রসুন

Comments

দীলতাজ রহমান

সকালবেলা ছেলেমেয়েরা যখন অফিসে যাচ্ছে ঠিক তখনি ফোন বেজে উঠলো। কেউ মেসেঞ্জারে কল দিয়েছে। এমন ব্যস্ত সমস্ত সময়ে এরকম কল সাধারণত বাংলাদেশ থেকে আসে, অস্ট্রেলিয়ার সাথে যাদের সময়ের ব্যবধানটা জানা নেই, তারা করে।

চশমা চোখেই ছিল। দেখলাম শিবলু কল দিয়েছে। দরজা খুলে বাইরে গেলাম। বাইরে বৃষ্টিসহ হু হু বাতাস। এমনিতে এখানে শীতকাল। তাই শীতটা গায়ে খুব লাগলো। তবু ফোল্ডিং চেয়ারটা খুলে আয়েস করে বসতে বসতে বললাম, কী রে, কী মনে করে?

– তরে মনে করে! তরে মনে করতে নাই?

– কই আর তুই আমারে মনে করলি?

– মনে হরাহরি থাক। তুই রসুন নিয়ে গল্পডা লেখছো?

– এই সাতসকালে তুই আমার গল্প লেখা নিয়ে পড়লি ক্যান?

– রসুন আর ছৈয়ালের আলাপডা তুই যেইবাবে করছো, কইছিলি এইডা নিয়া তুই তাড়াতাড়িই লেখবি! তাই হঠাৎ মনে অইলে তুই এক ছৈয়ালের কতা নিয়া গল্প যদি লিখতে পারোস্, আর আমার সাথে যহন তোর আবার দেহা অইলে, তো তোর গল্পে আমার কতা কী লেহস, লেখলে জানাইস! রাহি!

এভাবে লাইন কেটে দিলে কার না মেজাজ খারাপ হয়! শিবলুর সাথে বহু বছর আমি কেন আমাদের কারো সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ছিলো বলে জানা ছিলো না। অস্ট্রেলিয়া আসার পথে সেবার সম্ভবত ট্রানজিট পড়েছিলো হংকং। প্লেনে ওঠার আগে তো দেখা হয়ই নাই। ঘন্টা চারেকের ফ্লাইটে উঠেও না। নামার সময় দেখা! মনে হয়েছিলো ও ওখানেই পাতাল ফুঁড়ে উদয় হয়েছে! চোখ-মুখও ছিলো তেমনি ভাবলেশহীন। ওকে দেখে আমার কলিজার ভেতর ভীষণ চমকে উঠেছিলো। তাও আবার একই পথের যাত্রী! ওর সাথে তাল মিলিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁফাচ্ছিলাম। টুকটাক নয়, ঠাসঠুস কিছু কথাও হচ্ছিলো। শিবলু শুধু দৌড়াতে দৌড়াতে প্রত্যুত্তর দিচ্ছিলো। এর ভেতর দেখি ও কিছু না বলেই অন্যদিকে যাওয়া শুরু করলো। হতাশকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, ওদিকে কই যাস্?

আমি যামু সিডনি। তুই তো মেলবোর্নে থাহো…। বলে শিবলু চলে গেল! ক’দিন পরে এক সকালে ফেসবুক খুলে দেখি শিবলুর ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট। একসেপ্ট করেই মেসেঞ্জারে কল দিয়ে বললাম, অতদিন পর দেখা হলো এয়ারপোর্টে আর তুই অইভাবে চলে গেলি?

– চইল্লা যামু না তো তরে জড়াইয়া দইরা চুমা খামু? দেহা অইছিলো বুইল্লাই তো তরে খুঁইজ্জা রিকোয়েস্টটা দিলাম। তুই তো তাও দেওনাই! শিবলু তগো জীবন থেইক্কা মইরা গ্যাছে। ক, খোঁজ নেছো এতো বছরে? সেদিন একঘন্টারও কম সময় আছিলো সিডনির ফ্লাইটের। বাসার ঠিকানা দিয়া রাহিস। ফোন নাম্বারও। আমি মাজে মাজে মেলবোর্ন যাই। তবু যামুয়ানে তরে দ্যাকতে। রাহি…। বলেই লাইন কেটে দিয়েছিলো।

আমাপোড়া কাঠকয়লার মতো মনটা জ্বলছিলো। অক্ষম আক্রোশে বিড়বিড় করে বকছিলাম– যেন আমি ওর পাশের বাড়ি থাকি। যেন প্রতিদিন বাড়ির পুকুরের এঘাট-ওঘাটের দূরত্বে দেখা হয়। ওর এমনতরো বিষয় নিয়ে ওকে বকেও দেখেছি। কোনো কাজ হয় না। ও এমনই।

এরপর খুব বেশিদিন যায়নি। মানে কথা হওয়ার দুই সপ্তাহও না। এক পড়ন্ত দুপুরে শিবলু বাসায় এসে হাজির। গেট বোধহয় খোলাই ছিলো। সরাসরি টোকা শুনে দরজা খুলে শিবলুকে দেখে আমি এত আশ্চর্য ও আনন্দিত হয়েছিলাম, কিন্তু খুব কঠিনভাবে সে ভাব লুকিয়ে রাখলাম, কারণ ওর কাছে আমার ওই একটিই মাত্র হার, আমার সরল উচ্ছ্বাসের কাছে ওর কঠিন নিলির্প্তি। তাই নির্লিপ্ত-হিমকণ্ঠে বললাম, আয়…!

শিবলু ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, তোর ভাবখানা দেহি এমনতারা, য্যান আমার আওনের কতা তোর জানা আছিলো?

– এই ভাব তোর থেকে শিখেছি!

– ও আল্লা তুই দেহি ভাত বাইড়াই বইয়া আছো!

– হ্যাঁ তোর জন্য ভাত বেড়ে বসে আছি আর কি? রান্না করতে হবে। তাই বাসিটুকু ঝেড়েমুছে বের করেছি খেয়ে হাঁড়ি-পাতিল খালি করবো!

– তুই সর ওদিকে। আমি দ্যাখতে আছি তুই আমার লাইগা খাবার বাড়ছোস! তয় আমি ভাত খামু না! ভাতগুলা তুই মরিচ পুইড়া খা! ত্যালতেইল্যা স্যামন মাছখানা দেইহা জিব্বায় পানি চইল্যা আইছে। ওইহান আমারে দে! আমার রক্তে বোলে কোলেস্টরল। যা, ইট্টু সালাদ বানাইয়া আন, গোলমরিচের গুড়া ছিঁডাইয়া দিছ্! লেবু দে এক টুকরা! ডায়াবেটিসও বলে আমার কাছে আইয়া দাঁড়াইয়া আছে। বাইচ্ছা চলতাছি দেইক্খা নাগাল পাইতেআছে না! তরে এট্টা সত্যি কতা কই, তুই যা রান্দস, অন্যবাড়ি বইয়া খাইলেও বোজা যায়, এইডা তর রান্দা! আমার মা’য়ও বোলে তর মার থেইকা রান্দন শিখছিলো!

কিংকর্তব্যবিমুঢ় আমি সালাদ কাটতে কাটতে শিবলু আবার বলে উঠলো– সালাদ অইলে কড়া কইরা এককাপ বেলাক কফি দিস্!

আমি হাসবো-কাঁদবো, না রাগ করবো, না আনন্দ প্রকাশ করবো এই বয়সে ওর এমন আচরণে, ভেবে পাচ্ছি না। এ যদি ওর উদ্ভট আচরণ হয়, তবে ও সবসময় এমন! তাই নিজের জন্য বাড়া খাবার ওর দ্বারা সদ্গতি করাতে ওর ফরমাশ খাটতে খাটতে বললাম, কোলেস্টরলের জন্য কী খাচ্ছিস?

এ্যা কি এ্য, তগো ঘরে এট্টা এ্যাশট্রে নাই? এট্টা কাপ দে ছাই ফেলি! তুই, এই তুই একজনের লাইগ্যা এট্টা এ্যাশট্রে কিইন্না এ্যাকুরিয়ামের মইদ্যে রাইখ্যা দিছিলা, য্যান কেউ ব্যবহার না করতে পারে। তাও তর বিয়ার পর, মাইনে তর পোলাপাইন তহন স্কুল-কলেজে পড়ে! ও, এই দ্যাশের ডাক্তারেরা কোলেস্টরলের ওষুধ দেয়? খালি আটতে কয়! ছেমড়ি তুই এই দ্যাশে থাহো, জানো না?

