রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘মিনিমাম ওয়েজ অ্যান্ড লাইভলিহুড কন্ডিশনস অব আরএমজি ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক সংলাপে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ২৮ টাকা করার প্রস্তাব করা হয় গতকাল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রমিকনেতারা এই প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।

পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে গত ১৪ জানুয়ারি স্থায়ী মজুরি বোর্ডের পুনর্গঠন করে সরকার। গত মাসে মজুরি বোর্ডের সভায় মালিক পক্ষ ৬ হাজার ৩৬০ টাকা এবং মজুরি বোর্ডে শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি ১২ হাজার ২০ টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব করে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ মেটাল ক্যামিকেল গার্মেন্টস অ্যান্ড টেইলার্স  ওয়ার্কার্স ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে অগাস্ট থেকে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।

পোশাক শিল্প শ্রমিক(ছবি: ইন্টারনেট)

এই সময় গতকাল সন্তান আছে তৈরি পোশাকশিল্পের এমন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ২৮ টাকা করার প্রস্তাব করেছে সিপিডি। আর যাঁদের সন্তান নেই, এমন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৯ হাজার ২২৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

সিপিডির প্রস্তাবে ষষ্ঠ গ্রেডে অ্যাসিসটেন্ট সুইং মেশিং অপারেটর, অ্যাসিসটেন্ট ড্রাই ওয়াশিং ম্যান ও লাইন আয়রন ম্যান পদে কর্মরত একজন শ্রমিকের জন্য ৪০০৬ টাকা মূল বেতনের সঙ্গে ১৬০২ টাকা বাড়িভাড়া, ৮০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, ২০০০ টাকা খাদ্য ভাতা, সন্তানদের ভরন পোষণ ও শিক্ষা ভাতা হিসেবে ৮০০ টাকা এবং ১২০ টাকা সার্ভিস বেনিফিট ধরে মোট ১০ হাজার ২৮ টাকা ন্যূনতম মজুরির কথা বলা হয়েছে।

মোট ৬টি গ্রেডে তৈরি এই প্রস্তাবে গ্রেড-১ এর বেতন উন্মুক্ত রেখেছে সিপিডি। এছাড়া গ্রেড-২ এ ১৫ হাজার ৩৩৮ টাকা, গ্রেড-৩ এ ১৩ হাজার ৩৩৭ টাকা, গ্রেড-৪ এ ১১ হাজার ৮০৩ টাকা এবং গ্রেড-৫ এ ১০ হাজার ৭৩০ টাকা মজুরির সুপারিশ করা হয়েছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এই প্রস্তাব তুলে ধরেন।

পোশাক শিল্প

সিপিডির ১০০২৮ টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে শ্রমিকনেতা জলি তালুকদার বলেন, এটি বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চারজনের পরিবার হিসাব করে দুই বছর আগে ১৬ হাজার টাকা মজুরির প্রস্তাব করেছিলাম, কিন্তু এখন সেটাও যথেষ্ট নয়; বর্তমান বাজারের নিরিখে তা হবে ৩২ হাজার টাকা। আর বিজিএমইএর সভাপতি মজুরি বোর্ডে যে প্রস্তাব করেছেন, তা অবিশ্বাস্য রকম কম। আমাদের বিশ্বাস, প্রগতিশীল মালিকেরা তাঁর প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নন।’

অনুষ্ঠানে সিপিডির চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘জীবনযাপনের ব্যয়ের নিরিখে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করা নিয়ে চিরকালই বিবাদ হবে। আজ থেকে ৫৫ বছর আগেও এ নিয়ে মালিক-শ্রমিকের দ্বন্দ্ব হয়েছে এবং এখনো তা চলছে। দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন না এলে ধারণা করি, আমার নাতি-নাতনিরাও এই বিবাদ দেখবে। মজুরি নির্ধারণের এই পদ্ধতিকে পশু অ্যাপ্রোচ আখ্যা দেওয়া যায়। কিন্তু শ্রমিকেরা তো মানুষ, তাঁদের যেহেতু মন আছে, সেহেতু তাঁদেরও উৎসাহের দরকার আছে। মজুরি নির্ধারণে এই দিকটি বিবেচনা করা দরকার।’ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, শ্রমিকেরা যেহেতু মানুষ, সেহেতু অর্থনীতিতে বা কর্মক্ষেত্রে তাঁরা কীভাবে সম্পৃক্ত থাকেন এবং কত মজুরি পান, তার সঙ্গে উৎসাহিত হওয়ার সম্পর্ক আছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মজুরি নিয়ে আলোচনায় বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। পোশাকশ্রমিকরাই মূল চালিকাশক্তি। সে কারণে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে, অন্যথায় এই ঝগড়া চিরস্থায়ী হবে।

(ছবি: ইন্টারনেট)

ড. রেহমান সোবহান আরও বলেন, বাংলাদেশ একটি পোশাক রপ্তানি করে যে ৫ ডলার আয় করছে তা থেকে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সেটি যারা ২০ ডলারে বিক্রি করে ১৫ ডলার আয় করছে, তাদের বিষয়টি আলোচনায় আসছে না। পোশাকটি ওয়ালমার্ট বিক্রি করছে ২০ ডলারে। ১৫ ডলার লাভের অংশে শ্রমিকের পাওনা কতটুকু সেই বিষয়টি কখনোই আলোচনায় আসছে না সেভাবে। আমরাও করিনি, আন্তর্জাতিক মহলও সেটা আলোচনায় আনেনি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে।

শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ব্যাপারে দ্বৈতনীতি অনুসরণ করে বলে অভিযোগ করেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর কথা বলে, অথচ মূল্য বাড়ানোর কথা বললে এড়িয়ে যায়। আপনারা কমপ্লায়েন্সের কথা বলবেন, আবার প্রাইসের কথা আসলে বলেন, প্রাইস হল ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে কমপিটিটিভ বিষয়। তাহলে আপনাদের অধিকার নাই এ বিষয়ে কথা বলার।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আইএলওর ডিজির সঙ্গে আমি একাধিকবার কথা বলেছি। আপনারা শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কথা বলেন। আপনারা এক পেনি বাড়ালে এই পেনিই শ্রমিকরা পাবে, সেটা আমার মালিকরা নিশ্চিত করবে। কিন্তু তারা (বিদেশি ক্রেতা) সেটা করে না। তাদের কাছে ব্যবসাটাই মুখ্য। আমার শ্রমিকরা ভালো আছে না খারাপ আছে সেটা তারা মুখে বলে। কিন্তু যখন টাকা লাগবে, মূল্য বৃদ্ধির প্রশ্ন এলে তারা সেটি এড়িয়ে যায়।

ছবি: ইন্টারনেট

সম্প্রতি বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের দাম ও চাহিদা দুটোই কমেছে বলে জানান বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। এজন্য মজুরি কাঠামোতে `ভারসাম্য ’ রাখার ওপর জোর দেন তিনি।

তিনি বলেন, আপনার যদি সক্ষমতা না থাকে, তাইলে বেতন যতই বাড়ান, আস্তে আস্তে যদি ইন্ড্রাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে লাভটা কি হবে?

মজুরি কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের অনুপস্থিতির বিষয়ে ইংগিত করে তিনি বলেন, এখানে মূল স্টেকহোল্ডার বায়ার, তারা এখানে অনুপস্থিত। এখানে শ্রমিক, মালিক, সিভিল সোসাইটি আছি। কিন্তু যারা ১৫ ডলার নিয়ে যাচ্ছে তারা কিন্তু এখানে অনুপস্থিত। আমরাও মনে করি তাদের এর অংশ হওয়া উচিত।

শ্রমিকনেতা মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা আরও বাড়াতে হলে তাঁর স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। শ্রমিক এলাকায় সন্ধ্যার সময় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। তিনি আরও বলেন, শ্রমিক অঞ্চলের বাড়ির মালিকেরা ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ করেন। তাই শ্রমিকদের মজুরি বাড়লেও লাভ হবে না, অতিরিক্ত মজুরি বাড়ির মালিকের পকেটে যাবে। সে জন্য তিনি আইন অনুযায়ী এলাকাভেদে বাড়ি নির্ধারণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

 

সিপিডির সম্মনিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এই সংলাপে উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.