বদিউল আলম, ডাকনাম তপন হলেও আমাদের বন্ধুমহল, বিশ্ববিদ্যালয়, যুদ্ধক্ষেত্র- সর্বত্র সে বদি নামেই পরিচিত ছিল। বদির সাথে আমার পরিচয় ১৯৬১ সালে, যখন আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হই। বদির ছোট ভাই ফজলুল আলম (সেলিম) আমার সহপাঠি ছিল। বদির সঙ্গে পরিচয় থাকলেও তেমন সম্পর্ক গড়ে উঠে নাই কারণ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে এক বছরের সিনিয়র হলেও অনেক সিনিয়র, তাই ঘনিষ্ঠতার সুযোগ ছিল না। পরবর্তিতে ১৯৬৭ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলাম। একই বিভাগে বদি আমার এক বছরের সিনিয়র ছিল। সেখানে দেখা সাক্ষাৎ হতো, আড্ডা দেয়ারও যথেষ্ট সুযোগ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে বদি ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এন.এস.এফ)-এর সাথে যুক্ত ছিল কিন্তু আমার কোন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না। বদি exceptionally brilliant ছিল, প্রচুর বই পড়তো। সাধারণতঃ সে কথা কম বলতো, হয়তো নিজের সার্কেলের মধ্যে কথা বলতো।
প্রকৃতপক্ষে ঘনিষ্ঠতা বলতে যা বোঝায় বদির সঙ্গে সেটা আমার গড়ে উঠেছিল ১৯৭১ সালে-মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কিশোরগঞ্জ এবং জাওয়ারে। মে হতে জুলাই মাস পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে থাকতাম, খেতাম। সেখানে আমরা বেশ কিছু অপারেশন করেছিলাম। আহামরি কিছুু করতে পারিনি তবে সে সময়ের প্রেক্ষিতে অপারেশনগুলোর যথেষ্ট গুরুত্ব¡ ছিল। আমাদের দলে ছিল বদি, তার জজ মামা, মুশতাক মামা, খালেদ মামা, মনু (সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা), আমি আর স্থানীয় এক ছেলে জহির উদ্দিন। আমাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করতো বদির ছোট ভাই সেলিম, সাজু (বদির খালাতো ভাই), তারেক মামা। আমরা অনুধাবন করতে পারছিলাম যে আমাদের লোকবল বাড়াতে হবে, অস্ত্র বাড়াতে হবে। অস্ত্র যোগাড়ের উদ্দেশ্যে আমরা একবার তাড়াইল থানা ঘেরাও করলাম। ওসিকে রুমে পাওয়া গেলো। কিন্তু তেমন লাভ হলো না। রাইফেলের বোল্ট খোলা ছিল। তখন আমাদের সামগ্রিক কর্মকান্ড বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। প্রশিক্ষণ নেই, অভিজ্ঞতা নেই, প্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতি নেই। শুধু তাই নয় কোন ভবিষ্যৎ চিন্তা,পরিকল্পনা কিছুই ছিল না। যাই হোক, আমরা জানতে পারলাম সার্কেল অফিসারের কাছে একটা পয়েন্ট টুটু রাইফেল আছে। এটা তখন আমাদের কাছে অনেক বড় বিষয় ছিল। তড়িঘড়ি তার বাসা ঘেরাও করা হলো। বদি ভেতরে গেল, আমরা সব বাইরে অবস্থান করছিলাম। সার্কেল অফিসার তো কেঁদেকেটে এক সার, জানালো তার কাছে এ অস্ত্র নেই, কোনো কালে ছিলও না। আমাদের অস্ত্রশস্ত্র বলতে ছিল একটা পিস্তল, একটা শটগান, চারটা থ্রি-নট-থ্রি, রাইফেল, চারটা গ্রেনেড এবং কিছু গুলি।
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ের একটি ঘটনা-যেটা আমি যতদিন বেঁচে থাকবো আমার স্মরণে থাকবে। আমি তখন মোহাম্মদপুরে ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের পিছনে থাকতাম। ২৫ মার্চ এর বিভীষিকাময় রাত্রির পর আমরা তখন পুরোপুরি হতবুদ্ধি। ১৯৭১ সালে ক্র্যাকডাউনের পর ২৭ মার্চ যখন কারফিউ তোলা হলে যতদূর মনে পড়ে, আমি ধানমন্ডি গিয়েছিলাম। বদির একটা মোটরবাইক ছিল। সেও মোটরবাইক নিয়ে হাজির হলো সেখানে।
বদি বললো, কি করছ?
বললাম, কি করার আছে?
বদি বললো, Injustice is being done to us. And we can’t take it lying down. We have to retaliate.
বললাম, Somebody has to do something about it.
বদি বললো, Yes, that somebody has to be you or me.
ঐ মুহূর্তের আগ্ পর্যন্ত কি হচ্ছে, কি করতে হবে, কি করা যায় সেই বিষয়ে আমার কোন স্বচ্ছ ধারণাই ছিল না । বদিই আমাকে সর্বপ্রথম আমাদের করণীয় সম্পর্কে একটা সূত্র ধরিয়ে দিয়েছিল সেদিন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আরেকটি ঘটনা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে। আমরা একবার কিশোরগঞ্জ থেকে পাকুন্দিয়া গেলাম, বদির দাদাবাড়ি। খাওয়া দাওয়া করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর খালু (বদির বাবা) আমাকে বললেন, বদির মায়ের সাথে কথা বলে যেতে। গেলাম ভেতরে। খালা বসতে বললেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোরা কি করছিস?
