বাংলাদেশের এক অজপাঁড়া-গাঁ এর দরিদ্র ও নিম্নবর্ণের হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলেন তিনি। তিনি কেবল একজন বিনম্র পড়ুয়াই ছিলেন না, তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। তিনি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের ( Astrophysics) জনক মেঘনাদ সাহা।
বৃটিশ শাসনামলে মেঘনাদ সাহা সারা বিশ্বে একজন খ্যাতিমান পদার্থবিদ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি নক্ষত্রের বর্ণালী বিশ্লেষণে ‘গ্যাসসমূহের তাপীয় আয়নায়ন’ (Thermal Ionisation of Gases) তত্ত্বে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন ঢাকা জেলার তালেবাবাদ পরগনা অন্তর্গত যা বর্তমানে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার আটাবহ ইউনিয়নের বংশী নদীর তীরের শ্যাওড়াতলী গ্রামে বাবা জগন্নাথ সাহা মা ভুবনেশ্বরী দেবীর ঘরে জন্ম নেন মেঘনাদ সাহা। বাল্যকালে তিনি কঠোর দারিদ্র্যপীড়িত অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রতিপালিত হন। তাঁর মুদিদোকানি পিতা চেয়েছিলেন তিনি দোকানের বিক্রি-বাট্টার কাজে তাঁকে সাহায্য করবেন। তবে মেঘনাদের মা এবং কাকা এই পরিকল্পনায় বাধা দিয়ে তাঁর মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করার ব্যবস্থা করেন। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষে মেঘনাদ নিকটবর্তী শিমুলিয়ায় গমন করেন এবং সেখানে তিনি কাশিমপুর জমিদারের পারিবারিক চিকিৎসক অনন্ত কুমার দাসের আনুকূল্যে প্রতিপালিত হতে থাকেন।

মেঘনাদ সাহা
১৯০৫ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এই বছরটি বাংলা প্রদেশের ইতিহাসে ঝঞ্জা-বিক্ষুব্ধ ছিলো আর তার কারণ বঙ্গভঙ্গ। এই ঘটনায় সারা বাংলা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পূর্ববঙ্গ ও আসাম অংশের লেফটেন্যান্ট গভর্ণর জোসেফ ব্যাম্পফাইল্ড ফুলার ঢাকা ভ্রমণে এলে ঢাকার নাগরিকেরা প্রতিবাদ কর্মসূচীর উদ্যোগ নেন। এই প্রতিবাদ কর্মসূচীতে অংশ নেয়ার শাস্তি হিসেবে মেঘনাদের বৃত্তি বাতিল করা হয় এবং তাঁকে স্কুল থেকে বহিস্কার করা হয়। পরবর্তীতে মেঘনাদ সাহা কিশোরীলাল জুবিলী স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সহায়তায় তাঁর স্কুলে বিনাবেতনে ভর্তি হন এবং সাহার জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থাও হয়ে যায়। কিশোরীলাল জুবিলী স্কুল থেকে ১৯০৯ সালে বাংলা, সংস্কৃত, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে সর্বোচ্চ সম্মানসহ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির অধীনে সে বছরের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সারা বাংলায় তৃতীয় ও পূর্ববঙ্গে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
১৯১১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পরীক্ষা দেন এবং এবারে তিনি সারা বাংলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য কলকাতা যান। প্রেসিডেন্সি কলেজে সাহার সহপাঠী ছিলেন আরেকজন বরেণ্য পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সেখানে তিনি স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, স্যার আচার্য প্রফুলচন্দ্র রায়, অধ্যাপক ডি.এন মলিক, অধ্যাপক সি.ই কুলিস প্রমুখ শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেন। যদিও মেঘনাদ সাহা গণিত শাস্ত্রের ছাত্র ছিলেন, তথাপি তিনি স্যার প্রফুলের দ্বারা প্রভাবিত হন, যিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক। অল্পদিনেই মেঘনাদ সাহা তাঁর প্রিয় ছাত্রদের একজন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন। গণিত শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থানসহ তিনি গ্রাজুয়েট (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন।
