমানের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার অবসান ঘটানোর প্রয়োজন আছে। তার এবং আরও ৩৬ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হলো যা মূলত রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য এই নামে দায়ের করা হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি এক প্রেসনোটে ঘোষণা করে যে, সরকার ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি এক চক্রান্ত উদ্ঘাটন করেছে। সেই ঘোষণায় প্রথমে বঙ্গবন্ধুর নাম ছিল না। পরে ১৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র দফতর এতে শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের নাম অন্তর্ করে। কিছু বাঙালি সেনা কর্মকর্তা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বলা হয় কিন্তু শেখ মুজিব মূলত একজন স্বাধীনতাকামী মানুষ হলেও তিনি এই ষড়যন্ত্রে ছিলেন না তবে তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাকে বিনষ্ট করতে তাঁর বিরুদ্ধেও এই রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় তাঁকেই করা হয় প্রধান আসামি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তারা ভারত সরকারের সহায়তায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা শহরে ভারতীয় পক্ষ ও আসামি পক্ষদের মধ্যে এ ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ থাকায় একে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বলা হয়। মামলার বিচারের জন্য ফৌজদারি দন্ডবিধি সংশোধন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
১৯৬৮ সালের ১৯ জুন ৩৫ জনকে আসামি করে পাকিস্তান দন্ডবিধির ১২১-ক ধারা এবং ১৩১ ধারায় মামলার শুনানি শুরু হয়। মামলায় শেখ মুজিবকে ১ নম্বর আসামি করা হয় এবং ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং’ নামে মামলাটি পরিচালিত হয়। ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে একটি সুরক্ষিত কক্ষে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। মোট ১০০টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়। সরকার পক্ষে মামলায় ১১ জন রাজসাক্ষীসহ মোট ২২৭ জন সাক্ষীর তালিকা আদালতে পেশ করা হয়। তন্মধ্যে ৪ জন রাজসাক্ষীকে সরকার পক্ষ থেকে বৈরী ঘোষণা করা হয়।
১৯৬৮ সালের ৫ আগস্ট ব্রিটিশ আইনজীবী ও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য টমাস উইলিয়ম শেখ মুজিবের পক্ষে ট্রাইব্যুনাল গঠন সংক্রান্ত বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন পেশ করেন। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনায় তাঁর সহযোগী ছিলেন আবদুস সালাম খান, আতাউর রহমান খান প্রমুখ। সরকার পক্ষে প্রধান কৌশুলী ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্জুর কাদের ও অ্যাডভোকেট জেনারেল টি.এইচ খান। ৩-সদস্য বিশিষ্ট ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি এস এ রহমান। তিনি ছিলেন অবাঙালি। অপর দুজন এম আর খান ও মুকসুমুল হাকিম ছিলেন বাঙালি। সরকারি নির্দেশে মামলাটিকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। মামলার এ শিরোনামের পেছনে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের হয়ত উদ্দেশ্য ছিল; মামলার এ নামকরণ করে শেখ মুজিবকে দেশের জনগণের কাছে ভারতীয় চর ও বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলে জনসমর্থন সরকারের পক্ষে যাবে এবং শেখ মুজিবকে কঠোর সাজা দেয়া সম্ভব হবে।
এই মামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে জনবিচ্ছিন্ন করার যে ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল ছিল তা স্পষ্ট ছিল। আর তাঁর ৬-দফা প্রস্তাব যে মূলত স্বাধীনতার দিকেই বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে সেই আশংকায় পাকিস্তানের শাসককূল তাঁকে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে তুলে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু যে বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না , ছিলেন স্বাধীনতাকামী এক ব্যক্তি সেই কথাটি ক্রমশই প্রমাণিত হয়, তাঁর পরবর্তী বিচক্ষণ পদক্ষেপগুলিতে।
(পরবর্তী পর্ব ২৯ আগস্ট, ২০২৫-এ প্রকাশ্য)
লেখক:

আনিস আহমেদ
শিক্ষক, নিবন্ধকার ও বেতার সাংবাদিক; ওয়াশিংটন ডিসি
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক
ঐতিহাসিক সেই ভাষণের শ্রুতিলিখন পাঠ করুন:
মহাকাব্য: ৭ মার্চ ১৯৭১
উত্তাল মার্চের আর সব দিনগুলো:
পড়ুন –১ মার্চ ১৯৭১
২ মার্চ ১৯৭১
৩ মার্চ ১৯৭১
৪ মার্চ, ১৯৭১
৫ মার্চ, ১৯৭১