শ্রীমতী প্রমিতা মল্লিক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর আশ্রমকন্যা। শান্তিনিকেতনে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আশৈশব গানের সঙ্গে যুক্ত। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী-গুরু-গবেষকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সাথে কথা বলেছেন বাঙালীয়ানার প্রতিনিধি।

রবীন্দ্রসংগীত আপনার জীবনে এল কী ভাবে  ?

➤আমি রবীন্দ্রসংগীতের পরিবারে জন্মেছি, কারণ আমি কলকাতায় জন্মেও কিছুদিন পরে চলে যাই শান্তিনিকেতনে ,তারপর ওখানেই বড়ো হওয়া। আমাকে আলাদা করে রবীন্দ্রসংগীতের জগতে ঢুকতে হয়নি, আমার পরিমণ্ডলটাই ছিল রবীন্দ্রসংগীতের। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দশ বছরের মধ্যেই আমার জন্ম। তখন গোটা বিশ্ব রবীন্দ্রচর্চায় মত্ত। ওনার কাছে যারা গান শিখেছেন, সকলকেই দেখেছি ছোটবেলায়। অনেকের কাছে গানও শিখেছি। আমার কাকা শান্তিনিকেতনের সংগীত ভবনের প্রথম স্নাতক। তখন কথা ফোটেনি যখন বাড়িতে বড়দের কোলে বসে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছি, সুতরাং আমার জগৎ রবীন্দ্রনাথ ব্যতীত ছিল না। আর পেশাদার গায়িকা হিসেবে এলাম, সেটা বহু পরে, কারণ আমার ইচ্ছে বা শখ কোনোটাই ছিলোনা যে গানকে কোনোদিন পেশা হিসেবে গ্রহণ করবো বা গান গেয়ে পয়সা উপার্জন করবো, তাহলে হয়তো গান নিয়েই পড়াশুনো করতাম। আমি ইংরেজি নিয়ে অনার্স পাশ করি এবং পরে কলকাতায় চলে আসি, সত্তর দশকের গোড়ার দিকে। তারপর আমি অধ্যাপনা করেছি মডার্ন হাই স্কুল ফর গার্লস-এ, যা কলকাতার অন্যতম নাম করা একটি স্কুল। ছোট থেকেই গান গেয়ে আসছি, এদিক ওদিক থেকে আমার গান শুনে ডাক আসতে থাকে। সেভাবেই জোড়াসাঁকো থেকেও ডাক আসে, ডাক পাই রবীন্দ্রসদন থেকেও। পরীক্ষা দিয়েছিলাম বহু পরে. কলকাতায় এসে প্রথম অডিশনে সুযোগ পেয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে পেশাদারি গায়িকা হিসেবে কাজ শুরু করি। পঞ্চাশ টাকার চেক পেয়েছিলাম। তারপর পুরোটাই আস্তে আস্তে নিজের থেকে হয়ে গেলো।

প্রমিতা মল্লিক

শান্তিনিকেতনের সংগীতচর্চা এবং যখন কলকাতায় এলেনএখানকার সংগীতচর্চার মধ্যে কী পার্থক্য অনুভব করলেন?

➤প্রথমেশান্তিনিকেতনের সংগীত ভবনে কোর্স করেছিলাম। শান্তিদেব ঘোষ ক্লাস নিতেন। কিন্তু কোর্স শেষ করে পরীক্ষা দেওয়ার আগেই আমি কলকাতায় চলে আসি। স্কুলে বড়দের সাথে গান গাইতাম। বিশ্বভারতীর বিভিন্ন নাটকেও অংশগ্রহণ করতাম। বড় মানুষরা কিভাবে গান করতেন, নিজেদের উপস্থাপন করতেন সেগুলি শিখতাম তাদের বাড়ি গিয়ে। তবে ওটা অনেকটাই লৌকিকতাবর্জিত ছিল। কোথাও পুঁথিগত ব্যাপারটা আমার ভালো লাগতো না। রবিতীর্থ , গীতবিতান, এসব স্কুলে কখনোই আমার ভর্তি হতে ইচ্ছা হয়নি। আমি সুচিত্রা মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে গান শিখেছি। তারপর সুবিনয়দার একটি ছোট গ্রুপে গান শিখতাম, কিন্তু তাতে কোনো পরীক্ষার ব্যাপার ছিল না। উনি আমাকে খুব ভালোওবাসতেন। দেখতে দেখতে আমার আগ্রহ এতো বেড়ে গেলো,আমি রীতিমতো পড়াশুনো শুরু করে দিলাম,সেটা এখনও করি। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়,শান্তিদেব ঘোষ, সুবিনয় রায়ের প্রভাব পড়েছে আমার উপর। তারপর আমি আমার নিজের শৈলীও যুক্ত করেছি। পরিণত হয়েছে আমার চিন্তাধারা। যেটা মনে করেছি,যেভাবে পরিবেশন করা উচিত মনে করেছি,  সেটাই করেছি।এখন আমি মনে করি কোনো কিছুর তাগিদ ভিতর থেকে এলে ঠিক করে শেখা যায়, আগ্রহ নিয়ে  শেখা যায়,নাহলে পুরোটাই পাখি পড়ার মতো হয়ে যায়।

 

রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষা এখনকার সমাজে কিভাবে কতটা পৌঁছে দিতে পারছেন?

➤এখন আমার একটা নিজস্ব গানের স্কুল আছে। সেখানে তিনশো জন ছেলেমেয়ে গান শেখে আমার কাছে। তাদের আগ্রহ আছে বলেই, বা তারা আমার গায়কী পছন্দ করে বলেই নিশ্চয়ই আমার কাছে আসে। আমি কাউকে সচরাচর ছেড়ে যেতে দেখিনি , বদলি হওয়া ছাড়া। রবীন্দ্রভারতীর বিভিন্ন কাজের সঙ্গে আমি যুক্ত।ওখানকার পিএইচডির ছাত্রছাত্রীদের দেখি বিষয়টির প্রতি তাদের যথেষ্ট আগ্রহ এবং তারা অত্যন্ত মনোযোগী।আমি ছাত্রছাত্রীদের বলি কলাকৌশল,স্বরলিপির সঙ্গে সঙ্গে গলাটাও তৈরী করতে হবে। কোনো গান সুন্দরভাবে গাওয়ার মানদণ্ডই হলো সুরে গাওয়া। পিচ ঠিক রাখার জন্য শাস্ত্রে তালিম দরকার। যে তালিম আমিও নিই। কলকাতায় যখন আসি ,নিখিল বিশ্বাসের কাছে আমি ফিফ্থ ইয়ার অবধি শিখেছিলাম।তারপর কুমার প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাছেও অনেকদিন খেয়াল শিখেছি।আসলে গলাটাকে তৈরী করতে  হয়,তৈরী না করলে গলা ঠিকভাবে খোলে না। নিজের স্কেলও জানতে হয়। কোন স্কেলে কোন গান গাইবো,সেই বুদ্ধিমত্তা থাকতে হবে যাতে বিভিন্ন স্কেলে বিভিন্ন গান গাওয়া যায়। কোন স্কেলে করছি সেটা বড় কথা নয়,কোন সুরটা লাগছে সেটাই বড়।  আমি সেটা শেখাই,এবং যখন আমি রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটকের গান শেখাই সকলকে সেই নাটকটি পড়ে শোনাই। গানের প্রেক্ষিত সবসময় জানা দরকার,যাতে সে নিজে বোঝে কোন গান কিভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। তার স্বরলিপি ,তাল,লয়,বুঝতে হবে। আমি খাতা দেখে ইদানিং গান গাইতে দেই না। যখন কোনো নতুন গান শেখাই ,মুখে মুখে শেখাই ,বাড়ি গিয়ে লিখে নিতে বলি।তাতে যদি গানের আধখানা শেখা হয়,তবে তাই হয়। পরের সপ্তাহে বাকিটা হয়। এতে মনে হয় কিছু ক্ষতি হয়না।মোটামুটি যারা আমাদের অনুষ্ঠানে কোরাস শোনে,প্রায় সকলকেই বলতে শুনি ‘বৈকালী’র গান খুব ভালো হয়। আমার অনেক ছাত্রছাত্রী আছে যারা খুব ভালো গায়,যেমন সব প্রতিষ্ঠানেই থাকে।তারা নামও করছে বেশ।

 

  রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে হওয়া বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা একজন প্রশিক্ষক এবং রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হিসেবে কিভাবে দেখছেন? এর ফলে কিরকম প্রভাব পড়ছে?

➤রবীন্দ্রনাথের গানে খুব একটা পরীক্ষা নিরীক্ষা  করার সুযোগ নেই। উনি  আসলে  সেই  সুযোগটা দিয়ে যাননি। গানগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ। সুতরাং যা চেষ্টা হয় , জোর করে পরীক্ষা করবে বলে, তাতে গানটিতে কিছু যোগ হয়না। আমি এটাও দেখেছি সাধারণ মানুষ চটকদার জিনিস পছন্দ করে,নতুন কিছু,যেমন গানে রাগ,তান,বন্দেশ ঢুকিয়ে,জগাখিচুড়ি করা জিনিস। হয়তো শুনতে কোনো কোনো গান শ্রুতিমধুরও লাগে,কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের কোনো উপকার হয় বলে আমার মনে হয়না।অনেকক্ষেত্রে যেমন যন্ত্রের অযথা ব্যবহার হয়। তবে আমি এটাও মনে করিনা যে সব গান এসরাজ বা তানপুরা দিয়ে গাওয়া যাবে। যারা ভালো গায়ক তাদের তানপুরা ছাড়া কিছু লাগেও না। অনেকের গান শুনেছি যারা শুধু  তানপুরা-এসরাজ দিয়ে  মাতিয়ে দিতে পারে। কিন্তু অবশ্যই যন্ত্রের ব্যবহার হওয়া দরকার। ধরো যখন আমি তিনশো জনকে নিয়ে কোরাস  করি,তখন কীবোর্ড না থাকলে কেউ শুনতে পাবে না। আমি যখন টিকিট বুক করে লোককে আসতে বলছি সেখানে আমি রিস্ক নিতে পারিনা।যদি কেউ শুনতে না পায় ! কিন্তু যদি স্মরণসভায় গান গাইতে যাওয়া হয় সেখানে কীবোর্ড নেই না। এমনও হয় যে আমার গানে প্রধানত কীবোর্ড বাজায় তাকে আমি আমার সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজাতে বলি। একলার গানে যেমন কীবোর্ড লাগে না ,সেখানে এসরাজ বা তানপুরা দিয়েই শুধু হয়ে যায়,নির্ভর করে গানের উপর। আমি যেমন আমার একজন ছাত্রকে  গাইয়েছিলাম ড্রামের সঙ্গে।একটা রেকর্ডিঙে ও গেয়েছিল, আমি অনুমোদন করেছিলাম। সেটাও একটা অন্যতম মাত্রা পেয়েছিলো।তার গলা ছিল অসম্ভব জোরালো ,তাকে তাই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সবাইকে তা দেওয়া যায়না। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলতেন স্বাধীনতা দেব ,কিন্তু কাকে দেব ভাবতে হবে। তাকেই দেবো যে অপব্যবহার করবে না। সেটার জন্যই বুঝতে হয় কাকে কতটা দেওয়া দরকার।

।।বাঙালীয়ানা ডেস্ক।।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট