চন্দনা শুক্তি
সেই প্রথম উড়োজাহাজে যাত্রা। ঢাকা এয়ারপোর্ট তখন অনেক ছোট। ভেতরে ইমিগ্রেশনের আগে পর্যন্ত সবাই ঢুকতে পারে। বিদায় জানাতে এসেছিলেন আত্মীয়-বন্ধু অনেকে। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতিতে আমাদের বিদায়ী অনুষ্ঠানে যা বলা হয়েছে, আমি কোনদিন ভুলিনি….বাংলাদেশ ছোট্ট দেশ; বাইরের বেশীরভাগ মানুষ চিনতে পারে না। পরিচয় দিতে হয়, ভারতের পাশের দেশ হিসেবে। দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে আমাদেরকেই। আরও বলা হয়েছিল, অনেকে বাইরে গিয়ে নিজের পরিচয় ভুলে যায়। রাশান এ্যরোফ্লোট ছোট প্লেন। এর সিট গুলো তত ভাল নয়। যারা জীবনে কোনদিন প্লেনে উঠেনি, তাদের কেউ কেউ শুরুতেই এর বদনাম করতে শুরু করে, যা করা উচিত নয়।
দলে কতজন ছিলাম, ঠিক মনে নেই। হেঁটে হেঁটে প্লেনে উঠলাম আমরা। ভেতরে কাউকে দেখা যাচ্ছিলো না। তবু হাত নাড়লাম। হাতে ছিল একটা ভারি ব্যাগ। সোহেলের ব্যাগ একটু হালকা ছিল। ও আমার সাথে ব্যাগ বিনিময় করলো। সেই প্রথম বাইরের জীবনে বন্ধুর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। যদিও সোহেলের সাথে সেটাই প্রথম আর শেষ দেখা। চেহারাও মনে নেই।
প্লেনের সিট তিনটা করে। আমি জানালার পাশে বসলাম। রেখা ছিল পাশে। তখন থেকেই আমি জানালার পাশে বসতে পছন্দ করি। ছোটবেলায় আম্মা বলেছিলেন, উপর থেকে নদী গুলোকে চিকন ফিতার মত লাগে। বাড়িগুলোকে পুতুলের ঘর বাড়ি মনে হয়। আমি অধীর আগ্রহে সেই ফিতার মত নদী আর পুতুলের ঘরবাড়ি দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। এখনো আমি তাই দেখি। মেঘের ভেতর দিয়ে যখন প্লেন চলে, মেঘের ভেতর কখনো পাহাড়….হাতি, ঘোড়া, সিংহের মুখও দেখা যায় কল্পনায় সাজালে।
প্লেন উড়লো আকাশে। পেছনে পরে থাকলো পরিচিত মুখগুলো। সবাই চিন্তিত ছিল। আমিও জানিনা আমার ভবিষ্যৎ। কেবল প্রতিজ্ঞা নিজের কাছে, ভাল করে পড়াশুনা করতে হবে। কদিন আগে এক আত্মীয় দাওয়াত করে খাওয়ানোর সময় ঠাট্টা করে বলেছেন, “আইবুড়ো (অর্থ, বিয়ের আগের খাওয়া) খাইয়ে দিলাম।” তাঁর কথাও সত্যি হবে, তখন ভাবিনি।
প্রথম ঘণ্টা দুই যাত্রা বিরতি মুম্বাই ( বোম্বে) তে। গত বছর কনফারেন্সে যাবার পথে মুম্বাই এয়ারপোর্ট দেখে অবাক হলাম, এত উন্নত, এত সুন্দর এখন! তখন ছোট ছিল,বাথরুমে মগের ব্যবস্থা ছিল পানির জন্য, শাওয়ার ছিল না। আমাদের দেশের এখনকার এয়ারপোর্টের মত। আশা করি একদিন আমাদের দেশেও একসময় অনেক উন্নত হবে……. মুম্বাই এর পর থামলো করাচি এয়ারপোর্টে।
রাতের আলোতে ঝলমল করছিল করাচি। মন খারাপ লাগছিল। আমার আপন চাচা, আব্বার বড় ভাই থাকতেন ওখানে। পাকিস্তান নেভীতে চাকরি করতে গিয়ে ওখানে পাঞ্জাবী মেয়ে বিয়ে করে থিতু হয়েছিলেন। একবার এসেছিলেন দেশে আমি স্কুলে পড়ার সময়। খুব আদর করতেন। প্রতি রাতে তাঁর মশারি টাঙিয়ে দিতাম। উনি চলে যাওয়ার পর আব্বার চোখে পানি দেখেছিলাম। আব্বাকে খুব কম কাঁদতে দেখেছি। হয়তো বুঝেছিলেন, ওটাই ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা। আমিও একবারই দেখেছিলাম তাঁকে।
করাচি থেকে প্লেন ওড়ার পর খাবারের সাথে প্যাকেট ম্যাংগো জুস দিয়েছিল। অবাক হয়েছিলাম। তখন দেশে প্যাকেট জুস ছিল না…এরপর তাশখন্দে থেমেছিলাম তিন ঘণ্টা। সেবার প্রথম দেখলাম বাসের দরজা অটো বন্ধ হওয়া। এখন ভাবি, অবাক লাগা দারুণ এক অনুভূতি! পুরোনো চোখে এখন আর কিছুতে অবাক হই না।

সকালে মস্কো শেরেমেতোভা এয়ারপোর্ট পৌঁছালাম। বাইরে বাঙালি সিনিয়র ছাত্র অনেকে এসেছিলেন আমাদের রিসিভ করতে। বাসে করে যাচ্ছি তো যাচ্ছি। বিশাল শহর, অনেক বড় বড়, চওড়া রাস্তা। ঘুমে চোখ জড়িয়ে যাচ্ছিলো, তবু জোর করে চারপাশ দেখছিলাম। একঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে বাস পৌঁছালো ইউনিভারসিটি হোটেলে। বিদেশী ছাত্রদের ওখানেই রাখা হয় শুরুতে। আমি আর উপমা পেলাম এক রুম।
আমাদের খেতে নিয়ে যাওয়া হলো ক্যান্টিনে। সব খাবার অচেনা। কিছুই ভাল লাগলো না। ঘরে এসে বিস্কুট, চানাচুর খেলাম। বিকেলে আবার বাঙালি ভাইবোনেরা এলেন। আমাদের ঘুরিয়ে দেখালেন মস্কো নদী। ওখানে আমরা যেন আবার ছোট হয়ে গেলাম। আমি আর উপমা দৌঁড়ের প্রতিযোগিতা করলাম। মস্কো নদীর দুই পাড় বাঁধানো। ফেরার পথে গাছ থেকে আপেল পেড়ে খেলাম।
হোটেলে তিন রাত ছিলাম। আমাদের সাস্থ্য পরীক্ষা করা হলো। একদিন বড় ভাইরা তাঁদের হোস্টেলে নিয়ে গেলেন মেট্রো আর বাসে। আমি যত দেশের মেট্রো দেখেছি, মনে হয়, পৃথিবীর সবচে’ সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন রাশিয়ার মেট্রো রেল। হোস্টেলে ভাত খেলাম। মোটা চালের ভাত। সাথে ছিল মনে হয় গরুর মাংস। অন্যরকম। তবুও অমৃত মনে হলো দুদিন পর ভাত খেয়ে।
এরপর বিদায়ের পালা। সবাইকে সাবজেকট অনুযায়ী ভাগ করে বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়। কল্পনা ছিল, চম্পু, আমি একসাথে থাকবো। আমরা ঢাকায় প্ল্যান করতাম, আমরা কিভাবে হিসাব করে চলবো স্কলারশিপের টাকায়। চম্পু আগের সপ্তাহে এসে তাসখন্দ চলে গেছে। জামিলও যাবে তাসখন্দ। রেখা, উপমা যাবে কিয়েভ। আগের রাতে আমরা গল্প, গান করলাম। পরের দিন কাঁদলাম। জামিল আর উপমার সাথে আর দেখা হয়নি।
গ্রুপ করে বাসে তুলে রেল স্টেশনে পাঠানো হলো। যাওয়ার সময় তিন রুবল করে হাতে দিল পথ খরচ হিসেবে। আমি যাব উক্রাইনের খারকভ। আমার সাথে জামান, তৌহীদ আর বিজয় আর দিপু। ওদের সাথে খুব পরিচয় ছিল না। আপন লাগছিল না। খুব কান্না পাচ্ছিলো। স্টেশনে বিদায় জানাতে এসেছিলেন সুমন ভাই, নিপুন ভাই। আমি খুবই কাঁদছিলাম দেখে সুমন ভাই মাথায় হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিলেন। কেন এত খারাপ লেগেছিল জানিনা। হয়তো বন্ধুহারা হয়ে। এক মজার ঘটনা কিছুদিন আগে শুনলাম। আমাকে বিদায় দিয়ে সুমন ভাইও নাকি ভেউ ভেউ করে কেঁদেছিলেন। সবাই উনাকে খেপিয়েছিল। উনার সাথে দুই দিনের পরিচয়; তেমন কিছুই না। আসলে কান্নাটা সংক্রামক ছিল।

রাশিয়ার ট্রেন আর ট্রেনজার্নি খুবই ভাল ছিল। ট্রেনের ভাড়া ছিল প্লেনের চাইতে বেশি। পুরো ট্রেন কারপেটিং করা। আলাদা কুপেতে চারটা সিট। পরিষ্কার বিছানা বালিশ দেয়া থাকে। মন খারাপ ছিল, তাই বারান্দায় জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম। পাশে গিটার হাতে এক আফ্রিকান ছেলে এসে দাঁড়ালো। নাম জিজ্ঞেস করলো। আমিও জিজ্ঞেস করলাম। নাম ফাফা, দেশ মাদাগাস্কার। গিটার বাজিয়ে গান ধরলো। কিছু পর ভেতরে এসে এক ঘুমে রাত পার হলো। সকালে পৌঁছালাম খারকভ। স্টেশনে ছিলেন শিহাব ভাই সহ বেশ কজন বড় ভাই।
আবার বাস। হোসটেলে পৌঁছে ব্যাগ রেখে শিহাব ভাই আমাকে আর দিপুকে ভার্সিটি নিয়ে গেলেন। ওখানে ৩০ রুবল দেয়া হলো মাসের বাকি দিনের খরচ হিসেবে। তারপর শিহাব ভাই তাঁর হোস্টেলে নিয়ে গেলেন। ওখানে ভাত খেলাম। শিহাব ভাই দুইটা ডিম দিলেন প্লেটে। আমি খুব অবাক। জীবনে কখনো দুই ডিম একসাথে খাইনি! পরে দেখেছি, কেউ একসাথে পাঁচ ছয়টা ডিমও একবারে খায়। খেয়েই মরার মত ঘুম। তখন খুব ঘুমাতে পারতাম যেখানে সেখানে, যা এখন পারিনা।
এরপরের অনেক অভিজ্ঞতা। বাঙালি মানেই রাজনীতি আর দলাদলি। আমি খুবই মুর্খ ছিলাম। আব্বা পরবর্তী জীবনে রাজনীতির প্রতি এত বীতশ্রদ্ধ ছিলেন যে, এ ব্যাপারে আমাদের কখনো উতসাহিত করেন নি। আমি গল্পের বই ছাড়া কিছুই পড়িনি, কোন দল করিনি, খুব বেশী মিশিও নি অনেকের সাথে। কাজেই বাংগালিদের পলিটিক্সের জটিলতায় পড়ে গেলাম। সে অন্য অনেক ঘটনা।
।। লেখক পরিচিতি ।। চন্দনা শুক্তি ।।

ঢাকায় জন্ম। শৈশব, কৈশোর আর স্কুল-কলেজ জীবন ঢাকায় কেটেছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে মেডিক্যাল কলেজে পড়াশুনা; দেশে ফিরে চক্ষু বিষয়ে ডিপ্লোমা, এফ.সি.পি.এস. ও ফেলোশীপ শেষ করে ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে কর্ণিয়া বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। বাবা ছিলেন পঞ্চগড়ের সন্তান ভাষা সৈনিক ভাষা আন্দোলনের উপর প্রথম সাহিত্য সংকলন “একুশে ফেব্রুয়ারি” এর প্রকাশক, ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষঠাতা সভাপতি মোহাম্মদ সুলতান। মা ছিলেন বগুড়ার মেয়ে ও স্কুল শিক্ষিকা, নূরজাহান সুলতান। চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। স্বামী লেখক ও সাংবাদিক জাহীদ রেজা নূর; শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন এবং বেগম নূরজাহান সিরাজীর পুত্র। এক মেয়ে সনকা রেজা আর এক ছেলে শৌনক রেজা। ভালো লাগে অবসরে গান শুনতে, গল্পের বই পড়তে, দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে, আর টুকি টাকি লেখালেখি করতে।
