Do & Die: চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ

Comments

১৯৭১ সালের এপ্রিলের ১৭ তারিখে মেহেরপুরের আম্রকাননে দ্বিজাতিতত্বের সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের হিংস্র নখর ছিঁড়ে শাসনতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেছিল রাষ্ট্র “বাংলাদেশ” শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে।

১৯৩০ সালের এপ্রিলের ১৮ তারিখে চট্টগ্রামে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে চট্টগ্রাম শহরের কর্তৃত্ব ৪ দিন দখলে রেখে সারা ভারতবর্ষকে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল ৭৩ জন তরুণ বিপ্লবী সূর্যসেনের নেতৃত্বে।

মাস্টারদা ১৯৩০ সালে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রায় চল্লিশ বছরের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে ভিনদেশী শাসক শোষকের কবল থেকে বাংলাকে মুক্ত করেছিলেন গড়েছিলেন “বাংলাদেশ”।

১৯৩০ সালে ১৮ থেকে ২২ এপ্রিলের “যুব বিদ্রোহ” সূর্যাস্তহীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজসিংহাসনে গজাল ঠুকে দিয়েছিল। আর সে কারণেই “চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ”কে তারা জনতার সামনে “অস্ত্রাগার লুণ্ঠন” হিসেবে প্রচার করেছিল। এর কারণ ছিল এতে তাদের সূর্যাস্তহীন সাম্রাজ্যে এমন একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটেছিল তা ভারতের জনগণ জানলো না আবার ব্রিটিশদের ইগোতেও আঘাত লাগলো না। চট্টগ্রামের স্বাধীনতার ঐ চারটি দিন চট্টগ্রাম ছিল বিপ্লবীদের সম্পূর্ণ করায়ত্বে, ইংরেজদের কোন ক্ষমতা ছিল না ওদের ফেরাবার তা যদি ব্রিটেনের ট্যাক্স পেয়াররা জেনে ফেলতো তা হলে তা সরকারের জন্যে খুব সুখকর হতো না। ২২ তারিখে জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনী যখন সামান্য কয়জন অপ্রশিক্ষিত তরুণের হাতে নাকানিচুবানি খেয়ে

April 22_CTG_02

চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের শহীদ

৮০ জন সর্বোচ্চ প্রশিক্ষিত ব্রিটিশ সৈন্য হারিয়ে পিছু হটেছিল তা কি ব্রিটিশ সেনা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে খুব সম্মানের ছিল? তাইতো ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহকে “ভারতের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে সাহসিকতাপূর্ণ কাজ” বলে চিহ্নিত করেছেন। যা ছিল দু’শ বছরের ইতিহাসে ইংরেজদের জন্য সবচাইতে অপমানজনক ঘটনা। ইংরেজ বাহিনীর এদেশের মানুষের কাছে প্রথম পরাজয়।

এখানে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের ১৮ থেকে ২২ এপ্রিলের ঘটনাপঞ্জি দেবার চেষ্টা করলাম:

১১, ১২, ১৩ মে, ১৯২৯

এ সময় আয়োজিত চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। এই সম্মেলনে সূর্যসেন, অনন্ত সিংহ, গনেষ ঘোষ ও ত্রিপুরা সেন কংগ্রেসের অহিংস নীতি সমর্থন না করার কথা এবং তারা সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে চান বলে জানান সুভাষ বসুকে। নেতাজী এতে নৈতিক সমর্থন জানান। আর এরপরই তারা নতুন করে সশস্ত্র দল গঠন করতে শুরু করেন।

১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯২৯

লাহোর সেন্ট্রাল জেলে বিপ্লবীদের সাথে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ৬৩ দিন অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন যতীন্দ্রনাথ দাশ। যতীন দাসের অনশনে প্রাণত্যাগের ঘটনার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে এবং ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সশস্ত্র বিদ্রোহের আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয় এ ঘটনায়।

১৫ অক্টোবর, ১৯২৯

এক সভায় সিদ্ধান্ত হয় তাদের ঐ সশস্ত্র দল হবে “ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি”র চট্টগ্রাম শাখা। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন মাস্টারদা সূর্যসেন। প্রায় পাঁচ ঘন্টা আলোচনা করে সভায় উপস্থিত সূর্যসেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, নির্মল সেন, গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন:

  • চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারী ঘাঁটি দখল করে বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করা হবে;
  • এই বিদ্রোহের উদ্দেশ্য এর মাধ্যমে সারা ভারতের জনগণকে সশস্ত্র বিপ্লবে উদ্দীপ্ত করা;
  • মূলমন্ত্র নির্ধারণ – “Do and Die”;
  • চূড়ান্ত সফলতার জন্যে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রস্তুতি;
  • চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত কর্মী বাহিনী সংগ্রহ ও তাদের যথাসাধ্য প্রশিক্ষণ দান;
  • অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য জিনিষ সংগ্রহ;

১৯৩০ এর ১৮ই এপ্রিল তারিখটি বিপ্লবীরা সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য বেছে নিয়েছিলেন আয়ারল্যান্ডের ইস্টার বিদ্রোহকে স্মরণ করে।

চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের প্রস্তুতি

পাঁচ ছয় মাসের চেষ্টায় অনন্ত সিংহ ১৪টা অস্ত্র কিনতে পেরেছিলেন। বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল আনন্দ গুপ্তর বাড়ী। এপ্রিলের প্রথম দিকে বিস্ফোরক তৈরির সময় আহত হলেন রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, তারকেশ্বর দস্তিদার ও অর্দ্ধেন্দু দস্তিদার। এরপর এ কাজের ভার নিলেন গনেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ। তাঁরা সতেরটি তাজা বোমা তৈরি করেন।

মোটর গাড়ীর জন্য অনন্ত সিংহের ১টা, মাখনদের (পূর্ণ নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি) ২টো, হেরম্ব বলের ১টা, ডা: জগদা বিশ্বাসের ১টা গাড়ি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়। সে জন্য কয়েকজনকে ড্রাইভিং শেখানো হয়।

ব্রিটিশ শোষকের কর্মকান্ডের ফিরিস্তি, বিদ্রোহের কারণ ইত্যাদি ব্যাখ্যা করে তিন ধরনের প্রচারপত্র লেখেন গনেশ ঘোষ।

ত্রিপুরা সেনকে দায়িত্ব দেয়া হয় টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিসের সংবাদ সংগ্রহের।

আসাম বেংগল রেলওয়ে ব্যাটেলিয়ন এর হেডকোয়ার্টারের সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয় সুবোধ চৌধুরীকে।

গনেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহকে দায়িত্ব দেয়া হয় পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সংবাদ সংগ্রহের।

শহরের তিনটি বন্দুকের দোকান সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব রজত সেনকে দেয়া হয়।

রেললাইন তুলে ফেলার জন্য শহর থেকে ৮০ মাইল দূরে উপযুক্ত স্থান রেকি করবার দায়িত্ব শঙ্কর সরকার ও হারান দত্তকে দেয়া হয়।

ইউরোপীয়ান ক্লাবের সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয় নরেশ রায়কে।

চূড়ান্ত পরিকল্পনা

চূড়ান্ত আক্রমণের ৫ মিনিট আগে টেলিফোন-টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করা।

টেলিফোন-টেলিগ্রাফ অফিস দখলের ৫ মিনিট পর পুলিশ লাইন দখল করে সেখানে অস্হায়ী সরকারের হেডকোয়ার্টার স্হাপন।

টেলিফোন-টেলিগ্রাফ অফিস দখলের ৫ মিনিট পর আসাম বেংগল রেলওয়ে ব্যাটেলিয়ন এর হেডকোয়ার্টারের A.F.I আর্মারী দখল করা।

ধুম ও লাঙ্গলকোট স্টেশনে রেললাইন বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব চারজন করে আটজনকে দেয়া হয়।

বিদ্রোহের উদ্দেশ্য জনগণকে জানাতে প্রচারপত্র বিলির দায়িত্ব অর্দ্ধেন্দু গুহ, সুখেন্দু দস্তিদার, হরলাল চৌধুরী ও দীনেশ চক্রবর্তীকে দেয়া হয়।

সবার জন্য মিলিটারী খাকী পোষাক, ওয়াটার বটল প্রভৃতি সরঞ্জাম যোগাড় করা হয়।

১৮ এপ্রিল, ১৯৩০- রাত ১০টা – স্বাধীন বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা

মাস্টারদা সূর্যসেনের সর্বাধিনায়কত্বে ৭৩ জন বিপ্লবী দেশকে সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে মুক্ত করার উদাহরণ সৃষ্টির জন্যে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও চট্টগ্রামকে মুক্ত করে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করার লক্ষ্যে অভ্যুত্থান শুরু হলো।

রাত ঠিক দশটার সময় অম্বিকা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে ক’জন বিপ্লবী টেলিফোন-টেলিগ্রাফ ভবন আক্রমণ করে এবং দখলে নিয়ে চট্টগ্রামকে সারা বিশ্ব থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেললো।

দেবপ্রসাদ গুপ্ত, হিমাংশু সেন, হরিপদ মহাজন, সরোজ গুহ, গনেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, গনেশ ঘোষের নেতৃত্বে পুলিশ অস্ত্রাগার অধিকার করার জন্য ৬ জনের দল রাত-১০টা বাজবার ১৫ মিনিট আগে গনেশ ঘোষের বাড়ী থেকে রওনা হলো।

পুলিশ অস্ত্রাগারে বিপ্লবীরা জড়ো হবার পর তাদের লক্ষ্য করে পুলিশ লুইস গানের গুলি করে। গুলি বিপ্লবীদের কারো গায়ে লাগেনি। চার পাঁচ মিনিট পর গুলি থামিয়ে ইংরেজরা পালিয়ে যায়। এই সময় অতিরিক্ত অস্ত্রশস্ত্রে আগুন লাগাতে গিয়ে হিমাংশু সেন আহত হলে তাকে নিরাপদে রেখে আসার জন্য গনেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, জীবন ঘোষাল ও আনন্দ গুপ্ত তাকে নিয়ে শহরে গেলে তাদের সাথে মূল দলের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

অস্ত্রাগার অধিকার করে সেখানে বিপ্লবীদের হেডকোয়ার্টার স্হাপন করা হলো। বৃটিশ পতাকা পুড়িয়ে ভারতীয় পতাকা তোলা হলো। বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন বিপ্লবী সরকার গঠন করে ঘোষনাপত্র পাঠ করলেন। চট্টগ্রাম ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হল মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে গুটিকয় দামাল তরুণের দ্বারা।

নরেশ রায়, বিধু ভট্টাচার্য, ত্রিপুরা সেন, অমরেন্দ্র নন্দী, মনোরঞ্জন সেন, হরিগোপাল বল নরেশ রায়ের নেতৃত্বে বিধু ভট্টাচার্য, ত্রিপুরা সেন, অমরেন্দ্র নন্দী, মনোরঞ্জন সেন ও হরিগোপাল বল ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিতে যেয়ে ব্যর্থ হন। কারণ সেদিন গুড ফ্রাইডে থাকায় ইংরেজরা সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে গিয়েছিল।

অক্সিলিয়ারী ফোর্স অস্ত্রাগার অধিকার করার জন্য লোকনাথ বলের নেতৃত্বে মাখন ঘোষাল, নির্মল সেন, রজত সেন, সুবোধ চৌধুরী, ফনীন্দ্র নন্দী গাড়িতে করে অ্যাকশনে যান। হেঁটে যান আরো চারজন শান্তি নাগ, নিতাই ঘোষ, ক্ষীরোদ ব্যানার্জী ও প্রভাস বল। অক্সিলিয়ারী ফোর্স অস্ত্রাগার অধিকার করে তাঁরা। অনেক অস্ত্রশস্ত্র পেলেও গুলি পাননি একটাও। তাই পরবর্তীতে সেগুলো কোন কাজেই আসেনি।

উপেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বিজয় আইচ, শঙ্কর সরকার এবং সুশীল দে চট্টগ্রাম থেকে ৭২ মাইল দূরে নাঙ্গলকোট স্টেশনের কাছে রেললাইন তুলে ফেলল এবং পাশে টেলিগ্রাফের তার কেটে দিল। লালমোহন সেনের নেতৃত্বে সুবোধ মিত্র, সুকুমার ভৌমিক ও সৌ্রীন্দ্র কিশোর দত্তচৌধুরী চট্টগ্রাম থেকে ৬০ মাইল দূরে ধুম স্টেশনের কাছে রেললাইন তুলে ফেলল এবং পাশে টেলিগ্রাফের তার কেটে দিল। রাত ৯.৫৫তে মালগাড়ী উল্টে পড়ে পথ অবরুদ্ধ হল।