– শোন্, এককোয়া করে রসুন খা। রোজ। খালিপেটে খেলে অনেকের বুক জ্বলে। মুখে গন্ধ হয়…।

– মুখে গন্ধ অইলে অউক। আমি তো আর নতুন কইরা প্রেম কইরা কেউরে চুমা খাইতে যাইতেছি না। তয় আমার বুক জ্বলে! এই, এই এ্যাদ্দিন পর এট্টু সময়ের জন্যি দেহা, অন্যসব কথা বাদ দিয়া রসুন নিয়া তুই সস্তা কবিরাজি ফলাইতে আছোস্, এগুলা শিখলি কবেতন, এ্যাঁ?

– শোন আমি যখন বাড়ি করি এক ছৈয়াল বলেছিলো, সে যুবক বয়সে মোষের রাখাল ছিলো। কবজি ডুবিয়ে প্রতিবেলা মোষের দুধ দিয়ে ভাত খেতো। কিন্তু দুদিন যদি রসুনের ভর্তা না খেতো তাতে নাকি তার ভুঁড়ি নেমে যেতো! সে ছৈয়ালও তোদের বরিশালের ছিলো!

– ওরে আমার খোদারে, চল্লিশ বৎসর আগে তুই বাড়িতে ওয়ালের জাগায় চারখানা ব্যাড়া দিছিলি, আমি তোর বাড়ি দ্যাকতে গিয়া দুলাভাইয়ের লগে আমিও গেছিলাম সে ব্যাড়া কিনতে। কিন্তু ব্যাড়ার কাজ যে হরছে, হেই বুইড়া ব্যাডারে তুই এহনো মাথায় রাখছো? আর একটা ছৈয়ালের কতা তুই সত্যি বুইলা মানছো? ব্যাডার কাম আছিলো ব্যাড়া লইয়া…।

– দেখ ছৈয়ালের এমন কথা সত্যি না হয়ে যায় না! এই যে বড়ো বড়ো কোম্পানির আচার বা এমন অনেককিছু খাস্, সেসব কি কোম্পানির বাপ-দাদার না তাদের ঘরের বউয়ের রেসিপি? ওগুলো সাধারণ বউ-ঝি’দের রেসিপি! দেখিস না ফ্রিজ-টেলিভিশনের লোভ দেখিয়ে সারাদেশ থেকে কোম্পানীগুলো বউ-ঝি’দের একত্র করে?

– বুঝছি, কাগো তুই ওস্তাদ মানো!

মেজাজ এমন খারাপ হচ্ছিলো, মনে মনে বললাম এত ভাল একটা চাকরি করতি, অভিনয়ের দিকে ঝোঁক আগে থেকে ছিলো, চেহারা-সুরত-উচ্চতাও ভাল। চাইলে দেশে থেকে কোনো একটা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারতি। এখানে যা করছিস তা তো শখ করে। সেই কবে শুনেছিলাম চাকরি সূত্রে দেশ ছেড়ে চীনে গিয়েছে। সেখানেই একা বিয়ে করেছে। তারপর কয়েক বছরে বউ সব নিয়ে চলে গেছে। ওর সাথে যোগাযোগ হওয়ার পর সিডনিতে থাকা দেশের পরিচিত এক ফেসবুক ফ্রেণ্ডের কাছে ওর সম্পর্কে এমনিই জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে চিনেছে। বলেছিল বাঙালিদের যে নাট্য সংগঠন আছে, সেখানে ও অংশ নেয় এবং ভাল অভিনয় করে। তাই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ওকে দেয়া হয়। সেভাবেই সে ওকে চেনে।

বউয়ের সাথে মিল হলো কি-না এখন কাছে পেয়েও জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। কারণ আর কারো সাথে না হলেও আমার কাছে ও সুবিধা মতো উত্তর দেবে। তার থেকে সিদ্ধান্ত পাকা করে রাখলাম ওদিকে যাবোই না! 

শেষমেষ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো তুই কী করিস? মানে পেশা কি?

– গাড়ির ব্যাবসা করি!

– মেলবোর্ন আসছিস কেন?

– ওই কাজেই!

