৪২ বছর বয়সী মিসেস রহিমা একজন হাই স্কুল শিক্ষিকা। শারীরিক অসুস্থতা বলতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানা ছেড়ে দাঁড়ালেন, বুঝতে পারলেন মাথাটা খুব হালকা হয়ে গেছে, লক্ষ্য করলেন আশেপাশের সবকিছু ঘুরছে, মাথার উপরে তাকালেন দেখলেন সিলিং ঘুরছে ! বমি বমি ভাব এবং শেষপর্যন্ত অজ্ঞান হওয়ার মত অবস্থা। তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিছনে বিছানায় পড়ে গেলেন, বাসায় সমস্যাটা দেখা দেয়ায় তিনি দ্রুত পরিবারের বাকি সবার সাহায্যটা পেলেন। মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করা হল, কিছুক্ষণ পর তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। সেই দিন তিনি স্কুল থেকে ছুটি নিলেন।
পরের দিন স্কুলে গেলেন। দুপুরের দিকে ক্লাস নিচ্ছিলেন, বোর্ডে লিখছিলেন, সামনে থাকা টেবিলের উপর থেকে ডাস্টার নেয়ার জন্য পিছনে ঘুরে হাত বাড়ালেন। হঠাৎ তিনি আজকেও গতকালের মত অবস্থা বোধ করলেন! আবার সেই গতকালের মত মাথা হালকা হওয়া, বমি বমি ভাব সাথে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এবারও তিনি মাথা ঘুরে পরে গেলেন এবং শক্ত মেঝেতে পরার কারণে মাথায় হালকা আঘাত পেলেন। এবারেও আশেপাশে শিক্ষার্থী থাকার কারণে তাদের সহযোগিতায় উনাকে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল এবং আগের মতই তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন ঊনি ডিজিনেস বা মাথা ঘোরায় ভুগছেন ।
উপরের চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও উল্লেখিত সমস্যাগুলোর সাথে প্রায়শই আমরা বা আমাদের কাছের কেঊ না কেঊ সম্মুখীন হচ্ছেন। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় মাথা ঘোরা জনিত সমস্যার দরুণ যে পরিমাণ রোগী চিকিৎসকের নিকট শরণাপন্ন হন তার সংখ্যাটামাথা ব্যথা জনিত সমস্যার ঠিক পরেই। সমস্যাটা শুধুমাত্র রোগী বা তার স্বজনদের উদ্বিগ্ন করে না সাথে সাথে চিকিৎসকদের কাছেও সমস্যাটা উদ্বিগ্নের। সাধারণত ডিজিনেস বা মাথা ঘোরা সমস্যা থেকে আক্রান্ত ব্যক্তি খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন এবং অনেকক্ষেত্রেই সামান্য কিছু ওষুধ আর কিছু নিয়ম মেনে চললেই ডিজিনেস থেকে আরোগ্য লাভ করা যায় কিন্তু কখনও কখনও এর পিছনে লুকিয়ে থাকে ভয়ঙ্কর রোগ। সাধারণত ডিজিনেস হওয়ার পিছনে যে কারণগুলোকে দায়ী করা হয় সেগুলো হল- মাইগ্রেন, কিছু কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে, কানের ভিতরে ইনফেকশন ( কানের ভিতরে যে অংশে আমাদের দেহের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়) যেমন মিনাইএর্যাস রোগ,হঠাৎ রক্ত চাপ কমে যাওয়া ( লো ব্লাড প্রেসার ), হৃদরোগ, উদ্বিগ্নতা, হাইপোগ্ল্যাইসেমিয়া, রক্তশূন্যতা,পানি শূন্যতা, হিট স্ট্রোক, অতিরিক্ত শারীরিক শ্রম। এছাড়াও কখনও কখনও ব্রেইন টিউমার বা ব্রেইনের অন্য কোন রোগের উপসর্গ হিসেবেও হতে পারে। তবে ভয় পাবেন না, শারীরিক অতিরিক্ত শ্রমজনিত দূর্বলতা অথবা পানি শূন্যতা জনিত কারণে যদি ডিজিনেস হয় তাহলে ঘাবড়াবেন না। কিন্তু যদি আপনি আপনার মধ্যে উপরোক্ত শারীরিক উপসর্গগুলো নিয়মিত দেখা দিতে থাকে তাহলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের সরণাপন্ন হোন, বিশেষ করে একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আর আপনার আপনজন বা পাশের সহকর্মী যদি ডিজিনেস বা মাথা ঘোরানো সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তার প্রতি অবশ্যই খেয়াল রাখবেন বিশেষ করে তিনি যদি মোটর বাইক বা অন্যান্য কোন গাড়ি ড্রাইভিং করেন।
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, যদি কেউ মাথা ঘুরে পড়ে যায় তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাবার স্যালাইন খেতে দেয়া হয় এমনকি আরেকটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো কখনও কখনও হাতুঁড়ে ডাক্তারদের দ্বারা মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া রোগীকে কোন পরীক্ষা-নিরিক্ষা না করেই ইন্ট্রাভেনাস মাধ্যম দিয়ে স্যালাইন প্রবেশ করানো। মনে রাখবেন, এ ধরণের অপচিকিৎসা রোগীর জন্য ভয়ানক বিপদ ডেকে আনতে পারে এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
তাই আজ থেকেই সচেতন হোন ডিজিনেস বা মাথা ঘোরানো থেকে, মনে রাখবেন এটা সামান্য সমস্যা হলেও, ঘন ঘন একই সমস্যা হওয়া পরবর্তীতে অন্য কোন বড় রোগের ইংগিত প্রকাশ করে থাকতে পারে!
তথ্যসূত্রঃ
১. হেলথলাইন ডট কম
২. mayoclinic
৩. Population epidemiological study on the prevalence of dizziness in the city of São Paulo
লেখক:
বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি(৩য় বর্ষ), বিএইচপিআই, সিআরপি, সাভার