বিদ্রোহের উদ্দেশ্য জনগণকে জানাতে এবং তরুণদের সৈন্য দলে ভর্তি হবার আহ্বান জানিয়ে ঘোষনাপত্র প্রচারের ব্যবস্থা করা হল। শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর উপর দায়িত্ব ছিল ঘোষনাপত্র বিভিন্ন অঞ্চলে পৌছে দেবার। অর্ধেন্দু গুহের দায়িত্ব ছিল সদরঘাট- ফিরিঙ্গি বাজার অঞ্চল, সুখেন্দু দস্তিদার দেওয়ান বাজার- চকবাজার অঞ্চল, দীনেশ চক্রবর্তী ডবলমুরিং জেটি অঞ্চল। হরলাল চৌধুরীর দায়িত্ব ছিল চট্টগ্রামের বাইরে ঘোষনাপত্র প্রচার করা।

নির্বিঘ্নে প্রচার কাজের মধ্য দিয়ে কেটে গেল ১৯, ২০, ২১ তারিখ। বিপ্লবীরা জানতেন চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগ না করতে পারলে ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট ও কোলকাতা থেকে সৈন্য পাঠাবে ব্রিটিশ সরকার। তাই তাঁরা শেষ লড়াইয়ের স্থান হিসেবে বেছে নিলেন যুদ্ধ কৌশলগত সুবিধাজনক স্থান হিসেবে জালালাবাদ পাহাড়। ২১ তারিখ সন্ধ্যায় তাঁরা অবস্থান নিলেন জালালাবাদ পাহাড়ে।

April 22_CTG_03

চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের শহীদ

২২এপ্রিল, ১৯৩০ – বিকেল ৩ টা

জালালাবাদ পাহাড়ে তখন বিপ্লবীরা কেউ রাইফেল পরিষ্কার করছে কেউ বা ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। গাছের ডালে পাহারারত বিপ্লবীরা দেখতে পেল ব্রিটিশ সেনাদের আর্মড ট্রেন কোন স্টেশন না থাকা সত্ত্বেও অদূরে রেল লাইনের উপর থেমে গেল। শুরু হল ঝোপের আড়াল থেকে গুলি। সৈন্যদল বিভ্রান্ত হয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল। সৈন্যরা এরপর জালালাবাদ পাহাড়ের পূর্ব দিকের ছোট্ট একটি পাহাড়ের উপর লুইস গান বসিয়ে বিপ্লবীদের দিকে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ শুরু করল। দেশপ্রেম আর আত্মদানের গভীর আগ্রহে তরুণ বিপ্লবীরা পাহাড়ের বুকে শুয়ে সৈন্যদের লুইসগানের গুলিবর্ষণের জবাব দিল। সঙ্গে রয়েছেন তিন প্রধান নেতা সূর্য সেন, নির্মল সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী। সুর্যসেনের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক তরুণ বিপ্লবী কয়েকশত ব্রিটিশ সেনার সাথে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হল। Do & Die মন্ত্রে দীক্ষিত কিশোর হরিগোপাল বল, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেন, বিধু ভট্টাচার্য, প্রভাস বল, শশাঙ্ক দত্ত, নির্মল লালা, মতি কানুনগো, পুলিন ঘোষ, জিতেন দাশগুপ্ত এবং মধুসূদন দত্ত দেশমাতৃকার স্বাধীনতায় নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন। তিন ঘন্টা বিপ্লবীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ৮০ জন সৈন্যকে হারিয়ে ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হল।

সূর্যসেনের নির্দেশে বিপ্লবীরা ১১ জন শহীদের লাশ পাশাপাশি শুইয়ে রেখে সামরিক কায়দায় শেষ অভিবাদন জানালো। বাংলার ইতিহাসে এক গর্বিত অধ্যায় রচনা করে আহত বিপ্লবী অর্ধেন্দু দস্তিদারকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল বাংলার সূর্যসন্তানেরা।

লেখক:

সাগর লোহানী
সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.