– তার মানে তুই পুরনো গাড়ির ব্যাবসা করিস?

– তুই বুঝলি কেমনে?

– আমার ওস্তাদ কারা জানিসই তো!

– ছৈয়াল না হয় রসুনের গুণাগুণ শিখাইছে, কিন্তু এইটা কে শিখাইলো? নতুন গাড়ির ব্যাবসা অইলে তার জন্য অন্যহানে যাওয়া লাগে না?

– আমার চেনা এক দম্পতি আছে ওরা বেড়ানোর ছলে সবখানে ঘোরে আর সুবিধা মতো পুরনো গাড়ি কিনে ভাড়া দেয়। সেটাই তাদের আয়ের উৎস। তাই আমার জানাটা সবসময় সত্য না হলেও পুরোপুরি মিথ্যে হয়ে যায় না! আর শোন রসুন খাওয়া ছৈয়ালরে তুইও ওস্তাদ মানবি আরো একটা বুদ্ধিতে।

– বল, ওস্তাদ মানার মতো মানুষ পাইলে জীবনের ভার কমে। দেহি তর ছৈয়ালরে কিছুডা ভাগ দেওন যায় কি না!

– শোন, তখন ছৈয়ালের সাথে যে লোকটি যোগালির কাজ করতো, সে একদিন ছৈয়ালের বিরুদ্ধে আমার কাছে কিছু বলতে, বললো, ‘আপনে ওনারে এতো বালো পান কা? উনি মানুষটা কত্ত খারাপ জানেন? ওনার বউ আছে তার ওপর ফিরা আবার শালিরেও বিয়া হরছে! পাশাপাশি বাড়ি মোগো, সব জানি!’ আমারও তখন বয়স কম। হাতে সময়ও গড়গড়ায়। আমি যোগালির পরিণতি না ভেবে রে রে করে ছৈয়ালকে বললাম, ছৈয়াল ভাই, সমাজ তো এটা হতে দেয় না, তুমি বউ থাকতে শালিকে বিয়ে করে মৌলবি-মাওলানার মাইর না খেয়ে বেঁচে আছো কেমনে?

কম কথা বলা শিবলু আমার কথা গিলতে গিলতে আমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, তারপর? ছৈয়াল কী কইছেলে তরে?

শিবলুকে বললাম, ছৈয়াল বলছিলো, এইডা আবার আপনেরে কইহল্যে কেডা? তয় হোনেন, হোনছেনই যহন, বাইঙা কই! আমার শাওড়িরে আমার শ্বশুর তালাক দেলে আমার শাওড়ির আবার যেইহানে বিয়া অইছে, আমার হেই শ্বশুরের আগের গরের এউক্কা মাত্র মাইয়া দুইডা পোলাপান নিয়া বিদবা অইয়া বাপের বাড়ি ফিইরা আইছে। জোয়াইনকা মাইয়ার এল্হা থাহনের মতো দশা সেইহানে আছিলে না। শ্যাষে আমার দুই পোলাই তাগো মায়েরে কইলে আমাগো এই নানাও বাইচ্চা নাই। খালার অন্যহানে বিয়া অইলে হেই বেডা অয় আইয়া গরজামাই থাকবো, না হয় সম্পত্তিটুকু বেইচ্চা নিয়া যাইবো। শ্যাষে আমরা বেড়াইতে যামু কই? কিডা আমাগো বোচকা বাইন্দা জিরাতি দিবো? তাই আব্বারে কও খালারে নিকা করুক!

আমি আশ্চর্য হলে বললাম, শুধু বেড়াতে যাওয়া আর বোঁচকা পাওয়ার জন্য তোমার ছেলেরা এমন কি তোমার বউও তোমাকে আবার বিয়ে দিলো?

ছৈয়াল বলছিলো, ইয়া কন কি? খালি বেড়াইতে যাওনের লাইগ্যা অইবে কা? আমার পুলারা তার ওই খালার সম্পিত্তি পাইবে না তাগো বাপেরে বিয়া দিয়া? তয় কি আপনে বোজজেন এমনি এমনি?

– কেমনে লতায়-পাতায় জড়ানো সম্পর্কের খালার সম্পত্তি তোমার ছেলেরা পায়?

– হোনেন কই, আমি মরলে, আমি তাগো খালার স্বামী ইসাবে যেডু পামু, সেডুকতন তাগো খালায় আর তাগো মা’য় মিইল্যা পাইবে একআনা হইর‌্যা দুইআনা, আর তারা দোনো ভাইয়ে পাইবে চৌদ্দআনা…।’

আমার কথা শেষ হলে শিবলু বললো, ‘ভাবো ভাবো, ভাবা প্রাকটিস করো!’ এত বছর দইরা কিংবদন্তি চলচিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের এই বাণী খালি আওড়াইতেআছি। এই সেদিনও, মাইনে চাইর নভেম্বর তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বিদেশে বইয়া এত্তবড় একখান বক্তৃতা লেইখ্যা আমি ঝাড়লাম। তবু সেই মহাপুরুষ পারে নাই মোর মতো মাইনষেরে সত্যিকার অর্থে ভাবা প্রাকটিস করাইতে। বাণীডা খালি কানের কাছ দিয়ে গোরছে! তোর ছৈয়ালে সত্যিই এবার আমারে ভাবনার খাদে ফেলাইয়া দেলে! এবার ভাবনা প্রাকটিস করতে পারমু!’ 

শিবলু কতক্ষণের জন্য এসেছে বলেনি। ও এলে আমার আজো মনে হয় সময়ের চাকা বন্ধ হয়ে থাক। কিন্তু ওর সাথে আমার প্রেম দূরে থাক বন্ধুত্ব’র মতোও কিছু ছিলো না। সম্পর্কে ও ফুপাতো ভাই। তাও তিন পুরুষ আগে তার নানার পূর্ব পুরুষ আর আমার দাদার পূর্বপুরুষ আপন ভাই ছিলো এটা জানা যায়। শিবলুর মা মারা গেলে সে মামার বাড়ি চলে আসে। শূন্য হাতে গায়ে পড়ে যে কেউ কোনো অনটনের বাড়িতে আশ্রয় নিলে তার কদর বেশিদিন থাকে না। তার ওপর প্রভুহীন কুকুরের মতো কিশোরবেলা! তাই বেঁধা তিরের মতো আপন মামাদের পরিবারগুলোর সেই অবহেলার যন্ত্রণাটা যারা ওর ভেতর টের পেতো, মানে একই শ্রেণিভুক্ত আমাদের মা-চাচিদের অনেকে, যারা ওর আপন মামি ছিলো না, তাদের কেউ কেউ ওকে কাছে পেলে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। ভালো কিছু রান্না হলে ডেকে খাওয়াতো। কিন্তু কোনোদিন কারো প্রতি ওর কোনো ভাবান্তর আমি দেখিনি! এমন কি সৎমার কারণে বাবার ওপর অভিমান করে যাদেরকে আশ্রয় জেনে চলে এসেছিল এবং তাদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েও তাদের প্রতিও না! 

কাছাকাছি বয়স আমাদের তবু শুধু ওর ওইটুকু বিশেষত্ব বেশি বুঝতাম বলেই অনেকের ভেতর থেকে যেন আমার কাছে ওর অমূল্য কিছু বন্ধক রাখা আছে! যেন ও একটুকরো ধূপের প্রাণে একবিন্দু আগুন! ও কী মনে করে সেই কবে একদিন, ওই একদিনই বলেছিলো, ‘মা’র কথা মনে হলে তোর কথা মনে পড়ে! মা যেন চেহারায় না হলেও কিছু একটা রেখে গেছে তোর স্বভাবে!’

আমার বিয়ের পর দূরের আত্মীয়-স্বজনদের জন্যও আমার বাসাটা ঠাঁই হয়ে উঠেছিলো। একসাথে যাদের সাথে বেড়ে উঠেছিলাম তাদের জন্য তো বটেই! কারণ তখন ঢাকা শহরে অনেকেরই কোনো আত্মীয়-স্বজন ছিলো না। কিন্তু শিবলু প্রথম দিকে ঘন ঘন এলেও ক্রমে আসাটা কমিয়ে দিয়েছিলো। সে নিয়ে কৈফিয়ত তলব করলে একবার শুদ্ধ ভাষায় বলেছিলো– দুঃখ-হাহাকার নিয়ে সুখি মানুষদের ভেতর বেশি ভিড়তে নেই। তাতে দুঃখের মর্যাদা কমে যায়। দুঃখ খুব দামি বিষয় বুঝলি! সুখি মানুষেরা দুঃখের মূল্য না বুঝে দুঃখওয়ালাদের সম্মান না করে করুণা করে। সেটাই আমার সহ্য হয় না। তাই এখন তোর কাছে আসতে দুঃখগুলো অন্য কোথাও রেখে আসতে পারি না বলে আসতে ইচ্ছে করে না! একসময় দেখবি, বহু বহুদিন তোর আমার দেখা নেই!

আমি বলেছিলাম, তুই না এলে আমি দুঃখ পাবো…।

শিবলু হা হা করে হেসে বলেছিলো, মনে কর, দুইপ্রান্তে দুই দুঃখি মানুষের বসবাস। একজনের দুঃখ যথার্থই দুঃখ, আরেকজনের দুঃখ দুঃখের মতো…, হা হা হা…।

শিবলু বসা থেকে সটান উঠে দাঁড়ালো। তা কি চলে যাওয়ার জন্য না হাত-পা’র ঝিম ঝাড়ার জন্য আমি তা বুঝে ওঠার আগেই যেন স্বগোক্তি করতে লাগলো, যাইগিয়া রে। আর দুইঘণ্টা পর ফ্লাইট। একঘণ্টার বেশি লাগবো এয়ারপোর্ট পৌঁছতে। টিকেট কাটা না থাকলে আইজ রাইত হোটেলে থাইক্কা যাইতাম। কিন্তুক আগামীকাল একটা নাটকে পার্ট আছে। এইহানতন সরাসরি দলের প্রেসিডেন্টের বাসায় গিয়া রিহার্সেল দিতে যাওন লাগবো! অন্যরা অপেক্ষা করবো!’ ওর এসব যে আমি জেনেছি আমি তা চেপে যাই। কারণ ওর এতটা অধিকার ছিলো না আমার থেকে ওর নিজেকে এতোটা যোগাযোগহীন রাখার!  

বয়স সবারই মাথার চুল হালকা করে কপাল বড়ো করে তোলে। কিন্তু শিবলুর আগের মতো তেমনি মাথা ভরা চুল। সময় শুধু তাতে সাদামেঘের পরশ বুলিয়েছে। আমাদের একটি বাড়িতে পঞ্চাশটির মতো পরিবার বাস করতো। এদের কারোই তিনবেলা পেটপুরে খাওয়ার মতো অবস্থা ছিলো না। খাদ্যে যেখানে টানাটানি, সেখানে দেখতে নির্ভরতার মতো হলেও প্রতিটি সম্পর্কই থাকে চোরা টানাপোড়েনের থাবার ভেতর। তারওপর ছিলো না সেখানে কোনো একটি পরিবারেও এমন কেউ, উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েগুলো যার কাছে থেকে কোনোরকম দিকনির্দেশনা পেতে পারতো। অথবা কারো শুধু সত্যনিষ্ঠ আচরণে অভিভূত হয়ে পরবর্তী প্রজন্ম তাকে আদর্শ মানতে পারে। তবে পুরো বাড়িতে সমান তালে লেখাপড়ার চলটা ছিলো। সেটা কম করে হলেও আগের প্রজন্মেরও ছিলো। আর ছিলো একজন আরেকজনকে টপকে সামনে যাওয়ার আশাবাদিতা। সেটাও আগের থেকে। তাই যে কারণে পাথর গড়াতে গড়াতে গোলাকার ধারণ করে সেভাবেই পুরো বাড়ির ছেলেমেয়েরা একইভাবে শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলো। যে ক’জন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিলো, শিবলু তাদের একজন। তাই সয়ম্ভূ বলতে যা বোঝায় শিবলু আসলে তাই! তারওপর ও কোনোদিন কারো ভিতরে বিরক্তির উদ্রেক করেনি। সেটুকুই যেন সে চিরদিন সুসংহত করে রাখতে চেয়েছে। আর তার প্যাশনই হয়তো তাকে সর্ব অর্থে আজো এতোটা ঋজু রেখেছে। কৈশোরে সুযোগ পেলে ও আমার হাতের খাবারটুকু ছোঁ মেরে দূরে গিয়ে তারিয়ে খেতো। আজও হঠাৎ এসে তেমনি একটু সুযোগ পেয়ে যেন ষোলকলা পূর্ণ করতে পেরে সে তুষ্ট। এরচেয়ে বেশি আশা করলে হয়তো আমার নিয়তিই বদলে যেতো!