বললাম, কি আর করবো? আমাদের যা মনে হয় করা উচিত, তাই করছি।
শুনে বললেন, তোরাতো আমাদের কথা শুনবি না। তোরা বন্ধু-বান্ধবদের কথা শুনিস।
তারপর যেটা বললেন সেটা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। বললেন, আমার ছেলে দেশের জন্য মরে যাক্-আমার কোন আপত্তি নাই, আফসোসও নেই। কিন্তু সে আনরিকোগ্নাইজড্ অবস্থায় রাস্তাঘাটে মরে পড়ে থাকবে-সেটা আমি চাই না। ওকে তোরা বোঝা। ওকে কোন ট্রেনিং ক্যাম্পের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয়ে প্রশিক্ষণ নিতে বল এবং তারপর যুদ্ধ করুক।
আমি বললাম, ঠিক আছে। আমি কথা বলবো। এরপর বদিকে আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। শুনে বদি মুচকি মুচকি হাসল। হ্যাঁ না কিছুই বলল না। কিন্তু ট্রেনিং ক্যাম্পে সে যাবেই না।
জুলাই এর ৩য় সপ্তাহ হবে। বদিসহ নিয়ে ঢাকা আসলাম । তিনদিন থাকবো। ধানমন্ডিতে ছিলাম। কথা ছিল যাওয়ার দিন বদি ওখানে আসবে। নির্ধারিত দিনে বদি এসে বললো, ‘তুমি বাইরে আস। তোমার সাথে কথা আছে।’
ধানমন্ডি-৪ হতে আমরা হাঁটতে হাঁতে ধানমন্ডি-৭ এ এলাম, সেখানে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের একটা অফিস ছিল। দেখলাম একটা বেঞ্চিতে স্বপন (কামরুল হক স্বপন, বীর বিক্রম) বসে আছে। স্বপনের সাথে আমার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যদিও সে এক বছরের সিনিয়র ছিল। ও থাকতো মালিবাগে। বদি বললো, স্বপনকে কংগ্রাচুলেট করো।
জানতে চাইলাম, কেন?
ওরা একটি পাওয়ার ষ্টেশন ব্লো আপ করেছে। গুলি প্রায় ওর কাঁধের কাছ দিয়ে পাস করে গেছে। বলে শার্ট নামিয়ে দেখালো। দেখলাম ব্যান্ডেজ করা। তারপর বললো, আমি যেতে পারবো না। তুমি চলে যাও।
বললাম, তুমিতো আমাকে প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে আমার সাথে ফিরে যাবে।
তখন সে বললো, আমি স্বপনদের সাথে জয়েন করছি। এখানে অস্ত্রপাতির কোন সমস্যা নাই। প্রচুর আর্মস ও অ্যামিউনিশনস আছে।
বদি থেকে গেল। বদির সাথে এটাই আমার শেষ দেখা ছিল। সম্ভবত জুলাই ২৮/২৯ হবে। আমার বন্ধু আলিমকে সঙ্গে নিয়ে জাওয়ার (কিশোরগঞ্জ) ফিরে গেলাম। তারপর আমার মা ও বোনদের নিয়ে মেঘালয়ে বাবার কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে আমি ও আলিম তুরাতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের জন্য ঢুকে পড়লাম। এখানে উল্লেখ করবো, আমার বাবা সেসময় কিশোরগঞ্জের এস.ডি.পি.ও ছিলেন। তিনি এপ্রিল মাসেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং বর্ডার ক্রস করে মেঘালয় চলে যান। কাজেই আমার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল মা ও বোনদেরকে বাবার কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া।
কোন রকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই বদি এতো দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হতে পেরেছিল-এর মূলে ছিল ওর বেপরোয়া ভাব ও দুর্দান্ত সাহস। প্রাণের ভয় না থাকলে সব কিছুই সম্ভব। দেশের সেই পরিস্থিতিতে শুধু বদি নয়, অনেকেরই প্রাণের ভয় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বদি যে দুঃসাহসিক অপারেশনগুলো করেছিল তাতে সহজেই অনুমেয় যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং অসীম সাহসিকতার কারণেই তার পক্ষে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ আয়ত্ব করা সম্ভব হয়েছিল।
পরিশেষে, নিয়তির পরিহাসের কথা দিয়ে আমার স্মৃতিরচারণ শেষ করছি। আমরা জাওয়ার, তাড়াইল এবং আশেপাশে এলাকায় ছোট খাট অপারেশনে সম্পৃক্ত থাকলেও সেগুলো ঝুকিঁপূর্ণ ছিল। বদির দলে তার আপন মামা ছিল, বন্ধু মনু ছিল। কিন্তু কেন জানিনা বদি আমাকে বার বার প্রতিজ্ঞা করাতো যে যদি সে আহত হয়ে যায়, তাহলে আমি যেন তাকে হত্যা করি কেননা সে ওদের অত্যাচার সহ্য করতে পারবে না। বদির পরিণতি নিয়ে যখন ভাবি, অনুধাবন করি- নিয়তির অমোঘ বিধান কেউ খন্ডাতে পারে না। বদিও পারেনি। পাকবাহিনী নির্মম নির্যাতন শেষে তাকে হত্যা করে। যেই বিষয়টি সে মনেপ্রাণে চায়নি, সেটিই ছিল তার নিয়তিতে।
বন্ধু শহীদ বদিউল আলম, বীর বিক্রম-এর একাত্তরতম জন্মবার্ষিকীতে সমগ্র বাঙালি জাতির সঙ্গে সশ্রদ্ধচিত্তে তাকে স্মরণ করছি।
লেখক:

কাজী মোহাম্মদ আলী আনোয়ার (হেলাল)
শহীদ বদিউল আলমের বন্ধু ও সহযোদ্ধা (কিশোরগঞ্জ)
অনুলিখন: রুবিনা হোসেন
*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক