বাংলাদেশের আলোকচিত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ ও আধুনিক ফটোগ্রাফির জনক মনজুর আলম বেগ এর ২০ তম প্রয়াণ দিবস আজ। আলোকচিত্রশিল্পের বিদগ্ধ এ কিংবদন্তি মহান এই শিল্পী ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই অগণিত স্বজন, ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষী, শিক্ষার্থী, গুণগ্রাহী রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

মনজুর আলম বেগ ১৯৩১ সালে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কানসাটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম প্রফেসর হোসামউদ্দিন বেগ এবং মাতার নাম যাহেদা চৌধুরী। আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ সবার কাছে ‘এম এ বেগ’ এবং ‘বেগ স্যার’ নামে বেশি পরিচিত।

মনজুর আলম বেগ

মনজুর আলম বেগ (ছবি: ফ্লিক আর )

বর্তমান আলোকচিত্র সাংবাদিকদের বেশির ভাগই কোনো না কোনোভাবে মনজুর আলম বেগ এর সংস্পর্শে এসেছিলেন। আবার কেউ কাজ শুরু করছেন তাঁর ছাত্রের কাছে শিক্ষা নিয়ে। শুরু থেকেই তিনি সামান্য বিনিময়ে মূল্যবান এ শিক্ষা বিলিয়ে দিতেন। ফিল্ম ডেভেলপ, প্রিন্টের কাগজের খরচ মেটাতেন এ থেকেই। শুরুর দিকে তাঁর অনেক ছাত্র দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করতেন। তার পর আমৃত্যু মনজুর আলম বেগ এর সাথে যোগাযোগ রেখেছেন তারা। তাঁর সর্বশেষ ব্যাচের এক ছাত্রের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন সুপুরুষ। পোশাক-পরিচ্ছদে সবসময় পরিপাটি থাকতেন। যদিও তখন তিনি ছিলেন অনেকটা অসুস্থ। এ সময়ে ছাত্রদের শেখাতেন তাঁর বারান্দায় বসিয়ে। এ শিক্ষক বন্দুক নিয়ে বসতেন মোড়ার ওপর। ক্লাসের শুরু করতেন ডানোর পট দিয়ে তৈরি পিনহোল ক্যামেরা দিয়ে। তার পর ছবি তোলা, ফিল্ম ডেভেলপ, ছবি প্রিন্ট শেখাতেন ধাপে ধাপে। ঠিকমতো কাজ না করলে বন্দুক দেখিয়ে বলতেন, গুলি করবেন। এ বন্দুকের কোনো দিনও একটি গুলি ছোড়েননি। তার পরও সবাই এ বন্দুকের ভয়ে থাকত। কখনো ভালোবেসে কখনো ভয় দেখিয়ে এ দেশে আলোকচিত্রের বিস্তার ঘটিয়েছেন। গড়েছেন দক্ষ আলোকচিত্রী। আজকের ক্যামেরায় যে উন্নয়ন, তা এক দশক আগেও ছিল স্বপ্নের মতো বিষয়। আলোকচিত্র ছিল তখন কঠিন এক প্রক্রিয়ার বিষয়। কঠিন এ বিষয়টি হাতে-কলমে মানুষের মাথায় সেট করে দিয়েছেন মনজুর আলম বেগ।

মনজুর আলম বেগ

বেগার্ট ফটো ল্যাবরেটরির সামনে বিভিন্ন আলোকচিত্রী সহ মনজুর আলম বেগ (ছবি: ফ্লিকআর)

১৯৬০ সালে আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার ফটোগ্রাফি শিক্ষা কেন্দ্র বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠা করেন। ফটোগ্রাফি উন্নয়নে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান অপরিসীম। প্রধানত বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির উন্নয়ন এবং বিকাশ ঘটে এই ইনস্টিটিউট থেকেই। আলোকচিত্র বিষয়ক বই এবং পত্রিকা প্রথম প্রকাশসহ নিয়মিত বিভিন্ন মেয়াদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা আয়োজন করে আসছে এই প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই।

প্রবীণ আলোকচিত্র শিল্পী গোলাম কাশেম ড্যাডি ১৯৬২ সালে আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ, গোলাম মুস্তাফা, কফিল আহমেদ, ইউসুফ প্যাটেলকে সাথে নিয়ে ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। ক্লাবের প্রথম সভাপতি ইউসুফ প্যাটেল এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম কাশেম ড্যাডি। ১৯৬৪ সালে ইউসুফ প্যাটেল মারা যাওয়ার পর আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগকে সভাপতি করা হয়। বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্পে এই ক্লাবের অবদান অনেক।

Monjur Alam Beg Captured 3

মনজুর আলম বেগ

১৯৭৫ সালে বেগ আর্ট এ বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অফ ফটোগ্রাফির ১৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী এক সভায় আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির উন্নয়ন এবং বিকাশের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ফটোগ্রাফির সংগঠন করার প্রস্তাব দেন। বেগ আর্টের ছাত্র আলোকচিত্রশিল্পী মো. মাকসুদুল বারি সংগঠনের নাম ‘বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’ প্রস্তাব করেন, যা ওই সভায় গৃহীত হয়। এবং একই সভায় বেগকে বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়। ১৯৭৬ সালে প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফির ঠিকানায় পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন মেয়াদে আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সভাপতির পদে দায়িত্ব পালন করেন।

মনজুর আলম বেগ

মনজুর আলম বেগ এর তোলা ছবি (ছবি: ফ্লিকআর)

সে সময় বেগ আর্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি এবং বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠাসহ আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ তার ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি এবং ক্লাব গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। যার কারণে চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, ঢাকা সিনেসিক ক্লাব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, রাজশাহী ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, নারায়ণগঞ্জ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি এবং দিনাজপুর ফটোগ্রাফিক সোসাইটি গঠিত হয়। এবং ওইসব ক্লাবকে এক পতাকার নিচে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটিকে ফেডারেশনে উন্নীত করেন। যার ফলে বিপিএস আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফিক ফেডারেশনের (FIAP) সদস্যপদ লাভ করে আরো শক্তিশালী হয়।

মনজুর আলম বেগ

মনজুর আলম বেগ এর তোলা ছবি (ছবি: ফ্লিকআর)

১৯৬৮ সালে ব্রিটেনের ‘হার্টফিল্ড কলেজ অব টেকনোলজি’ থেকে রিপ্রোগ্রাফি ও ‘কোডাক ফটোগ্রাফিক স্কুল’ থেকে রঙিন ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে এসে তার শিক্ষা ছড়িয়ে দেন ছাত্রদের মাঝে। তিনি ১৯৭৮ সালে জার্মানির ‘ফটোকিনা’ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে ভারতের ‘ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অব দমদম’ তাঁকে সে বছরের পৃথিবীসেরা ১১ জন আলোকচিত্রীর একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ আলোকচিত্রের সাথে বসবাস করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তার লেখা আলোকচিত্রের ওপর বই ‘আধুনিক ফটোগ্রাফি’ দুই বাংলার ফটোগ্রাফারদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

মনজুর আলম বেগ

মনজুর আলম বেগ এর তোলা ছবি (ছবি: ফ্লিকআর)

১৯৯০ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটিতে আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ প্রখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী আব্দুল মালেক বাবুল, গোলাম মুস্তাফা, বিজন সরকার, শহিদুল আলম, দেবব্রত চৌধুরীকে নিয়ে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইনস্টিটিউট (বিপিআই) প্রতিষ্ঠা করেন।

আলোকচিত্রজগতে প্রচলিত আছে, মনজুর আলম বেগ চারুকলা ইনস্টিটিউটের মতো একটি প্রতিষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন আলোকচিত্রের ওপর, যে বিদ্যাপীঠে সবসময় আলোকচিত্র পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন শিক্ষার্থীরা। সে প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়ে দক্ষতার সাথে কাজ করবেন দেশের সব প্রতিষ্ঠানে। চাকরিতে এ প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য হবে অন্যান্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো। সে স্বপ্ন নিয়ে অনেক কাজও করেছিলেন শুনেছি। কিন্তু কেন সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়নি, তা জানা যায় না। তাই বলে বাংলাদেশের আলোকচিত্র থেমে নেই। শিল্পকলা মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এসেছে আলোকচিত্রের মাধ্যমেই। আলোকচিত্রের অস্কারখ্যাত ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস’ পুরস্কার এসেছে এ পর্যন্ত সাতটি।

মনজুর আলম বেগ

মনজুর আলম বেগ এর তোলা ছবি (ছবি: ফ্লিকআর)

জাতীয় পর্যায়ে ফটোগ্রাফিশিল্পে অনন্য অবদানের জন্য ২০০৭ সালে তাকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। ফটোগ্রাফি উন্নয়ন বিষয়ে বিশেষ অবদান রাখার জন্য জনাব এম এ বেগকে দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করেছে ফটোগ্রাফিবিষয়ক বাংলাদেশের সোসাইটিগুলো, পার্শ্ববর্তী দুটি দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফিক ফেডারেশন FIAP থেকে।

১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই বাংলাদেশে আলোকচিত্র আন্দোলনের এ মহান নেতা, আলোকচিত্র বিবর্তনের দ্রষ্টা মৃত্যুবরণ করেন। যদিও বাংলাদেশের অগণিত আলোকচিত্র কারিগরের কর্মচাঞ্চল্যের মাঝে আলোকচিত্র শিল্পীদের জনককে আমরা প্রতিনিয়ত শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করি; প্রতি মুহূর্তে গভীর ভালোবাসায় অনুভব করি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অগণিত আলোকচিত্রীর আদর্শ এবং অনুপ্রেরণা হয়ে আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ বেঁচে থাকবেন যুগ-যুগান্তর। শিল্প-সৃজনের কীর্তিমান এই প্রথিকৃতের সৃষ্টি ও স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.