আরো এককাপ কফি এনে শিবলুর সামনে রাখলে ও হেসে বললো, তুই হাঁসের মতো শুধু আমারেই খওয়াইবি?’ আমি মুখে তিতিবিরক্তির ভাব ফুটিয়ে বললাম, তোর খেদমত করতে করতেই তো আমি মরছি! আমার কথায় শিবলু হা হা করে হেসে উঠলো এবং আগ্রহ নিয়ে কফিটা খেয়েই যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো। আমি ওর পিছন পিছন গেট পর্যন্ত গেলাম। ও গেটের বাইরে গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে আমার মাথায় জোরে চাটি মেরে বলল, বেডা ছৈয়াল এতদিনে নির্ঘাত মরছে। কিন্তু তোর মাথার বিতর দুইডা কার্যকরী বিষয় ডুকাইয়া অমর অইয়া আছে। কী কপাল ব্যাডার! তর এইডা মাথা না রদ্দিমালের দোকান এহন তাই ভাবদেয়াছি…। আগে বাবদাম তর এত ব্যস্ততা, এতো ছুটাছুটি তার বেতর শিবলু মুরসালিন নামের কেওরে তুই চিনতি এইডাই বোধহয় বুইলা গেছোস্, তাই বাবছিলাম সবাইরে বুইলা যাইতে সুযোগ দিই…।’ বলতে বলতে পকেট থেকে চারপাশে সুতা ওঠানো একটুকরো সাদা কাপড় বের করে সতর্ক হাতে আমার সামনে মেলে ধরলো। যাতে অপটু হাতের সেলাই করা অসমাপ্ত ক্ষুদ্র একটি নকশা। শিবলু বললো, তুই বাড়ির ভাবীগো কাছে রুমাল শিলাই শিখতেআছিলি মনে আছে? শেলাই শ্যাষ অওনের আগে সে রুমাইল আরাইয়া গেলো। হায় রে তর চিল্লাফাল্লা! কান্দনে বাড়িতে বন্যা বইয়া গেছিলো। তুই এইডা খুঁজতে খুঁজতে খালি আমারে বাদ দিয়া আমাগো সমাইন্না সবগুলারে একেক করে চোর দরলি। মনে উডলে আমি এহনো হাসি। আমারে তুই এ্যকবার সন্দেহও করলি না! আমি জানি এইডা শিলাইয়া তুই কারে দিতি, এই লাইগা লুকাইয়া ফেলছিলাম, বিশ্বাস কর চুরি করি নাই! এই তোর সেই অসমাপ্ত রুমাল! এহন ছৈয়ালের লগে আরো এট্টা মুখও যোগ অইলে তোর বিশেষভাবে মনে রাখতে। আমি নিশ্চিত…। তর এইহানে আমু দেইখ্যা আবর্জনা ঘাইট্টা এইডা লইয়া আইছি।

বুকের ভেতর একটা প্লাবন টের পেলাম। মুহূর্তে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমার যেন মন একাই হিসেব করে ফেললো, আমার বিয়ে হয়েছে পঞ্চাশ বছর। এ রুমাল তারও আগের। ব্যবহারহীন থাকায় কাঠপেন্সিলের আঁকও অম্লান রয়ে গেছে। চুরির জন্য করা চুরির যে এক ক্ষুদ্র অহেতুক বস্তু ও চারযুগের বেশি সময় ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে, এর কী মূল্য ও নির্ধারণ করে, তা ওর ওপর ছেড়ে শুকনো কণ্ঠে বললাম, তোকে একটা বর্ণচোরা বলা যায় বড়জোর…! আমার কথা পা বাড়ানো শিবলুর কানে গেলেও সে আর ফিরে তাকায় না! কিন্তু ওর অহেতুক রুমাল চুরির মতো আমিও অহেতুক প্রসারিত দৃষ্টিতে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ ওকে দেখা যায়…। 

লেখক:
Diltaj Rahman
দীলতাজ রহমান
গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও কবি; বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট