ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে যে ক’জন কিংবদন্তি শিল্পী আছেন, তাদের মধ্যে আশা ভোঁসলের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে নিঃসন্দেহে। প্রায় ৮০০ ভারতীয় ভিন্ন ভিন্ন চলচ্চিত্রে ১২ হাজারেরও বেশি গানে কন্ঠ দিয়ে গড়েছেন অনন্য রেকর্ড। অগ্রজ লতা মঙ্গেশকরের সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছেন সেই পঞ্চাশের দশক থেকে। বহুমূখী ধারায় নিজের স্বকীয়তা গড়েছেন যুগে যুগে। সময়ের সাথে নিজেকে করেছেন আরো পরীক্ষিত। বিভিন্ন ধারার গানে কন্ঠ দিয়ে শুধু শ্রোতাদেরই নয়, মুগ্ধ করেছেন বিশ্বের নানান সংগীতজ্ঞ ও সঙ্গীত বোদ্ধাদের। প্লে ব্যাক গানের জন্য বিখ্যাত হলেও, আশা ভোঁসলে নিজ গায়কী মেধা, প্রজ্ঞা ও পরিশ্রমে হয়েছেন সংগীতের অনন্য মহারথী। ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া আশা ভোঁসলে প্রায় ৭০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নিজেকে ভেঙ্গেছেন, গড়েছেন নানা ভাবে।

আশা ভোঁসলে
বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের হাত ধরে প্লেব্যাক সংগীত জীবনে প্রবেশ করেন আশা ভোঁসলে। তাঁর সংগীত জীবনের শুরু ১৯৪৩ সালে। প্রথম প্লে-ব্যাক করেন মারাঠি ছবিতে। প্রথম এককভাবে হিন্দি গানে কণ্ঠ দেন ১৯৪৯ সালে। ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক গানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেন বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে। যে গানের শিরোনাম ছিলো ‘স্বপন আয়া।’ এই গান দিয়েই আশার শক্তিশালী কন্ঠ সবার নজরে আসে। ১৯৫০ সালে তখনকার অন্যতম সেরা শিল্পী গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর এবং শমসাদ বেগমের ফিরিয়ে দেয়া প্রস্তাব আসে আশার কাছে। তাঁর বেশীরভাগ গানেরই প্রস্তাব আসে তখন বলিউডের বি-গ্রেড, সি-গ্রেড চলচ্চিত্র থেকে। ওপরে ওঠার জন্য এসব তাকে আরো কঠিন অধ্যবসায়ের মধ্যে নিয়ে আসে।
তাঁর সাধনা এবং কঠিন পরিশ্রম এর মূল্য আসে ১৯৫৬ সালের ‘সিআইডি’ ছবিতে প্লে ব্যাকের মধ্য দিয়ে। ও পি নায়ারের পৃষ্ঠপোষকতায় আশা আরো বড় বড় কাজের প্রস্তাব পেতে থাকেন, এবং ধারাবাহিক ভাবে সেসব কাজ হিট তকমা পেতে থাকে। ১৯৫৭ সালের ‘নয়া দৌড়’ ছবিতে প্রথমবারের মত সফলতার স্বাদ পান আশা। ও পি নয়্যার এর সাথে আশা আরো অনেক হিট গান উপহার দেন। এর মধ্যে ‘আইয়ে মেহেরবান’, ‘দিওয়ানা হুয়া বাদল’, ইশারো ইশারো ম্যায়’, ‘আও হুজুর তুমকো’, ‘উদে জাব জাব জুলফে তেরি’ অন্যতম।

আশা ভোঁসলে ও রাহুল দেব বর্মণ। (ছবি-সংগৃহিত)
এসব গানের ব্যাপক সফলতার পর সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মণের নজরে পড়েন আশা। আশা এবং এস ডি বর্মণ মিলে অসংখ্য হিট প্লেব্যাক গানের কাজ করেন। এসবের মধ্যে ‘কালাপানি’, ‘কালা বাজার’, ‘ইনসান জাগ উঠা’, ‘লাজান্তি’, ‘সুজাতা’ ও ‘তিন দেবীয়া’ ছবি অন্যতম। এসব ছবির গানে আশার সাথে মোহাম্মদ রাফি ও কিশোর কুমারের দ্বৈত গান গুলো সবচেয়ে বেশী হিট তকমা পেয়েছিল। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আশা এবং আর ডি বর্মণের কাজের মধ্য দিয়ে আশা তার ক্যারিয়ারের মধ্য গগণে অবস্থান নেন।
আশা আর রাহুল দেব বর্মণ (পঞ্চম) জুটি অসংখ্য জনপ্রিয় সংগীত উপহার দিয়েছেন ভারতীয় সংগীত ধারায়। রাহুলের সুরে আশা যেন সংগীতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন শ্রোতাদের সামনে। সংগীতের প্রেম দুজনের ব্যক্তিগত জীবনকেও প্রভাবিত করেছিল। ১৯৮০ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

মাদাম তুসো জাদুঘরে আশা ভোসলের মোমের মুর্তির পাশে আশা ভোসলে নিজে। (ছবি-সংগৃহিত)
আশা ভোঁসলে তখনকার ডান্স কুইন হেলেনের অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠেন। তাঁর গায়কীতে হেলেন নিজের নাচের কোরিওগ্রাফি খুঁজতেন। হেলেন প্রায়ই তাঁর রেকর্ডিং স্টুডিওতে এসে তার গানের ভেতর দিয়ে নিজেকে অনুভব করতেন এবং নাচের মুদ্রাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে বুঝতে চাইতেন।
[ আরো পড়ুন: জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না ]
আশা-হেলেন জুটির ১৯৬৬ সালের ‘তেসরি মানজিল’ ছবির ‘ও হাসিনা জুলফো ওয়ালি’, ১৯৭১ এর ‘ক্যারাভান’ ছবির ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ১৯৭৮ সালের ‘ডন’ ছবিতে ‘ইয়ে মেরা দিল’ গানগুলো চিরসবুজ গান হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে। এছাড়াও ১৯৭২ এর ‘জাওয়ানি দিওয়ানি’ ছবির ‘জানে জা’ গানটি তাকে খুব সহজেই সবার কাছে সমান ভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণা’ ছবির ‘দম মারো দম’ গানটি তার মেধার অন্য এক রূপ প্রকাশ করেছে। ‘ইয়াদুন কি বারাত’ ছবির ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’ গানটি শতাব্দীর সেরা রোমান্টিক গানের তালিকায় আছে।

বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের সাথে। (ছবি-সংগৃহিত)
আশা ভোঁসলে সমানতালে গান করেছেন বিভিন্ন ধারায়। প্রথম বাংলা গান করেন ১৯৫৮ সালে। মান্না দে’র সংগীতায়োজনে তার সাথে দ্বৈত কন্ঠ দেন বিনোদ চট্টোপাধ্যায়। পরের বছরেই পূজো উৎসবের জন্য মান্না দে’র সঙ্গীতে গান করেন আশা। তিনি প্রচুর পূজোর গান করেন বাংলায়। সত্তরের দশকের মাঝামঝিতে সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষের সংগীতে আশা ঘনঘন বাংলায় গান করতে থাকেন। ১৯৭৫ সালে কিশোর কুমারের সাথে ‘সারা পেয়ার তুমহারা’ বাংলা ভার্সনে গেয়েছেন একই শিরোনামে। ১৯৮১ সালে কিশোর কুমারের সাথে গেয়েছেন ‘আধো আলো ছায়াতে’। ১৯৮২ সালে দেবশ্রি রায়ের জন্য ‘ত্রয়ী’ ছবিতে গেয়েছেন ‘কথা হয়েছিলো’। ১৯৮৬ সালে বাপ্পী লাহিড়ির সংগীত পরিচালনায় কিশোর কুমারের সাথে গেয়েছেন ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’। ২০১৪ সালে তাঁর স্বামী আর ডি বর্মণের সম্মানে তাঁর ৭৫ তম জন্ম বার্ষিকীতে করেন ‘পঞ্চম তুমি কোথায়’ নামের নতুন এলবাম করেন। যার ৮টি গানই আর ডি বর্মণের কম্পোজ করা। এছাড়াও আশা ৮১ বছর বয়সে, ২০১৪ সালে বাংলা ছবি ‘পারাপার’এ কন্ঠ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে আশা ভোঁসলে । (ছবি-সংগৃহিত)
১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’ ছবিতে গজল গেয়ে আশা সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করেন। তিনি প্রমাণ করেন, তিনি অন্য সকল ধারার মতই যে কোন ক্লাসিক্যাল ধারাতেই গান করতে পারেন।
বলিউডের মূলধারায় যখন আশা গান করেন, তখন তাকে তাঁর বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের সাথে লড়াই করতে হয়েছে এবং আশা তাঁর নিজস্বতা দিয়ে একদম ভিন্ন একটি অবস্থান তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন। আশা একাধারে ক্লাসিক্যাল, ওয়েস্টার্ন প্রভাবিত গানের পাশাপাশি পপ, সরাই, গজল পর্যন্ত গেয়েছেন। আশা তাঁর বহুমূখী গানের ধারা দিয়ে বোনের ছায়া থেকে বের হয়ে এসেছেন। নিজেকে বারবার পরীক্ষানিরীক্ষা করে দর্শককে সবসময় ভিন্ন কিছু দিয়েছে একই সাথে।

আশা’জ রেস্টুরেন্ট, দুবাই। (ছবি-সংগৃহিত)
সংগীতের পাশাপাশি আশা রান্নায় বেশ পারদর্শী। তার পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মী’রা তার রান্নায় সবসবময় পঞ্চমুখ। বিশেষ করে তার বানানো চিংড়ির পিঠা ও পায়া কারির জন্য তার প্রশংসা সুদূরপ্রসারী। রান্না ও খাবারের প্রতি ভালোবাসায় ভর দিয়েই আশা দুবাই, বাহরাইন, কাতার, আবুধাবী, কুয়েত এবং ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারে আশা’জ নামে নিজের রেস্টুরেন্ট খোলেন। আশার শৈশবের প্রিয় খাবার, আর ডি বর্মণের প্রিয় খাবার গুলোই সেখানে বিশেষ করে পরিবেশন করা হয়। সাথে আশা’র সবসময়ের জনপ্রিয় গানগুলো বাজতে থাকে।

রেস্টুরেন্টে আশা’র পছন্দের খাবার গুলো পরিবেশন করা হয় বিশেষ ভাবে। (ছবি-সংগৃহিত)
আশা ভোঁসলে গানের পাশাপাশি অভিনয় করেছেন ‘মাই’ নামের একটি চলচ্চিত্রেও। এটি পরিচালনা করেন মহেশ কদিয়াল। অনুপম খের, রাম কাপুর এবং পদ্মিনি ছিলেন অন্যান্য চরিত্রে। আশা ভোঁসলে টাইটেল শিরোনামেই অভিনয় করেন এই ছবিতে।

আশা ভোঁসলে অভিনীত ‘মাই’ চলচ্চিত্রের পোস্টার। (ছবি-সংগৃহিত)
আশা ভোঁসলে তাঁর মেধার বিচ্ছূরণ ঘটিয়েছেন তাঁর বহুমূখী প্রতিভা দিয়ে। তারই ধারাবাহিকতায় পেয়েছেন সম্মান, অসংখ্য পুরস্কার। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ফিল্ম ফেয়ার এওয়ার্ড পেয়েছেন ৭ বার। নবীনদের সুযোগ দেয়ার জন্য এরপর তিনি জানান, তাঁর নাম যেন আর ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য গণ্য করা না হয়। ২০০১ সালে ফিল্ম ফেয়ার এওয়ার্ডে আজীবন সম্মাননা লাভ করেন আশা। ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালে ন্যাশনাল এওয়ার্ড পান ‘দিল চিজ কিয়া হ্যায়’, ‘মেরি কুচ সামান’ গানের জন্য। ১৯৮৭ সালে পান নাইটেঙ্গল এশিয়া এওয়ার্ড। ১৯৭৭ সালে এশিয়ার প্রথম শিল্পী হিসেবে গ্রামি এওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হন। ২০০২ সালে বিবিসি’র আজীবন সম্মাননা পান। ২০০২ সালে ‘লাগান’ চলচ্চিত্রের ‘রাধা ক্যায়সে না জানে’ গানের জন্য আইফা এওয়ার্ড অর্জন করেন। এছাড়াও ১৭ বার মহারাষ্ট্র স্টেট এওয়ার্ড পান। ২০০২ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্র চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার পান আশা। ২০১১ সালে গিনেস কতৃপক্ষ সংগীত ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী গানের রেকর্ডের জন্য আশার নাম ঘোষণা করে।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান করে নিয়েছেন আশা ভোসলে। (ছবি-সংগৃহিত)
বিশ্ব সংগীতের অনন্য সারথির নাম আশা ভোঁসলে। বিশ্বব্যাপী আলো ছড়িয়েছেন গানের ভেলায় চড়ে। যুগের পর যুগ সেই রথ চলছেই, আরো মোহাবিষ্ট করার প্রয়াসের নামই যেন আশা ভোঁসলে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কোটি ভক্তের হৃদয়ে এই জীবন্ত কিংবদন্তি বেঁচে থাকবেন সুরের ডানায় ভর করে।
বাঙালীয়ানা/টিএইচ/এসএল/জেএইচ