স্যার আশুতোষ মুখার্জী ১৯১৬ সালে কলকাতায় নবপ্রতিষ্ঠিত কলেজ অব সায়েন্স-এ মেঘনাদ সাহাকে পদার্থবিজ্ঞান ও মিশ্র গণিতের একজন প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দান করেন। এই পেশায় নিয়োজিত থাকাকালে মেঘনাদ সাহা লন্ডনের কিংস কলেজে তাঁর ডক্টরাল থিসিস উপস্থাপন করেন। ১৯১৯ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই বছর ‘Selective Radiation Pressure and its Application to the Problems of Astrophysics’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। এই অভিসন্দর্ভের মধ্য দিয়ে তিনি নভোপদার্থবিদ্যার (Astrophysics) গবেষণা জগতে প্রবেশ করেন এবং তাঁর নতুন কর্মকান্ডের অধ্যায় সূচিত হয়। প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি এবং গুরুপ্রসন্ন ঘোষ বৃত্তি মেঘনাদ সাহাকে ১৯২০ সালে ইউরোপ যেতে উৎসাহিত করে এবং তিনি সেখানকার ইম্পিরিয়াল কলেজে কিছুকাল গবেষণা করেন। ইম্পিরিয়াল কলেজে তিনি নরম্যান লকইয়ার-এর উত্তরাধিকারী প্রফেসর এ ফাউলার-এর সঙ্গে তাঁর সর্বাধিক বিখ্যাত বিজ্ঞান গবেষণাকর্ম ‘গ্যাসসমূহের তাপীয় আয়নায়ন’ (Thermal Ionisation of Gases) প্রকাশনার লক্ষ্যে কাজ করেন। তাঁর তত্ত্ব হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় মানমন্দির-এর স্যার নরম্যান ও প্রফেসর পিকারিং কর্তৃক সঞ্চিত তথ্যসমূহের সুস্পষ্ট ও যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদানে সক্ষম হয়। উপর্যুক্ত বিজ্ঞানিদ্বয় দুই লক্ষ তারকার বর্ণালি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের সুনির্ধারিত দলে শ্রেণীবিন্যস্ত করে।
মেঘনাদ সাহা ১৯২১ সালে তাঁর তত্ত্বের পরীক্ষামূলক যাচাই-এর উদ্দেশ্যে বার্লিন গমন করেন এবং সেখানে প্রফেসর ডবিউ নেরনস্ত-এর গবেষণাগারে কাজ শুরু করেন। বার্লিনে গবেষণারত অবস্থায় তিনি জার্মানির পদার্থবিদদের তাঁর তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত করার জন্য মিউনিখের প্রফেসর সমারফিল্ডের কাছ থেকে আমন্ত্রণ লাভ করেন। ১৯২১ সালের মে মাসে মেঘনাদ সাহা বার্লিনে বক্তৃতা প্রদান করেন এবং তাঁর এই বক্তৃতা Zeitschrift fur Physik-এর ষষ্ঠ খন্ডে প্রকাশিত হয়। বার্লিনে অবস্থানের সময় তিনি কালজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন-এর সাহচর্যে আসেন। প্রায় একই সময়ে স্যার আশুতোষ খয়রা-র রাজার আর্থিক অনুদানে মেঘনাদ সাহার জন্য পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে একটি চেয়ার প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনেন।
তৎকালীন সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এক সঙ্কটপূর্ণ কাল অতিবাহিত করছিল এবং ড. সাহা কলকাতায় অবস্থান করে তাঁর তত্ত্বের পরীক্ষামূলক যাচাই সংক্রান্ত গবেষণাকর্মের জন্য একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে বন্ধু ড. এন আর ধরের চেষ্টায় অধ্যাপক সাহা ১৯২৩ সালের অক্টোবর মাসে এলাহাবাদে পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি অত্র বিভাগের উন্নয়ন সাধন এবং এর পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন ও গবেষণাসূচি প্রণয়নে আত্মনিয়োগ করেন।

বাঁ থেকে বসা, মেঘনাদ সাহা, জগদীশচন্দ্র বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ (রসায়নবিদ), বাঁ থেকে দাঁড়ানো, স্নেহময় দত্ত (পদার্থবিজ্ঞানী), সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দেবেন্দ্রমোহন বসু (পদার্থবিজ্ঞানী), নিখিলরঞ্জন সেন (পদার্থবিজ্ঞানী), জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (পদার্থবিজ্ঞানী), নগেন্দ্রচন্দ্র নাথ (রসায়নবিদ)
ইতোমধ্যে অধ্যাপক সাহার ‘আয়নায়ন তত্ত্ব’ (Ionisation Theory) নিয়ে কাজ করার জন্য অনেক খ্যাতনামা বিজ্ঞানীই আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সর্বাগ্রে ছিলেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হেনরী নরিস রাসেল। অধ্যাপক রাসেল বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র নিয়ে সাহার তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ নিয়ে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেন এবং সাহার অনেক অনুমানের যথার্থতা প্রমাণ করেন। প্রফেসর রাসেলের পথ ধরে ক্যামব্রিজের দুজন মেধাবী স্নাতক আর.এইচ ফাউলার এবং ই.এ মিলনি মেঘনাদ সাহার তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখেন এবং এই তত্ত্বের নতুন নতুন প্রয়োগ চিহ্নিত করেন। ১৯২৫ সালে বিজ্ঞানী আলফ্রেড ফাউলার রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপের জন্য অধ্যাপক সাহার নাম প্রস্তাব করলে দুবছর পর সাহা এই সম্মাননা লাভ করেন। তিনি ফ্রান্সের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির আজীবন সদস্য এবং লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা ফেলো ছিলেন। তিনি এককভাবে অথবা সহকর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তাঁর নতুন প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব ‘পরমাণুর গঠন’ (Structure of Atoms) পদার্থের ভৌত ধর্মাবলী (Physical phenomena) অধ্যয়নে একটি বিরাট অবদান হিসেবে প্রমাণিত হয়।
১৯৩৫ ও ১৯৩৬ সালে পর পর দুবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাবিত হলেও তিনি অবশ্য নোবেল পুরস্কার পাননি। যদিও এখন বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন তাঁর কাজ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতোই।
এলাহাবাদে ১৫ বছরের (১৯২৩-১৯৩৮) অবস্থানকালে মেঘনাদ সাহা ডি.এস কোঠারী, আর.সি মজুমদার এবং পি.কে কিচ্লু সহ আরও অনেকের সহায়তায় একটি সক্রিয় গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলেন। তবে গবেষণা কর্মকান্ড পরিচালনা ছাড়াও এসময় তিনি বিজ্ঞানীদের এমন একটি সম্মিলিত সংস্থায় সংঘবদ্ধ করার ব্যাপারে গভীরভাবে জড়িত হন, যে সংস্থাটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে শুধুমাত্র পেশাগত যোগাযোগই রক্ষা করবে না, অধিকন্তু গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিকভাবে তদ্বির করবে এবং বৈজ্ঞানিক উদ্যোগসমূহের প্রতি জনসমর্থন আদায়ের জন্য যথাযথ ভূমিকা রাখবে। সাহা ১৯৩৪ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স একাডেমী গঠনের প্রস্তাব করেন, যা ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস-এর দায়িত্বসমূহ গ্রহণ করবে। তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে, এ ধরনের সংগঠন রাষ্ট্রকে একটি জাতীয় গবেষণা কমিটি গঠন করতে উৎসাহিত করবে, যেখানে বিজ্ঞানীদের একটি যুক্তিসম্মত প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সাহার এই উদ্যোগের ফলাফল হিসেবে ১৯৩৫ সালে কলকাতায় ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সেস’ প্রতিষ্ঠিত হয়, পরবর্তীতে যার নামকরণ করা হয় ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমী’। ১৯৪৫ সালে ইনস্টিটিউট-এর সদর দফতর ভারতের রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তর করা হয়।
প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়ার সময় মেঘনাদ সাহা বিপ্লবী স্বদেশী আন্দোলনকারী নেতৃত্ববৃন্দের সংস্পর্শে আসেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এবং শৈলেন ঘোষ। অবশ্য বিপ্লবীদের গুঢ় আন্দোলনপন্থার কারণে ইতিহাসবিদগণের পক্ষে মেঘনাদ সাহার বিপ্লবী আন্দোলনের বিস্তারিত জানা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময় মেঘনাদ সাহা অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তরের সাথে জড়িত ছিলেন।
বিপ্লবী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়ে যতীন্দ্রনাথ মুখার্জী (বাঘা যতীন নামে অধিক পরিচিত) এবং পুলিন দাসের মতো নেতার সংস্পর্শে এসে তরুন মেঘনাদ সাহা সশস্ত্র প্রতিরোধে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। এর ফলে ব্রিটিশ নানাবিধ চাপে তাঁর জীবন ওষ্ঠ্যাগত হয়ে যায়। একটি ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে একজন পদার্থবিদের এধরনের বিপ্লবের সাথে জড়িয়ে যাওয়া খুবই বিরল ঘটনা।
অনুশীলন সমিতির সাথে ১৯১৫ এর দিকে পাঞ্জাবের বিপ্লবী সংগঠন গদর পার্টির বেশ ঘনিষ্ট সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে এই দলটির কর্মকান্ড পরিচালিত হত কানাডা ও সানফ্রান্সিসকো প্রবাসী বিভিন্ন বিপ্লবী নেতার মাধ্যমে। বার্লিনে অবস্থিত গদর বাহিনীর কিছু সদস্য বাঘা যতীনকে অবহিত করেন যে জার্মানীর কাইজার উইলহেম ভারতীয় বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভুতিশীল এবং জার্মানী এই বিপ্লবীদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করতে আগ্রহী। এই কর্মকান্ডের তদারকিতে ইন্ডিয়ান রেভোলিউশন কমিটি নামে বার্লিনে একটি সংগঠন তৈরি হয়। কাইজারের মারফত বাঘা যতীন জানতে পারেন হেনরী নামের অস্ত্রবাহী একটি জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে ফিলিপাইন হয়ে সুন্দরবনে ভীড়বে।
মেঘনাদ সাহা এবং যাদুগোপাল মুখার্জীকে এই জাহাজ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ১৯১৫ এর ২ জুন, হেনরী যখন সাংহাইয়ের বন্দরে ভেড়ে, তখন ব্রিটিশ এবং ফরাসী বাহিনী জাহাজটিতে তল্লাশি চালিয়ে সমস্ত অস্ত্র জব্দ করে নিয়ে যায়। জাহাজটি সুন্দরবনে না ভীড়ে জার্মানীতে ফিরে যায় এবং মেঘনাদ সাহা খালি হাতে ফিরে আসেন।

গবেষণাগারে মেঘনাদ সাহা
১৯১৯ সালটি শুধু মেঘনাদ সাহার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্যই গুরুত্বপূর্ন নয়, বরং এ বছরটি ভারতীয় মুক্তিকামী আন্দোলনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার ঠিক পর-পরই এইবছর ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী বিতর্কিত রাওলাট আইন জারি করে। এই আইনের আওতায় যে কোন ব্যক্তিকে সন্দেহের বশে এবং কোনো রকম আপিল করার সুযোগ প্রদান ছাড়াই আটক করে রাখা যাবে এবং তাদের আইনি সুবিধাবঞ্চিত করা যাবে। এই আইনের বিরুদ্ধে সারা ভারতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আন্দোলনের তীব্রতা বাংলা এবং পাঞ্জাবেই সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। এই আইনের প্রেক্ষিতেই মহাত্মা গান্ধী সত্যাগ্রহ চালু করেন। ব্রিটিশ সরকার সেই সময় যেখানে সম্ভব হয়েছে কঠোরভাবে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করেছে।
১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসারের জালিয়ানওয়ালাবাগে একটি নৃসংস ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ কর্নেল রেজিনাল্ড ডায়ার একটি নিরস্ত্র প্রতিবাদের উপর নির্বিচারে গুলি করার আদেশ দিলে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। মেঘনাদ সাহা এর প্রতিবাদে লেখালেখি করেন। বিদ্যমান নৃশংসতায় মনোবল হারিয়ে তিনি পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করেন। নিজের জ্ঞান দিয়ে তিনি ভারতের উন্নয়নকল্পে মনোনিবেশ করেন।
ভারতের নানাবিধ সমস্যা যেমন: নদী ব্যবস্থাপনা, রেলওয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভারতের বিদ্যুৎব্যবস্থা এসব নিয়ে লেখালেখি করেন এবং ভারতজুড়ে এসব বিষয়ে সাংস্কৃতিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তাঁর সারা জীবনের অন্যতম প্রেরণা ছিলো জাতির জন্য বিজ্ঞান সচেতনতা এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমেই জাতির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা। ১৯৩১ সালে তিনি Academy of Sciences of the United Provinces of Agra and Oudh প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩২ সালে তিনি এর প্রেসিডেন্ট নিয়োজিত হন।
একাডেমির প্রেসিডেন্ট পদ নেওয়ার দুই বছরের মাথায় তিনি Indian Science News Association প্রতিষ্ঠা করেন। এই এসোসিয়েশনের সহায়তায় তিনি Science and Culture নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করেন। ১৯৫৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি একই জার্নালের সম্পাদক হিসেবে কাজ করে গেছেন। প্রখ্যাত ব্রিটিশ জার্নাল Nature এর আদলে গঠিত এই জার্নালটিতে বিজ্ঞানের সামাজিক অবদানসমূহ তুলে ধরা হতো এবং অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার দূর করে সাধারণ মানুষের মাঝে বিজ্ঞানের ধারণা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চালানো হতো। সাহা আশা করেছিলেন এই জার্নালের লেখাগুলোতে সাধারণভাষায় গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হবে যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে এবং বিজ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের সমস্যাগুলো এই জার্নালের গবেষণাপত্রে উঠে আসবে। এর মাধ্যমে তিনি চেয়েছিলেন ভারতীয় সমাজে সাংস্কৃতিক এবং মানবীয় চর্চা বৃদ্ধি পাবে, জাত-পাতের সমস্যা দূর হবে, মানুষের মধ্যে সমতা তৈরি হবে এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির গঠনমূলক সমালোচনা উঠে আসবে।
Science and Culture জার্নালটির প্রথম ভলিউমে মেঘনাদসাহার নিজের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশ পায়। এর মধ্যে রয়েছে “Ultimate constituents of matters” যাতে সমসাময়িক নিউক্লীয় পদার্থ বিজ্ঞান, বোরের এটমিক মডেল এবং তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। “The march towards absolute zero” তে জার্মানীতে নার্নস্টয়ের গবেষণাগারে থাকাকালীন তাঁর পোস্টডক্টরাল কাজকর্ম তুলে ধরেন। “The existence of free magnetic poles” এ ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাকের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার ধারণা এবং একক চৌম্বক মেরুর অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এবং “Spectra of comets” গবেষণাপত্রে সাহার প্রাথমিক গবেষক জীবনের জোতিঃপদার্থবিদ্যার বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় যাতে তাঁর ধুমকেতুর বর্ণালী বিষয়ক গবেষণা উঠে আসে।
১৯৩৩ এবং ১৯৩৫ সালে ড. সাহা দুটি বিজ্ঞান সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন- একটি হচ্ছে ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি (১৯৩৩) এবং অন্যটি ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ এসোসিয়েশন (১৯৩৫)। এই সংবাদ সংস্থাটি ১৯৩০-এর দশকের মধ্যভাগ হতে Science and Culture নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করে আসছিল, যেটি ভারতের জাতীয় পুনর্গঠন ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিতর্কে বিকল্প রাজনৈতিক উচ্চারণ হিসেবে কাজ করত। ড. সাহা জাতীয় পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানের ব্যবহারের ওপর প্রস্তাব পেশ করেন এবং সুভাষচন্দ্র বসুর বিখ্যাত লন্ডন তত্ত্বের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। সুভাষ বসু তাঁর প্রদত্ত লন্ডন তত্ত্বে জাতি গঠনমূলক কর্মকান্ডে বিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতাকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখেন। পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ১৯৩৮ সালে গঠিত জাতীয় পরিকল্পনা কমিটিতে অধ্যাপক সাহা একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে মনোনীত হন।
১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পালিত অধ্যাপক’ (Palit Professor) হিসেবে যোগদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সময়কালে পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। পারমাণবিক পদার্থ বিজ্ঞানে নব আবিষ্কৃত ইউরেনিয়ামের পারমাণবিক বিদারণ বিক্রিয়া (nuclear fission reaction) এবং শিল্প-কারখানায় পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ওপর অধ্যাপক সাহা গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি এম.এসসি পাঠ্যক্রমের একটি বিশেষ বিষয় হিসেবে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সকে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এর জন্য একটি বিশেষ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। নিউক্লিয়ার ফিজিক্স চর্চার একটি পৃথক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর একক প্রচেষ্টার ফলে ১৯৫১ সালে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মেরী জুলিও কুরী ইনস্টিটিউটটি উদ্বোধন করেন। গবেষণা কেন্দ্রটির নাম দেওয়া হয় ‘ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’। ড. সাহার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ হয় ‘সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’।
ভারতের অপর খ্যাতনামা পদার্থ বিজ্ঞানী হোমি ভব (Homi Bhaba) পরমাণু শক্তি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করলে ১৯৪৮ সালে ভারত সরকার ড. সাহার মতামত জানতে চান। তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং যুক্তি দেখান যে, প্রয়োজনীয় পরমাণু জনশক্তির যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি তখন পর্যন্ত ভারতে এর সুষ্ঠু শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠেনি। মেঘনাদ সাহার বিরোধিতা সত্ত্বেও ভারত সরকার ভব-এর প্রস্তাব অনুসারে পরমাণু শক্তি কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যায় এবং সাহা নিজেকে ক্রমশ তার সর্বাধিক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব পন্ডিত নেহেরুর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেন।

সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন মেঘনাদ সাহা
তবে অধ্যাপক সাহা জাতীয় ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা অব্যাহত রাখেন এবং তাঁর জার্নালে তিনি এসব বিষয় নিয়ে লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন। ভারতের নতুন সরকারের কাছে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে তাঁর অনেক চিন্তাভাবনা বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপিত হয়। দামোদর উপত্যকার উন্নয়ন, খরা ও দুর্ভিক্ষের পুনঃসংঘটনের সমস্যা, জাতীয় ভিত্তিতে বিজ্ঞানের সংগঠন, জলতাত্ত্বিক গবেষণার উন্নয়ন প্রভৃতি জাতীয় পর্যায়ের নদী উপত্যকা উন্নয়ন কর্মসূচী প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত হয়।
এই জর্নালের সম্পাদকীয়তে তিনি খোলা মনে ভারতীয় সরকারের বিজ্ঞান বিষয়ক নীতিমালার সমালোচনা করেন। বিশেষ করে তিনি ভারতের স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর বিভিন্ন উদ্যোগের সমালোচনা করেন। তিনি মনে করতেন নেহেরু বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠার জন্য খুবই তাড়াহুড়া করছেন এবং এটি করতে গিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি, ভারতের উপযোগী প্রযুক্তির প্রতি জোর দিচ্ছেন না। নেহেরু একজন স্বপ্নদ্রষ্টা কিন্তু তাঁর বৈজ্ঞানিক দক্ষতার অভাবের কথা সাহা তাঁর সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া সাহা একেবারে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশ থেকে থেকে উঠে আসা মানুষ তাই তাঁর পক্ষে সাধারণ মানুষের চিন্তাধারা, প্রয়োজনীয়তা এসব উপলব্ধি করা সহজ, কিন্তু অভিজাত পারিবারিক ইতিহাসের নেহেরুর পক্ষে সাধারণ্যের প্রয়োজনীয় সবকিছু উপলব্ধি করা সহজ নয়। এই চিন্তার কারণে সাহার সাথে নেহেরুর তিক্ততাও তৈরি হয়।
তাঁর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অনুভূতি তাঁকে ১৯৫১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেঘনাদ সাহা তাঁর নিকটতম কংগ্রেস প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে ভারতের লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি দেশ বিভাগের পর লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সংশিষ্ট ছিলেন। শরণার্থী পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার লক্ষ্যে ড. সাহা বেঙ্গল রিলিফ কমিটি গঠন করেছিলেন।
হতদরিদ্র, শিক্ষাবঞ্চিত, নিম্নবর্ণের পরিবার থেকে দুঃখ-কষ্টের কষাঘাতে জর্জরিত হতে হতে বড় হয়েছেন মেঘনাদ সাহা। এত কিছুর পরেও তিনি শুধু একাডেমিক দিক থেকেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি বরং একজন সংগঠক হিসেবে বিজ্ঞানকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সারা ভারতের মানুষের মাঝে। জনগণ এবং শিক্ষার প্রতি সতত নিবেদিত প্রফেসর মেঘনাদ সাহা ছিলেন একজন অক্লান্ত কর্মী।
১৯৫৪-র পর থেকে পরিশ্রমী এই জ্ঞানকর্মীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী এক বৈঠকে যোগদানের উদ্দেশ্যে দিল্লীর পরিকল্পনা কমিশন দপ্তরে যাওয়ার পথে প্রফেসর মেঘনাদ সাহার মহাপ্রয়াণ ঘটে।
বাঙালীয়ানা/এসএল