১৯৩০ সাল। এ বছর ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার-নির্যাতন শতগুণে বেড়ে যায়। শত শত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও বিপ্লবীদের গ্রেফতার করে জেলে আটক রেখে চলে নির্যাতন। এই সময় ব্রিটিশ পুলিশ সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এবং সত্য বক্সীর মতো নেতৃত্বকেও গ্রেফতার করে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে আটকে রাখে। একের পর এক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করায় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে নতুন বন্দীদের জায়গা দেওয়া যাচ্ছিল না। জেলের মধ্যে সৃষ্টি হলো এক অসহনীয় অবস্থা। রাজবন্দীদের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছিল। তাঁরা জেলকোড অনুযায়ী কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন দমানোর জন্য ব্রিটিশ পুলিশ বেদমভাবে লাঠি চালায়। চলে নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচার। সুভাস বসু, যতীন্দ্রমোহন এবং সত্য বক্সীরাও বাদ গেলেন না এই অত্যাচার থেকে। এঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ল জেলের ভিতরে। জানা গেল এই অত্যাচারের পিছনে রয়েছে ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এনএস সিম্পসন। বিপ্লবীদের টার্গেট হলো কারা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল লে. কর্নেল সিম্পসন। যিনি বসতেন ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ এ। বন্দীদের উপর পাশবিক নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিল সিম্পসন। তাই সিম্পসনের নাম হত্যা তালিকার শীর্ষে ছিল।

বিনয় বসু
তাই বিপ্লবীদের পরবর্তী অভিযান ছিল কোলকাতার ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ আক্রমণ। অসংখ্য পুলিশ প্রহরী পরিবেষ্টিত দুর্ভেদ্য অফিস ‘রাইটার্স বিল্ডিং’। এই ভবন আক্রমণ করে সেখান থেকে ফেরার আশা কেউ করতে পারে না। বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনা চলল কে এই আক্রমণ পরিচালনা করবেন? বিপ্লবী নেতারা অনেক ভেবেচিন্তে এই দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জ মহকুমার রোহিতভোগ গ্রামের রেবতীমোহন বসুর পুত্র বিনয় বসুকে। তাঁর সঙ্গী হলেন আরো দুজন নির্ভীক যুবক। মুন্সিগঞ্জ মহকুমার যশোলঙের সতীশচন্দ্র গুপ্তের পুত্র দীনেশ গুপ্ত ও মুন্সিগঞ্জ মহকুমার পূর্ব শিমুলিয়ার অবনী গুপ্তের পুত্র সন্তান বাদল গুপ্ত। কিশোর বয়স থেকেই বিনয় বসু, দীনেশ গুপ্ত ও বাদল গুপ্ত পরস্পর পরিচিত ছিলেন। বিপ্লবী নেতারা স্থির করলেন ভারত সরকারের সরকারী অফিসের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী কেন্দ্রস্থল “রাইটার্স বিল্ডিং” আক্রমণ করে দেখাতে হবে যে বিপ্লবীরা সক্রিয় রয়েছেন। তাঁদের একজনকে জেলে বন্দী করলে দশজন অগ্রসর হয়।

বাদল গুপ্ত
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর এ্যাকশনের জন্য তিন বিপ্লবী প্রস্তুত। ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ এর একটি কক্ষে কারা বিভাগের সর্বময় কর্তা ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এস এন সিম্পসন তাঁর কাজকর্ম পরিচালনা করছেন। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী জ্ঞান গুহ পাশে দাঁড়িয়ে আলোচনা করছেন। বেলা ঠিক ১২টা। বিলাতী পোশাকে তিন বাঙালী যুবক কর্নেল সিম্পসনের সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তাঁরা সিম্পসনের সহকারীকে ঠেলে কামরার ভিতরে প্রবেশ করল। হঠাৎ পদধ্বনী শুনে কর্নেল তাঁদের দিকে তাকালেন। বিস্ময়-বিমূঢ় চিত্তে দেখলেন সম্মুখে তিন বাঙালী যুবক হাতে রিভলবার তার সামনে দণ্ডায়মান। মুহূর্তের মধ্যে বিনয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হল, ‘প্রে টু গড কর্নেল। ইওর লাষ্ট আওয়ার হ্যাস কাম’। কথাগুলো উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনটি রিভলবার থেকে ছয়টি বুলেট সিম্পসনের দেহ ভেদ করে বের হয়ে গেল। সিম্পসনের নিথর দেহ লুটিয়ে পড়লো মেঝের উপর।

দীনেশ গুপ্ত
মুহুর্তে আক্রমণ প্রতিরোধে ছুটে এলো পুলিশ রাইটার্স বিল্ডিঙের করিডোরে শুরু হল যুদ্ধ, স্টেটসম্যান পত্রিকা এই যুদ্ধকে নাম দিয়েছিল “veranda battle” “বারান্দা যুদ্ধ”। একদিকে তিন বাঙালী যুবক, হাতে শুধুমাত্র তিনটি রিভলবার। আর অন্যদিকে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট ও ডেপুটি কমিশনার গার্ডনের নেতৃত্বে রাইফেলধারী সুশিক্ষিত পুলিশ। এক পর্যায়ে যুদ্ধে আহত হল জুডিসিয়েল সেক্রেটারী নেলসন। ডাক পড়ল গুর্খা বাহিনীর।

শিল্পীর ক্যানভাসে বারান্দা যুদ্ধের প্রথম দৃশ্য
এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালাতে ব্যস্ত সমস্ত রাইটার্স বিল্ডিং, বিভীষিকাময় অবস্থা, রিদিকে শুধু ছুটাছুটি, কলরব- কোলাহল- চিৎকার আর শুধু এক রব ‘বাঁচতে চাও তো পালাও’। দীনেশের পিঠে একটি গুলি বিদ্ধ হল। তিনি তাতে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। অসংকোচে গুলিবর্ষণ করতে লাগলেন শত্রুকে লক্ষ্য করে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিনয়-বাদল-দিনেশের হাতে গুলি ছিল, ততক্ষণ কেউ তাঁদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেননি। একপর্যায়ে বিপ্লবীদের গুলি নিঃশেষ হল। গুর্খা ফৌজ অনবরত গুলিবর্ষণ করে চলল। তখন তিনজন বিপ্লবী একটি শূন্য কক্ষে প্রবেশ করলেন। বাদল সঙ্গে আনা সায়েনাইডের পুরিয়া মুখে দিলেন। বাদল শহীদ হলেন। বিনয় ও দীনেশ নিজেদের রিভলভারের শেষ বুলেট দুটি ব্যবহার করলেন নিজেদের মস্তক লক্ষ্য করে। দুজনেই আহত হয়ে ধরা পড়লেন। গুরুতর আহত বিনয় ও দীনেশকে পুলিশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দিল।।

রাইটার্স বিল্ডিঙের সামনে বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্তের ভাস্কর্য
চিকিৎসায় সামান্য সুস্থ হয়ে উঠলেন দুজনেই। বিনয় বসু মেডিকেল ছাত্র, তাঁর জানা ছিল এনাটমি। জানতেন মৃত্যুর সম্ভাব্য পথ। ১৪ ডিসেম্বর রাতে কাঙ্খিত মৃত্যুকে বরণ করার জন্য মস্তিষ্কের ব্যাণ্ডেজের ভিতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে নিজ মস্তিষ্ক বের করে আনেন এবং মৃত্যুকে বরণ করে নেন মৃত্যুঞ্জয়ী বীর বিনয় কৃষ্ণ বসু।
অন্যদিকে ডাক্তার ও নার্সদের আপ্রাণ চেষ্টায় দীনেশ ক্রমশ সুস্থ হয়ে ওঠেন। সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে পাঠানো হয় কনডেমড সেলে। ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই দীনেশ গুপ্তের ফাঁসি কার্যকর হয়।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বিনয়-বাদল-দীনেশের নামানুসারে কোলকাতার ডালহৌসি স্কয়ারের নাম পাল্টে রাখা হয় “বিনয় বাদল দীনেশ বাগ” যা এখন “বিবাদীবাগ” নামেই পরিচিত।
তথ্য ও ছবিসূত্র:
১। গুণীজন /
২। বাংলার বিপ্লব প্রচেষ্টা: হেমচন্দ্র কানুনগো। চিরায়ত প্রকাশনী, কোলকাতা। প্রকাশকাল: জুন, ১৯২৮
৩। অগ্নিযুগের ইতিহাস: ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন। প্রকাশক: মুক্তধারা। প্রকাশকাল; ডিসেম্বর ১৯৭৯
৪। Advocate (Burnie, Tas. : 1890 – 1954), Saturday 30 August 1930, page 2
৫। স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ভূমিকা: সুধাংশু দাশগুপ্ত, ন্যাশনাল বুকস এজেন্সি কোলকাতা
৬। ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা: চিন্ময় চৌধুরী। দে’ জ পাবলিকেশন, কোলকাতা। প্রকাশ: জানুয়ারী ১৯৯৮
৭। বিদ্রোহী ভারত: নীহাররঞ্জন গুপ্ত। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা: লি: কোলকাতা, প্রকাশ: অগ্রহায়ণ-১৩৯১
৮। হেমেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, ভারতের বিপ্লব কাহিনী, ২য় ও ৩য় খন্ড, কোলকাতা, ১৯৪৮
লেখক:
সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা