খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না । কামরুল নাজিম

Comments

১।
‘তোদের সমস্যা কি জানিস, তোরা খেলার সাথে রাজনীতি মিশিয়ে ফেলোস। আমি ওসব রাজনৈতিক ঝামেলা খেলায় আনি না। আর মুসলমান হিসেবে পাকিস্তানের সাপোর্ট আমি করতেই পারি, তুই বাঁধা দেয়ার কে? ডান্ডি পান্ডি মালাউনের সাপোর্ট তো আর আমি করছি না’, নজীবের কণ্ঠস্বর এভাবেই গর্জে উঠে।

টঙ দোকান ঘরটিতে প্রবেশ করতেই এসব শুনে শফিক। নজীবের কথা কাটাকাটি চলে মোক্তারের সাথে। মোক্তার বলে, ‘পাকিস্থানের সাথে হনুলুলুর খেলা হলেও আমি পাকিস্তানের সাপোর্ট করবো না।’ মোক্তারের কথা শুনে হাসির রোল পড়ে যায় সর্বত্রই। নজীব আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে তখন।

শফিক দু’জনকেই থামায়। বলে, ‘চা খাবি তোরা?’ এই বলেই চায়ের অর্ডার করে শফিক। শফিকের মুখে হাসি। ঠোঁট নেড়ে একবার শুধু বলে, ‘হনুলুনু।’ বলে আবার হাসে।
নজিব বলে, ‘ভাই, আমি চা খবো না।’ তার চোখেমুখে রাগ। শফিক আবারো হাসে। একেবারে অট্টহাসি। তারপর হাসি থামিয়ে বলে, ‘আচ্ছা, নজিব, শোন তাহলে! আমি তোরে খেলার কথাই বলি।’ খুব ঠান্ডা মাথায় কথাটা বলে শফিক।

‘রকিবুল হাসান অনেক ভালো খেলতো তখন। রকিবুল হাসানকে চিনিস তো! ওই যে টকশো’তে আসে মাঝে মাঝে। ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা করে। তখন রকিবুল হাসান ঘরোয়া লীগে সেরা পারফরমারদের একজন ছিল। কিন্তু, তবুও পাকিস্তান দলে জায়গা পেত না। কেন জানিস?’
‘কেন ভাই?’, আস্তে করে বললো নজিব।
‘কারন সে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ক্রিকেটার। ৬৯-৭০ সালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট দলে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছিল একবার। এরপরে পাকিস্তানের হয়ে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছে ১৯৭১ সালে। ২৬ ফেব্রুয়ারী ছিল সেদিন। পাকিস্তান বনাম কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যকার অনানুষ্ঠানিক টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিন। পাকিস্তানি খেলোয়াড়েরা ব্যাটে তলোয়ারের স্টিকার লাগিয়ে ব্যাট করতে নেমেছিলো। তলোয়ার ছিল ভুট্টো’র পিপিপির নির্বাচনী প্রতীক। কিন্তু রকিবুল কি করেছে সেদিন জানিস? তোর মতই ১৮ বা ১৯ বছর বয়স ছিল তার৷ কিন্তু সে ছিল একটা সত্যিকারের বাঘের বাচ্চা। তাই ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার লাগিয়ে ব্যাট উঁচিয়ে ধরে মাঠে নেমেছে। এই বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে কেবল একটা আঠারো বছরের বাঙালী ছেলেও কি আগুন পুষে রাখে নিজের ভিতর। তারপর কি হয়েছে জানিস?’
‘কী হয়েছে?’, নজীবের ছোট্ট জিজ্ঞাসা।

খেলা শেষ হলে পাকিস্তান দলের টিম ম্যানেজার রকিবুলকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘তুমি কি করেছো তুমি জানো?’ রকিবুল তখন উত্তর দিয়েছিল, ‘যা করেছি বুঝে শুনে করেছি, আমি কোন ভুল করিনি।’ রকিবুল পরে আর কোন দিন পাকিস্তান দলে চান্স পায়নি।

নজিব বলেলো, ‘ভাই, ঐসব তো পলিটিকাল ব্যাপার স্যাপার ছিল।’
‘হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস। তাহলে এবার বোঝ এই খেলাটার ভিতরেই কত রাজনীতি লুকিয়ে থাকে’, শফিক বললো।

শোন নজিব, ‘আমাদের ক্রিকেটার আরোও ছিল। কিন্তু তারা কোনদিন পাকিস্তান দলের হয়ে খেলতে নামার সুযোগ পায়নি। তবে তারা ঠিকই মাঠে নেমেছিল। একাত্তরে ব্যাটটাকেই স্টেনগান বানিয়ে নিয়েছিল বাংলাদেশের হয়ে খেলবে বলে। জানিস, সেই মারকুটে ওপেনার জুয়েলের বাম হাতের তিনটে আঙুলই ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল পাকিস্থানী সেনাদের গুলিতে। জুয়েলকে যখন অপারেশন করে হাতের তিনটে আঙুলই কেটে ফেললো তখন জুয়েল কী বলেছিল জানিস? জুয়েল হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘ডাক্তার আপা, আমার এই কেটে ফেলা আঙুলগুলো যত্ন করে রাইখেন। দেশ স্বাধীন হলে আমি হবো স্বাধীন বাংলা ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন। আঙুলগুলো লাগবে তখন।’
তারপর একটু সুস্থ হয়েই জুয়েল আবার যুদ্ধে চলে গেল। দেশ স্বাধীন করতে হবে না! স্বাধীন বাংলা ক্রিকেট টিম গঠন করতে হবে তো। জুয়েল হবে সেই টিমের ক্যাপ্টেন কাম মারকুটে ওপেনার। জানিস, সেই জুয়েল, মোশতাকদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে আফ্রিদির পূর্ব পুরুষেরা।’

‘ওই যে, বিজয় দিবসের দিনে শহীদ জুয়েল একাদশ বনাম শহীদ মুশতাক একাদশ প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় না? হ্যাঁ, আমাদের সেই জুয়েল, আমাদের সেই মোশতাক। মারকুটে ক্র‍্যাকহেডেড ওপেনার!’

‘ভাই, আপনারা খেলার সাথে রাজনীতি মেশান কেন? ঐটা যুদ্ধ ছিল, এটা খেলা।’ নজীবের কণ্ঠে ভারী বিরক্তি।
‘কেন? তোর কেন মনে হচ্ছে না এই খেলাটায় অনেক বড় একটা রাজনীতি! এখানে জয়-পরাজয় দেশকেন্দ্রীক। এখানে উড়তে থাকা পতাকাটা লাল সবুজ বনাম ওই চাঁদ তারা।’
‘ধুর ভাই!’ নজীবের কণ্ঠে আবারো বিরক্তি।

২।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে ঢুকেই দেখে লিরার পোস্ট- ‘মিস ইউ আফ্রিদি। ইউ আর দ্য রিয়েল হিরো। উমমম….মা।’ শফিকের মেজাজটাই খারাপ হয়ে যায়। শালার! পাকি দালাল সর্বত্রই।

শফিক সেখানে কমেন্টস করে, ‘আফ্রিদির দাদা একাত্তরে আমার দাদীরে জোর করে ধর্ষণ করেছিল। আমার ছোট দাদার কলিজাটা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে এনেছে।’

লিরা রিপ্লাই দেয়, ‘হোয়াট দ্য হেল? আই হেইট পলিটিক্স।’

লিরার রিপ্লাইয়ে আটাশটা লাভ রিয়েক্ট। আর শফিকের মন্তব্যে যে তেরোটা রিয়েক্ট তার মধ্যে দশটাই হাহা, একটা অ্যাংরি অন্য দুটো লাভ।

আরো আগে ইমরান খান যখন পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিল, লিরা তখনো ইমরান খানের ছবি পোস্ট করে লিখেছিল, ‘হ্যান্ডসাম ফরএভার’। শফিক তখনও কমেন্ট করেছিল, ইমরান খান হচ্ছে জেনারেল নিয়াজীর ভাতিজা। একটা রেপিস্ট, বদমাইশের রক্তকে নিয়ে এত উচ্ছ্বসিত কেন বুঝতে পারি না। লিরা রিপ্লাই না দিলেও সে কমেন্টে অ্যাংরি রিয়েক্ট করেছিল।

শফিক এখনো বুঝতে পারে না, জেনে বুঝে পাকিস্তানের মত একটা দেশের সমর্থন কীভাবে বাংলার মানুষেরা করতে পারে!

৩।
স্থানীয় টুর্নামেন্টে সেমিফাইনালে উঠেছে শফিকদের ‘অল স্টার ক্রিকেট একাদশ’। নজিব আবার শফিকের দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। সেমিফাইনালে তাদের খেলা পড়েছে পাশের এলাকার ‘ইয়ং স্টার একাদশের’ সাথে। ইয়ং স্টারও অনেক শক্তিশালী দল। তাদেরকে হারিয়ে ফাইনালে যাওয়াটা কষ্টকর হবে। শফিকের মাথায় এখন কেবলই সেমিফাইনালের ম্যাচ। দলের শক্তি বাড়াতে হবে। ইয়ং স্টারকে হারাতেই হবে।

সেই চিন্তা থেকেই সেমিফাইনাল ম্যাচে শফিক হায়ার করে নিয়ে আসলো পাশের গ্রাম নোয়াপাড়ার তানভীরকে। অনেক বড় বড় ছক্কা মারার সুখ্যাতি রয়েছে তানভীরের।
কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে তানভীর আসা মাত্রই অপ্রত্যাশিত বিপত্তিটা ঘটলো।

তানভীরকে দেখামাত্রই তেলে-জলে জ্বলে উঠলো নজিব। যদিও তানভীরকে নিয়ে আসার বিষয়টি আগেই সবাইকে জানিয়েছিল শফিক। তখন কিছু না বললেও এখন পুরো বিগড়ে গিয়েছে নজিব। তানভীর খেললে সে খেলবে না, সাফ জানিয়ে দিল সে। কিন্তু কেন খেলবে না, সেটা বলছে না।

সেই অজানাটা খুব ভালোই জানা শফিকের। তবুও সে জানতে চায়। শেষ পর্যন্ত সোহেলের কাছ থেকে জানা যায় মূল ঘটনা।
নজিবের বোন লিরাকে নাকি খুব উত্যক্ত করতো তানভীর। কিন্তু লিরা তাকে পাত্তা দিত না। কিছুদিন আগে লিরাকে পথ আগলে প্রপোজ করে তানভীর। লিরা তখন তানভীরকে অমানুষের বাচ্ছা বলে গালী দিয়ে জুটাপেটা করবে বলেছে। জন্মের ঘাড়ত্যাড়া তানভীর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এতে। আজেবাজে অনেক কথা বলে জনসন্মুখেই নাকি লিরার হাত টেনে ধরে সে। এটা নিয়ে পরবর্তীতে অনেক কিছুই হয়েছে দু’পরিবারের মধ্যে।
কিন্তু তানভীর এখন কুল থাকার চেষ্টা করে। এই ঘটনাটা সে স্বীকারই করে না। এমন ভাব নেই যেন এই ব্যাপারে সে কিছুই জানে না।

নজিব পারলে এখনই খুন করে ফেলে তানভীরকে। রাগে গজরাতে গজরাতে সে বলে, কোন অমানুষের বাচ্চার সাথে একই দলে আমি খেলবো না। তানভীর এই কথাটা শুনতে পায়। সেও পালটা মন্তব্য করে নজিবের উদ্দেশ্যে। নজিব স্ট্যাম্প হাতে তেড়ে আসে তানভীরের দিকে।

শফিক দৌঁড়ে এসে নজিবের পথ আগলায়। নজিবকে সে কোনভাবেও থামাতে পারছে না। শফিক বলে-
দেখ নজিব, ওটা তোদের মধ্যকার ঝামেলা, তোদের পারিবারিক রাজনীতি। এটা আমাদের সেমিফাইনালের খেলা। খেলার সাথে একদম রাজনীতি মিশাবি না।

 

লেখক পরিচিতি:

কামরুল নাজিম, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.